নজরুলের গণমুখিতা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী আজ।

স্ট্রিম গ্রাফিক

কাজী নজরুল ইসলামকে বোঝার জন্য তাঁর সাহিত্যকে শুধু পাঠ্যবইয়ের অলংকার হিসেবে পড়লে চলে না। তাঁকে বুঝতে হলে শুনতে হয় বাংলার শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তরুণদের অস্থিরতা, ধর্মীয় বিভাজনে ক্লান্ত মানুষের আর্তি, অবহেলিত নারীর আর্তনাদ। নজরুল সেইসব কণ্ঠকে ভাষা দিয়েছিলেন। তাঁর কলমে বিদ্রোহ ছিল, কিন্তু সেই বিদ্রোহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষ। আর এ কারণেই তিনি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে গণমুখী কবিদের একজন।

কাজী নজরুল ইসলামের গণমুখিতা বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমে স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে ‘গণমুখী’ শব্দটি নিজেই একটি জটিল ধারণা। সাহিত্যে ‘গণমুখী’ শব্দটি বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ নিয়ে বিতর্ক কম নয়। কোনো সাহিত্যিক গণমানুষের কথা বললেই কি তিনি গণমুখী? নাকি গণমুখী হওয়ার জন্য মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে নিজের জীবন ও চেতনার একাত্মতা প্রয়োজন? নজরুলের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, তিনি শুধু মানুষের পক্ষে কথা বলেননি উল্টো তিনি নিজেই মানুষের ভেতর থেকে উঠে এসেছিলেন। তাঁর জন্ম কোনো অভিজাত পরিবারে নয়। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছোটবেলায় মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন, লেটো দলে গান লিখেছেন, রুটির দোকানে কাজ করেছেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। জীবনের শুরু থেকেই তিনি অভাব, অপমান ও অনিশ্চয়তার স্বাদ পেয়েছিলেন। ফলে নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণা তাঁর কাছে কল্পনার বিষয় ছিল না, ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতা।

বাংলা সাহিত্যে ‘গণমুখী’ শব্দটি দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করেছে। ‘গণমুখী সাহিত্য’ বলতে সাধারণভাবে এমন সাহিত্যকে বোঝানো হয়, যেখানে সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবন, সংকট, সংগ্রাম, ভাষা, সংস্কৃতি ও আকাঙ্ক্ষা শিল্পরূপ লাভ করে। তবে এই ধারণা একরৈখিক নয়। জনগণের প্রতিনিধিত্ব করলেই কোনো সাহিত্য গণমুখী হয়ে ওঠে না। গুরুত্বপূর্ণ হলো লেখক জনগণকে কীভাবে দেখছেন, তাদের কণ্ঠকে কতখানি স্বাধীনতা দিচ্ছেন, এবং ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানকে কীভাবে নির্মাণ করছেন। গণমুখিতা তাই ভাষার প্রশ্ন, শ্রেণিচেতনার প্রশ্ন, সাংস্কৃতিক অবস্থানের প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্য নবজাগরণ, ভদ্রলোক সমাজ ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির ভেতর বিকশিত হয়েছিল। এই সাহিত্যধারায় সাধারণ মানুষের জীবন অনেক সময় উপস্থিত থাকলেও তাদের কণ্ঠ সচরাচর মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মিত হয়েছে। বিশ শতকের প্রথমার্ধে ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন, শ্রমিক সংগঠন, মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থান ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিস্তারের মধ্যে বাংলা সাহিত্যেও নতুন ধরনের গণসচেতনতা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক সাহিত্যিক, যিনি কাব্য, গান, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা, ছোটগল্প ও উপন্যাস সবক্ষেত্রেই ক্ষমতাবিরোধী উচ্চারণ, নিপীড়িত মানুষের প্রতি সংহতি এবং সাংস্কৃতিক সাম্যের ধারণাকে সামনে নিয়ে আসেন।

গণমুখিতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়। একজন লেখক কি জনগণের হয়ে কথা বলেন, নাকি জনগণকে নিজের কণ্ঠে কথা বলার সুযোগ দেন? কারণ অনেক সময় লেখক জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তাদের অভিজ্ঞতাকে নিজের মতাদর্শের মধ্যে বন্দি করে ফেলেন। ফলে সত্যিকারের গণমুখিতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাহিত্য প্রান্তিক মানুষের জীবনকে শুধু বিষয় হিসেবে ব্যবহার না করে তাদের মানবিক ও রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যও স্বীকার করে।

‘গণমুখী সাহিত্য’ সম্পর্কে আলোচনায় আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, ‘গণ’ শব্দটি এখানে কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, বিশেষত শোষিত, প্রান্তিক, শ্রমজীবী, ঔপনিবেশিক শাসনে আক্রান্ত কিংবা সাংস্কৃতিকভাবে বঞ্চিত মানুষের সমষ্টিগত অভিজ্ঞতাকে বোঝাতে এই ধারণা ব্যবহৃত হয়। মার্ক্সবাদী সাহিত্যতত্ত্বে সাহিত্যকে শ্রেণিসংগ্রামের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। জর্জ লুকাচ, আন্তোনিও গ্রামশি কিংবা রেমন্ড উইলিয়ামসের আলোচনায় দেখা যায়, জনগণের অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক উৎপাদনের সম্পর্ক সাহিত্যকে রাজনৈতিকভাবে অর্থবহ করে তোলে। জনগণের ভাষা, তাদের প্রতিদিনের জীবন, শ্রম, ক্ষুধা, প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি যখন সাহিত্যে প্রবেশ করে, তখন সাহিত্য সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলে। তবে গণমুখিতা শুধু শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতির প্রশ্ন নয়।

সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের আলোচনায় গায়ত্রী স্পিভাক বা রণজিৎ গুহ দেখিয়েছেন, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ প্রায়শই ক্ষমতাবান বর্ণনার আড়ালে চাপা পড়ে যায়। ফলে কোনো সাহিত্য গণমুখী হতে চাইলে তাকে জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি তাদের বক্তব্যের স্বতন্ত্রতাও স্বীকার করতে হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে নজরুলের সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ তিনি জনগণকে স্থির বা নীরব সত্তা হিসেবে দেখেন না। তার বহু রচনায় শ্রমিক, কৃষক, মজুর, পথবাসী কিংবা বঞ্চিত নারী নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়।

গণমুখিতা ভাষার সঙ্গেও যুক্ত। সাহিত্য যদি এমন ভাষায় নির্মিত হয় যা জনগণের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন, তবে তার গণসংযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। নজরুলের ভাষা এখানে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি আরবি-ফারসি শব্দভান্ডার, লোকভাষা, আঞ্চলিক উচ্চারণ, হিন্দু পুরাণ, ইসলামি ঐতিহ্য ও জনপ্রিয় সংগীতরীতিকে একত্রে ব্যবহার করেছেন। এর ফলে তার সাহিত্য ভদ্রলোক সংস্কৃতির একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

গণমুখী সাহিত্যকে রাজনৈতিক মুক্তির প্রশ্ন থেকেও বিচ্ছিন্ন করা যায় না। ঔপনিবেশিক সমাজে জনগণের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রীয় দমন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে গণমুখিতা প্রায়ই রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। নজরুলের প্রবন্ধ, সম্পাদকীয় ও কবিতায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে ভাষা দেখা যায়, তা শুধুমাত্র দেশপ্রেমের ভাষা নয় সেখানে সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে গণমুখী সাহিত্য সবসময় শ্রেণিসংগ্রামের সরাসরি ভাষায় লেখা হয় না।

অনেক সময় মানবিক সংহতি, ধর্মীয় সাম্য, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ কিংবা সামাজিক ন্যায়ের ধারণাও গণমুখিতার অংশ হয়ে ওঠে। নজরুলের রচনায় এই বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট। তিনি যেমন শ্রমিক ও কৃষকের কথা বলেছেন, তেমনি হিন্দু-মুসলমান ঐক্য, নারীমুক্তি এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও লিখেছেন। ফলে তার সাহিত্যে গণমুখিতা একমাত্রিক বিষয় না হয়ে তা হয়ে উঠেছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বহুস্তরীয় অভিজ্ঞতার সমষ্টি। ফলে তা ঔপনিবেশিক যুগ বা তারও আগে থেকে সমাজে বা রাষ্ট্রে নির্মিত এলিটিস্ট প্যারাডাইমকে ভেঙে দেয়।

‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয়গুলোতে তিনি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেন। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার কারণে তার কারাবরণ দেখায় যে তার সাহিত্য রাষ্ট্রের কাছে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। কারাগারে থেকেও তিনি ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ লেখেন, যেখানে স্বাধীনতার প্রশ্নকে জনগণের মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেখানে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ব্যক্তিগত ক্ষোভ ছিল না, তা ছিল নিপীড়িত মানুষের পক্ষে অবস্থান।

গোলাম মুরশিদ তাঁর বিদ্রোহী রণক্লান্ত গ্রন্থে লিখেছেন, নজরুলের সাহিত্যিক চেতনার কেন্দ্রে ছিল অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে অন্য কবিদের চেয়ে আলাদা করেছে। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ ছিল গভীর ও বিশ্বজনীন, কিন্তু নজরুলের মানবতাবাদ ছিল রক্তমাংসের মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। তিনি ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধা দেখেছেন, শ্রমিকের ঘাম দেখেছেন, সৈনিকের মৃত্যুভয় দেখেছেন। ফলে তাঁর কবিতায় মানুষের দুঃখ বিমূর্ত নয়, খুবই স্পষ্ট ও জীবন্ত। সুকান্ত ভট্টাচার্যের সঙ্গে নজরুলের মিল হলো উভয়ের সাহিত্যেই শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সুকান্তের কাব্যভাষা স্পষ্ট মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে গড়ে উঠেছে। নজরুলের ক্ষেত্রে মানবতাবাদ, ধর্মীয় সাম্য ও বিপ্লবী আবেগ একসঙ্গে কাজ করেছে।

ওয়াল্ট হুইটম্যানের সঙ্গে নজরুলের মিল পাওয়া যায় জনগণের সমষ্টিগত শক্তির উদযাপনে। হুইটম্যান আমেরিকার সাধারণ মানুষকে গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। নজরুলও জনগণকে ইতিহাসের সক্রিয় শক্তি হিসেবে কল্পনা করেন। তবে হুইটম্যানের আশাবাদী গণতান্ত্রিক কল্পনার তুলনায় নজরুলের অভিজ্ঞতা ঔপনিবেশিক দমন ও সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে বেশি যুক্ত। পাবলো নেরুদার মতো নজরুলও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং রাজনৈতিক কবিতাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তবে নেরুদার কবিতায় শ্রেণিসংগ্রাম ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষণ বেশি সুস্পষ্ট।

এআই জেনারেটেড ছবি
এআই জেনারেটেড ছবি

নজরুলের কবিতায় আবেগ ও নৈতিক প্রতিবাদ তুলনামূলকভাবে বেশি প্রাধান্য পায়। ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির সঙ্গেও নজরুলের মিল পাওয়া যায় আর তা হলো উভয়ের কবিতায় বিপ্লবী উচ্চারণ ও সমবেত কণ্ঠের ব্যবহার। কিন্তু মায়াকোভস্কি সোভিয়েত বিপ্লবের সংগঠিত রাজনৈতিক ভাষার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নজরুল কোনো একক রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ফয়েজ আহমদ ফয়েজের সঙ্গে নজরুলের তুলনায় দেখা যায়, উভয় কবিই প্রেম ও বিপ্লবকে একসঙ্গে ধারণ করেছেন। ফয়েজের কবিতায় রাজনৈতিক হতাশা ও রাষ্ট্রীয় দমন সূক্ষ্ম প্রতীকের মাধ্যমে আসে; নজরুলের ভাষা অধিক প্রত্যক্ষ ও উচ্চকণ্ঠ।

বাংলা সাহিত্যে শ্রমজীবী মানুষকে কেন্দ্রে রাখার কাজটি নজরুলের আগেও কেউ কেউ করেছেন, কিন্তু নজরুল সেটা যেভাবে করলেন তাতে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। তাঁর আগে শ্রমিক বা কৃষক চরিত্র প্রায়ই সাহিত্যে করুণার পাত্র হিসেবে উপস্থিত হয়েছে, পাঠক তাদের দেখে দয়া অনুভব করবেন, এই ছিল ধারণা। নজরুল এই মনোভঙ্গি পুরোপুরি উল্টে দিলেন। তাঁর শ্রমিক করুণার পাত্র নন, তারা ক্রোধের, শক্তির এবং দাবির ধারক।

‘কুলি-মজুর’ কবিতায় নজরুল লিখলেন, ‘দেখিনু সেদিন রেলে / কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে’! এই দৃশ্যটি নজরুল শুধু বর্ণনাই করেননি, তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, দাবি করেছেন। কুলির ঘামে যে সভ্যতা নির্মিত হচ্ছে, সেই সভ্যতা কেন তাকে চড় মারার অধিকার দেয় বাবু সাহেবকে? এই প্রশ্ন তখনকার বাংলা কবিতায় এতটা সরাসরি আসেনি। নজরুলের ‘চাষার গান’-এ ফসল ফলানো কৃষক নিজেই বলছেন তাঁর বঞ্চনার কথা কারণ এই মাটি তার, এই ফসল তার পরিশ্রমের, তবু সে পায় না কিছু। আর তখনই নজরুলের চাষারা বিপ্লবী হয়ে বলছে যে, ‘যে লাঙল ফলা দিয়ে শস্য ফলাই মুরুর বুকে/ আছে সে লাঙল আজও ভাঙব তাতেই ওদের গলদ’।

নজরুল ১৯২৫ সালে লাঙল পত্রিকার সম্পাদনা করেন, যা ছিল শ্রমিক-কৃষকদের কণ্ঠস্বর। এই পত্রিকায় তিনি লিখলেন সাম্যবাদী ভাবধারার গান, প্রবন্ধ। কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল, মুজফফর আহমদের মতো বামপন্থী নেতার সঙ্গে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। কিন্তু নজরুল কখনো মতাদর্শের যাঁতাকলে পড়েননি। তিনি ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত, এবং সেই স্বতঃস্ফূর্ততাই তাঁর সাম্যবাদী কবিতাকে রাজনৈতিক প্রচারপত্রের বদলে সত্যিকারের কবিতা করে তুলেছে।

গবেষক গোলাম মুরশিদ তাঁর নজরুল-বিষয়ক আলোচনায় উল্লেখ করেছেন যে নজরুল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম কবি যিনি শ্রমিক শ্রেণির মানুষকে সাহিত্যিক মহিমা দিয়েছেন; তাদের জীবনকে শুধু বর্ণনাযোগ্য নয়, গাওয়ার এবং গর্বের যোগ্য বলে ঘোষণা করেছেন। এটি শুধু সাহিত্যিক অবদান নয়, এটি একটি মতাদর্শগত বিপ্লবও বটে।

নজরুলের গণমুখিতা তার সাংস্কৃতিক অবস্থানেও প্রকাশ পায়। বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সংস্কৃতির উপাদান দীর্ঘ সময় প্রান্তিক ছিল। তিনি আরবি-ফারসি শব্দ, ইসলামী ইতিহাস, হামদ-নাত, গজল এবং মুসলিম লোকঐতিহ্যকে বাংলা সাহিত্যের মূলধারায় নিয়ে আসেন। এর মাধ্যমে তিনি মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। তবে তিনি কোনো সাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক প্রকল্প নির্মাণ করেননি। তার রচনায় ইসলামী ঐতিহ্যের পাশাপাশি শাক্ত, বৈষ্ণব ও পুরাণভিত্তিক উপাদানও সমানভাবে উপস্থিত।

এই বহুসাংস্কৃতিক অবস্থান জনগণের মধ্যে বিভাজনের বদলে সংহতির ধারণাকে পাকাপোক্ত করেছে। নজরুল ব্যক্তিজীবনেও ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থান করেছিলেন। তিনি রাজদরবারের কবি হননি, প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক দমন এবং সামাজিক বিরোধিতার মধ্য দিয়েও তিনি নিজের অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। যদিও তার জীবন সবসময় সুসংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিল না, তবু জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা তার লেখালেখি ও জীবনযাপনের মধ্যে বারবার ফিরে এসেছে।

তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে সাধারণত রাজনৈতিক বিদ্রোহের কবিতা হিসেবে দেখা হয়। অথচ কবিতাটিতে অন্ততর্নিহিত রয়েছে মানবিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। “আমি চির-বিদ্রোহী বীর” এই ঘোষণা আত্মপ্রকাশের পাশাপাশি সমস্ত শৃঙ্খল ভাঙার ডাক। সেই শৃঙ্খল রাজনৈতিকও, সামাজিকও, ধর্মীয়ও। কবিতাটিতে তিনি নিজেকে কখনো ‘ধূর্জটি’, কখনো ‘ইস্রাফিল’, কখনো ‘বেদুইন’, কখনো ‘চেঙ্গিস’ হিসেবে কল্পনা করেছেন। এই বহুমাত্রিক পরিচয়ের ভেতরে লুকায়িত আছে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান। তিনি মানুষকে ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আটকে রাখতে চাননি।

নজরুলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, তাঁকে অনেক সময় কেবল বিদ্রোহের কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। অথচ তাঁর ভেতরে ছিল অসাধারণ মানবিক কোমলতা। প্রেম, বেদনা, আধ্যাত্মিকতা, করুণা সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক স্রষ্টা। নজরুলের কবিতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো সেখানে জনগণকে সক্রিয় শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি নিপীড়িত মানুষকে করুণার অবলম্বন হিসেবে দেখাননি; বরং তাদের সংগ্রামের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছেন। তার কবিতায় শ্রমিকজীবনের কঠোর বাস্তবতা যেমন আছে, তেমনি আছে প্রতিরোধের সম্ভাবনা। কবিতায় শ্রমিকের ক্লান্ত দেহ যা সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করে তা পুঁজিবাদী সমাজের শ্রেণিবিন্যাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।‘শ্রমিকের গান’ কবিতায় তিনি লিখেছেন: ‘ও ভাই আমরা মায়ের ময়লা ছেলে/কয়লা খনির বয়লা ঠেলে/ যে অগ্নি দিই দিগবিদিকে জ্বলে রে! এই উচ্চারণে শ্রমিক পরিচয় লজ্জার নয়, এটি আত্মমর্যাদার পরিচয়। কবিতার ভাষা সহজ, স্লোগানধর্মী এবং সমবেত কণ্ঠের মতো নির্মিত। এর মাধ্যমে নজরুল কবিতাকে পাঠকের ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গা থেকে সরিয়ে জনসমাবেশের ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন।

বাংলা সাহিত্যে ‘গণমুখী’ শব্দটি দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করেছে। ‘গণমুখী সাহিত্য’ বলতে সাধারণভাবে এমন সাহিত্যকে বোঝানো হয়, যেখানে সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবন, সংকট, সংগ্রাম, ভাষা, সংস্কৃতি ও আকাঙ্ক্ষা শিল্পরূপ লাভ করে। তবে এই ধারণা একরৈখিক নয়।

‘দারিদ্র্য’ কবিতায় দারিদ্র্যকে অভিশাপ হিসেবে দেখানো হলেও কবি তাকে আত্মশক্তির উৎসে রূপান্তর করেন। এখানে দারিদ্র্য সামাজিক বাস্তবতা, আবার আত্মসম্মানের পরীক্ষাও। এই দ্বৈততা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি দারিদ্র্যকে রোমান্টিক করেন না উল্টো দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা থেকে প্রতিবাদের শক্তি খুঁজে পান। নজরুলের কম আলোচিত বহু কবিতায় মুসলিম কৃষক, পথশিশু, ভবঘুরে মানুষ এবং শহুরে দরিদ্রের উপস্থিতি দেখা যায়। ‘ফরিয়াদ’, ‘ভিখারিণী’, ‘সর্বহারা’, ‘মানুষ’ ইত্যাদি কবিতায় তিনি শ্রেণিগত বৈষম্যকে ধর্মীয় ও নৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

‘মানুষ’ কবিতায় তিনি ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করতে চান। সেখানে মন্দির-মসজিদের চেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তার কবিতায় জনগণ কখনও বিপ্লবী শক্তি, কখনও সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক। ‘সব্যসাচী’ কবিতায় যে সংগ্রামী সত্তা নির্মিত হয়, তা ব্যক্তিগত নায়কত্বের চেয়ে সমষ্টিগত প্রতিরোধের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। তার কবিতার ছন্দও গণমুখী চরিত্র বহন করে। সামরিক মার্চের ছন্দ, লোকগানের সুর, ইসলামী সংগীতের ধ্বনি এবং কীর্তনের গতি মিলিয়ে তিনি এমন ছন্দ নির্মাণ করেছেন যা আবৃত্তি বা গানের মাধ্যমে সহজে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তার কবিতা যেমন শিক্ষিত পাঠকের মধ্যে আলোচিত হয়েছিল, গান পৌঁছে গিয়েছিল বৃহত্তর জনগণের কাছে। তিনি বাংলা গানের ভাষা ও সুরে যে পরিবর্তন আনেন, তা সাংস্কৃতিক গণতন্ত্রের দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।

নজরুল সংগীতে ইসলামী সংগীতধারা, গজল, কাওয়ালি, লোকসংগীত, কীর্তন, শ্যামাসংগীত, ভাটিয়ালি ও সামরিক সুরের মিশ্রণ ঘটান। এর ফলে সংগীত কোনো একক সম্প্রদায়ের সম্পত্তি হয়ে থাকেনি। মুসলিম জনগোষ্ঠী বাংলা ভাষায় নিজেদের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির নতুন ক্ষেত্র খুঁজে পায়। একই সঙ্গে হিন্দু ও মুসলিম সংগীতরীতির মিলনের মধ্য দিয়ে তিনি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক অবস্থান তৈরি করেন। তার গণসংগীতধর্মী গানগুলো রাজনৈতিক সমাবেশে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘কারার ঐ লৌহকপাট’, ‘জাগো অনশনবন্দী’, ‘চল্ চল্ চল্’ প্রভৃতি গান শুধু দেশপ্রেমের ভাষা নয়, এগুলো জনগণকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানায়। এই গানগুলোতে সমষ্টিগত কণ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ। ‘আমি’ নয়, ‘আমরা’ উচ্চারণ বেশি শক্তিশালী।

নজরুলের প্রেমের গানেও সামাজিক বাস্তবতা অনুপস্থিত নয়। বহু গানে নিম্নবর্গীয় মানুষের আবেগ, বিচ্ছেদ ও জীবনের সংকট উঠে এসেছে। লোকঐতিহ্যের ব্যবহার গানকে জনগণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। গণসংস্কৃতির ক্ষেত্রে নজরুলের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তিনি উচ্চাঙ্গ ও লোকসংস্কৃতির বিভাজন ভেঙে দিয়েছেন। বাংলা ভদ্রলোক সমাজ দীর্ঘ সময় লোকসংগীত বা মুসলিম সংগীতধারাকে নিম্নমানের বলে দেখত। নজরুল এই সাংস্কৃতিক শ্রেণিবিন্যাস অস্বীকার করেন। তার সংগীতচর্চা দেখায় যে জনগণের সংস্কৃতিও শিল্পের মর্যাদা পেতে পারে।

নজরুলের গল্প ও উপন্যাসের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও গণমুখিতা বোঝার ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর গল্পে শহুরে দরিদ্র, যৌনপল্লির নারী, বঞ্চিত মুসলিম পরিবার, নিম্নবর্গীয় যুবক এবং সামাজিকভাবে অবদমিত মানুষের উপস্থিতি লক্ষণীয়। নজরুল এখানে সমাজের ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্ন করেন। নারী চরিত্রগুলোর মধ্যেও আত্মমর্যাদাবোধ লক্ষণীয়। তার মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসে সমাজের নিম্নবর্গ, ক্ষুধার্ত মানুষ, বেকার যুবক, নিপীড়িত নারী এবং ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় বিপর্যস্ত জনগণের জীবনকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে তারা শুধু করুণার পাত্র বললে ভুল হবে তারা সামাজিক সংকটের ভেতরে সংগ্রামরত মানুষও বটে। উপন্যাসটি ব্যক্তিগত প্রেম বা মধ্যবিত্ত সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না থেকে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা এর কেন্দ্রে চলে আসে। এখানে ক্ষুধা শারীরিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক এই তিন স্তরেই কাজ করে। ক্ষুধা মানুষকে নৈতিকভাবে ভেঙে দেয় আবার বিদ্রোহের দিকেও ঠেলে দেয়। অর্থাৎ নজরুল ক্ষুধাকে ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখেন না, তিনি মনে করেন তা সামাজিক কাঠামোর ফল। এই দৃষ্টিভঙ্গিই গণমুখী সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং শহুরে সংকট মানুষের জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলছিল, তার ইঙ্গিত উপন্যাসে পাওয়া যায়। নজরুল সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণ দেন না, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতার নির্মাণের মধ্য দিয়েই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার সমালোচনা করেন।

নজরুলের গণমুখিতা নারীর প্রশ্ন ছাড়া সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। তিনি নারীকে নিছক প্রেমের বিষয় বা গৃহস্থালির চরিত্র হিসেবে দেখেননি। ‘নারী’ কবিতায় তিনি নারীকে মানবসভ্যতার সমান অংশীদার হিসেবে দেখেছেন। যদিও এই কবিতায় রোমান্টিক মানবতাবাদের প্রবণতা আছে, তবু নারীকে সামাজিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দিকটি তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর বহু গল্প ও গানে নারী চরিত্র সামাজিক অবদমন, যৌন বৈষম্য ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়ায়। ‘বেশ্যা’ কবিতায় যৌনপল্লির নারীকে নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে নয়, সামাজিক শোষণের শিকার মানুষ হিসেবে দেখা হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তৎকালীন সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

নজরুল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন। তিনি হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রশ্নকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দুই দিক থেকেই দেখেছেন। তার কবিতা ও গানে ইসলামী ও হিন্দু ঐতিহ্যের সম্মিলন এই অবস্থানের প্রতিফলন। তিনি ধর্মকে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে স্বীকার করলেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে তিনি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার মতে, ঔপনিবেশিক শক্তি জনগণকে বিভক্ত করে শাসন করতে চায়। ফলে ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রশ্ন তার কাছে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গেও যুক্ত।

তবে গণমুখিতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়। একজন লেখক কি জনগণের হয়ে কথা বলেন, নাকি জনগণকে নিজের কণ্ঠে কথা বলার সুযোগ দেন? কারণ অনেক সময় লেখক জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তাদের অভিজ্ঞতাকে নিজের মতাদর্শের মধ্যে বন্দি করে ফেলেন। ফলে সত্যিকারের গণমুখিতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাহিত্য প্রান্তিক মানুষের জীবনকে শুধু বিষয় হিসেবে ব্যবহার না করে তাদের মানবিক ও রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যও স্বীকার করে।

এই সাহিত্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান। রাষ্ট্র, সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, শ্রেণিশোষণ, ধর্মীয় কুসংস্কার বা সামাজিক অন্যায়ের সমালোচনা প্রায়ই এতে উপস্থিত থাকে। ফলে গণমুখী সাহিত্য সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে। যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি তার সাহিত্য ও ব্যক্তিজীবন পুরোটা জুড়েই ছিলেন গণমানুষের দিকে এবং গণমানুষের হয়ে। নজরুলের গণমুখিতা কতটা স্থায়ী সামাজিক পরিবর্তন আনতে পেরেছিল সেই প্রশ্নও থেকে যায়। তাঁর সাহিত্য মানুষকে আবেগতাড়িত করেছে, আন্দোলিত করেছে, কিন্তু সমাজের বাস্তব কাঠামো কতটা বদলেছে? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। সাহিত্য একা সমাজ বদলায় না। কিন্তু সাহিত্য মানুষের চেতনা বদলায়, আর সেই চেতনা থেকেই সামাজিক পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়। নজরুল সেই চেতনার অন্যতম নির্মাতা।

  • সামিয়া রহমান: প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত