‘হেলিকপ্টার থেকে গুলি’ ও ইনুর উসকানির প্রমাণ নেই: আসামিপক্ষ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬, ১৯: ০১
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। স্ট্রিম ছবি

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ‘হেলিকপ্টার থেকে গুলি’ বা বোমাবর্ষণের কোনো প্রমাণ নেই। এ ছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর ফোনালাপে আন্দোলন দমনে কোনো উসকানি বা ষড়যন্ত্রের উপাদান পাওয়া যায়নি বলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাবি করেছে আসামিপক্ষ।

বুধবার (৬ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে হাসানুল হক ইনুর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়।

প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

জুলাই আন্দোলনে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আটটি অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুর পক্ষে এ যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। গত ২ এপ্রিল শুরু হওয়া আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক বুধবার শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করে।

ট্রাইব্যুনালে ইনুর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন সাবেক বিচারপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। তাকে আইনি সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট মো. সুলতান মাহমুদ সিমন, অ্যাডভোকেট মো. আবুল হাসান ও ব্যারিস্টার সিফাত মাহমুদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মঈনুল করিম, আবদুস সোবহান তরফদার প্রমুখ।

শুনানির শুরুতে আসামিপক্ষ তদন্তকারী কর্মকর্তার জেরার অংশবিশেষ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরে। তারা আদালতকে জানান, জেরায় তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে হেলিকপ্টার থেকে বোমাবর্ষণের বিষয়ে তিনি র‍্যাবের কোনো কর্মকর্তা বা হেলিকপ্টার আরোহীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে আসামিপক্ষ জানায়, ওই প্রতিবেদনে ৫ আগস্টের পর নিয়োগ পাওয়া আইজিপি ও র‍্যাব মহাপরিচালকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত র‍্যাবের হেলিকপ্টার থেকে কোনো গুলি বা বোমাবর্ষণ করা হয়নি।

শুনানিতে ইনুর আইনজীবীরা বলেন, ‘এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেছেন, “ইহা সত্য নহে”। অথচ জাতিসংঘের প্রতিবেদনে খোদ আইজিপি ও র‍্যাব ডিজির বক্তব্য রয়েছে। এ থেকেই প্রমাণিত হয় তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না করে ট্রাইব্যুনালে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন।’

আসামিপক্ষ তাদের যুক্তিতর্কে দাবি করে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন নিছক কোনো ছাত্র আন্দোলন ছিল না; বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। এর সপক্ষে তারা বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করে।

আন্দোলনে রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার প্রমাণ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের বিবিসি বাংলাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ তুলে ধরা হয়। সেখানে তিনি বলেছিলেন, “এটার পেছনে যে আমরা ছিলাম এটা গোয়েন্দারা জানতো, সরকার জানতো। এ জন্যই তো আমাদেরকে ব্যান করেছে।… এটা যে জামায়াত-শিবিরের আন্দোলন এটা যেন প্রকাশিত না হয়, আমরা চেয়েছি এটা একটা সার্বজনীন রূপ দেওয়ার জন্য।’

এ ছাড়া দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে আসামিপক্ষ জানায়, সিএমএইচে চিকিৎসাধীন আনসার সদস্যদের ওপর বেসামরিক লোকজন ৭.৬২ এমএম রাইফেল দিয়ে হামলা করেছিল। ছাত্র আন্দোলনের নামে কারা এই সশস্ত্র অবস্থায় ছিল, তার তদন্ত হয়নি।

হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের অধীনে আনা অভিযোগ খণ্ডন করে আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী জানান, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ইনুর টেলিফোন কথোপকথনের যে দুটি রেকর্ড প্রসিকিউশন দাখিল করেছে, সেখানে আন্দোলন দমনে গুলি, বোমাবর্ষণ বা নির্যাতনের কোনো কথা নেই। পাশাপাশি প্রসিকিউশন থেকে দাখিল করা ইনুর তিনটি সাক্ষাৎকার এবং ৫টি সংবাদ প্রতিবেদনেও আন্দোলন দমনে উসকানি, ষড়যন্ত্র বা সহযোগিতার কোনো উপাদান নেই।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর গত বছরের ২৬ অগাস্ট হাসানুল হক ইনুকে উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর তাকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়।

এ ছাড়া, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ইনুর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছে। মামলায় তার বিরুদ্ধে ৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। একই ধরনের অভিযোগে তার স্ত্রী আফরোজা হকের বিরুদ্ধেও আলাদা মামলা করেছে দুদক।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত