ad

শিকারির খপ্পরে সাংবাদিকতা: ক্ষমতা, পুঁজি ও নজরদারির ব্যবচ্ছেদ

লেখা:
লেখা:
রুদ্র আল মুত্তাকিন

‘বাংলাদেশে শিকারি সাংবাদিকতা’ বইয়ের প্রচ্ছদ
‘বাংলাদেশে শিকারি সাংবাদিকতা’ বইয়ের প্রচ্ছদ

সাংবাদিকতার বিকাশের সঙ্গে ক্ষমতা, পুঁজি ও রাজনৈতিক প্রভাব একইসঙ্গে কাজ করেছে। যুগের সঙ্গে সাংবাদিকতা চর্চার ধরনও বদলেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংবাদ উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে, আবার তা কাটিয়েও উঠেছে। পুঁজির বিনিয়োগে সাংবাদিকতা বিস্তৃত ও প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী হয়েছে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও প্রভাব এবং সংবাদের ‘পণ্যায়ন’ও ঘটেছে। মুনাফা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা চর্চা সাংবাদিকতাকে দখল করেছে।

ওয়াচডগ থেকে ‘ল্যাপডগ’

আধুনিক সাংবাদিকতার শুরুর দিকে গণমাধ্যমকে ‘ওয়াচডগ’ ভূমিকায় প্রত্যাশা করা হতো। বলা হতো, গণমাধ্যম ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করবে, সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করবে। পঞ্চাশের দশকের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় সেটা ‘ল্যাপডগ’-এ পরিণত হয়। অর্থাৎ গণমাধ্যম ক্ষমতাসীন সরকার, রাজনৈতিক দল, করপোরেট গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমালোচনা না করে বরং তাদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং অনুগত আচরণ করে। ধীরে ধীরে তা সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও তা ঘটেছে।

আজকাল সংবাদকে ‘কনটেন্ট’ হিসেবে বলা বা দেখার চল হয়েছে। মূলধারার গণমাধ্যমকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্যও কনটেন্ট নির্মাণ করতে হচ্ছে। কোনটা সংবাদ আর কোনটা কনটেন্ট—ফারাক করা কষ্টসাধ্য কাজ। ফলে ‘পেশাগত সাংবাদিকতা’ নানা কাঠামোগত শর্তের ভেতর দিয়ে রূপান্তর হচ্ছে। বাংলাদেশে শিকারি সাংবাদিকতা বইয়ে এরকম আরও অনেক প্রবণতার কথা উল্লেখ আছে।

‘বাংলাদেশে শিকারি সাংবাদিকতা’ বইটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ আল মামুন এবং সহযোগী অধ্যাপক কাজী মামুন হায়দার লিখেছেন। আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিকতা চর্চার পর্যালোচনা করে নোয়াম চমস্কি ও এডোয়ার্ড এস হারম্যান লেখেন Manufacturing Consent: The Political Economy of the Mass Media। ‘সম্মতি উৎপাদন’ নামে বইটির অনুবাদ করেন অধ্যাপক আ আল মামুন।

লেখকদ্বয় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের গণমাধ্যম বিষয়ক ক্রিটিক্যাল লেখালেখি করে যাচ্ছেন। এই বইটিতে তাঁদের তত্ত্বগত বোঝাপড়া ও গবেষণাগত অভিজ্ঞতার ছাপ আছে। শিকারি সাংবাদিকতার প্রবণতাকে বিদ্যায়তনিক গবেষক হিসেবে না দেখে বরং বিষয়টিকে তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে বিশ্লেষণের চেষ্টাও রয়েছে। বইটি তাঁদের তত্ত্ব ও গবেষণার পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশও বলা যেতে পারে।

‘শিকারি সাংবাদিকতা’র জন্ম যেভাবে

প্রথমেই ‘শিকারি সাংবাদিকতা’ ধারণাটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। লেখকদ্বয় মনে করেন, কোনো রাষ্ট্রে দীর্ঘদিন স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ থাকার কারণে শিকারি সাংবাদিকতা চর্চার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এই সময়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বা গোয়েন্দা সংস্থার কোনো অংশ, তাদের নানা স্টেকহোল্ডার এবং সাংবাদিকদের একটা অংশ কখনো কখনো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর একসঙ্গে আক্রমণ চালায়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চর্চা চালু থাকে।

শিকারি সাংবাদিকতায় বেশির ভাগ সময় পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি আক্রমণ বা সহিংসতার মাধ্যমে হয় না। বরং নিজেদের প্রভাব বলয়ের গণমাধ্যমগুলোকে দিয়ে ভুয়া সংবাদ কাভারেজের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি, ভাবমূর্তি নষ্ট করা এবং ক্ষেত্রবিশেষে বলপ্রয়োগ করে সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

অধ্যাপক আ আল মামুন ও কাজী মামুন হায়দার এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কারণ দেখিয়েছেন। একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধারার গণমাধ্যম একে অপরের সঙ্গে মিথোজৈবিক সম্পর্ক তৈরি করে, অন্যদিকে নব্য-উদারবাদী অর্থনীতির কারণে মিডিয়া অনেকটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এসব মিলিয়েই ‘শিকারি সাংবাদিকতা’র প্রবণতা তৈরি ও বিস্তার লাভ করে।

‘বাংলাদেশে শিকারি সাংবাদিকতা’ বইয়ে প্রচ্ছদ
‘বাংলাদেশে শিকারি সাংবাদিকতা’ বইয়ে প্রচ্ছদ

বইটির প্রথম অধ্যায়ে বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে শিকারি সাংবাদিকতার চর্চা ও বিকাশ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশে এর উত্থানের কারণ হিসেবে পেশাগত নৈতিকতার সংকট, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ, গণমাধ্যমের বাণিজ্যিকীকরণ এবং ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে মূলধারার মিডিয়ার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। লেখক অধ্যাপক মামুন ২০০৬-২০০৭ সালে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই চর্চা প্রথম খেয়াল করেন।

বইয়ে সেই সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীর ‘নাটকীয়’ভাবে গ্রেপ্তারের ঘটনা উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে এক ধরনের ‘অবমাননাকর, আক্রমণাত্মক, আগ্রাসী’ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। সময়ের পরিবর্তনে সেটা সর্বস্তরের মানুষের ক্ষেত্রেও ঘটেছে।

চার ঘটনায় শিকারির মুখ

এই ধারণার বাস্তব প্রয়োগ বোঝাতে বইয়ে চারটি ঘটনাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কেস হিসেবে বাছাই করা হয়েছে—রিসোর্টে অবরুদ্ধ হেফাজত নেতা মামুনুল, মোসারাত জাহান মুনিয়ার ‘আত্মহত্যা’, পরীমনির বাসায় র‌্যাবের অভিযান এবং প্রথম আলোর ফটোকার্ড। এসব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে সাংবাদিকতার এই বিশেষ চর্চা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

এর পরের অধ্যায়ে এই চারটি কেসের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি-বেসরকারি প্রতাপশালীদের শিকারে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর সহায়তায় লেখকদ্বয় একধরনের আখ্যান নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। ‘শিকার’ ও ‘শিকারির’ ডিসকোর্স তৈরি করেছেন। চারটি কেস নিয়ে নয়টি গণমাধ্যমের প্রকাশিত ও সম্প্রচারিত সংবাদের ধরন ও সংখ্যাত্মক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁরা দেখাতে চেয়েছেন যে কীভাবে শিকারি সাংবাদিকতার প্রবণতাকে রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে থেকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে।

এর মধ্যে মোসারাত জাহান মুনিয়ার ‘আত্মহত্যা’র কেসটি বিশ্লেষণ করে জরুরি কিছু প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে। ঘটনাটির সংবাদ কাভারেজ যথেষ্ট না হওয়ার পেছনের কারণ খোঁজা হয়েছে। প্রশ্ন এসেছে, বাংলাদেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর হওয়াতে ‘আত্মহত্যাটি’ ‘রহস্যময়’ থেকে গেছে কিনা। কেসটিতে তাঁরা আরও দেখিয়েছেন, মিডিয়াগুলো কীভাবে করপোরেট পুঁজি ও মালিকানার প্রভাবে অথবা টিকে থাকার প্রশ্নে চুপ থাকতে বাধ্য হয়। কেননা এর সঙ্গে বিজ্ঞাপনসহ আরও অনেক রকমের আন্তব্যবসায়িক সম্পর্ক জড়িয়ে আছে।

এর পরের পরিস্থিতি আরও ভয়ানক। শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব অর্থায়নে পালিত সেসব গণমাধ্যম মূল অভিযুক্তের অপরাধ আড়াল করতে ভিকটিমের ব্যক্তিগত জীবন, মানসিক অবস্থা কেমন ছিল এবং তার পরিবারের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ‘চরিত্রহনন’ শুরু করে। একপর্যায়ে ঘটনাটির রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টাও হয়। এই পুরো সময়ে পুলিশ অভিযুক্তকে আটক বা জিজ্ঞাসা করেনি। এই অধ্যায়ে সংবাদ শিরোনাম ও তারিখ ধরে ধরে বিস্তারিত বিশ্লেষণ আছে।

আরেকটি কেসের বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক মামুন এবং হায়দার দেখিয়েছেন, একটি গণমাধ্যম নিজেও শিকারে পরিণত হতে পারে। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং এর সুবিধাভোগীরা সঙ্গী হয়ে কীভাবে মতামত উৎপাদন ও এর প্রচারণা করে, সেটিও সেখানে উঠে এসেছে। বাকি দুটি কেসের পর্যালোচনাতেও শিকারি সাংবাদিকতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।

শিকার তৈরির সংবাদ-ফ্রেম

তৃতীয় অধ্যায়ের আলোচনা মূলত কোন উপায়ে ও কৌশলে শিকারি সাংবাদিকতার প্রবণতা প্রচারিত বা প্রকাশিত হয়, সেসব নিয়ে। সংবাদের শিরোনাম, সংবাদ-সূচনা, উদ্দেশ্যমূলক সংবাদসূত্র, টেলিভিশন সংবাদে ইমেজের ব্যবহার ইত্যাদি এর মধ্যে রয়েছে।

লেখকদ্বয় কেসগুলোর নিউজ ফ্রেমিংয়ের ভিত্তিকাঠামো সম্পর্কে বলেছেন—যৌনতা, অর্থ, মাদক, জঙ্গি কানেকশন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধিতা। মূলত এসব দিয়ে সংবাদ সাজানো হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীরা এই ফ্রেমে প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে কাঠামোগতভাবে শিকারি সাংবাদিকতার চর্চাও স্বাভাবিক করে তুলেছে।

নজরদারির জালে গণমাধ্যম

বইটির চতুর্থ অধ্যায় ‘ফ্যাসিবাদের জমানায় শিকারি সাংবাদিকতার জাল’। ‘জাল’ বা নেটওয়ার্কের একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থাকে, যিনি হুকুম করেন। বাকি কাজ ইশারায় হয়ে যায়। অনেক সময় নির্দেশনার প্রয়োজন হয় না, অটোমেটিক হয়ে যায়। যদিও মডেলটা এত সরলভাবে কাজ করে না।

ভিন্ন স্বার্থে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সম্পর্কের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। গোয়েন্দা সংস্থা তথ্য দিতে পারে, সাংবাদিক সেটিকে সংবাদে রূপ দিতে পারে, মিডিয়া সেটিকে প্রকাশ করে। এই অধ্যায়ে মালিক-সাংবাদিকদের সংশ্লিষ্টতা এবং সরকার ও তার এজেন্সিগুলোর ভূমিকা উঠে এসেছে।

অধ্যায়টি মূলত একান্ত সাক্ষাৎকারনির্ভর। বিগত ফ্যাসিবাদী সময়ে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসব সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। লেখকদ্বয় গণমাধ্যমের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তাঁরা বেশ খোলামেলাভাবে সাংবাদিকতায় শিকারিপনার নানা দিক তুলে ধরেছেন। সাংবাদিকদের আলাপচারিতায় ফ্যাসিবাদের সময়ে সাংবাদিকতার নানামুখী চাপের কথা উঠে এসেছে। অনেকে শিকারি সাংবাদিকতার সশস্ত্রকরণের কার্যকারণগুলো বলার চেষ্টা করেছেন। লাইভ সম্প্রচার বা ক্রসফায়ারের সাজানো গল্পগুলো নিয়েও খোলাখুলি বলেছেন।

অধিকাংশ সাক্ষাৎকারদাতা ১/১১-এর সময়ে শিকারি সাংবাদিকতার প্রাথমিক ইশারা দেখতে পেয়েছেন। স্মৃতি হাতড়ে তাঁরা অনেকে বলেন, টেলিভিশন মিডিয়াগুলোর ১/১১-এর সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের বাসায় পাওয়া ‘মদের বোতলের’ লাইভ সম্প্রচারের কথা। তখন বেগম খালেদা জিয়ার বাসাতেও ‘মদের বোতল’ লাইভ দেখানো হয়। মিডিয়ায় বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে এই সম্প্রচার পুরোটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল বলে সাক্ষাৎকারদাতারা মনে করেন। এর দায় তাঁরা রাষ্ট্র, সরকার ও এজেন্সিকে দিয়েছেন।

এই অধ্যায়ে সাংবাদিকরা এরকম অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁরা কতটা নজরদারির মধ্যে থেকে রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন, সেসব বর্ণনা দিয়েছেন। একজন সম্পাদক পর্যায়ের সাংবাদিক ফ্যাসিবাদী সময়ে এস আলম গ্রুপ-সংক্রান্ত এক রিপোর্টের কথা স্মরণ করেন। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেন, রিপোর্ট প্রকাশের উদ্দেশ্যে নিউজ সিস্টেমে আপলোড করার মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে এবং প্রেসে যাওয়ার ২০ মিনিট আগে গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সরাসরি কল দিয়ে রিপোর্টটি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। অতি গোপন রিপোর্টটি জেনে ফেলার ঘটনাকে তিনি সংবাদপত্রের নিউজ সফটওয়্যার ও সার্ভার গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ মনিটরিংয়ের প্রমাণ হিসেবে দেখেছেন। অনেক মিডিয়া হাউসে সিআরআইয়ের নিজস্ব ডেস্ক ছিল বলেও জানা গেছে। তাছাড়া বিদেশি মিশনের হস্তক্ষেপ, ভিউ বাণিজ্য—এরকম আরও বিষয় শিকারি সাংবাদিকতার প্রবণতাকে উসকে দিয়েছে।

অভ্যুত্থানের পরও কি সেই জাল আছে?

বইটির শেষ অধ্যায়টিতে ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সময়ে মিডিয়ার হালচাল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম চারটি অধ্যায়ে ২০০৭-০৮ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের শিকারি সাংবাদিকতার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করা হলেও শেষ অধ্যায়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে, একই পজিশনে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে আবার কথা বলেছেন গবেষকদ্বয়। তাঁরা খোঁজার চেষ্টা করেছেন, মিডিয়ার গুণগত পরিবর্তন হয়েছে কিনা।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর লেখকদ্বয় দেখেছেন, যেসব মিডিয়া ফ্যাসিবাদের তাঁবেদারি করেছিল, জনগণের একটা অংশ সেসব মিডিয়ায় ভাঙচুর করেছে, প্রায় বয়কট করেছে। অনেক সাংবাদিক পালিয়ে গেছেন। কয়েকজন জেলে আছেন। অর্থাৎ নেটওয়ার্কের অনেকেই নিজের তৈরি জালে ফেঁসেছেন।

ছয় মাসের ব্যবধানে নেওয়া সাক্ষাৎকারগুলোতে পরিষ্কার দেখা গেছে, ফ্যাসিবাদের সেই পুরনো কাঠামো পুরোপুরি ভাঙেনি। বরং একই অবস্থানে নতুন জোট তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। অনেকেই আগের মিডিয়াতেই পুনর্বাসিত হয়েছেন। অবশ্য বেশ কিছু পত্রিকার সম্পাদক পরিবর্তন হয়েছে। এজেন্সির দাপট কিছুটা কমেছে। তবে সাংবাদিকদের মনে ঘুরেফিরে ফ্যাসিবাদী সময়ের ভূত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনে থাকার পর সংস্কার হতে বা পরিবর্তন আসতে একটু সময় লাগবে বলছেন তাঁরা।

আপাত আশার কথাও আছে। লেখকদ্বয় বলছেন, অভ্যুত্থানের পর শিকারি সাংবাদিকতার প্রবণতা প্রকটভাবে তাঁরা দেখছেন না। তাঁদের যুক্তি হলো, যে স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোতে এই বিশেষ প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, সেটা এখন নতুন ঘরানায় হাজির হচ্ছে। তবে পক্ষগুলো প্রস্তুত রয়েছে।

বাংলাদেশে শিকারি সাংবাদিকতা বইটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে অস্বস্তিকর অথচ গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বইটির গুরুত্ব এখানেই। লেখকদ্বয় শিকারি সাংবাদিকতাকে কেবল কয়েকজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত বিচ্যুতি হিসেবে দেখাতে চাননি। তাঁরা একে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, গোয়েন্দা সংস্থা, রাজনৈতিক আধিপত্য, গণমাধ্যমের বাণিজ্যিকীকরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এর উত্থান ও বিকাশকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। ফলে বইটি সাংবাদিকতার সংকটকে ব্যক্তি পর্যায় থেকে কাঠামোগত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ সাংবাদিকতার জন্য বইটির পাঠ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশে শিকারি সাংবাদিকতা

ধরন: গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতাবিষয়ক গবেষণা ও প্রবন্ধ

লেখক: আ-আল মামুন, কাজী মামুন হায়দার

১ম প্রকাশ, ২০২৬

প্রকাশক: প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

মূল্য: ৩৫০ টাকা

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত