ছোট জয়ে বড় হাসি, থেরাপি কক্ষের অন্যরকম উপাখ্যান

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ৪৯
খেলনার ঘরের মতো দেখতে এই কক্ষটি অনেক পরিবারের আশ্রয়ের জায়গা। স্ট্রিম ছবি।

কক্ষজুড়ে ছড়িয়ে আছে লাল, নীল ও হলুদ ডোরাকাটা বল। দেয়ালে শিশুদের জন্য রঙিন ছবি, স্টিকার ও নির্দেশনা। কক্ষের মাঝখানে লিনিয়ার সুইং; অন্য পাশে থেরাপি বল, ফোম ম্যাট, ছোট্ট ক্লাইম্বিং স্ট্রাকচার, মই আর দড়ির দেয়াল। প্রথম দেখায় এটি মায়াভরা খেলার ঘর মনে হলেও এর প্রতিটি অনুষঙ্গের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। এসবের মাধ্যমে শিশুদের মোটর স্কিল, ভারসাম্য, শরীরের ভর নিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর অনুশীলন করানো হয়।

রাজধানীর আদাবরে বাংলাদেশ থেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ফাউন্ডেশনে (বিটিআরএফ) ঢুকতেই চোখে পড়লো রঙিন এক ভিন্ন জগৎ। খেলনার ঘরের মতো দেখতে এই কক্ষটি অনেক পরিবারের আশ্রয়ের জায়গা। এখানে ছোট ছোট অর্জনগুলোকেও অনেক বড় করে দেখা হয়। কারণ এই সামান্য পরিবর্তনের পেছনেই লুকিয়ে থাকে বহুদিনের দুশ্চিন্তা আর অপেক্ষার গল্প।

স্ট্রিম ছবি।
স্ট্রিম ছবি।

কক্ষটিতে নুমায়ের আহমেদ খান নামের এক শিশু লিনিয়ার সুইংয়ে দোল খাচ্ছিল। তার মুখে একরাশ স্বস্তি। পাশে দাঁড়িয়ে মা নিলুফা আক্তার জানান, নুমায়েরের বিকাশ ১৪ মাস পর্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। তবে ২২ মাস বয়সে তিনি কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন। শিশুটি কিছু শব্দ বললেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বা কোনো নির্দেশনা মানত না। এরপর তিনি বিটিআরএফে স্পেশাল স্কুলিং, অকুপেশনাল থেরাপি ও স্পিচ থেরাপি শুরু করেন। নিলুফা জানান, শুরুতে বাসায় ছেলেকে সামলানো অসম্ভব মনে হতো। থেরাপিস্টদের নির্দেশনায় বাসায় নিয়মিত অনুশীলনের ফলে এখন তিনি সন্তানের আচরণ বুঝতে ও সামলাতে পারেন। তিন বছর বয়সে নুমায়ের যখন প্রথমবার ‘মা’ বলে ডাকল, নিলুফার কাছে সেটিই ছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

আরেক অভিভাবক কণা (ছদ্মনাম) জানান, তাঁর সন্তান আলিফের (ছদ্মনাম) হাঁটা ও দাঁত উঠতে দেরি হয়েছিল। ১৪ মাসের দিকে কিছু শব্দ এলেও আলিফ স্থির হয়ে বসত না এবং ঘুমের সমস্যা ছিল। পরে তিনি বুঝতে পারেন, আলিফের সেন্সরি ইস্যু ও স্পিচ ডিলে রয়েছে। চিকিৎসক ও থেরাপি সেন্টারের গাইডলাইন মেনে চলায় এখন আলিফের মধ্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। সে এখন ডান হাত বাড়ানোর নির্দেশ বোঝে, টেবিলে বসে নিজে খাবার খায় এবং ‘দাও’ বলার চেষ্টা করে। এই ছোট ছোট পরিবর্তনই কণার জীবনের বড় স্বস্তি।

স্ট্রিম ছবি।
স্ট্রিম ছবি।

বিটিআরএফের ক্লিনিক্যাল অকুপেশনাল থেরাপিস্ট সায়মা হোসেন জানান, তাদের কাছে আসা শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশ অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডার, ২০ শতাংশ এডিএইচডি এবং বাকি ১০ শতাংশ বিভিন্ন নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল বা সেন্সরি সমস্যায় আক্রান্ত। তিনি ইয়ামিন নামের এক শিশুর উদাহরণ দিয়ে বলেন, শুরুতে তার আই কন্টাক্ট ও বসার অভ্যাস ছিল না। ওরাল ম্যাসাজ ও ফ্ল্যাশ কার্ডের মতো নানা থেরাপির মাধ্যমে এখন সে কথা বলতে ও বসে কাজ করতে পারে। তিনি আরও জানান, সাফওয়ান নামের একটি শিশু মায়ের মৃত্যুর ট্রমায় কথা বলা হারিয়ে ফেলেছিল, যা থেরাপির মাধ্যমে ফিরে এসেছে।

স্ট্রিম ছবি।
স্ট্রিম ছবি।

স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি চিকিৎসক ফিদা আল শামস বলেন, অটিজমকে সমস্যা হিসেবে না দেখে নিউরো-ডাইভারসিটি ও মানবাধিকারের জায়গা থেকে দেখতে হবে। সঠিক সহায়তা পেলে এই শিশুরাও সমাজে অবদান রাখতে পারে। তিনি জানান, সাধারণত ৯-১৮ মাসে শিশু একক শব্দ, ১৮-২৪ মাসে দুই শব্দের বাক্য এবং আড়াই বছরে তিন শব্দের বাক্য বলা শুরু করে। যদি ১৮ মাসেও শিশু চোখে চোখ না রাখে বা কথা না বলে, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। আর্লি ইন্টারভেনশন এবং স্পিচ ও অকুপেশনাল থেরাপির সমন্বিত চিকিৎসা এই শিশুদের বিকাশে অপরিহার্য।

বিটিআরএফের সেই রঙিন কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার সময় এটি স্পষ্ট হয় যে, সেখানে বড় সাফল্য আসে ছোট ছোট অর্জনের হাত ধরে। কখনো ‘মা’ ডাকের মধ্য দিয়ে, কখনো বাটি থেকে নিজে খাবার খাওয়ার মধ্য দিয়ে। বাইরের জগতের কাছে এগুলো ছোট মনে হলেও সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে এগুলোই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্প।

সম্পর্কিত