ডিজিটাল আইনগুলো মতপ্রকাশের জন্য এখনো ঝুঁকিপূর্ণ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ২৩: ২১
‘অর্থবহ, অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন প্রণয়ন’—প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা অনুষ্ঠান। সংগৃহীত ছবি

সংসদে সম্প্রতি পাস হওয়া ডিজিটাল আইনগুলো মানুষের মতপ্রকাশ ও ব্যক্তি-গোপনীয়তার জন্য এখনো ঝুঁকিপূর্ণ এবং অধিকার রক্ষায় প্রতিটি আইনই পুনরায় পর্যালোচনা করা দরকার। ডিজিটাল রাইটস এশিয়া-প্যাসিফিক বাংলাদেশ জাতীয় সম্মেলন ২০২৬-এ অংশ নিয়ে এমন মত দেন অতিথিরা।

ইন্টারনেটে মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইট ও এনগেজমিডিয়ার আয়োজনে ‘অর্থবহ, অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন প্রণয়ন’—এই প্রতিপাদ্যে মঙ্গলবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলেনে সেশন পার্টনার হিসেবে অংশগ্রহণ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ডি-নেট।

অনুষ্ঠানের প্রথম প্লেনারি আলোচনায় সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া সাইবার সুরক্ষা আইন, সংশোধিত টেলিযোগাযোগ আইন, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নতুন আইনগুলোতে নানা অসংগতি আছে এবং এই আইনগুলো জুলাইয়ের চেতনা বা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পুরোনো আইনগুলোই আসলে নতুন নামে আবার আনা হয়েছে, যা মানুষের ক্ষমতায়নে তেমন সহায়ক হয়নি। অথচ সংসদের নেতাদের অনেকেই অতীতে এমন আইনের অপব্যবহারের শিকার হয়েছিলেন, তবুও তারা একই ধরনের আইন প্রণয়ন করেছেন।’

এই অধিবেশনে পাস হওয়া আইনের পারস্পরিক সম্পর্ক গণ-নজরদারির যে কাঠামো তৈরি করতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ জানান অন্য বক্তারা। এ সময় ডেইলি স্টারের জয়েন্ট এডিটর আশা মেহরীন আমিন বলেন, ‘ফেসবুক পোস্টের কারণে আগে যেভাবে মামলা হতো, এই সরকারের সময়েও একইভাবে মামলা হতে দেখা যাচ্ছে। আগে সাংবাদিকেরা যেমন নজরদারির ঝুঁকিতে ছিলেন, এখনো তেমন ঝুঁকিতে আছেন।’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করেই আইনগুলো তৈরি হয়েছে এবং নতুন সরকার কোনো রকম আলোচনা ছাড়াই সেই আইনগুলো কিছুটা সংশোধিত আকারে তড়িঘড়ি করে পাস করেছে। এতে আগের অধ্যাদেশের দুর্বলতাগুলো রয়ে গেছে এবং সরকারের জবাবদিহির জায়গাগুলোও আরো দুর্বল হয়েছে।

বাংলাদেশে ইউনেস্কোর হেড অব রিপ্রেজেন্টেটিভ সুজান ভাইজ বলেন, ‘প্রতিটি আইনকে সমাজের নিরিখে যাচাই করা প্রয়োজন। নতুন সরকার যেন আইনগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করে মানবাধিকার রক্ষার জায়গাগুলো উন্নততর করার সুযোগ কাজে লাগায়।’

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন বলেন, ‘এই আইনগুলো দরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও সমস্যা থাকলে তা পরে সংশোধন করা যাবে এবং সরকার ইতিমধ্যে সেগুলো উন্নত করার জন্য কাজ করছে।’

এই অধিবেশনে মেটার রুজান সারওয়ার বলেন, ‘উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আইন নিয়ে আমরা চার বছর ধরে লড়েছি। ডেটা স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণের বিধানসহ কয়েকটি ধারার কারণে, আদৌ বাংলাদেশে মেটার উপস্থিতি রাখা যাবে কিনা তা নিয়ে ভেবেছি। তবে, সংসদে যে উপাত্ত সুরক্ষা আইন পাস হয়েছে, সেটি মেটা ও গুগলের মতো প্লাটফর্মগুলোর জন্য ভালো।’

বিটিআরসির কমিশনার মাহমুদ হোসাইন বলেন, ‘অনেক সময় বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর কারণে আইন বদলে যায়। কিছু শক্তিশালী গোষ্ঠী যেভাবে নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছাতে পারে, অন্যরা তেমনটা পারেন না। এতে আস্থার অভাব তৈরি হয়। তবে বিটিআরসি সবার সঙ্গে কথা বলেই নীতি প্রণয়নের চেষ্টা করে।’

ডিনেটের আয়োজনে তৃতীয় প্যানেল আলোচনায় প্রতিষ্ঠানটি নির্বাহী চেয়ার ড. অনন্য রায়হান এবং অন্য বিশেষজ্ঞরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) নীতিমালা প্রণয়নে অর্থবহ আলোচনার তাগিদ দেন। অনুষ্ঠানের শেষ অধিবেশনে ডিজিটালি রাইটের নবীন টেক পলিসি ফেলোরা তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু ও মতামত তুলে ধরেন।

আয়োজনের সমাপনী অনুষ্ঠানে ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এককভাবে সরকার বা বেসরকারি কোম্পানির বিষয় নয়। এতে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ সব অংশীজনদের মতের প্রতিফলন থাকতে হবে।’

সম্পর্কিত