জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে হামলার আগে রাস্তা কেটে রাখে সন্ত্রাসীরা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬, ১৩: ০১
এক্সকাভেটর দিয়ে রাস্তা কেটে রাখে সন্ত্রাসীরা। সংগৃহীত ছবি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় যৌথবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলার আগে সন্ত্রাসীরা অন্তত পাঁচটি স্থানে এক্সকাভেটর দিয়ে রাস্তা কেটে ফেলেছিল। সোমবার (২৫ মে) সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।

এদিকে হামলার পর ভোরে র‍্যাব-পুলিশের পাঁচ শতাধিক সদস্য পায়ে হেঁটে জঙ্গল সলিমপুরে ঢুকে অভিযান শুরু করে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত (দুপুর ১২টা) অভিযান চলছে। অভিযান সূত্রে জানা গেছে, এরইমধ্যে এ ঘটনায় সন্দেহভাজন সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছে।

অভিযান সংশ্লিষ্টরা বলেন, অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলার খবর পেয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে ভোরে অভিযান শুরু হয়। তবে রাস্তা কেটে ফেলায় যান্ত্রিক বাহন ব্যবহার সম্ভব হয়নি। পরে পায়ে হেঁটেই আইশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা ৩০ হাজার একর পাহাড়ি এলাকা পুরোটা ঘিরে ফেলেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, শুধু রাস্তা কাটাই নয়, ক্যাম্পের সীমানাপ্রাচীরও ভাঙার চেষ্টাও করা হয়েছিল। সকালে পাওয়া ছবিতে দেখা যায়, প্রাচীরের একটি অংশ ভেঙে পড়েছে। হামলার সময় ক্যাম্পটি তিনদিক থেকে ঘিরে গুলি ছোঁড়া হয় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, সমন্বিত হামলার এই ধরন দেখে মনে হচ্ছে, এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত নাশকতা ছিল।

জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে পরিচিত। সরকারি খাসজমিতে অবৈধ বসতি গড়ে ওঠার পাশাপাশি পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, দোকান ও মার্কেট।

জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সরকার পুলিশ ট্রেনিং একাডেমি, জেলা কারাগারসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্প ঘোষণার আগে থেকেই একটি সংগঠিত গোষ্ঠী স্থানীয়দের উচ্ছেদ আতঙ্ক দেখিয়ে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করছিল, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ঈদের পর আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এলাকা পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে। রোববার সকালে তার সফরসূচি সম্পর্কে অবহিত হয় প্রশাসন। এদিন রাতেই এই হামলার ঘটনা ঘটল।

হামলা চালানো হয় পরিকল্পিতভাবে

সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড়ি এলাকায় গাড়ি চলাচল একেবারে অচল করে দিতে রাতভর মাটি কেটে রাস্তার মাঝখানে বড় বড় গর্ত তৈরি করা হয়। ক্যাম্পে অতর্কিত হামলার আগ মুহূর্তে এই কৌশলগত নাশকতাই হামলাকারীদের পরিকল্পনার সুস্পষ্ট প্রমাণ বলে মনে করছে যৌথবাহিনী।

স্থানীয়রা জানান, রোববার দিবাগত রাত ১০টার পর থেকেই রাস্তা কাটার কাজ শুরু হয়। এক্সকাভেটর প্রায় তিন ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে কাজ করে। রাস্তার পাঁচটি পয়েন্টে প্রায় চার ফুট গভীর করে কেটে ফেলা হয় পুরো পাটাতন। কাটাছেঁড়া মাটির ঢিবি এমনভাবে ছড়িয়ে রাখা হয়, যাতে জরুরি মুহূর্তে র‍্যাব-পুলিশের গাড়ি সামনে এগোতে না পারে।

আর সেই পরিকল্পনার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ঘটে রাত ১টার দিকে, যখন জঙ্গল সলিমপুর ও পাশের আলীনগরের অস্থায়ী ক্যাম্প দুটি একই সময়ে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রধারী একটি দল আক্রমণ করে।

অভিযানে অংশ নেওয়া র‍্যাব-৭ এর ডেপুটি সহকারী পরিচাল কামাল হোসাইন বলেন, ‘রাস্তা কেটে তারা পুরো এলাকা অবরুদ্ধ করে দেয়। গাড়ি তো দূরের কথা, মোটরসাইকেলও ঢুকতে পারছিল না। ভেতরে থাকা সদস্যদের ওপর হঠাৎ হামলা চালানোই ছিল তাদের মূল পরিকল্পনা।’

রাস্তা কাটার জন্য যে এক্সকাভেটরটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি পরে ঘটনাস্থলের কাছেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

এদিকে হামলার এমন খবরে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ভাঙা রাস্তা, এক্সকাভেটরের কাটাছেঁড়া মাটি ও ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাম্প দেখে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছে। স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘এমন দৃশ্য কোনো দিন দেখিনি; পাহাড় কেটে রাস্তা উধাও, পাশে গুলির শব্দ, রাতভর বিশৃঙ্খলা।’

হামলার পর ক্যাম্প। সংগৃহীত ছবি
হামলার পর ক্যাম্প। সংগৃহীত ছবি

ভারী অস্ত্রে রাতভর তীব্র গুলিবর্ষণ

রাস্তা কেটে পালানোর সুবিধা নিশ্চিত করে হামলাকারীরা মধ্যরাতে অস্থায়ী ক্যাম্পকে ঘিরে ফেলে সন্ত্রাসীরা। র‍্যাব সদস্যদের ভাষ্য, একে-৪৭ ধাঁচের ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয় হামলায়। রাত ১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত গোলাগুলি চলে। টিনশেড ক্যাম্পের কাঠামোতে একাধিক স্থানে গুলিবিদ্ধ চিহ্ন দেখা গেছে।

এক র‍্যাব সদস্য বলেন, ‘হঠাৎ চারদিক থেকে গুলি শুরু হয়। আমাদের সদস্যরা দ্রুত অবস্থান বদলে পাল্টা গুলি চালান, নইলে হতাহতের সংখ্যা বাড়ত।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রাত ১২টার পর এলাকায় বৃষ্টি শুরু হলে পাহাড়ি ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে হামলাকারীরা নেমে আসে। বৃষ্টির শব্দে অস্ত্রের প্রাথমিক শব্দ ঢাকা পড়ে যায়। বৃষ্টির মধ্যেই তারা ক্যাম্পের বেশ কাছে পৌঁছে যায়।

অন্যদিকে অস্থায়ী ক্যাম্পে স্থায়ী ব্যারাক তৈরি না হওয়ায় সদস্যদের বড় অংশই পাশের একটি স্কুল ভবনে থাকতেন। হামলাকারীরা এই বিষয়টি জানত বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

নিরাপদে আছেন ক্যাম্পের সদস্যরা

র‍্যাব–৭ এর কমান্ডিং কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এটি ছিল পরিকল্পিত হামলা। রাস্তা কেটে ফেলার মধ্য দিয়ে তারা আগেই নিজেদের সুবিধা নিশ্চিত করেছে। তবে আমাদের সদস্যরা নিরাপদ আছেন এবং আমরা পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি।’

যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে আরও বড় অভিযান চালানো হবে।

জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘হামলার আগে সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে কয়েক জায়গায় রাস্তা কেটে ফেলেছিল। এটা এমনভাবে করা হয়েছে যে আমাদের গাড়ি কোনোভাবেই সামনে এগোতে পারেনি। আমরা পায়ে হেঁটে সদস্য পাঠাই। রাতভর গুলিবর্ষণের পর ভোরে তারা পালিয়ে যায়। এখন পুরো এলাকা ঘিরে অভিযান চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের সমন্বিত হামলা চালাতে হলে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি লাগে। কারা এর সঙ্গে জড়িত, সেটি আমরা খতিয়ে দেখছি। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

সম্পর্কিত