চাকরি হারানোর ঝুঁকি সামলাতে ‘ক্যারিয়ার কুশনিং’ কীভাবে কাজে আসে

একসময় চাকরি খোঁজার অর্থ ছিল, কেউ চাকরি বদলাতে চাইছেন, নয়তো বর্তমান কর্মস্থলে কোনো সমস্যা হয়েছে। বসের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না, বেতন কম, কাজের পরিবেশ ভালো নয় কিংবা ক্যারিয়ারে সামনে এগোনোর সুযোগ নেই; এ ধরনের কারণেই অনেকে নতুন চাকরির জন্য আবেদন করতেন।
কিন্তু এখন চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। অনেকেই চাকরি ছাড়ার কথা ভাবছেন না, বর্তমান কর্মস্থল নিয়েও বড় কোনো অভিযোগ নেই। তারপরও নিয়মিত চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখছেন, পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, সিভি আপডেট করছেন কিংবা লিংকডইনের মতো পেশাগত প্ল্যাটফর্মে নিজের প্রোফাইল ঠিকঠাক রাখছেন।
এর পেছনে কাজ করছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। আর তা হলো, ‘চাকরিটা আগামী বছরও থাকবে তো?’
বিশ্বজুড়ে এই প্রবণতাকে বলা হচ্ছে ‘ক্যারিয়ার কুশনিং’। সহজ ভাষায়, বর্তমান চাকরিতে থাকা অবস্থাতেই ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করে রাখা। চাকরির বাজারে পরিবর্তন, খরচ কমানোর চাপ কিংবা নিয়োগের অনিশ্চয়তার কারণে এই প্রবণতা অনেক পেশাজীবীর কাছে ক্যারিয়ারের দৌড়ে টিকে থাকার কৌশল হয়ে উঠছে।
তবু কেন অনিশ্চয়তা
তরুণদের জন্য ভালো চাকরি পাওয়া সহজ নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি পদের বিপরীতে অনেক আবেদনকারী থাকেন। ফলে একবার চাকরি পাওয়ার পর সেটি ধরে রাখার বিষয়টিও অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক চাপ। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, পরিবারের দায়িত্ব বাড়ছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পরিস্থিতিও সবসময় স্থিতিশীল নয়। ফলে চাকরিতে ভালো অবস্থানে থাকলেও কর্মীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না।
আবার, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানে হঠাৎ কর্মী ছাঁটাই হয়েছে’—এমন খবরও কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ কমে গেলে বা ব্যবসা ছোট হয়ে এলে অন্য কর্মীরাও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। এখানেই ক্যারিয়ার কুশনিংয়ের বিষয়টি সামনে আসে।
ধরা যাক, ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন লামিয়া। নিজের চাকরি নিয়ে তিনি মোটামুটি সন্তুষ্ট। কিন্তু দেখতে পাচ্ছেন, গত কয়েক মাসে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ আগের তুলনায় কমেছে। কিছু পদ খালি থাকার পরও নতুন কর্মী নেওয়া হয়নি। ফলে লামিয়া বুঝতে পারছেন না, সামনে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে। তাই চাকরি ছাড়ছেন না, আবার চুপচাপ বসেও থাকছেন না। সপ্তাহে একদিন চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখছেন, নিজের সিভি ঠিকঠাক করে আবেদন করছেন।
এ ধরনের প্রস্তুতি কর্মীর মনে কিছুটা স্বস্তি তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে কোনো পরিবর্তন এলে অন্তত তিনি একেবারে অপ্রস্তুত থাকবেন না।
প্রস্তুতি ভালো, কিন্তু অতিরিক্ত চিন্তা নয়
ক্যারিয়ার কুশনিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি কর্মীদের নিজের ক্যারিয়ার সম্পর্কে সচেতন করে। বর্তমান চাকরি ভালো চলছে বলে ভবিষ্যৎ নিয়ে একেবারে ভাবতে হবে না এমন ধারণা এখন অনেকের কাছেই বাস্তবসম্মত নয়।
সিভি নিয়মিত আপডেট করা, নতুন দক্ষতা শেখা, পেশাগত পরিচিতি বাড়ানো কিংবা চাকরির বাজারে নিজের দক্ষতার মূল্য সম্পর্কে ধারণা রাখা—এসব ইতিবাচক বিষয়। এমনকি নতুন চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখলেও যে চাকরি ছাড়তেই হবে, তা নয়। বরং একজন কর্মী জানতে পারেন, তাঁর দক্ষতার চাহিদা কোথায়। কোন দক্ষতা শিখলে ভবিষ্যতে আরও ভালো সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে যে বেতন পাচ্ছেন, সেটি তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার তুলনায় কেমন—সেটিও বোঝা সম্ভব।
তবে সমস্যা শুরু হয় যখন প্রস্তুতি ধীরে ধীরে দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা চাকরির সাইট ঘাঁটা, প্রতিষ্ঠানের ছোটখাটো পরিবর্তনকে ছাঁটাইয়ের সংকেত মনে করা কিংবা সহকর্মীর চলে যাওয়ার পর নিজের চাকরি নিয়েও আতঙ্কিত হয়ে পড়া; এসব মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। ফলে এর প্রভাব বর্তমান কাজেও পড়তে পারে।
ক্যারিয়ার কুশনিং-এর ভালো দিক কি নেই
বাংলাদেশের তরুণ পেশাজীবীদের জন্য ক্যারিয়ার কুশনিংয়ের সবচেয়ে কার্যকর দিক হতে পারে দক্ষতা বাড়ানো। শুধু নতুন চাকরির বিজ্ঞপ্তি খুঁজলেই চলবে না। নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে।
ডিজিটাল দক্ষতা, ইংরেজি শেখা, ডেটা বিশ্লেষণ, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা কিংবা নিজের পেশার সঙ্গে সম্পর্কিত নতুন কোনো দক্ষতা যে ক্ষেত্রেই হোক, শেখার অভ্যাস একজন কর্মীকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত রাখতে পারে।
একই সঙ্গে পেশাগত যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক সহকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, একই খাতের পেশাজীবী কিংবা পরিচিতদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখলে ভবিষ্যতে কাজের সুযোগ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সহজ হতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে চাকরি পেলেই আবার নতুন চাকরি খুঁজতে হবে। বরং বর্তমান চাকরিতে ভালো কাজ করার পাশাপাশি নিজের বিকল্প পথটিও সচল রাখা যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, ভয় বা দুশ্চিন্তায় পড়ে নিজের বর্তমান কাজকে হেলাফেলা করবে না। কোনো উড়োকথা শুনেই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই বছরের পর বছর একই জায়গায় আটকে থাকাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
ক্যারিয়ার কুশনিং তাই মূলত বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে ভারসাম্য রাখার বিষয়। এখানে বর্তমান চাকরিকে গুরুত্ব দেওয়া, পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখা দুটিই একসঙ্গে করা সম্ভব।
.png)

-7c29dd-256x144.webp)







