তারেক অণু

‘মিশিগান’ স্টেটেই নাকি আছে প্রায় এক হাজার বাতিঘর! পৃথিবীর বিখ্যাত সেই পঞ্চহ্রদ ‘সুপিরিয়র’, ‘মিশিগান’, ‘ইরি’, ‘অন্টারিও’ আর ‘হিরন’। যাদেরকে বলা হয় ‘গ্রেট লেকস’। এই হ্রদগুলোতে যে পরিমাণ সুপেয় পানি তরল আকারে সঞ্চিত আছে, তা পৃথিবীর অন্য সব হ্রদের মিলিত জলরাশির চেয়েও বেশি। আর তা পাহারা দিতেই যেন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ‘বাতিঘর’ সেনাদল। আমাদের এবারের যাত্রা সেদিক পানেই।
ওহাইও থেকে মিশিগানে ঢোকার পরপরই চারপাশের প্রকৃতি আর গাছপালা একটু অন্যরকম মনে হলো। আগের রাজ্যের রাস্তার ধারের গাছগুলোর রং ছিল কিছুটা ফিকে সবুজ, যেন মৃদু কোমল ফ্লোরেসেন্ট আভার মতো ছিল। কিন্তু মিশিগানের সবুজ বেশ গাঢ় আর জমাট বাঁধা। আসলে মিশিগানে আসার পর থেকেই মনে হচ্ছে ফিনল্যান্ডে চলে এসেছি! সেই একই সারি সারি লম্বা উত্তুরে গাছ, মাঝে মাঝে স্বপ্ননীল হ্রদ আর হরিণের ছোটাছুটি।

এখন বাংলাদেশের বনে-বাদাড়ে খুব নিয়মিত গেলেও, প্রথম বনের নিসর্গ একা একা উপভোগ করতে শিখেছি ফিনল্যান্ডেই। তাই এই পরিবেশ আমার অতি আপন, চিরচেনা। জীবনানন্দ দাশের সূক্ষ্ম উপমার মতো। মিশিগান এসেই তাই মনে মনে বলতে ইচ্ছে করল ‘I am home’। রেজওয়ান আগে অনেকবার এই পথে আমেরিকা ঘুরেছেন, তার মতেও আমেরিকার একেকটি স্টেটে প্রকৃতি একেক রূপ নিয়ে ধরা দেয়, খালি চোখেই বোঝা যায়।
রাস্তায় ব্যাপক মরীচিকা দেখা যাচ্ছিল। একটু পরপরই মনে হচ্ছিল, রাস্তায় জল পড়ে চিকচিক করছে। কিন্তু সে আলোর খেলায় চোখের ভুল। গাড়িতে গান বাজছে—
‘আমি আমি জানি জানি
চোরাবালি কতখানি
গিলেছে আমাদের রোজ’
বেশ রাত করে আমরা পৌঁছালাম ম্যাকিনাউ শহরে। মিশিগান আর হিরন হ্রদের সংযোগস্থলে এই শহর। এই প্রথম আমেরিকার কোনো মোটেলে থাকা হলো, ঠিক যেমনটা হলিউডের ক্রাইম মুভিগুলোতে দেখা যায়। রাজন ভাই জানালেন, আমেরিকার অধিকাংশ মোটেলের মালিকই গুজরাটি; এই ব্যবসায় তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য।

মোটেলের সঙ্গেই বালির সৈকত। সেখানে দোলনায় দুলতে দুলতে আকাশের উল্টো হয়ে থাকা সপ্তর্ষি আর বৃশ্চিক মণ্ডল দেখতে দেখতেই মাঝরাত পেরিয়ে গেল। এর মাঝেই অপু আর রাজন ভাই চটজলদি ভাত, আলু ভর্তা আর বেগুন ভাজি রেঁধে ফেললেন। এমনকি পরদিন দুপুরের জন্য খিঁচুড়ি আর গরুর মাংসের ঝোলও রান্না হয়ে গেল!
তারপর কী হলো? তা জানে শ্যামলাল!
পরদিন বেলা করে উঠে আমেরিকান বুফেতে পেটপুরে নাস্তা করলাম। প্রথমে নীল হ্রদ আর কয়েকটা বাতিঘর বাইরে থেকে দেখে নিয়ে সেতু পেরিয়ে প্রবেশ করলাম ‘Pictured Rock National Lakeshore’ এলাকায়।
সেখানে এক মজার পাসপোর্ট পাওয়া যায়। আমেরিকার সব ন্যাশনাল পার্কের তথ্য আর ম্যাপ আছে তাতে। আর আছে ফাঁকা জায়গা, যেখানে যে ন্যাশনাল পার্কে যাবেন, সেখানের সিল মেরে নিতে পারবেন। আর সংগ্রহ হতে থাকবে দারুণ এক স্মৃতিচিহ্ন। রাজন ভাই দুইটা কিনে আমাকে একটা উপহার দিলেন, আর আমার সেই দারুণ স্মৃতির সংগ্রহ শুরু হলো এখান থেকেই!

লেক সুপিরিয়র মানে সব হ্রদের সেরা। লম্বায় ৫৬৩ কিলোমিটার, সবচেয়ে চওড়া স্থানে ২৫৭ কিলোমিটার। এই হ্রদকে কোনোভাবেই হ্রদ মনে হয় না, বরং মহাসাগরের অংশ বলেই ধারণাটা জোরদার হয়। এক ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে তার পান্নাসবুজ জ্বলজ্বলে জলের সঙ্গে নীল জলের জলকেলি যে অপার্থিব সুন্দরের জন্ম দেয়, তা তাবৎ মানুষকে ‘মোহিত কিন্ত বোবা’ করে দেয়। এখান এসে সবচেয়ে সেলফি পাগলও ছবি তোলার আগে হ্রদের নীল-সবুজকে দুইবার দেখে নেয়।
ক্যাম্পিং-এর পথে যাবার সময় দুইটি ‘স্যান্ডহিল সারস’ দেখলাম। ব্যাপক আনন্দ পেলাম। জলা জায়গার ঘাসফুলে ঘেরা পথে বিরল প্রজাতির এই পাখি জীবনে প্রথম চাক্ষুষ করলাম।
লিটল বিভার হ্রদে ক্যাম্পিং করতে গিয়ে দেখি তাঁবু খাটানোর মতো তিল ধারণের জায়গা নেই। আসলে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এখন মার্কিন মুল্লুকে লম্বা ছুটির উইকেন্ড চলছে, তাই সবাই দলেবলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। জায়গার বেশ অভাবই দেখা গেল।

অগত্যা ম্যাপ দেখে ওই হ্রদ থেকে আরও আড়াই কিলোমিটার দূরে নির্জন এক ক্যাম্পিং সাইটের খোঁজে রওনা হলাম। তবে রওনা হওয়ার আগে মালপত্রের ভার কমাতে আমাদের সেই খিঁচুড়ি আর মাংসের সঠিক ব্যবহার সেরে নিলাম। ঠিক তখনই আমাদের সঙ্গে যোগ দিল এক গালফুলো চিপমাঙ্ক। পেটে হয়ত খুব খিদে ছিল ওর, তাই ভয়ডর ভুলে একদম পায়ের কাছে এসে বসল।
বন্যপ্রাণীকে আমরা সাধারণত খাওয়াই না, কিন্তু ছোট্ট প্রাণীটির অবস্থা দেখে আর কোনো নিষেধমূলক নোটিশ না থাকায় ওকে এক দলা খাবার দেওয়া হলো। কিউট সেই প্রাণীটি বেশ গপগপ করে খেল। আমার তো মনে হয়, পুরো ট্রিপের সেরা ভিডিও আর ছবিগুলো ওর কল্যাণেই পাওয়া হয়ে গেল।
এবার পালা গভীর বনে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানোর—

‘মিশিগান’ স্টেটেই নাকি আছে প্রায় এক হাজার বাতিঘর! পৃথিবীর বিখ্যাত সেই পঞ্চহ্রদ ‘সুপিরিয়র’, ‘মিশিগান’, ‘ইরি’, ‘অন্টারিও’ আর ‘হিরন’। যাদেরকে বলা হয় ‘গ্রেট লেকস’। এই হ্রদগুলোতে যে পরিমাণ সুপেয় পানি তরল আকারে সঞ্চিত আছে, তা পৃথিবীর অন্য সব হ্রদের মিলিত জলরাশির চেয়েও বেশি। আর তা পাহারা দিতেই যেন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ‘বাতিঘর’ সেনাদল। আমাদের এবারের যাত্রা সেদিক পানেই।
ওহাইও থেকে মিশিগানে ঢোকার পরপরই চারপাশের প্রকৃতি আর গাছপালা একটু অন্যরকম মনে হলো। আগের রাজ্যের রাস্তার ধারের গাছগুলোর রং ছিল কিছুটা ফিকে সবুজ, যেন মৃদু কোমল ফ্লোরেসেন্ট আভার মতো ছিল। কিন্তু মিশিগানের সবুজ বেশ গাঢ় আর জমাট বাঁধা। আসলে মিশিগানে আসার পর থেকেই মনে হচ্ছে ফিনল্যান্ডে চলে এসেছি! সেই একই সারি সারি লম্বা উত্তুরে গাছ, মাঝে মাঝে স্বপ্ননীল হ্রদ আর হরিণের ছোটাছুটি।

এখন বাংলাদেশের বনে-বাদাড়ে খুব নিয়মিত গেলেও, প্রথম বনের নিসর্গ একা একা উপভোগ করতে শিখেছি ফিনল্যান্ডেই। তাই এই পরিবেশ আমার অতি আপন, চিরচেনা। জীবনানন্দ দাশের সূক্ষ্ম উপমার মতো। মিশিগান এসেই তাই মনে মনে বলতে ইচ্ছে করল ‘I am home’। রেজওয়ান আগে অনেকবার এই পথে আমেরিকা ঘুরেছেন, তার মতেও আমেরিকার একেকটি স্টেটে প্রকৃতি একেক রূপ নিয়ে ধরা দেয়, খালি চোখেই বোঝা যায়।
রাস্তায় ব্যাপক মরীচিকা দেখা যাচ্ছিল। একটু পরপরই মনে হচ্ছিল, রাস্তায় জল পড়ে চিকচিক করছে। কিন্তু সে আলোর খেলায় চোখের ভুল। গাড়িতে গান বাজছে—
‘আমি আমি জানি জানি
চোরাবালি কতখানি
গিলেছে আমাদের রোজ’
বেশ রাত করে আমরা পৌঁছালাম ম্যাকিনাউ শহরে। মিশিগান আর হিরন হ্রদের সংযোগস্থলে এই শহর। এই প্রথম আমেরিকার কোনো মোটেলে থাকা হলো, ঠিক যেমনটা হলিউডের ক্রাইম মুভিগুলোতে দেখা যায়। রাজন ভাই জানালেন, আমেরিকার অধিকাংশ মোটেলের মালিকই গুজরাটি; এই ব্যবসায় তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য।

মোটেলের সঙ্গেই বালির সৈকত। সেখানে দোলনায় দুলতে দুলতে আকাশের উল্টো হয়ে থাকা সপ্তর্ষি আর বৃশ্চিক মণ্ডল দেখতে দেখতেই মাঝরাত পেরিয়ে গেল। এর মাঝেই অপু আর রাজন ভাই চটজলদি ভাত, আলু ভর্তা আর বেগুন ভাজি রেঁধে ফেললেন। এমনকি পরদিন দুপুরের জন্য খিঁচুড়ি আর গরুর মাংসের ঝোলও রান্না হয়ে গেল!
তারপর কী হলো? তা জানে শ্যামলাল!
পরদিন বেলা করে উঠে আমেরিকান বুফেতে পেটপুরে নাস্তা করলাম। প্রথমে নীল হ্রদ আর কয়েকটা বাতিঘর বাইরে থেকে দেখে নিয়ে সেতু পেরিয়ে প্রবেশ করলাম ‘Pictured Rock National Lakeshore’ এলাকায়।
সেখানে এক মজার পাসপোর্ট পাওয়া যায়। আমেরিকার সব ন্যাশনাল পার্কের তথ্য আর ম্যাপ আছে তাতে। আর আছে ফাঁকা জায়গা, যেখানে যে ন্যাশনাল পার্কে যাবেন, সেখানের সিল মেরে নিতে পারবেন। আর সংগ্রহ হতে থাকবে দারুণ এক স্মৃতিচিহ্ন। রাজন ভাই দুইটা কিনে আমাকে একটা উপহার দিলেন, আর আমার সেই দারুণ স্মৃতির সংগ্রহ শুরু হলো এখান থেকেই!

লেক সুপিরিয়র মানে সব হ্রদের সেরা। লম্বায় ৫৬৩ কিলোমিটার, সবচেয়ে চওড়া স্থানে ২৫৭ কিলোমিটার। এই হ্রদকে কোনোভাবেই হ্রদ মনে হয় না, বরং মহাসাগরের অংশ বলেই ধারণাটা জোরদার হয়। এক ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে তার পান্নাসবুজ জ্বলজ্বলে জলের সঙ্গে নীল জলের জলকেলি যে অপার্থিব সুন্দরের জন্ম দেয়, তা তাবৎ মানুষকে ‘মোহিত কিন্ত বোবা’ করে দেয়। এখান এসে সবচেয়ে সেলফি পাগলও ছবি তোলার আগে হ্রদের নীল-সবুজকে দুইবার দেখে নেয়।
ক্যাম্পিং-এর পথে যাবার সময় দুইটি ‘স্যান্ডহিল সারস’ দেখলাম। ব্যাপক আনন্দ পেলাম। জলা জায়গার ঘাসফুলে ঘেরা পথে বিরল প্রজাতির এই পাখি জীবনে প্রথম চাক্ষুষ করলাম।
লিটল বিভার হ্রদে ক্যাম্পিং করতে গিয়ে দেখি তাঁবু খাটানোর মতো তিল ধারণের জায়গা নেই। আসলে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এখন মার্কিন মুল্লুকে লম্বা ছুটির উইকেন্ড চলছে, তাই সবাই দলেবলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। জায়গার বেশ অভাবই দেখা গেল।

অগত্যা ম্যাপ দেখে ওই হ্রদ থেকে আরও আড়াই কিলোমিটার দূরে নির্জন এক ক্যাম্পিং সাইটের খোঁজে রওনা হলাম। তবে রওনা হওয়ার আগে মালপত্রের ভার কমাতে আমাদের সেই খিঁচুড়ি আর মাংসের সঠিক ব্যবহার সেরে নিলাম। ঠিক তখনই আমাদের সঙ্গে যোগ দিল এক গালফুলো চিপমাঙ্ক। পেটে হয়ত খুব খিদে ছিল ওর, তাই ভয়ডর ভুলে একদম পায়ের কাছে এসে বসল।
বন্যপ্রাণীকে আমরা সাধারণত খাওয়াই না, কিন্তু ছোট্ট প্রাণীটির অবস্থা দেখে আর কোনো নিষেধমূলক নোটিশ না থাকায় ওকে এক দলা খাবার দেওয়া হলো। কিউট সেই প্রাণীটি বেশ গপগপ করে খেল। আমার তো মনে হয়, পুরো ট্রিপের সেরা ভিডিও আর ছবিগুলো ওর কল্যাণেই পাওয়া হয়ে গেল।
এবার পালা গভীর বনে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানোর—
.png)

২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে পা রেখেছিলেন। গন্তব্য ছিল ভারতের রাজধানী দিল্লি। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল দীর্ঘ পথচলা, যা দুই দশক পর এসে পৌঁছেছে ১০০ দেশ ভ্রমণের মাইলফলকে। আফ্রিকার দেশ জাম্বিয়ায় পা রেখে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন বাংলাদেশের ভ্রমণপিপাসু তানভীর অপু।
০৫ আগস্ট ২০২৬
তানজানিয়ার সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্ক। সোনালী সাভানার বুকে মা চিতা ও তার চার শাবকের সঙ্গে সাক্ষাৎ। বন্যপ্রাণীর রাজ্যে রোমাঞ্চ, বিস্ময় আর আজীবন মনে রাখার মতো ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন ভূ-পর্যটক তানভীর অপু।
৩১ জুলাই ২০২৬
বিখ্যাত ‘গ্রেট মাইগ্রেশন’ সরাসরি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছেন ভ্রমণপিপাসু তানভীর অপু। এটি মূলত সবুজ ঘাস ও পানির সন্ধানে লাখ লাখ ওয়াইল্ডবিস্ট এবং জেব্রার এক দেশ থেকে আরেক দেশে দলবেঁধে ছুটে চলার বার্ষিক মহাযাত্রা। বিশেষ করে মারা নদী পার হওয়ার সময় বন্যপ্রাণীদের জীবন-মৃত্যুর সেই রোমাঞ্চকর লড়াই তিনি খুব
২৮ জুলাই ২০২৬
আজ ‘শার্ক অ্যাওয়ারনেস ডে’ বা আন্তর্জাতিক হাঙর সচেতনতা দিবস। হাঙর সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে তাদের অপরিহার্য ভূমিকা তুলে ধরা এবং বিলুপ্তপ্রায় এই প্রাণীটিকে রক্ষা করাই এই দিবসের প্রধান লক্ষ্য। ভূ-পর্যটক তারেক অণু ২০১০ সালের জুনের শেষ দিকে গিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে। মহ
১৪ জুলাই ২০২৬