মৌলভীবাজারে নদ-নদীর পানি কমলেও নতুন প্লাবিত ৭ গ্রাম

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
মৌলভীবাজার

কমলগঞ্জে নতুন করে প্লাবিত পতনউষার এলাকায় বন্যার পানিতে সাঁতার কাটছে এক শিশু। স্ট্রিম ছবি

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের দুই উপজেলার অন্তত ২৭টি গ্রামের ১৯ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। এর মধ্যে রাজনগর উপজেলায় মনু নদীর একটি প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে ২০টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছে। কমলগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ভাটির দিকে পতনঊষার ইউনিয়নের অন্তত ৭টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, জেলার সবকটি নদীর পানি শুক্রবার (১০ জুলাই) বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও শনিবার (১১ জুলাই) সকাল থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। নতুন করে অতি ভারী বৃষ্টি না হলে নদীর পানি পুনরায় বাড়ার সম্ভাবনা নেই জানিয়েছে পাউবো।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মনু নদীর পানি রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৯০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ২৬২ সেন্টিমিটার এবং জুড়ি নদীর পানি বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজনগরের টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর এলাকায় মনু নদীর বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। রাতে আকুয়া এলাকায় বেড়িবাঁধের অংশ ভেঙে গেলে আকুয়া, হরিপাশা, উজিরপুর, সৈয়দনগর, আদিনাবাদ, মশাজানসহ অন্তত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পরদিন শুক্রবার সকালে মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ৮০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে উপজেলার টেংরা ও কামারচাক ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে পানি প্রবেশ করে। পানিতে তলিয়ে যায় নিম্নাঞ্চলের শত শত বাড়িঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও গ্রামীণ সড়ক।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় মালপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পাননি। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেকে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। বিশুদ্ধ পানির সংকট, রান্নার সমস্যা এবং গবাদিপশু রক্ষার বিষয়টি এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত। সংগৃহীত ছবি
মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত। সংগৃহীত ছবি

কমলগঞ্জের নতুন প্লাবিত ৭ গ্রাম

কমলগঞ্জে বৃহস্পতিবার রাত থেকে ইসলামপুর ও আদমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি নামতে শুরু করে। তবে জমে থাকা কাদা, ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ি, ভাঙাচোরা সড়ক ও নষ্ট হওয়া অবকাঠামোর কারণে মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। অনেক পরিবার এখনো বাড়িঘরে ফিরতে পারেনি। যারা ফিরেছেন তারা ঘরবাড়ি পরিষ্কার ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে হিমশিম খাচ্ছেন।

এ ছাড়া ভাটির অঞ্চল হওয়ায় উপজেলার পতনঊষার ইউনিয়নে ঢলের পানি প্রবেশ করে গোপীনগর, রাধাগোবিন্দপুর, নয়াবাজার, পতনঊষারসহ অন্তত ৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম।

পতনঊষার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অলি আহমদ খান বলেন, ভাটি অঞ্চলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় তার ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি ত্রাণ বরাদ্দ এবং দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম প্রয়োজন।

তবে শুক্রবার মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাজী মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী রহিমপুর, পতনঊষার ও আদমপুর এলাকার বন্যাকবলিত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করেন।

উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যায় প্রায় ২৫০ হেক্টর আউশ ধান, আমনের বীজতলা এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

কমলগঞ্জ ইউএনও মো. আছাদুজ্জামান বলেন, ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

পরিস্থিতির উন্নতির আশা পাউবোর

এদিকে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা ও দুর্গতদের সহায়তায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলায় মোট ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, পানিবন্দি দুর্গত মানুষদের ইতোমধ্যে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের মাঝে শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

মৌলভীবাজার পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওলিদ জানান, জেলার নদীগুলোর পানি অনেকটাই কমেছে। যেসব এলাকায় নদীর বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেঙে গেছে, সেগুলো দ্রুত মেরামতের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। জেলাজুড়ে নতুন করে অতি ভারী বৃষ্টিপাত না হলে বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে। দুর্গতদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত