বায়ুবিদ্যুতের ৩ কেন্দ্র অচল, নতুন প্রকল্পের তোড়জোড়

কক্সবাজারে স্থাপন করা টারবাইন। সংগৃহীত ছবি

বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে পাঁচ কেন্দ্রের তিনটিই অচল। ব্যবহারযোগ্য দুটির মধ্যে একটিতে মিলছে বিদ্যুৎ। এমন অবস্থায় বিএনপি সরকার নতুন প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে। সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনা যাচাই করতে পাঁচটি সমীক্ষার পরিকল্পনা করেছে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ বিভাগ এই উদ্যোগ নিচ্ছে, যা আগামী অর্থবছর থেকে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে এবং সুনীল অর্থনীতি (ব্লু-ইকোনমি) সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সমীক্ষা পরিচালনা করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।

সূত্র জানায়, অনশোর (উপকূল সংলগ্ন স্থলভাগ) এবং অফশোর (সমুদ্র বক্ষ) এলাকায় প্রকল্পভিত্তিক বায়ুসম্পদের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। এর অংশ হিসেবে পাঁচটি সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) পরিচালনা করা হবে।

২০২৫ সালে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা তৈরি করে। নীতিমালায় ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ২০২০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য আছে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, সমীক্ষাগুলোর মাধ্যমে বায়ুসম্পদের সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে দেশে বায়ুবিদ্যুৎ তথা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের ব্যাপক বিকাশ ঘটবে। এর মাধ্যমে সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকার অব্যবহৃত প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহকে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্যে, বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রধান ও পূর্বশর্ত হচ্ছে ‘উইন্ড রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট’ বা বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাব্যতা যাচাই। কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার ১০ থেকে ৫০ বছরের বায়ুর গতিবিধি, আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করেই এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

বাংলাদেশে বায়ুশক্তির ব্যবহার নতুন নয়। তবে অতীতে নেওয়া উদ্যোগগুলোর অধিকাংশ ফলপ্রসূ হয়নি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলছে, নির্মিত পাঁচটি বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে তিনটি অচল। দুটি ব্যবহারযোগ্য হলেও উৎপাদন হচ্ছে একটিতে।

কক্সবাজারে ৬০ মেগাওয়াট ও সিরাজগঞ্জের ২ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্র বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য। এর মধ্যে ২০২৩ সালে নির্মিত কক্সবাজারের কেন্দ্র থেকে কিছুটা বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। আর গত বছর চালু হওয়া সিরাজগঞ্জের কেন্দ্র থেকে সম্প্রতি কোনো উৎপাদনের তথ্য পিডিবির বিবরণীতে পাওয়া যায়নি।

২০০৮ সালে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার একটি বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। কয়েক বছর পরই সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বর্তমানে পরিত্যক্ত। ২০০৫ সালে একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ফেনীর মহুরি নদীর তীরে ৬ একর জমির ওপর বাংলাদেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ২০০৭ সালে কারিগরি ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত বাতাস না থাকায় এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সংস্কার করে ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে তা পুনরায় চালু হয়। কিছুদিন পর ফের বন্ধ হয়ে যায়। কেন্দ্রটি বর্তমানে অচল।

পিডিবির সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) জহুরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, নির্মিত বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র যে খুব একটা কাজে এসেছে, তা নয়। এর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। যে সাইট সিলেকশন করা হয়েছে, সেটি ভালো হয়নি। এখানে নিয়মিতভাবে বাতাস পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ঠিকভাবে জরিপ বা সম্ভাব্যতা যাচাই না করে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করলে সুফল পাওয়া যায় না। বর্তমানে কক্সবাজারে ৬০ মেগাওয়াটের যেটি চলছে, সেটিও যে খুব ভালো উৎপাদন করছে, তা নয়।

তিনি বলেন, আমরা রিনিউয়েবল এনার্জি সম্প্রসারণে নানা স্টাডি করছি। সরকারের পক্ষ থেকেও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এখনই বলা যাচ্ছে না যে কোথায় কী হবে?

যদিও স্রেডার তথ্যে, বাংলাদেশে প্রায় ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা রয়েছে, যেখানে বাতাসের গড় বেগ সেকেন্ডে ৫.৭৫ থেকে ৭.৭৫ মিটার। এই বাতাসকে কাজে লাগিয়ে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বিশেষ করে খুলনার দাকোপ, চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং চাঁদপুরের নদী মোহনা এলাকায় ১০০ মিটার উচ্চতায় বাতাসের গড় বেগ সেকেন্ড ৬ মিটারের বেশি, যা বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী।

এ বিষয়ে স্রেডার সদস্য (নবায়নযোগ্য জ্বালানি) ড. আশরাফুল আলম স্ট্রিমকে বলেন, অনশোর ও অফশোর- উভয় জায়গাতেই বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে আমরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি। আগে জরিপে যা পাওয়া গেছে, তাতে দেখা গেছে– খুলনা, চাঁদপুর ও উপকূলীয় এলাকায় বায়ু বিদ্যুতের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডি শুরু হয়েছে। সুনির্দিষ্ট প্রকল্প বা পরিকল্পনা নেওয়ার আগের কাজগুলো করা হচ্ছে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত