টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে ধান, বজ্রপাতের ভয়ে মিলছে না শ্রমিক

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
গাইবান্ধা

প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ৩৭
গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চলে পানি জমায় জমি থেকে বোরোধান কাটছেন শ্রমিকেরা। স্ট্রিম ছবি

কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চলের শত শত হেক্টর বোরো ধানের জমিতে পানি জমেছে। অনেক জমিতে বাতাসে নুয়ে পড়েছে ধান। এতে আধা পাকা ধান জমিতেই নষ্ট হচ্ছে। এদিকে বজ্রপাতের আতঙ্ক ও শ্রমিক সংকটে জমির ধান কাটতে পারছেন চাষিরা। এর মধ্যে মৌসুম শুরুর আগেই জনপ্রতি শ্রমিকের মজুরি দৈনিক ৭০০-৮০০ টাকা হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তাঁরা।

কৃষকরা জানান, পানি জমে যাওয়ায় বিঘা প্রতি সাত থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে। তবুও ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। আবার খেত থেকে কেটে আনা ধানে পানি জমে থাকছে। রোদ নেই। এভাবে বেশিদিন থাকলে ধান থেকে চারা বের হবে। এতে খড়ও পচে যাচ্ছে।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধান চাষ হয়েছে। তবে কয়েকদিনের বৃষ্টির পানিতে ২১২ হেক্টর জমির ধান আক্রান্ত হয়েছে।

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সদর উপজেলার বাদিয়াখালি, চক বরুল, হরিনাবাড়ি, বেতকাপা ও তুলশীঘাট; গোবিন্দগঞ্জের পাটোয়ার গঙ্গা, হরিনাবিল ও পুরানদহ; পলাশবাড়ীর রাইতি নরাইল, নান্দিশহর বিল, মালিয়ানদহ, খামার নান্দিশহর, পকুরিয়া বিল, মাঠেরবাজার ও কুমারগাড়ি; সুন্দরগঞ্জের তারাপুর, হরিপুরসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চলের শত শত হেক্টর জমির আধাপাকা ধান পানির নিচে ডুবে আছে। অনেকে আধা পাকা ধান কাটছে।

জমিতে পানি জমায় বোরোধান কাটছেন এক কৃষক। স্ট্রিম ছবি
জমিতে পানি জমায় বোরোধান কাটছেন এক কৃষক। স্ট্রিম ছবি

পলাশবাড়ীর সোলাগাড়ি বিলে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানান গেছে, বিলে প্রায় ৫০০ বিঘা জমিতে ধান রয়েছে। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে অনেক জমিতে পানি জমে গেছে। আগে বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি নালা ছিল। কিন্তু কয়েক বছর আগে নালাটি বন্ধ একটি ইটভাটা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে নিচু জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

উপজেলার হরিণাবাড়ী গ্রামের কৃষক মিন্টু মিয়ার এবার ৪০ শতাংশ জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। ফলনও হয়েছিল ভালো। কিন্তু কয়েকদিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় জমির অনেক ধান পানিতে ডুবে আছে, কিছু পানির ওপর কাঁত (নুয়ে) হয়ে পড়ে আছে। তিনি বলেন, আগে এক বিঘা জমি ধান কাটতে তিন-চার হাজার লাগত, সেখানে এখন সাত-আট হাজার টাকার বেশি লাগতেছে। টাকা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না।

নান্দিশহর গ্রামের ইজিবাইকচালক জাফিরুল ঋণ করে কিছু জমিতে ধান লাগিয়েছিলেন। তাঁর কষ্টের ফসল চোখের সামনে পানি পচে যাওয়ার শঙ্কায় আছেন। তিনি বলেন, ‘ঋণ করে এসব জমিতে ধান লাগাইছি। যেটুকু ধান পাব, তা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করব, না নিজের খাদ্য মেটাব?’

সদর উপজেলার বাদিয়াখালি ইউনিয়ন ধানচাষী মনজু মিয়ার পাঁচ বিঘা বোরো জমিতে হাঁটু পানি জমে রয়েছে। পচে যাচ্ছে ধান গাছ৷ এতে ফলন অর্ধেক কমে যাওয়ার শঙ্কা করছেন তিনি। একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানান ওই ইউনিয়নের কৃষক কলিম উদ্দিন শেখ।

গাইবান্ধায় আরও বৃষ্টিপাতের আশঙ্কায় আধাপাকা ধান কেটে নিচ্ছেন চাষিরা। স্ট্রিম ছবি
গাইবান্ধায় আরও বৃষ্টিপাতের আশঙ্কায় আধাপাকা ধান কেটে নিচ্ছেন চাষিরা। স্ট্রিম ছবি

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, জমি থেকে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন করে বৃষ্টি না হলে আক্রান্ত জমির ধানের তেমন ক্ষতি হবে না। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে গত রোববার (২৬ এপ্রিল) বিকালে বজ্রপাতে জেলার তিন উপজেলায় ৫ জন মারা গেছেন৷ এর মধ্যে সুন্দরগঞ্জে শিশুসহ ৩ জন মারা যান। এতে জেলার লোকজনের মধ্যে বজ্রপাতের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সোনাইডাঙ্গা গ্রামের কৃষক ময়েন উদ্দিন আকন্দ বলেন, আবহাওয়া এতটাই খারাপ যে, বাড়ির বাইরে বের হতেও ভয় লাগে— কোন সময় বজ্রপাত হতে পারে৷ তাই ধান কাটার জন্য খেতে যেতে পারছি না৷

রংপুর বিভাগের আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মো. মোস্তাফিজার রহমান জানান, গত এক সপ্তাহে গাইবান্ধায় বৃষ্টিপাতের গড় অনুপাত ছিল ৫০ দশমিক ৭ মিলিমিটার। বুধবার (২৯ এপ্রিল) বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১৬ মিলিমিটার। আগামী দুই দিন এই জেলায় আরও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে।

সম্পর্কিত