পীর হত্যা মামলায় নাম: যা বলছেন খেলাফত মজলিস ও শিবিরের সাবেক নেতা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া)

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৪: ৫২
দৌলতপুরের ফিলিপনগরে শনিবার পীর শামীমের দরবারে হামলা। স্ট্রিম ছবি

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় মাজারে হামলা চালিয়ে পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরকে (৬৫) হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় জেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের উপজেলা সভাপতি, জামায়াত কর্মী হিসেবে পরিচিত একজন এবং স্থানীয় এক মাদ্রাসার শিক্ষকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১৮০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাতে দৌলতপুর থানায় নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান এই মামলা করেন। এর আগে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত আইনি পদক্ষেপ নিলেন তারা। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকালে মামলার বাদী ফজলুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করে কেটে দেন।

মামলা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভেড়ামারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন। তিনি জানান, মামলায় ফিলিপনগর গ্রামের বাসিন্দা কাঠমিস্ত্রি রাজীব দফাদারকে (৩২) প্রধান আসামি করা হয়েছে। তিনি স্থানীয় গাজী মিস্ত্রির ছেলে।

রাজিব দফাদার ছাড়াও মামলার এজাহারে নামীয় আসামি হিসেবে রয়েছেন— জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি খাজা আহম্মেদ (৩৫), খেলাফত মজলিসের উপজেলা সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ (৪৫) এবং আবেদের ঘাট এলাকার একটি মাদ্রাসার শিক্ষক সাফি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন আরও জানান, হামলার দিনের বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে ইতোমধ্যে আরও ২২ থেকে ২৩ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা যায়নি। পুলিশ ঘটনাটির তদন্তে কাজ করছে।

এর আগে গত শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে উত্তেজিত জনতা আব্দুর রহমান শামিমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় তাঁর তিনজন অনুসারী আহত হন। একই সঙ্গে তাঁর আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। ঘটনার পরদিন রোববার ময়নাতদন্ত শেষে বিকেলে গ্রামের কবরস্থানে আব্দুর রহমান শামিমকে দাফন করা হয়।

যা বলছেন অভিযুক্তরা

মামলার এজাহারে নামীয় চার আসামির সঙ্গেই যোগাযোগের চেষ্টা করে স্ট্রিম। তাঁদের মধ্যে দুজনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। আর অন্য দুজনের মধ্যে একজন রাজিব দফাদার। এলাকায় তিনি জামায়াতের কর্মী হিসেবে পরিচিত থাকলেও তার কোনো দলীয় পদ পাওয়া যায়নি। রাজিব ঘটনার দিন বিকেল থেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। বক্তব্য জানতে একাধিকবার খোঁজ করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

তাঁর বিষয়ে উপজেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন বলেছেন, ‘ওই এলাকায় রাজিব মিস্ত্রি, পিতা গাজী মিস্ত্রি—এ নামে কেউ জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।’

এছাড়া সাফি নামে অপর আসামি আবেদের ঘাট এলাকার একটি মাদ্রাসার শিক্ষক বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই এলাকায় একমাত্র মাদ্রাসাটিতে আজ মঙ্গলবার সকাল কয়েক দফায় গিয়েও তাঁর খোঁজ মেলেনি। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তিনি এই মাদ্রাসার শিক্ষক।

এদিকে মামলার বিষয়ে জেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি খাজা আহম্মেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘হামলার দিন দুপুর ২টার দিকে স্থানীয় মসজিদের ইমাম, মুসল্লি ও এলাকাবাসী মিলে বসে আইনি উপায়ে বিষয়টি সমাধানের কথা ছিল। তবে হঠাৎ ফেসবুকে মিছিলের ছবি দেখে তিনি নিহত শামিমের বড় ভাই ফজলুর রহমান সান্টুকে ফোন দিয়ে সতর্ক করেন যে কিছু লোক আস্তানার দিকে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সান্টু তাকে জানান, সেখানে হামলা ও ভাঙচুর শুরু হয়েছে। এরপর তিনি ঘটনাস্থলে যেতে চাইলে সান্টু তাঁকে সেখানে যেতে নিষেধ করেন এবং হাসপাতালে যেতে বলেন।’

খাজা আহম্মেদ আরও জানান, পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে লাশ হস্তান্তর পর্যন্ত তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে কেন মামলায় আসামি করা হয়েছে, তা তাঁর বোধগম্য নয় বলে তিনি দাবি করেন।

এ বিষয়ে মামলার আরেক অভিযুক্ত খেলাফত মজলিসের উপজেলা সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘হামলা বা কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেই লক্ষ্যে সেদিন দুপুরে বসার কথা ছিল। এ বিষয়ে তার সঙ্গে পুলিশেরও কথা হয়েছিল এবং তারা আইনি সমাধানই চেয়েছিলেন।’

তিনি দাবি করেন, ‘তবে বিকেল আড়াইটার দিকে স্থানীয় কিছু লোক হামলা চালায় এবং তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছান বিকেল ৩টার কিছু আগে, যখন পরিস্থিতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।’

হামলার সময় ধারণ করা একটি ভিডিওতে আসাদুজ্জামান আসাদকে আস্তানার দোতলার সিঁড়ি দিয়ে কাগজে মোড়ানো কিছু হাতে নিয়ে নামতে দেখা যায়। সেটি লুট করা কোনো মালামাল ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না, সেটি সেখানে পড়ে থাকা একটি কোরআন শরিফ ও কিছু অজিফা ছিল, যা তিনি সংরক্ষণের জন্য নিচে নিয়ে আসেন।

তিনিও হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও অস্বীকার করেন।

সম্পর্কিত