সীমান্তে পুশ-ইন চেষ্টা রুখল বিজিবি, ওপারে জড়ো শত শত মানুষ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও গাংনী সীমান্তে বিজিবির সঙ্গে টহল কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্ট্রিম ছবি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশ-ইন (ঠেলে পাঠানো) চেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসব সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ২৮ জন আটকে

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে বিএসএফের ঠেলে পাঠানো ২৮ জন ব্যক্তি এখনও নোম্যান্সল্যান্ডে অবস্থান করছেন। বিএসএফ তাদের এখনও ফেরত নেয়নি এবং বিজিবিকে কোনো সিদ্ধান্তও জানায়নি। আজ শুক্রবার (৪ জুন) সকালে বিজিবির ১৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম এ তথ্য জানিয়েছেন।

বিজিবি অধিনায়ক জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর থেকে ওই ২৮ জন সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে অবস্থান করছেন। বর্তমানে তারা সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে নোম্যান্সল্যান্ডের ভারতীয় অংশের ৫০ গজ অভ্যন্তরে রয়েছেন।

বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠক ও দুর্ভোগ

গতকাল বিকেলে বিজিবি ও বিএসএফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসএফ ২৮ জনকে ঠেলে পাঠানোর কথা স্বীকার করে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেয়। তবে পরবর্তীতে আর কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। বর্তমানে নোম্যান্সল্যান্ডে খোলা আকাশের নিচে তীব্র গরম আর বৃষ্টিতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, 'রাতে বিএসএফ জোর করে ২৮ জনকে পুশ-ইন করার চেষ্টা করে। পরে বিজিবি তাদের বাধা দেয়। সীমান্তের শূন্য লাইনে তারা মানবেতর সময় পার করছে। বৃষ্টিতে ভিজে নাজেহাল অবস্থা। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। তারা শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে ভারতে তাদের নির্যাতন করা হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব না।'

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা শামিম বলেন, 'আমরা বিজিবির সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় সতর্ক অবস্থায় আছি। কোনোভাবেই বিএসএফের অমানবিক আচরণ মেনে নেব না।'

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নাসিরুল ইসলাম জানান, গভীর রাত থেকে ওই ২৮ জন ব্যক্তি শূন্য লাইনে আটকে আছেন। খাওয়া-দাওয়া ছাড়া তীব্র গরমে তাদের অমানবিক জীবনযাপন করতে হচ্ছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে বিএসএফের ১২ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর ক্যাম্পের সদস্যরা এই ২৮ জনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠায়, যার মধ্যে ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী ও ৬ জন শিশু রয়েছে। গতকাল বিকেলে বিজিবির রাজশাহী সেক্টর কমান্ডার কর্নেল কামাল হোসেন সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করে জানান, পুশ-ইন প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

সংগৃহীত ছবি
সংগৃহীত ছবি

সাতক্ষীরায় ওপারে জড়ো শত শত মানুষ

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কেঁড়াগাছি সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুদের অবৈধভাবে ঠেলে দেওয়ার (পুশ-ইন) চেষ্টা করছে বিএসএফ। আজ শুক্রবার সকালে বিষয়টি নজরে আসার পর সাতক্ষীরা সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বিজিবি। বাড়ানো হয়েছে টহল ও নজরদারি। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এক দফায় ওই সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। এ অবস্থায় সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অনিবন্ধিত অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত কিছু মানুষকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৬ মে থেকে কলারোয়া উপজেলার কেঁড়াগাছি ও চন্দনপুর সীমান্তের বিপরীতে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বাদুড়িয়া থানার হাকিমপুর সীমান্তে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে জড়ো করা হয়েছে। তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভারতীয় পুলিশ বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করেছে বলে সীমান্তের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থান ও বাড়তি সতর্কতার কারণে বিএসএফের সেই চেষ্টা এখন পর্যন্ত সফল হয়নি।

সাতক্ষীরা-৩৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান বলেন, তাঁর আওতাধীন সাতক্ষীরা সীমান্তের ৫৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দিন-রাত টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে বিজিবির সব ছুটি। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চেকপোস্টগুলোতে নিরাপত্তা-ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ কিংবা পুশ-ইন প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, পুশ-ইনের আশঙ্কায় তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা সীমান্তে নজরদারি আরও জোরদার করার পাশাপাশি কূটনৈতিক উপায়ে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

কুষ্টিয়া ও মেহেরপুরেও একাধিক চেষ্টা ব্যর্থ

এদিকে কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে বিএসএফের একাধিক পুশ-ইন চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় সীমান্তবাসী। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সীমান্ত পরিস্থিতিতে কিছুটা উত্তেজনা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থানরত কিছু মানুষকে বাংলাদেশি নাগরিক দাবি করে বিএসএফ বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় হোল্ডিং সেন্টারে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১০ থেকে ১৫ জনকে জড়ো করে যানবাহনে করে সীমান্তের কাছাকাছি এনে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়। তবে কুষ্টিয়ার ৪৭ বিজিবির দায়িত্বপূর্ণ দৌলতপুর সীমান্তের প্রায় ৪৬ কিলোমিটার এবং মেহেরপুরের গাংনী সীমান্তের ৩৬ কিলোমিটার এলাকায় বিজিবি সদস্যরা দিনরাত নিরাপত্তা জোরদার করেছেন। অতিরিক্ত জনবল মোতায়েনের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারাও লাঠি হাতে বিজিবির সঙ্গে টহল কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।

বিজিবির পাশে গ্রামবাসী

দৌলতপুর সীমান্তের চিলমারী চল্লিশপাড়া এলাকার বাসিন্দা জাহিরুল ইসলাম বলেন, 'ভারত থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের যে চেষ্টা চলছে, তা আমরা কখনো মেনে নেব না। বিজিবি যেভাবে দিন-রাত টহল পরিচালনা করছে, তাতে অবৈধ অনুপ্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত মাইকিং ও বাঁশি বাজিয়ে সতর্কতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। আমরাও সীমান্তবাসী হিসেবে বিজিবির সঙ্গে থেকে সুরক্ষায় সহযোগিতা করছি।'

৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, 'আমার দায়িত্বপূর্ণ কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে একাধিকবার পুশ-ইনের চেষ্টা চালানো হয়েছে। আমরা কোনোভাবেই তা সমর্থন করিনি। সীমান্তে ২৪ ঘণ্টা টহল, মাইকিং ও সতর্কতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সম্ভাব্য পুশ-ইন পয়েন্টগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সীমান্ত রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।' এই সময়ে সীমান্তে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকেরা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন এবং পালাক্রমে বিজিবির সঙ্গে টহল দিচ্ছেন বলে তিনি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত