মাহফুজা মাহবুব

বিখ্যাত ব্যক্তিদের ব্যক্তিজীবন ইতিহাসের চেয়ে কম কিছু নয়। তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা নিয়ে এত কিংবদন্তির জন্ম হয় যে নির্দিষ্ট সময় পর আর পার্থক্য করা যায় না—কোন ঘটনাটি আসলেই সত্য, আর কোনটি মিথ। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) সাম্য, প্রেম ও দ্রোহের কবি।
কবিতায় যিনি বিদ্রোহী, প্রবন্ধ-সাংবাদিকতায় চুলচেরা সমালোচক, যাঁর গল্প নাটক-উপন্যাস যেন বাঁধনহারা কোনো হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি। সংগীতজ্ঞ নজরুলকে নিয়ে তো আছে সমগ্র একটি ধারা, ‘নজরুল-গীতি’। আর মিথের মতো অগণিত জনশ্রুতি বিদ্যমান সংগীতগুলোকে ঘিরে। কোন প্রেক্ষাপটে কোন হৃদয়াবেগকে তুলে ধরতে লিখেছিলেন কোন গানটি, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা, তর্ক-বিবাদের অন্ত নেই।
২০২২ সালের বাংলা নববর্ষে কোক স্টুডিও বাংলা নজরুলের ‘বাগিচায় বুলবুলি’ গানটা কভার করার পর থেকে কিছুদিন বুলবুলি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে ছিল। গানটির গায়কী, সংগীতায়োজন নিয়ে অনেকেই অনেক মতামত দিয়েছেন, আলাপ হয়েছে বিস্তর। ইউটিউবে মূল গানে, গান নিয়ে করা রিএকশন ভিডিওগুলোর কমেন্ট বক্সে একটা কমেন্ট খুব দেখা যাচ্ছিল। অনেকেই বলেছেন এই গানটা নজরুল তাঁর পুত্র বুলবুলকে হারানোর শোকে লিখেছেন, আর গানের বুলবুলিই হচ্ছে নজরুলের দ্বিতীয় পুত্র অরিন্দম খালেদ বুলবুল। বরাবরের মতো এখানেও আছে অনেক অনুমান, অনেক লোকশ্রুতি, অনেক সত্য-মিথ্যা আর মিথের মিশেল। গানের কথাতেও আছে অনেক আড়াল, উপমার আশ্রয়:
বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে
দিসনে আজি দোল।
আজো তার ফুলকলিদের ঘুম টুটেনি
তন্দ্রাতে বিলোল।।
আজো হায় রিক্ত শাখায় উত্তরী বায়
ঝুরছে নিশিদিন
আসেনি দখনে হাওয়া গজল গাওয়া
মৌমাছি বিভোল।
কবে সে ফুল-কুমারী ঘোমটা চিরি
আসবে বাহিরে,
শিশিরের স্পর্শসুখে ভাঙবে রে ঘুম
রাঙবে রে কপোল।
ঠিক এমন একটি দ্বিধা থেকেই বিষয়টি নিয়ে ভাবনা শুরু, এরপরে কিছু হিসাব মেলাতে গিয়ে ভুল ভাঙে। ‘বাগিচায় বুলবুলি’ গজলটি নজরুলের ‘বুলবুল’ গীতিগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত; বইটি প্রকাশিত হয় ১৯২৮ সালে। পুত্র বুলবুলের নামেই বইয়ের নামকরণ। আর বুলবুলের মৃত্যু হয় ১৯৩০ সালের মে মাসের ৭ তারিখে—বসন্ত রোগে। বাগিচায় বুলবুলি গানের ভেতরেও বসন্তে ঘুম ভাঙাতে চাওয়ার ব্যঞ্জনা আছে, আছে রিক্ত হৃদয়ের যাতনা; সুতরাং বিভ্রম তৈরি হওয়া বেশ স্বাভাবিক। এই জটিলতা আরও বৃদ্ধি করে বুলবুলের মৃত্যুর পর নজরুলের লেখা আরেকটি বিখ্যাত গীতি, ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি,/করুণ চোখে চেয়ে আছে সাঝের ঝরা ফুলগুলি।’
এই বিষয়গুলোর অনুসন্ধানই আগ্রহী শ্রোতা ও ভক্তের জানার আগ্রহ ক্রমশ বাড়িয়ে তোলে, ফলে নজরুল আর বুলবুল সংক্রান্ত অনেক তথ্য আবিষ্কৃত হয়। কবি নজরুল তাঁর পিতৃহৃদয়ের ক্ষত এবং হাহাকারের দলিল বলা যায় এই ঘটনাগুলোকে। তাঁর সাহিত্যকর্মের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল বুলবুল সেটিও উপলব্ধি করা যায়।
নজরুলের কবি-জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটে হুগলি-কৃষ্ণনগরে। ১৯২৪ সালে নবপরিণীতা বধূ আশালতা সেনগুপ্তা প্রমীলাকে নিয়ে হুগলিতে ছিমছাম ছোট্ট সংসার বাঁধেন নজরুল। নজরুল-প্রমীলা দম্পতির প্রথম সন্তান কৃষ্ণ মোহাম্মদ ওরফে আজাদ কামাল। অকালেই চলে যায় তাদের প্রথম সন্তান, সেই পুত্রের শোক হয়তো বাবা-মা ভুলতে পেরেছিলেন বুলবুলের আগমনে। কিংবা একটা সন্তান হারানোর পরে বুলবুল এসেছিলই বিশেষ বার্তা নিয়ে। বুলবুল ছিল স্বভাবে পিতারই ক্ষুদে সংস্করণ, ভীষণ মায়াবী এই শিশু সেই ছোট্ট বয়সেই বাবার গানের সুরে মাথা দোলাতো। নজরুলের শখ ছিল বুলবুলকে গান শেখাবেন, তাঁর সব সুর ঠাঁই পাবে বুলবুলের গলায়।

চার বছর বয়সে বুলবুলের বসন্ত হয়। ব্যস্ত পিতা তবুও সর্বক্ষণ বসে থাকতেন রুগ্ন পুত্রের শিয়রে। সেই ফাঁকেই তিনি অনুবাদ করেছিলেন হাফিজের রুবাই।
বুলবুলের বসন্ত আর সারেনি, বুলবুল আর গান গায়নি, বুলবুলের শরীরের বসন্ত নজরুলের জীবন থেকে বসন্তকে চিরতরে মুছে দিয়েছিল। ‘রুবাইয়াৎ-ই- হাফিজ’ যখন গ্রন্থাকারে বের হল কবি সেটি উৎসর্গ করলেন তার অকালপ্রয়াত সন্তানকে। লিখলেন:
“বাবা বুলবুল,
তোমার মৃত্যুশিয়রে বসে ‘বুলবুল-ই-শিরাজ’ হাফিজের রুবাইয়াতের অনুবাদ আরম্ভ করি। যেদিন অনুবাদ শেষ করে উঠলাম, সেদিন তুমি- আমার কাননের বুলবুলি-উড়ে গেছ। যে দেশে গেছ তুমি, সে কি বুলবুলিস্তান ইরানের চেয়েও সুন্দর?”
বুলবুলের মৃত্যুশোকে নজরুল পাগলপ্রায় ছিলেন বেশ অনেকদিন। এরপর পুত্রশোক ভুলতে কাজে ডুব দিয়েছেন। এর মধ্যে তার পিছু ছাড়েনি পূর্বের রাজনৈতিক জীবন। একদিন হঠাৎ পুলিশ হানা দেয় তার বাড়িতে তল্লাশি চালানোর জন্য। কবি নিজেই সব ঘর-বাক্স খুলে দেখাচ্ছিলেন। কিন্তু গোয়েন্দা অফিসার একটা বাক্সে হাত দেয়া মাত্রই এগিয়ে এসে বললেন, “না না, ওটাতে হাত দেবেন না।’’ পুলিশের সন্দেহ বাড়লো, অফিসার বাক্স উপুড় করতেই অঝোরে কাঁদতে লাগলেন নজরুল, বাক্স থেকে বের হল বুলবুলের খেলনা, ব্যবহার্য সামগ্রী।
১৯৪২ সালের জুলাইয়ে নজরুলের রোগের প্রথম আক্রমণ ঘটে। এর অনেক আগ থেকেই ভেতরে ভেতরে আক্রান্ত হচ্ছিলেন তিনি। দেশভাগের সময়ে একেবারেই নিথর ছিলেন কবি। ক্রমশ তাঁর মস্তিষ্কও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছিল। ১৯৪৮ সালে কবি বন্ধু খান মুহম্মদ মইনুদ্দীন তাঁকে দেখতে গেলেন। কবি বোধ হয় তাঁকে ঠিকঠাক চিনতেও পারলেন না, শুধু অবোধ শিশুর মতোন হাসলেন। খান সাহেব এক টুকরো কাগজ এগিয়ে দিলে সেটিতে আঁকিবুঁকি কাটলেন তিনি। চারটি লাইনের মর্মোদ্ধার করে বোঝা গেল তিনি লিখেছেন, “কবি কাজী নজরুল কবে চির
বুলবুলকে গান শেখাব-গান শেখাব
গান করার কবিতা গান করব-
কবি কাজী নজরুল ইসলাম চিরদিন।”
শেষ লেখায় প্রলাপের মতো করে তিনি আওড়ে গেছেন বুলবুলেরই নাম, তাঁকে গান শেখানোর পিতৃহৃদয়ের অপূর্ণ বাসনার কথা, হাহাকারের কথা। এরপর ধীরে ধীরে তিনি অসুস্থই হয়েছেন। ১৯৪২-৭৬ এই সময়টুকু জীবন্মৃত কাটিয়েছেন তিনি। যদি চেতন থাকতেন, হয়তো এবারে সহ্য করতে হতো তৃতীয় পুত্রের শোক। কনিষ্ঠ পুত্র কাজী অনিরুদ্ধ, যাঁকে নজরুল ডাকতেন ‘নিনি’ বলে, তিনিও মারা যান কবির জীবদ্দশাতেই। চার পুত্রের মধ্যে একমাত্র কাজী সব্যসাচী বেঁচে ছিলেন পিতার মৃত্যুর তিন বছর পরেও। এবং দেশভাগের কাঁটাতারের বেড়াজালে কলকাতায় থাকা হতভাগ্য পুত্রের কপালে জোটেনি পিতাকে শেষবার দেখার সৌভাগ্য।
সাহিত্য, সংগীত বা যেকোনো শিল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার এটির উপলব্ধির আবেদন। বুলবুলের শোকে নজরুল লিখেছিলেন তাঁর আরেকটি কালজয়ী গান:
তুই নাই বলে ওরে উন্মাদ
পান্ডুর হলো আকাশের চাঁদ
কেঁদে নদী হলো করুণ বিষাদ
ডাকে আয় তীরে আয়।।
শূণ্য এ বুকে পাখি মোর আয়
ফিরে আয় ফিরে আয়।
তোরে না হেরিয়া সকালের ফুল
অকালে ঝরিয়া যায়।
প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক পৃথিবীতে যুগে যুগে, কালে কালে এক। মানুষ বরাবর নিজের অনুভূতিগুলোর আশ্রয় খোঁজে গল্প, কথায়, সুর আর ছবিতে। সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয় এমন শোক মানুষের জীবনে আসলে, স্রষ্টা যেন সেটি সইবার ও শক্তি দেন। সকালের ফুল অকালে ঝরার কষ্ট বইবার সামর্থ্য কজনেরই-বা ছিল। সবাই তো আর নজরুল হতে পারেন না!

বিখ্যাত ব্যক্তিদের ব্যক্তিজীবন ইতিহাসের চেয়ে কম কিছু নয়। তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা নিয়ে এত কিংবদন্তির জন্ম হয় যে নির্দিষ্ট সময় পর আর পার্থক্য করা যায় না—কোন ঘটনাটি আসলেই সত্য, আর কোনটি মিথ। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) সাম্য, প্রেম ও দ্রোহের কবি।
কবিতায় যিনি বিদ্রোহী, প্রবন্ধ-সাংবাদিকতায় চুলচেরা সমালোচক, যাঁর গল্প নাটক-উপন্যাস যেন বাঁধনহারা কোনো হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি। সংগীতজ্ঞ নজরুলকে নিয়ে তো আছে সমগ্র একটি ধারা, ‘নজরুল-গীতি’। আর মিথের মতো অগণিত জনশ্রুতি বিদ্যমান সংগীতগুলোকে ঘিরে। কোন প্রেক্ষাপটে কোন হৃদয়াবেগকে তুলে ধরতে লিখেছিলেন কোন গানটি, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা, তর্ক-বিবাদের অন্ত নেই।
২০২২ সালের বাংলা নববর্ষে কোক স্টুডিও বাংলা নজরুলের ‘বাগিচায় বুলবুলি’ গানটা কভার করার পর থেকে কিছুদিন বুলবুলি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে ছিল। গানটির গায়কী, সংগীতায়োজন নিয়ে অনেকেই অনেক মতামত দিয়েছেন, আলাপ হয়েছে বিস্তর। ইউটিউবে মূল গানে, গান নিয়ে করা রিএকশন ভিডিওগুলোর কমেন্ট বক্সে একটা কমেন্ট খুব দেখা যাচ্ছিল। অনেকেই বলেছেন এই গানটা নজরুল তাঁর পুত্র বুলবুলকে হারানোর শোকে লিখেছেন, আর গানের বুলবুলিই হচ্ছে নজরুলের দ্বিতীয় পুত্র অরিন্দম খালেদ বুলবুল। বরাবরের মতো এখানেও আছে অনেক অনুমান, অনেক লোকশ্রুতি, অনেক সত্য-মিথ্যা আর মিথের মিশেল। গানের কথাতেও আছে অনেক আড়াল, উপমার আশ্রয়:
বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে
দিসনে আজি দোল।
আজো তার ফুলকলিদের ঘুম টুটেনি
তন্দ্রাতে বিলোল।।
আজো হায় রিক্ত শাখায় উত্তরী বায়
ঝুরছে নিশিদিন
আসেনি দখনে হাওয়া গজল গাওয়া
মৌমাছি বিভোল।
কবে সে ফুল-কুমারী ঘোমটা চিরি
আসবে বাহিরে,
শিশিরের স্পর্শসুখে ভাঙবে রে ঘুম
রাঙবে রে কপোল।
ঠিক এমন একটি দ্বিধা থেকেই বিষয়টি নিয়ে ভাবনা শুরু, এরপরে কিছু হিসাব মেলাতে গিয়ে ভুল ভাঙে। ‘বাগিচায় বুলবুলি’ গজলটি নজরুলের ‘বুলবুল’ গীতিগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত; বইটি প্রকাশিত হয় ১৯২৮ সালে। পুত্র বুলবুলের নামেই বইয়ের নামকরণ। আর বুলবুলের মৃত্যু হয় ১৯৩০ সালের মে মাসের ৭ তারিখে—বসন্ত রোগে। বাগিচায় বুলবুলি গানের ভেতরেও বসন্তে ঘুম ভাঙাতে চাওয়ার ব্যঞ্জনা আছে, আছে রিক্ত হৃদয়ের যাতনা; সুতরাং বিভ্রম তৈরি হওয়া বেশ স্বাভাবিক। এই জটিলতা আরও বৃদ্ধি করে বুলবুলের মৃত্যুর পর নজরুলের লেখা আরেকটি বিখ্যাত গীতি, ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি,/করুণ চোখে চেয়ে আছে সাঝের ঝরা ফুলগুলি।’
এই বিষয়গুলোর অনুসন্ধানই আগ্রহী শ্রোতা ও ভক্তের জানার আগ্রহ ক্রমশ বাড়িয়ে তোলে, ফলে নজরুল আর বুলবুল সংক্রান্ত অনেক তথ্য আবিষ্কৃত হয়। কবি নজরুল তাঁর পিতৃহৃদয়ের ক্ষত এবং হাহাকারের দলিল বলা যায় এই ঘটনাগুলোকে। তাঁর সাহিত্যকর্মের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল বুলবুল সেটিও উপলব্ধি করা যায়।
নজরুলের কবি-জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটে হুগলি-কৃষ্ণনগরে। ১৯২৪ সালে নবপরিণীতা বধূ আশালতা সেনগুপ্তা প্রমীলাকে নিয়ে হুগলিতে ছিমছাম ছোট্ট সংসার বাঁধেন নজরুল। নজরুল-প্রমীলা দম্পতির প্রথম সন্তান কৃষ্ণ মোহাম্মদ ওরফে আজাদ কামাল। অকালেই চলে যায় তাদের প্রথম সন্তান, সেই পুত্রের শোক হয়তো বাবা-মা ভুলতে পেরেছিলেন বুলবুলের আগমনে। কিংবা একটা সন্তান হারানোর পরে বুলবুল এসেছিলই বিশেষ বার্তা নিয়ে। বুলবুল ছিল স্বভাবে পিতারই ক্ষুদে সংস্করণ, ভীষণ মায়াবী এই শিশু সেই ছোট্ট বয়সেই বাবার গানের সুরে মাথা দোলাতো। নজরুলের শখ ছিল বুলবুলকে গান শেখাবেন, তাঁর সব সুর ঠাঁই পাবে বুলবুলের গলায়।

চার বছর বয়সে বুলবুলের বসন্ত হয়। ব্যস্ত পিতা তবুও সর্বক্ষণ বসে থাকতেন রুগ্ন পুত্রের শিয়রে। সেই ফাঁকেই তিনি অনুবাদ করেছিলেন হাফিজের রুবাই।
বুলবুলের বসন্ত আর সারেনি, বুলবুল আর গান গায়নি, বুলবুলের শরীরের বসন্ত নজরুলের জীবন থেকে বসন্তকে চিরতরে মুছে দিয়েছিল। ‘রুবাইয়াৎ-ই- হাফিজ’ যখন গ্রন্থাকারে বের হল কবি সেটি উৎসর্গ করলেন তার অকালপ্রয়াত সন্তানকে। লিখলেন:
“বাবা বুলবুল,
তোমার মৃত্যুশিয়রে বসে ‘বুলবুল-ই-শিরাজ’ হাফিজের রুবাইয়াতের অনুবাদ আরম্ভ করি। যেদিন অনুবাদ শেষ করে উঠলাম, সেদিন তুমি- আমার কাননের বুলবুলি-উড়ে গেছ। যে দেশে গেছ তুমি, সে কি বুলবুলিস্তান ইরানের চেয়েও সুন্দর?”
বুলবুলের মৃত্যুশোকে নজরুল পাগলপ্রায় ছিলেন বেশ অনেকদিন। এরপর পুত্রশোক ভুলতে কাজে ডুব দিয়েছেন। এর মধ্যে তার পিছু ছাড়েনি পূর্বের রাজনৈতিক জীবন। একদিন হঠাৎ পুলিশ হানা দেয় তার বাড়িতে তল্লাশি চালানোর জন্য। কবি নিজেই সব ঘর-বাক্স খুলে দেখাচ্ছিলেন। কিন্তু গোয়েন্দা অফিসার একটা বাক্সে হাত দেয়া মাত্রই এগিয়ে এসে বললেন, “না না, ওটাতে হাত দেবেন না।’’ পুলিশের সন্দেহ বাড়লো, অফিসার বাক্স উপুড় করতেই অঝোরে কাঁদতে লাগলেন নজরুল, বাক্স থেকে বের হল বুলবুলের খেলনা, ব্যবহার্য সামগ্রী।
১৯৪২ সালের জুলাইয়ে নজরুলের রোগের প্রথম আক্রমণ ঘটে। এর অনেক আগ থেকেই ভেতরে ভেতরে আক্রান্ত হচ্ছিলেন তিনি। দেশভাগের সময়ে একেবারেই নিথর ছিলেন কবি। ক্রমশ তাঁর মস্তিষ্কও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছিল। ১৯৪৮ সালে কবি বন্ধু খান মুহম্মদ মইনুদ্দীন তাঁকে দেখতে গেলেন। কবি বোধ হয় তাঁকে ঠিকঠাক চিনতেও পারলেন না, শুধু অবোধ শিশুর মতোন হাসলেন। খান সাহেব এক টুকরো কাগজ এগিয়ে দিলে সেটিতে আঁকিবুঁকি কাটলেন তিনি। চারটি লাইনের মর্মোদ্ধার করে বোঝা গেল তিনি লিখেছেন, “কবি কাজী নজরুল কবে চির
বুলবুলকে গান শেখাব-গান শেখাব
গান করার কবিতা গান করব-
কবি কাজী নজরুল ইসলাম চিরদিন।”
শেষ লেখায় প্রলাপের মতো করে তিনি আওড়ে গেছেন বুলবুলেরই নাম, তাঁকে গান শেখানোর পিতৃহৃদয়ের অপূর্ণ বাসনার কথা, হাহাকারের কথা। এরপর ধীরে ধীরে তিনি অসুস্থই হয়েছেন। ১৯৪২-৭৬ এই সময়টুকু জীবন্মৃত কাটিয়েছেন তিনি। যদি চেতন থাকতেন, হয়তো এবারে সহ্য করতে হতো তৃতীয় পুত্রের শোক। কনিষ্ঠ পুত্র কাজী অনিরুদ্ধ, যাঁকে নজরুল ডাকতেন ‘নিনি’ বলে, তিনিও মারা যান কবির জীবদ্দশাতেই। চার পুত্রের মধ্যে একমাত্র কাজী সব্যসাচী বেঁচে ছিলেন পিতার মৃত্যুর তিন বছর পরেও। এবং দেশভাগের কাঁটাতারের বেড়াজালে কলকাতায় থাকা হতভাগ্য পুত্রের কপালে জোটেনি পিতাকে শেষবার দেখার সৌভাগ্য।
সাহিত্য, সংগীত বা যেকোনো শিল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার এটির উপলব্ধির আবেদন। বুলবুলের শোকে নজরুল লিখেছিলেন তাঁর আরেকটি কালজয়ী গান:
তুই নাই বলে ওরে উন্মাদ
পান্ডুর হলো আকাশের চাঁদ
কেঁদে নদী হলো করুণ বিষাদ
ডাকে আয় তীরে আয়।।
শূণ্য এ বুকে পাখি মোর আয়
ফিরে আয় ফিরে আয়।
তোরে না হেরিয়া সকালের ফুল
অকালে ঝরিয়া যায়।
প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক পৃথিবীতে যুগে যুগে, কালে কালে এক। মানুষ বরাবর নিজের অনুভূতিগুলোর আশ্রয় খোঁজে গল্প, কথায়, সুর আর ছবিতে। সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয় এমন শোক মানুষের জীবনে আসলে, স্রষ্টা যেন সেটি সইবার ও শক্তি দেন। সকালের ফুল অকালে ঝরার কষ্ট বইবার সামর্থ্য কজনেরই-বা ছিল। সবাই তো আর নজরুল হতে পারেন না!

এদিকে এবারে অনলাইনে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গরু কেনাবেচার পাশাপাশি হোম ডেলিভারী, কসাইয়ের সুবিধাসহ আরও বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে।
১ ঘণ্টা আগে
আজ বব ডিলানের জন্মদিন। ১৯৪১ সালের ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এই নগরবাউল ছয় দশক ধরে গানে গানে বলেছেন চলতি সময় ও সমাজের কথা। আজ ফিরে তাকানো যাক ১৯৬৫ সালের ২৫ জুলাইয়ের সেই সন্ধ্যায়। যেদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে ‘নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভ্যাল'-এ ইলেকট্রিক গিটার হাতে দেখা মিলেছিল ‘অচেনা’ এক ডিলানের। কী ঘটেছ
৪ ঘণ্টা আগে
কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে বহু গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু উপন্যাস? হ্যাঁ, তাও লেখা হয়েছে। নজরুলের বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও বেদনা যেন উপন্যাসের আধারেই মুদ্রণযোগ্য। কেননা তাঁর জীবন সংগ্রাম, আবেগ, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিতে সমৃদ্ধ। এ লেখায় নজরুলের জীবনীভিত্তিক পাঁ
৮ ঘণ্টা আগে
কাজী নজরুল ইসলামকে বোঝার জন্য তাঁর সাহিত্যকে শুধু পাঠ্যবইয়ের অলংকার হিসেবে পড়লে চলে না। তাঁকে বুঝতে হলে শুনতে হয় বাংলার শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তরুণদের অস্থিরতা, ধর্মীয় বিভাজনে ক্লান্ত মানুষের আর্তি, অবহেলিত নারীর আর্তনাদ। নজরুল সেইসব কণ্ঠকে ভাষা দিয়েছিলেন। তাঁর কলমে বিদ
৮ ঘণ্টা আগে