leadT1ad

মিঠাপানির মাছে ঈর্ষণীয় সাফল্য বাংলাদেশের

প্রথমবারের মতো মিঠাপানির মাছ আহরণে চীনকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে বাংলাদেশ। সর্বশেষ প্রতিবেদনেও একই অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ২৩: ২২
সব অংশীজনের চেষ্টায় বাংলাদেশের মাছের সামগ্রিক উৎপাদন এগিয়ে যাচ্ছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

বিশ্বে মিঠাপানি থেকে আহরিত মাছের সাড়ে ১১ শতাংশ বাংলাদেশের। নদী, খাল-বিল, হাওরের মতো উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বিশ্বে টানা দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থান ধরে রেখেছে দেশটি। শুধু তাই নয়, বদ্ধ জলাশয়ে মাছ আবাদেও বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের অন্যতম এখন দক্ষিণ এশিয়ার নদীবিধৌত বাংলাদেশ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সর্বশেষ প্রতিবেদন দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকোয়াকালচার ২০২৬-এ এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতি দুই বছর পর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এবারের প্রতিবেদন ২০২৪ সালের হালনাগাদ তথ্যে করা।

এর আগে ২০২৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো মিঠাপানির মাছ আহরণে চীনকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে বাংলাদেশ। সর্বশেষ প্রতিবেদনেও একই অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের আগে রয়েছে ভারত।

এফএওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় থেকে প্রায় ১৪ লাখ ১২ হাজার টন মাছ আহরণ করে বাংলাদেশ, যা এই খাতের বৈশ্বিক উৎপাদনের সাড়ে ১১ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার মতো দেশের অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদ বিশ্বের সবচেয়ে উৎপাদনশীল খাতগুলোর অন্যতম। এসব জলাশয় লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জেলের জীবিকার উৎস এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান বলেন, এফএওর প্রতিবেদনের চিত্র খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। সব অংশীজনের চেষ্টায় আমাদের মাছের সামগ্রিক উৎপাদন এগিয়ে যাচ্ছে।

তাঁর মতে, উন্মুক্ত জলাশয়ে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে হাওর-বিলে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, পোনা অবমুক্তকরণ, সমাজভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা এবং আইনের প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি বিলুপ্তপ্রায় অনেক দেশি মাছও এখন উন্মুক্ত জলাশয়ে ফিরে আসছে, যা আমাদের জন্য বড় অর্জন।

মৎস্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ মৎস্য বিভাগের পরিচালক মোতালেব হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘সার্বিকভাবে মৎস্য উৎপাদনের আশা জাগানিয়া চিত্র এফএও তাদের প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে। মূলত এই অর্জন মৎস খাতের সঙ্গে যুক্ত সব অংশীজন, গবেষক ও মাঠ কর্মকর্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল।

তিনি বলেন, মাছের উৎপাদন আরও বাড়াতে আমরা বেশ কিছু নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছি। নীতিমালাতেও যুগোপযোগী পরিবর্তন আনা হচ্ছে। কক্সবাজারে একটি বড় চিংড়ি এস্টেট গড়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ের খামার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করা যায়, প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে আগামীতে মৎস্য উৎপাদনে আমরা আরও এগিয়ে যাব।

মাছ চাষেও শীর্ষ পাঁচে

বদ্ধ জলাশয় বা অ্যাকোয়াকালচারেও বাংলাদেশের অগ্রগতি নজর কেড়েছে। এফএওর তথ্যে, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয়ে মাছ চাষের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ ছিল বাংলাদেশ। সর্বশেষ প্রতিবেদনেও অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। বৈশ্বিক মোট অ্যাকোয়াকালচার উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ বাংলাদেশের।

এফএওর হিসাবে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে অ্যাকোয়াকালচার থেকে মাছের উৎপাদন ছিল প্রায় ২৯ লাখ ৭৮ হাজার টন। চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। এই পাঁচ দেশ মিলে বিশ্বের মোট চাষের মাছের ৮২ থেকে ৮৪ শতাংশ উৎপাদন করে।

কর্মসংস্থানে বড় শক্তি

মৎস্য ও অ্যাকোয়াকালচার খাতে সরাসরি কর্মসংস্থানের দিক থেকেও বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের একটি বাংলাদেশ। এফএওর তথ্যে, বিশ্বের মোট মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কর্মীর প্রায় ২৪ শতাংশ বাংলাদেশে কাজ করেন, যা সংখ্যার হিসাবে প্রায় ৮ লাখ।

তবে এই খাতে বাংলাদেশের একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে সংস্থাটি। বিশ্বজুড়ে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে সাধারণত নারীর অংশগ্রহণ বেশি। তবে বাংলাদেশে এই চিত্র ঠিক উল্টো। এই খাতে কাজ করা ৯২ শতাংশ কর্মীই পুরুষ। এফএও বলছে, বিশ্বব্যাপী মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে নারীর গড় অংশগ্রহণ হার ২৮ শতাংশ। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক পুরুষ কর্মীদের হিসাব বাদ দিলে নারীর বৈশ্বিক এই হার এক লাফে ৫৬ শতাংশে পৌঁছে যায়।

সাফল্যের মাঝেও ইলিশ নিয়ে শঙ্কা

মৎস্য খাতের সামগ্রিক অগ্রগতির মধ্যেও জাতীয় মাছ ইলিশ নিয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আনিসুর রহমান বলেন, উন্মুক্ত জলাশয়ে বাড়লেও গত দুই বছরে ইলিশের উৎপাদন কিছুটা কমেছে। এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্য হ্রাস, দূষণ এবং অতিরিক্ত আহরণ দায়ী। তাঁর মতে, উন্মুক্ত জলাশয়ের সাফল্যের ধারা বজায় রাখার পাশাপাশি ইলিশ সংরক্ষণে বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

রপ্তানি করে আয়, আমদানিতে পুষ্টি

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মৎস্য বাণিজ্যের একটি আকর্ষণীয় দিক উঠে এসেছে। আর্থিক মূল্যের হিসাবে বাংলাদেশ মাছের ‘নেট এক্সপোর্টার’ বা নিট রপ্তানিকারক দেশ। অর্থাৎ চিংড়ির মতো উচ্চমূল্যের মাছ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে বাংলাদেশ। কিন্তু পুষ্টি বা প্রোটিনের হিসাবে বাংলাদেশ আবার ‘নেট ইম্পোর্টার’ বা নিট আমদানিকারক। কারণ, সাধারণ মানুষের প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা পূরণে তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর মাছ আমদানি করে বাংলাদেশ।

জেলেদের সুরক্ষায় উদ্যোগ

দেশের মৎস্য উৎপাদনের বড় অংশ আসে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জেলের হাত ধরে। তাদের জীবনমান উন্নয়ন ও টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ। বে অব বেঙ্গল প্রোগ্রামের (বিওবিপি-আইজিও) সদস্য হিসেবে ভারত, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে মিলে বাংলাদেশ প্রান্তিক জেলেদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (এনপিওএ-এসএসএফ) প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।

এফএওর মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রান্তিক মানুষের টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করার পথ আরও শক্তিশালী হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত