হাসান মামুন

কোরবানি ঈদের আগ দিয়ে বাজারে কিছু সুখবর আছে। যেমন, বেড়ে যাওয়া ডিমের দাম কমে এসেছে। ব্রয়লার আর সোনালি মুরগির দামও। দাম আগের জায়গায় আসার ‘প্রত্যাশা’ থাকলেও সেটা কমই ঘটে। কারণ বাজারে সক্রিয় থাকে দাম বৃদ্ধির উপাদানগুলো। এরই মধ্যে তো ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। তাতে রাতারাতি বেড়েছে পণ্য পরিবহন ব্যয়। হালে ডিমের সরবরাহ বাড়লেও বর্ধিত পরিবহন ব্যয়ের চাপ থাকবে দামের ওপর। মুরগির দামের ওপরও থাকবে।
ডিমের ডজনপ্রতি দাম যখন ১৫০ টাকার দিকে রওনা হয়েছিল, তখন কেউ কেউ বলছিলেন—সামনেই ঈদের সময় এর দাম কমবে। তখন গরিবের ঘরেও থাকবে গরু-ছাগলের মাংস। পশু কোরবানি বেড়েছে দেশে। কোরবানিতে অসমর্থদের মধ্যে মাংস বিতরণও বেড়েছে। সবাই ডিপ ফ্রিজে কোরবানির মাংস ঢুকিয়ে ফেলে, তা নয়। একটা ‘রেমিট্যান্স পল্লী’র কথা জানি, যেখানে কোরবানি দিতে না পারা প্রতিটি পরিবার ১০ কেজি গোমাংস পেয়েছে গেলবার। অনেকে তো কুড়িয়ে পাওয়া মাংস বেচে দেয় জায়গামতো দাঁড়িয়ে। এরও ক্রেতা রয়েছে। কথা হলো, কিছুদিনের জন্য হলেও যখন ঘরে ঘরে কোরবানির মাংস থাকবে; তখন লোকে হয়তো আর ডিম কিনবে না। মুরগিও কম কিনবে। এতে সরবরাহ বেড়ে দাম কমবে ওইসব পণ্যের। বাজারে এভাবে ‘ভারসাম্য’ প্রতিষ্ঠার একটা প্রক্রিয়া চলে।
কোরবানির আগ দিয়ে প্রতিবারই মসলার দামের ওপর খবর আসে মিডিয়ায়। মাংস রান্নার জন্য মসলার চাহিদা অনেক বাড়ে তখন। দামও বাড়ে। তবে আজকাল খুব বাড়ে না। কারণ আমদানির পাশাপাশি চোরাই পথেও মসলা আসে। মিথ্যা ঘোষণায় অধিক মসলাও আনে অনেক ব্যবসায়ী। যারা আনে, তারা নাকি ব্যবসাটা ভালোভাবে করতে পারে। নইলে চোরাই পথে আসা মসলার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে না দামে। ভোক্তা তো আর জানে না, কোনটা চোরাই পথে এসেছে আর কোনটা শুল্ক দিয়ে। তার চাই কম দামে একই পণ্য। কোনো কোনো কোরবানি ঈদে বেশি আমদানি হওয়ায় মসলার দাম উল্টো কমে যায়। কারণ একইসঙ্গে চোরাচালানও হয়। দুইয়ের চাপে দাম যায় পড়ে।
মসলা নিত্যপণ্য বৈকি। এর শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে রাখার দাবি রয়েছে এবং এটা সমর্থনযোগ্য। আর আমাদের উচিত যেসব মসলা দেশে ভালো হয় কিংবা হতে পারে, সেগুলোর উৎপাদনে মনোনিবেশ করা। রোজার সময়ও কিছু মসলার চাহিদা বাড়ে, বিশেষত ইফতার সামগ্রী তৈরিতে। পেঁয়াজকে যদি মসলা ধরি, তবে এর চাহিদা অনেক বাড়ে পেঁয়াজু বানানোর জন্য। কোরবানি ঈদেও এর চাহিদা বাড়ে মাংস রান্নায়। রসুন আর আদার চাহিদাও কম বাড়ে না। পেঁয়াজ ভালো হয়েছিল এবার। তাই এর দাম সহনীয় পর্যায়ে আছে। আদা, রসুনের দামও কম ছিল। তবে কোরবানির আগ দিয়ে বিশেষ করে আদার দাম বৃদ্ধি খবর হয়েছে। ভোজ্যতেলের চাহিদাও এ সময়ে বাড়ে। তবে এর দাম কিছুদিন আগেই বাড়ানো হয়েছে বলে নতুন করে বাড়ার কিছু নেই।
এ সময়ে সবজির দামও কিছুটা কমে আসবে মনোযোগ অন্যদিকে বলে। গ্রীষ্মের শুরুতে এর দাম একটু বেশিই থাকে– শীতের সবজি বিদায় নেয় বলে। ঝড়বৃষ্টির কবলে এর সরবরাহও ব্যাহত হয়। বাড়ে অপচয়। এগুলো গিয়ে ঢোকে সবজির দামে। গরু-ছাগলের মাংস যখন ঘরে ঘরে ঢুকবে, তখন সবজির চাহিদা যাবে কমে। এর ব্যবসায়ীরাও কমিয়ে দেবে ব্যবসা। অতঃপর সবজি, ডিম, মুরগি, এমনকি মাছের বাজার স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে সময় লাগবে। ঈদে লম্বা ছুটি দেওয়া হচ্ছে আজকাল। এর ইতিবাচক দিক অস্বীকার করা যাবে না। নেতিবাচক দিক হলো, এতে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগে। কাঁচাবাজারের ঝিমানো ভাব যেন কাটতেই চায় না। হঠাৎ করে কোনো পণ্য কেনা জরুরি হলে তখন দেখা যায়, সেটা সহজে মিলছে না। দাম বেশি; মানেও খারাপ।
কোরবানি ঈদের আগ দিয়ে লোকে অবশ্য এইসব আলোচনায় যেতে চায় না। তারা জানতে চায়, হাটে ওঠা গরু-ছাগলের দাম কেমন। যে কোরবানি দেবে না, দেওয়ার সামর্থ্যও হয়তো নেই; সেও জানতে চায়। কোরবানি না দেওয়া লোকই তো বেশি। এক কোটি পশু জবাই হলেও বুঝতে হবে, বহু পরিবারে কোরবানি হয়নি। তবে তাদের ঘরেও কোরবানির মাংস পৌঁছবে কোনো না কোনো উপায়ে। আমাদের মাথাপিছু গোমাংস পরিভোগ তো খুবই কম; বলা যায় দুনিয়ায় সবচেয়ে কম। আমরা ডিম, ব্রয়লার আর সোনালি মুরগি দিয়ে কোনোমতে পুষ্টি চাহিদা মেটাই। গরু বা ছাগলের মাংস নয়; সারাবছর ডিম আর মুরগির দাম নিয়েই চিন্তিত থাকি। সেজন্যই আসলে ডিম আর মুরগির দামের কথা বলে নিবন্ধটা শুরু করা। কোরবানির ঈদ শেষে আমাদের আবার ফিরতে হবে এগুলোর কাছে। এমনকি সবজির কাছে। আর মাছের বাজারে। ‘চাষের মাছের’ ব্যবস্থা না হলে কী হতো, বলুন তো?
মাছের মতো কোরবানির গরুও খামারে তৈরি হচ্ছে। ছাগল নিয়ে আলোচনা কেন কম, সেটা অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না। ছাগল আর ভেড়া তো কোরবানির পশুর প্রায় ৫০ শতাংশ। এদিকে ছোট গরুর চাহিদা বাড়ছে। কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যাও কমছে ক’বছর ধরে। এসব তথ্য-উপাত্তের সঠিকতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তবে কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা আরও ১০ লাখ কমিয়ে ধরলেও এটা পাকিস্তানের চাইতে বেশি। সেখানে জনসংখ্যা অনেক বেশি আমাদের চেয়ে। তার মানে, পশু কোরবানিতে আমরা এগিয়ে। শীর্ষেই নাকি আছি। আর এসব পশুর প্রায় শতভাগ তৈরি হচ্ছে দেশীয় খামারে। উল্লেখযোগ্য অংশ আসছে পারিবারিক উদ্যোগ থেকে। তাদের কাছে নগদ অর্থ যাচ্ছে কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে। যেসব বেপারি তাদের গরু-ছাগল এনে বিক্রি করছে, তারাও ব্যবসা করছে। এদের ভূমিকা ছাড়া গোটা কর্মযজ্ঞটাই অসম্ভব। এদের মুনাফা করতে হবে। নইলে পরেরবার ব্যবসায় নামবে না।
ব্যবসায় সবাই ভালো করে না। কিছু বড় ব্যবসায়ীও লোকসান করে রণে ভঙ্গ দেয়। ছোট-বড় অনেক খামারিও প্রতিবার লোকসান করে। অনেক বেপারিও লোকসান দেয় নিশ্চয়। নতুন অনেকে এসে জোটে। পারিবারিক উদ্যোগে লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলানো কঠিন। বিরাট এক তরুণ জনগোষ্ঠী এসব কাজে নিয়োজিত। তাতে গরু-ছাগলে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে মাথাপিছু মাংস পরিভোগ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি হয়তো ভিন্নরকম দাঁড়াবে। আয় না বাড়লে অবশ্য সেটা ঘটবে না। গরু-ছাগল পেলেপুষে সংশ্লিষ্টদের আয় কেমন বাড়ছে, সে বিষয়ে কোনো অনুসন্ধানমূলক কাজ হয়েছে কি? একটা ‘অবরুদ্ধ বাজার’ পেয়ে তারা ভালো করছে, সন্দেহ নেই। তবে যে ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ায় গরু-ছাগল পালা হচ্ছে, সেটা ব্যবসা হিসেবে কতটা যুৎসই? মূল্যস্ফীতির চাপে পশু কোরবানি যখন কমছে এবং অন্য সময়েও মাংস বিক্রি ক্রমহ্রাসমান, তখন উৎপাদন বাড়িয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ কিনা? গরু-ছাগলের উৎপাদন নাকি বাড়ছেও না। কে জানে, একটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে হয়তো!
কিছু দেশ পশু কোরবানি দেয় আমদানি করে। আমরাও কিছু ‘আমদানি’ করতাম ভারত থেকে। চোরাই পথে এনে বৈধ করে নেওয়ার একটা বন্দোবস্তও ছিল। তাতে উভয় পক্ষই লাভবান হতো। এখন পশ্চিমবঙ্গেও যখন বিজেপি ক্ষমতায় এসে গেছে, তখন ধরে নিতে হবে– সীমান্তপথে গরু আসা আরও কমবে। তারপরও চাহিদা কোনো বিধিনিষেধ মানে না বলে ওখান থেকে গরু ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিজেপির বাজারবিরুদ্ধ বাড়াবাড়িতে তাদের পশুপালন খাতে নামতে পারে বিপর্যয়। তবে তাদেরটা তারা বুঝবে। আমাদেরটা আমরা। আমাদের গোচারণভূমি নেই বললেই চলে। আছে কিছু চরাঞ্চল। তাতে কম খরচে মহিষ পালন বাড়ানো যায়। কিন্তু গরু-ছাগল? এ খাতে ব্যয় কমিয়ে গরু ও এর মাংস সহজলভ্য করার সুযোগ কোথায়?
আলোচনা জটিল হয়ে যাচ্ছে। সরল সমাধানের সুযোগ তো অনুপস্থিত। তবে উৎপাদিত গরু-ছাগল ঘিরে যে বাণিজ্য হচ্ছে বিশেষ করে কোরবানি ঈদে, তাতে অর্থের বিপুল লেনদেনে গ্রাম অবধি সচলতা তৈরির বিষয়টি তাৎপর্যবহ। এতে করে যাদের হাতে বাড়তি অর্থ আসে, সেটা তারা ব্যয় করে মূলত কোথায়? এদের মধ্যে যারা দরিদ্র, তারা কি সেটা কাটিয়ে উঠতে পারছে? পারছে অন্তত ভাগে কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য অর্জন করতে? সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা জোগাতে? নাকি তাদেরও গরু-ছাগল পেলেপুষে কায়ক্লেশে বাঁচতে হবে? এরা কি মাছ, মাংস, ডিম, দুধের মতো খাবারের বদলে বেশি করে ভাত খেয়ে পেট ভরাবে? ঈদের ছুটিতে বোরো উত্তোলনও চলবে। চলবে বৃষ্টিবাদল। আর বজ্রপাত। কৃষিতেই নাকি এবার প্রবৃদ্ধি ভালো। আর এতে জড়িয়ে আছে বিপুল জনগোষ্ঠী। এদের বড় অংশই আবার তরুণ। আরও বেশি উপার্জনমূলক কাজে জড়িয়ে আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ কি এদের করে দিতে হবে না?
ফিরে যাই ডিমে; ব্রয়লার আর সোনালি মুরগিতে। ক্ষুদ্র পুঁজি নিয়ে এসবে যারা জড়িয়ে– হয়তো নিরুপায় হয়ে, তাদের কতজন কেমন আছে? এরাও তো বলে, দাম একটু বাড়লে– যেমন, ডিমের ডজনপ্রতি দাম ১৫০ হলে তবেই একটা গ্রহণযোগ্য মুনাফা হয় তাদের। বছরজুড়ে সহজ পুষ্টির জোগান দিয়ে যাচ্ছে তারা ১৬-১৭ কোটি মানুষকে। ‘মিড ডে মিল’ পুরোপুরি চালু হলে ১ কোটি ৭০ লাখ শিশুর পাতে তারাই তো ডিমের জোগান দেবে। সেই খামারিদের কতজন এবার স্বচ্ছন্দে উৎসবে শামিল হতে পারছে?

কোরবানি ঈদের আগ দিয়ে বাজারে কিছু সুখবর আছে। যেমন, বেড়ে যাওয়া ডিমের দাম কমে এসেছে। ব্রয়লার আর সোনালি মুরগির দামও। দাম আগের জায়গায় আসার ‘প্রত্যাশা’ থাকলেও সেটা কমই ঘটে। কারণ বাজারে সক্রিয় থাকে দাম বৃদ্ধির উপাদানগুলো। এরই মধ্যে তো ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। তাতে রাতারাতি বেড়েছে পণ্য পরিবহন ব্যয়। হালে ডিমের সরবরাহ বাড়লেও বর্ধিত পরিবহন ব্যয়ের চাপ থাকবে দামের ওপর। মুরগির দামের ওপরও থাকবে।
ডিমের ডজনপ্রতি দাম যখন ১৫০ টাকার দিকে রওনা হয়েছিল, তখন কেউ কেউ বলছিলেন—সামনেই ঈদের সময় এর দাম কমবে। তখন গরিবের ঘরেও থাকবে গরু-ছাগলের মাংস। পশু কোরবানি বেড়েছে দেশে। কোরবানিতে অসমর্থদের মধ্যে মাংস বিতরণও বেড়েছে। সবাই ডিপ ফ্রিজে কোরবানির মাংস ঢুকিয়ে ফেলে, তা নয়। একটা ‘রেমিট্যান্স পল্লী’র কথা জানি, যেখানে কোরবানি দিতে না পারা প্রতিটি পরিবার ১০ কেজি গোমাংস পেয়েছে গেলবার। অনেকে তো কুড়িয়ে পাওয়া মাংস বেচে দেয় জায়গামতো দাঁড়িয়ে। এরও ক্রেতা রয়েছে। কথা হলো, কিছুদিনের জন্য হলেও যখন ঘরে ঘরে কোরবানির মাংস থাকবে; তখন লোকে হয়তো আর ডিম কিনবে না। মুরগিও কম কিনবে। এতে সরবরাহ বেড়ে দাম কমবে ওইসব পণ্যের। বাজারে এভাবে ‘ভারসাম্য’ প্রতিষ্ঠার একটা প্রক্রিয়া চলে।
কোরবানির আগ দিয়ে প্রতিবারই মসলার দামের ওপর খবর আসে মিডিয়ায়। মাংস রান্নার জন্য মসলার চাহিদা অনেক বাড়ে তখন। দামও বাড়ে। তবে আজকাল খুব বাড়ে না। কারণ আমদানির পাশাপাশি চোরাই পথেও মসলা আসে। মিথ্যা ঘোষণায় অধিক মসলাও আনে অনেক ব্যবসায়ী। যারা আনে, তারা নাকি ব্যবসাটা ভালোভাবে করতে পারে। নইলে চোরাই পথে আসা মসলার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে না দামে। ভোক্তা তো আর জানে না, কোনটা চোরাই পথে এসেছে আর কোনটা শুল্ক দিয়ে। তার চাই কম দামে একই পণ্য। কোনো কোনো কোরবানি ঈদে বেশি আমদানি হওয়ায় মসলার দাম উল্টো কমে যায়। কারণ একইসঙ্গে চোরাচালানও হয়। দুইয়ের চাপে দাম যায় পড়ে।
মসলা নিত্যপণ্য বৈকি। এর শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে রাখার দাবি রয়েছে এবং এটা সমর্থনযোগ্য। আর আমাদের উচিত যেসব মসলা দেশে ভালো হয় কিংবা হতে পারে, সেগুলোর উৎপাদনে মনোনিবেশ করা। রোজার সময়ও কিছু মসলার চাহিদা বাড়ে, বিশেষত ইফতার সামগ্রী তৈরিতে। পেঁয়াজকে যদি মসলা ধরি, তবে এর চাহিদা অনেক বাড়ে পেঁয়াজু বানানোর জন্য। কোরবানি ঈদেও এর চাহিদা বাড়ে মাংস রান্নায়। রসুন আর আদার চাহিদাও কম বাড়ে না। পেঁয়াজ ভালো হয়েছিল এবার। তাই এর দাম সহনীয় পর্যায়ে আছে। আদা, রসুনের দামও কম ছিল। তবে কোরবানির আগ দিয়ে বিশেষ করে আদার দাম বৃদ্ধি খবর হয়েছে। ভোজ্যতেলের চাহিদাও এ সময়ে বাড়ে। তবে এর দাম কিছুদিন আগেই বাড়ানো হয়েছে বলে নতুন করে বাড়ার কিছু নেই।
এ সময়ে সবজির দামও কিছুটা কমে আসবে মনোযোগ অন্যদিকে বলে। গ্রীষ্মের শুরুতে এর দাম একটু বেশিই থাকে– শীতের সবজি বিদায় নেয় বলে। ঝড়বৃষ্টির কবলে এর সরবরাহও ব্যাহত হয়। বাড়ে অপচয়। এগুলো গিয়ে ঢোকে সবজির দামে। গরু-ছাগলের মাংস যখন ঘরে ঘরে ঢুকবে, তখন সবজির চাহিদা যাবে কমে। এর ব্যবসায়ীরাও কমিয়ে দেবে ব্যবসা। অতঃপর সবজি, ডিম, মুরগি, এমনকি মাছের বাজার স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে সময় লাগবে। ঈদে লম্বা ছুটি দেওয়া হচ্ছে আজকাল। এর ইতিবাচক দিক অস্বীকার করা যাবে না। নেতিবাচক দিক হলো, এতে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগে। কাঁচাবাজারের ঝিমানো ভাব যেন কাটতেই চায় না। হঠাৎ করে কোনো পণ্য কেনা জরুরি হলে তখন দেখা যায়, সেটা সহজে মিলছে না। দাম বেশি; মানেও খারাপ।
কোরবানি ঈদের আগ দিয়ে লোকে অবশ্য এইসব আলোচনায় যেতে চায় না। তারা জানতে চায়, হাটে ওঠা গরু-ছাগলের দাম কেমন। যে কোরবানি দেবে না, দেওয়ার সামর্থ্যও হয়তো নেই; সেও জানতে চায়। কোরবানি না দেওয়া লোকই তো বেশি। এক কোটি পশু জবাই হলেও বুঝতে হবে, বহু পরিবারে কোরবানি হয়নি। তবে তাদের ঘরেও কোরবানির মাংস পৌঁছবে কোনো না কোনো উপায়ে। আমাদের মাথাপিছু গোমাংস পরিভোগ তো খুবই কম; বলা যায় দুনিয়ায় সবচেয়ে কম। আমরা ডিম, ব্রয়লার আর সোনালি মুরগি দিয়ে কোনোমতে পুষ্টি চাহিদা মেটাই। গরু বা ছাগলের মাংস নয়; সারাবছর ডিম আর মুরগির দাম নিয়েই চিন্তিত থাকি। সেজন্যই আসলে ডিম আর মুরগির দামের কথা বলে নিবন্ধটা শুরু করা। কোরবানির ঈদ শেষে আমাদের আবার ফিরতে হবে এগুলোর কাছে। এমনকি সবজির কাছে। আর মাছের বাজারে। ‘চাষের মাছের’ ব্যবস্থা না হলে কী হতো, বলুন তো?
মাছের মতো কোরবানির গরুও খামারে তৈরি হচ্ছে। ছাগল নিয়ে আলোচনা কেন কম, সেটা অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না। ছাগল আর ভেড়া তো কোরবানির পশুর প্রায় ৫০ শতাংশ। এদিকে ছোট গরুর চাহিদা বাড়ছে। কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যাও কমছে ক’বছর ধরে। এসব তথ্য-উপাত্তের সঠিকতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তবে কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা আরও ১০ লাখ কমিয়ে ধরলেও এটা পাকিস্তানের চাইতে বেশি। সেখানে জনসংখ্যা অনেক বেশি আমাদের চেয়ে। তার মানে, পশু কোরবানিতে আমরা এগিয়ে। শীর্ষেই নাকি আছি। আর এসব পশুর প্রায় শতভাগ তৈরি হচ্ছে দেশীয় খামারে। উল্লেখযোগ্য অংশ আসছে পারিবারিক উদ্যোগ থেকে। তাদের কাছে নগদ অর্থ যাচ্ছে কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে। যেসব বেপারি তাদের গরু-ছাগল এনে বিক্রি করছে, তারাও ব্যবসা করছে। এদের ভূমিকা ছাড়া গোটা কর্মযজ্ঞটাই অসম্ভব। এদের মুনাফা করতে হবে। নইলে পরেরবার ব্যবসায় নামবে না।
ব্যবসায় সবাই ভালো করে না। কিছু বড় ব্যবসায়ীও লোকসান করে রণে ভঙ্গ দেয়। ছোট-বড় অনেক খামারিও প্রতিবার লোকসান করে। অনেক বেপারিও লোকসান দেয় নিশ্চয়। নতুন অনেকে এসে জোটে। পারিবারিক উদ্যোগে লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলানো কঠিন। বিরাট এক তরুণ জনগোষ্ঠী এসব কাজে নিয়োজিত। তাতে গরু-ছাগলে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে মাথাপিছু মাংস পরিভোগ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি হয়তো ভিন্নরকম দাঁড়াবে। আয় না বাড়লে অবশ্য সেটা ঘটবে না। গরু-ছাগল পেলেপুষে সংশ্লিষ্টদের আয় কেমন বাড়ছে, সে বিষয়ে কোনো অনুসন্ধানমূলক কাজ হয়েছে কি? একটা ‘অবরুদ্ধ বাজার’ পেয়ে তারা ভালো করছে, সন্দেহ নেই। তবে যে ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ায় গরু-ছাগল পালা হচ্ছে, সেটা ব্যবসা হিসেবে কতটা যুৎসই? মূল্যস্ফীতির চাপে পশু কোরবানি যখন কমছে এবং অন্য সময়েও মাংস বিক্রি ক্রমহ্রাসমান, তখন উৎপাদন বাড়িয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ কিনা? গরু-ছাগলের উৎপাদন নাকি বাড়ছেও না। কে জানে, একটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে হয়তো!
কিছু দেশ পশু কোরবানি দেয় আমদানি করে। আমরাও কিছু ‘আমদানি’ করতাম ভারত থেকে। চোরাই পথে এনে বৈধ করে নেওয়ার একটা বন্দোবস্তও ছিল। তাতে উভয় পক্ষই লাভবান হতো। এখন পশ্চিমবঙ্গেও যখন বিজেপি ক্ষমতায় এসে গেছে, তখন ধরে নিতে হবে– সীমান্তপথে গরু আসা আরও কমবে। তারপরও চাহিদা কোনো বিধিনিষেধ মানে না বলে ওখান থেকে গরু ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিজেপির বাজারবিরুদ্ধ বাড়াবাড়িতে তাদের পশুপালন খাতে নামতে পারে বিপর্যয়। তবে তাদেরটা তারা বুঝবে। আমাদেরটা আমরা। আমাদের গোচারণভূমি নেই বললেই চলে। আছে কিছু চরাঞ্চল। তাতে কম খরচে মহিষ পালন বাড়ানো যায়। কিন্তু গরু-ছাগল? এ খাতে ব্যয় কমিয়ে গরু ও এর মাংস সহজলভ্য করার সুযোগ কোথায়?
আলোচনা জটিল হয়ে যাচ্ছে। সরল সমাধানের সুযোগ তো অনুপস্থিত। তবে উৎপাদিত গরু-ছাগল ঘিরে যে বাণিজ্য হচ্ছে বিশেষ করে কোরবানি ঈদে, তাতে অর্থের বিপুল লেনদেনে গ্রাম অবধি সচলতা তৈরির বিষয়টি তাৎপর্যবহ। এতে করে যাদের হাতে বাড়তি অর্থ আসে, সেটা তারা ব্যয় করে মূলত কোথায়? এদের মধ্যে যারা দরিদ্র, তারা কি সেটা কাটিয়ে উঠতে পারছে? পারছে অন্তত ভাগে কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য অর্জন করতে? সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা জোগাতে? নাকি তাদেরও গরু-ছাগল পেলেপুষে কায়ক্লেশে বাঁচতে হবে? এরা কি মাছ, মাংস, ডিম, দুধের মতো খাবারের বদলে বেশি করে ভাত খেয়ে পেট ভরাবে? ঈদের ছুটিতে বোরো উত্তোলনও চলবে। চলবে বৃষ্টিবাদল। আর বজ্রপাত। কৃষিতেই নাকি এবার প্রবৃদ্ধি ভালো। আর এতে জড়িয়ে আছে বিপুল জনগোষ্ঠী। এদের বড় অংশই আবার তরুণ। আরও বেশি উপার্জনমূলক কাজে জড়িয়ে আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ কি এদের করে দিতে হবে না?
ফিরে যাই ডিমে; ব্রয়লার আর সোনালি মুরগিতে। ক্ষুদ্র পুঁজি নিয়ে এসবে যারা জড়িয়ে– হয়তো নিরুপায় হয়ে, তাদের কতজন কেমন আছে? এরাও তো বলে, দাম একটু বাড়লে– যেমন, ডিমের ডজনপ্রতি দাম ১৫০ হলে তবেই একটা গ্রহণযোগ্য মুনাফা হয় তাদের। বছরজুড়ে সহজ পুষ্টির জোগান দিয়ে যাচ্ছে তারা ১৬-১৭ কোটি মানুষকে। ‘মিড ডে মিল’ পুরোপুরি চালু হলে ১ কোটি ৭০ লাখ শিশুর পাতে তারাই তো ডিমের জোগান দেবে। সেই খামারিদের কতজন এবার স্বচ্ছন্দে উৎসবে শামিল হতে পারছে?

দেশজুড়ে যেন শিশু মৃত্যুর এক নীরব মিছিল নেমেছে—যে মিছিল প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। অথচ এই ভয়াবহ পরিস্থিতিও আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা প্রশাসনের মধ্যে তেমন কোনো বড় আলোড়ন তুলতে পারেনি। সংক্রমণ শুরুর দুই মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো সর্বাত্মক উদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি না
১ ঘণ্টা আগে
শিশু ধর্ষণ এতকাল ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু হালে তা রূপ পেয়েছে ‘নিরবচ্ছিন্ন ঘটনায়’। অনেক ক্ষেত্রে ঘটছে আবার দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। এমনকি কখনও কখনও ওই ধর্ষণের নৃশংসতা ‘হত্যা’ পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এই যেমন, গত চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষিত হয়। গত দুই সপ্তাহে ধর্ষণের পর অন্তত চার শিশুকে
১৯ ঘণ্টা আগে
কোরবানির ঈদের সকাল মানে একটা বিশেষ আলো। মসজিদ বা ঈদগাহ থেকে ফেরার পথে মানুষের মুখে হাসি, কোলাকুলি, ছোটদের নতুন জামা, উঠানে-পার্কিংয়ে-রাস্তায় পশু বাঁধা, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গন্ধ। এই দিনটার জন্য বছর ধরে অপেক্ষা করে সবাই। বিশেষ করে যারা দূরে থাকে, যারা পরিবার ছেড়ে শহরে বা বোর্ডিংয়ে আছে, তাদের কাছে
২০ ঘণ্টা আগে
পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিল সে। ক্লাসমেটদের সঙ্গে উদযাপন করার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সেই আনন্দ আর হলো না। পল্লবীর একটি ভবনের তৃতীয় তলার ঘরে, প্রতিবেশী সোহেল রানার হাতে সাত বছরের রামিসা আক্তারের জীবনপ্রদীপ নিভে গেল। ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে শিরশ্ছেদ করা হয়েছে তার।
২১ ঘণ্টা আগে