মুডিসের মূল্যায়ন আমাদের সাহসী করুক

আন্তর্জাতিক ঋণমান যাচাইকারী সংস্থা মুডিস বাংলাদেশ বিষয়ে সর্বশেষ যে মূল্যায়ন তুলে ধরেছে, সেটাকে ইতিবাচক বলে গ্রহণের অবকাশ রয়েছে বৈকি। মূল ঋণমান পূর্বাবস্থায় রাখলেও এর পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করাটা বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্বস্তিকর বলেই বর্ণিত হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতা মাথায় রেখেছে মুডিস। গণতান্ত্রিক নির্বাচনে সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার শংকা যেমন কমেছে; তেমনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সংস্কার আনয়নে ঝুঁকি কমেছে বলে তাদের মূল্যায়ন যথাযথ। অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ লুটপাটের শিকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে অনেক সময় নিয়েছিল। আর রাজনৈতিক সংস্কারেই তাদের আগ্রহ ছিল বেশি। এনবিআর সংস্কারে হাত দিয়েও তারা এগোতে পারেননি মূলত রাজনৈতিক দুর্বলতায়। আইএমএফের সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচিও ঝুলে পড়েছিল। নির্বাচিত সরকার নতুন ঋণ কর্মসূচিতে যাওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। এনবিআর সংস্কারের উদ্যোগও তাদের নিতে হবে। এর সঙ্গে মুডিসের মূল্যায়নে ঘুরেফিরে আসা রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতির প্রশ্নটি সম্পর্কিত।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা মুডিসের নজর স্বভাবতই এড়ায়নি। অন্তর্বর্তী শাসনামল থেকেই অবশ্য এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি হ্রাস এবং আস্থা পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে এনে পরিস্থিতি মোকাবিলা অব্যাহত রেখেছে বর্তমান সরকার। বাংলাদেশ এতটা খারাপ ঋণ পরিস্থিতিতে পড়ার কারণ মুডিসেরও নিশ্চয় জানা। দেশটি নজিরবিহীন অর্থ পাচারেরও শিকার হয়েছে, যার পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব। এ অবস্থায় সরকারি অর্থায়নে ব্যাংক টিকিয়ে রাখা কিংবা আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণও কঠিন। মুডিসের মূল্যায়নে ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের নির্ভরশীলতার চিত্রও উঠে এসেছে। এ মুহূর্তে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম বলে সংকট তীব্র না হলেও প্রবৃদ্ধি ধীরে বাড়তে থাকার প্রবণতা ধরা পড়েছে সংস্থাটির চোখে। এ ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি জ্বালানি ঘাটতি বাধা হিসেবে থাকার বিষয়ে মুডিসের পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও সবাই একমত হবেন।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা গেলেও এখনো সহনীয় হয়নি আর সহসা তা করার সুযোগও কম। তবে জ্বালানির বিদ্যমান কাঠামোকে শক্তিশালী করে এর আপাত সমাধানের একটা সুযোগ রয়েছে। সরকার এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিকল্পনাও পেশ করেছে, যা মুডিসের মতো সংস্থার নজর এড়ানোর কথা নয়। তাদের মূল্যায়ন অনুকূলে আসায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিদেশি ঋণেই আমরা সুবিধা পাব, তা নয়; প্রত্যাশিত খাতগুলোয় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও এগিয়ে যেতে পারব। বাংলাদেশ বিশেষত সমুদ্রে জ্বালানি সম্পদ আহরণে আন্তর্জাতিকভাবে সুনামের অধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ চায়, যা উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক হবে। দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও মুডিসের মতো সংস্থার মূল্যায়ন নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চাইবেন। ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ঝিমিয়ে পড়া কাজের বাজার চাঙ্গা করতে তাদের সাহসী ভূমিকাও আমরা দেখতে চাইব।
সংকটকালে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি আর তাতে প্রবাসী আয়ের জোরালো প্রবাহ মুডিসের নজর কেড়েছে। ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয়ের চাপ সামলাতে অবশ্য আমরা সংকটে পড়তে পারি, যদি রপ্তানি আয় স্থিতিশীলভাবে না বাড়ে। পোশাক খাত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরতার কাঠামোগত সংকট কিন্তু আমাদের রয়েই গেছে। ইরান যুদ্ধের অভিঘাতে জনশক্তি রপ্তানিতেও কিছুটা চাপে পড়ার শংকা রয়েছে। বন্যার চাপ, দুর্বল অবকাঠামো, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও আইনের শাসনে বাংলাদেশের সমস্যার কথাও তুলে ধরেছে মুডিস। এগুলো দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সুদৃষ্টি আকর্ষণের সুযোগ অনুপস্থিত। তবে মুডিসের মূল্যায়নে আশা করা যায় সমগোত্রীয় অন্যান্য প্রভাবশালী সংস্থার ইতিবাচক রেটিং পেতে আমাদের সুবিধা হবে। বাংলাদেশ গুরুতর সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে একাধিকবার। উন্নয়ন সহযোগী, বিদেশি ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সহায়তা; সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারক, দেশীয় উদ্যোক্তা এবং অন্যান্য অংশীজনের সম্মিলিত প্রয়াসে বাংলাদেশ বর্তমান সংকট থেকেও উত্তরণের দিকে যেতে সক্ষম হবে নিশ্চয়ই।
.png)
-40e58c.jpeg)

