সুনামগঞ্জে হাওরে ডুবো ধান কেটে রক্ষার চেষ্টা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সুনামগঞ্জ

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৮: ২৩
সুনামগঞ্জের হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কেটে রক্ষার চেষ্টা করছেন দুই কৃষক। স্ট্রিম ছবি

কৃষক আতাউর রহমান এবার শিয়ালমারা হাওরে চার কেয়ার (বিঘা) জমিতে বোরো চাষ করেছেন। এর মধ্যে ৩ কেয়ার জমির ধানই পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) দুপুরে স্কুলপড়ুয়া একমাত্র ছেলেকে নিয়ে পানিতে নেমেছেন বাকি ধান কাটার জন্য। তাঁর স্ত্রী সেই ধান মাড়াইয়ের জন্য নৌকা থেকে সড়কে তুলছিলেন।

শিয়ালমারা হাওর সংলগ্ন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের ফকিরনগর গ্রামের কৃষক আতাউর রহমান বলেন, ‘আমি একলা মানুষ। চার কেয়ার জমি করেছিলাম। এর ওপর নির্ভর করেই সারা বছর চলে সংসার। ধান পানির নিচে চলে যাচ্ছে। তাই কষ্ট করে ছেলেকে নিয়ে কেটে আনার চেষ্টা করছি।’

আতাউরের স্ত্রী জমিরুন নেছা আক্ষেপ করেই বলেন, ‘আমি জীবনের হাওরে আইছি না। বাধ্য হয়েই হাওরে আইছি। এখন আমার স্বামী অসুস্থ হয়েও ছেলেকে নিয়ে ধান কাটছেন আর আমি ভেজা ধান সড়কে নিয়ে শুকানো চেষ্টা করছি।’

সুনামগঞ্জের হাওরে হাজারো কৃষককে পানির নিচে থেকে ধান কেটে তুলতে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। অনেকে বুক সমান পানিতে নেমে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে নৌকায় তুলে শেষ রক্ষার চেষ্টা করছেন। তবে কেটে তোলা ধান শুকাতে না পাড়লে তা কোনো কাজে আসনে না বলে জানান কৃষকরা।

সুনামগঞ্জের হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কেটে নৌকায় তুলছেন চাষিরা। স্ট্রিম ছবি
সুনামগঞ্জের হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কেটে নৌকায় তুলছেন চাষিরা। স্ট্রিম ছবি

সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁও গ্রামের কৃষক আবু বক্করের ২০ কেয়ার (বিঘা) জমির মধ্যে ১৪ কেয়ারই পানিতে তলিয়ে গেছে। বাকি জমির ধান পানির নিচ থেকে তিনি কেটে তুলতে চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ১৫টা গরু আছে। আমরা কোনো রকম বাঁচতাম পারমু। গরুরে তো বাঁচানো যাইব না। তাই পানিতে ডুবেই ধান কাটছি।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতার পানিতে ডুবেছে ৯ হাজার ৪৯ হেক্টর জমি। যা ধানের হিসেবে ৫০ হাজার টন ক্ষতি হয়েছে। টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কেটি টাকা।

এদিকে চারদিন পর বৃহস্পতিবার রোদ উঠেছে হাওরে। তবে বিকেলে আবহাওয়ার খারাপ হতে দেখা গেছে। বৃষ্টি পুরোপুরি না থামলে ধান উত্তোলন সম্ভব হবে না। এর মধ্যেই উজানে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্টে পানি ক্রমাগতই বাড়ছে।

সুনামগঞ্জের হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কেটে নৌকায় তুলছেন চাষিরা। স্ট্রিম ছবি
সুনামগঞ্জের হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কেটে নৌকায় তুলছেন চাষিরা। স্ট্রিম ছবি

বন্যা পূর্ভাবাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বার্তা অনুযায়ী, চলতি মাসের ২৬ এপ্রিল (গত রোববার) থেকে মেঘালয় চেরাপুঞ্জিতে হওয়া বৃষ্টির পানির ঢলে সুনামগঞ্জে পাহাড়ি নদীসহ ছোট বড় ৯৭ নদীতে পানি বেড়েছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে হওয়া ভারী বর্ষণে এবং অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে জলাবদ্ধতায় পড়েছে ১৯৯টি ছোট বড় হাওর।

এতে হাওরপাড়ে কৃষকের মধ্যে বইছে হতাশার সুর। পানির নিচে ডুবে গেছে সোনালি স্বপ্নের ধান। দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে এই ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কৃষকরা জানান, জেলার হাওরে অর্ধেক জমির ফসল এখন পানির নিচে। কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে হাহাকার চলছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী (পাউবো) প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলছেন, উজানে বৃষ্টি হওয়ায় নদীর পানি বেড়েছে। বাঁধ কেটে জলাবদ্ধতার পানি ভাটিতে বা নদীতে ছাড়ার কোনো উপায় নেই। এই অবস্থায় সুনামগঞ্জের নদীগুলোর পানি ধনু নদী হয়ে মেঘনায় নামতে সপ্তাহ খানেক লাগবে। এরপর হাওরের জলাবদ্ধতার পানি নামতে থাকবে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত