বিআইজিডির বার্ষিক সম্মেলন

নতুন প্রজন্মের কাছে ডান-বাম মতাদর্শ নয়, জবাবদিহিই মুখ্য

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

ব্র্যাক সেন্টারে ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক দিনব্যাপী সম্মেলন। স্ট্রিম ছবি

নতুন প্রজন্মের কাছে রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে জবাবদিহি ও প্রতিশ্রুতি রক্ষাই মুখ্য বলে মন্তব্য করেছেন নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অনিক রায়।

সোমবার (৩ আগস্ট) ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) বার্ষিক সম্মেলনে এই কথা বলেন তিনি।

সম্মেলনে বক্তারা বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, নতুন যাত্রার সূচনা মাত্র।

বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন বলেন, ‘গণতন্ত্র কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। এটি চলমান প্রক্রিয়া এবং একটি নকশা। প্রতিটি সমাজকেই প্রয়োজনে গণতন্ত্রকে পুনর্বিবেচনা ও পুনর্কল্পনা করতে হয়। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে বাস্তবতায় নতুনভাবে ভাবাই আমাদের উদ্দেশ্য।’

মূল প্রবন্ধে বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক ও উপদেষ্টা মির্জা এম. হাসান বলেন, বাংলাদেশ কোনো সময়ই ন্যূনতম মানদণ্ডের গণতন্ত্র অর্জন করতে পারেনি। দীর্ঘদিনের একদলীয় শাসন ও আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারে দেশে কর্তৃত্ববাদ দৃঢ় হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে জুলাই অভ্যুত্থানকে ‘আংশিক ভাঙন’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এটি প্রচলিত রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরশীল না থেকে সাধারণ মানুষের নেতৃত্বে হয়েছিল।

সম্মেলনে কথা বলেন বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক ও উপদেষ্টা মির্জা এম. হাসান। স্ট্রিম ছবি
সম্মেলনে কথা বলেন বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক ও উপদেষ্টা মির্জা এম. হাসান। স্ট্রিম ছবি

মির্জা হাসান আরও বলেন, নাগরিকদের রাজনৈতিক দলের ওপর পুরোপুরি ভরসা না করে তৃণমূল পর্যায় থেকে সাংবিধানিক গণতন্ত্র নির্মাণের দায়িত্ব নিতে হবে।

ভোটের আচরণ রাজনৈতিক দলগুলোর রূপান্তর

‘নির্বাচন ২০২৬: ভোটাধিকারের আচরণ ও গতিশীলতা বিশ্লেষণ’ শীর্ষক প্রথম অধিবেশনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন মুগ্ধ মাহজাব, শুভাশীষ বড়ুয়া, নাজমুল আহসান, আকিব মো. শাতিল এবং তাহরিমা বিনতে তারিক।

ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক এ কে এম ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক রুবাইয়া মুর্শেদ বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের সক্রিয় নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি। তবে জুলাই অভ্যুত্থান নতুন করে আশাবাদী করেছে।’

অলটারনেটিভসের সংগঠক মাহফুজ আলম বলেন, ‘অভ্যুত্থানের পর গঠিত “নাগরিক কমিটি” ছিল ডান, বাম, ইসলামপন্থী, উদারপন্থী, হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন মতের ৫৭ সদস্যের সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম। উদ্দেশ্য ছিল “পোস্ট-আইডিওলজি” (উত্তর-আদর্শিক) ধারণার ওপর ভিত্তি করে মধ্যপন্থী ধারা তৈরি করা। কিন্তু আদর্শগত মতভেদে তৈরি হওয়া বিভাজনের জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। প্রতিষ্ঠিত দলগুলো এই সুযোগই কাজে লাগিয়েছে।’

রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান নিয়ে চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ তাসনিম জারা বলেন, নারীদের বিষয়গুলো দলের নারী শাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং সেখানে তাঁদের একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে মূল নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখা হয়।

সম্মেলনের ‘গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ’ অধিবেশনে কথা বলছেন অনিক রায়। স্ট্রিম ছবি
সম্মেলনের ‘গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ’ অধিবেশনে কথা বলছেন অনিক রায়। স্ট্রিম ছবি

তিনি আরও বলেন, রাজনীতি এখন ব্যক্তি ও পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্কনির্ভর হয়ে পড়ায় সংসদে গঠনমূলক বিতর্ক ও জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

সম্মেলনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন ইয়াসিন শাফি, সোহেলা নাজনীন, মাহীন সুলতান ও মারুফা আক্তার।

নতুন প্রজন্মের কাছে মতাদর্শ নয়, জবাবদিহিই মুখ্য

সম্মেলনের শেষ অধিবেশনে নাগরিক সমাজ ও নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনিক রায় বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের কাছে আপনি বাম না ডান, সেটি আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং আপনি কতটা জবাবদিহিমূলক, প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা করেন এবং ভিন্নমতের মানুষের পক্ষে কতটা সাহসের সঙ্গে কথা বলেন, সেটাই মুখ্য।’

পিপলস রেভল্যুশনারি ইনিশিয়েটিভের প্রতিনিধি আরিফ সোহেল বলেন, ‘এত দিন আমরা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বলতে শুধু ভোটাধিকারকেই বুঝেছি। কিন্তু মানুষের মত, চাহিদা ও পরিচয়ে বৈচিত্র্য রয়েছে। তাই প্রচলিত বাম-ডান বিভাজনের বাইরে গিয়ে মানুষকে সংগঠিত করার নতুন পথ নিয়ে ভাবতে হবে।’

একই অধিবেশনে তাজনুভা জাবীন বলেন, তরুণদের ক্ষমতার কেন্দ্রে বা রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া খারাপ বিষয় নয়। তরুণদেরই বাংলাদেশের ‘নতুন অভিভাবক’ হতে হবে। বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে নতুন রাজনৈতিক ধারা বা সংগঠন তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত