ফিরে দেখা জুলাই

ভাই হত্যার বিচার চেয়ে সৈকতের বোনের আবেগঘন আর্তি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নিহত হন মাহামুদুর রহমান সৈকত। স্ট্রিম গ্রাফিক

‘আমার ভাই কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবেন? আমার এই গোটা পৃথিবীর আর কিছু চাই না, আমার ভাই চাই।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নিহত মাহামুদুর রহমান সৈকতের স্মৃতিতে দুই বছর পূর্তির দিনে এমনই আহ্বান জানিয়েছেন তার বড় বোন সাবরিনা আফরোজ শাবন্তি।

আজ রোববার (১৯ জুলাই) নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবারের যন্ত্রণা এতটুকুও কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শোক সহ্য করার অভ্যাস তৈরি হয়েছে, কিন্তু প্রিয় ভাইকে হারানোর শূন্যতা এক মুহূর্তের জন্যও মুছে যায়নি।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হন মাহামুদুর রহমান সৈকত। পরে তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বড় দুই বোনের সঙ্গে মাহামুদুর রহমান সৈকত। সংগৃহীত ছবি
বড় দুই বোনের সঙ্গে মাহামুদুর রহমান সৈকত। সংগৃহীত ছবি

সাবরিনা শাবন্তি লিখেছেন, ‘আজ ১৯ জুলাই। আমার এবং আমার পরিবারের জীবন এলোমেলো হওয়ার দুই বছর। ঠিক দুই বছর আগে এই দিনে দুপুর নাগাদ জানতে পারি, আমার বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে, আমার একমাত্র ভাইকে পুলিশ গুলি করেছে। বহু চড়াই-উতরাই পার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে গিয়ে দেখতে পাই আমার ভাইয়ের নিথর দেহ। প্রথম কথাটাই মাথায় এসেছিল, আম্মুকে কী জবাব দেব আমি!’

তিনি স্মৃতিচারণ করে আরও লেখেন, দুই মেয়ের পর জন্ম নেওয়া একমাত্র ছেলে ছিল সৈকত। মায়ের অত্যন্ত আদরের সন্তান ছিল সে। সেই আদর নিয়েই ছোটবেলায় ভাইকে নিয়ে মায়ের সঙ্গে অভিমান করতেন তিনি।

‘আম্মুর সঙ্গে অনেক ঝগড়া করতাম, কারণ মনে হতো আম্মু ওকে বেশি ভালোবাসে,’—লিখেছেন তিনি।

দুই বছর ধরে ভাইয়ের মৃত্যুর ভিডিও বারবার দেখার অসহনীয় অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন সাবরিনা। তিনি লেখেন, ‘ভাবতাম ধীরে ধীরে কষ্ট কমবে। কষ্ট কমে না, শুধু সহ্য হয়ে যায়। প্রায় এক বছর প্রতিদিন ওর গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ভিডিও দেখেছি। প্রতিদিন মনে হতো, হয়তো নতুন কোনো সূত্র পাব, ভিডিওতে নতুন কোনো চেনা মুখ দেখতে পাব।’

মাহামুদুর রহমান সৈকত। সংগৃহীত ছবি
মাহামুদুর রহমান সৈকত। সংগৃহীত ছবি

সবচেয়ে বড় আক্ষেপের জায়গা তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘দুই বছরেও খুনি ধরা পড়েনি। জানি না কখনো ধরা পড়বে কি না। শুধু এতটুকুই চাই, খুনিটা ধরা পড়ুক।’

ভাইকে হারানোর পর বদলে যাওয়া পরিবারের কথাও আবেগঘন ভাষায় বর্ণনা করেন তিনি। লেখেন, ‘আমার পরিবারটা কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবেন? আমার সেই হাসিখুশি পরিবার? যেখানে বাবা ছিলেন, মা ছিলেন, দুই বড় বোন, একটা ভাই আর আমাদের ছোট্ট বিড়াল পুটু ছিল। যে পরিবারে আম্মুর চোখে প্রতিদিন পানি থাকত না, প্রতিদিন কান্না থাকত না।’

পোস্টের শেষে শহীদ মাহামুদুর রহমান সৈকতের আত্মার মাগফিরাত কামনায় সবার কাছে দোয়া চান সাবরিনা আফরোজ শাবন্তি।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের সেই গুলির শব্দে শুধু একজন তরুণের জীবনই থেমে যায়নি; ভেঙে পড়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, হাসি আর স্বাভাবিক জীবন। দুই বছর পরও সেই পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা একটাই—মাহামুদুর রহমান সৈকতের হত্যার বিচার এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত