ঢাকায় ইরানি কার্পেটের বাণিজ্য: বাজারে নেই, তবু বিক্রি হচ্ছে

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ২২: ৫৭
ইরানি কার্পেট ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের প্রতীক। স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরান থেকে বাংলাদেশে কার্পেট আমদানি শূন্যের কাছাকাছি হলেও ঢাকার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সীমিত কিছু বিক্রয় চ্যানেলে বিক্রি হচ্ছে পার্সিয়ান বা ইরানি কার্পেট। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মধ্যবর্তী দেশ হয়ে আসা এই পণ্য বিলাসবহুল ও সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।

বাংলাদেশের কার্পেট বাজারের বার্ষিক বিক্রয় প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা। এই বাজার প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর, যেখানে ইরানি কার্পেটের অংশ খুবই ছোট। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)-এর জানুয়ারি ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান থেকে বাংলাদেশের আমদানি অত্যন্ত সীমিত। ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি ছিল শূন্য। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাত্র ৩৬ লাখ টাকা। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যে সামান্য আমদানি হয়েছে, তা ছিল যন্ত্রপাতি ও মেকানিক্যাল পণ্যের জন্য। কার্পেট এই তালিকায় ছিল না।

জাতিসংঘের কমট্রেড তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে ইরান থেকে বাংলাদেশে কার্পেট রপ্তানির সর্বোচ্চ পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১০ হাজার ৫১০ ডলার, যা ফেল্ট ফ্লোর কভারিংসের জন্য। ২০১৪ সালে নটেড কার্পেট রপ্তানি ছিল মাত্র ২ হাজার ৮২০ ডলার। ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে তা-ও বন্ধ হয়ে যায়।

রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড, বায়তুল মোকাররম, গুলশান ডিসিসি মার্কেট ও বাড্ডা লিংকরোড এলাকায় কার্পেটের বিভিন্ন দোকানে সরেজমিনে গিয়ে ইরানি কার্পেট বিক্রি হতে দেখা যায়নি। কার্পেট ব্যবসায়ীরা জানান, তারা এখন আর ইরানের কার্পেট আমদানি বা বিক্রি করেন না।

এলিফ্যান্ট রোডের মিঠু কার্পেটসের ম্যানেজার হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ইরান থেকে কোনো কার্পেট আমদানি করা যায় ন। আর তা ছাড়া ইরানি কার্পেট অনেক দামি। সারা বছরে বা ছয় মাসে একটা দুটো বিক্রি হয়। তাই আমরা ইরানি কার্পেট বিক্রি করি না।’

মিশু কার্পেটসের ব্যবস্থাপকও জানান, তারা ইরানি কার্পেট আমদানি বা বিক্রি করেন না। এ ছাড়া আরাফাত কার্পেটস, সারমানস কার্পেটস, পনির কার্পেটস, মোরেশদ কার্পেটস ও নিউ রুপসী কার্পেটসের শোরুমের ব্যবস্থাপক ও বিক্রয় কর্মীদের সঙ্গে কথা বলা জানা যায়, তারাও ইরানি কার্পেট বিক্রি করেন না।

গুলশানের ডিসিসি মার্কেটে গিয়েও জানা যায় সেখানকার কার্পেট ব্যবসায়ীরা ইরান থেকে কোনো কার্পেট আমদানি করেন না। শুধু একটি দোকানের বিক্রয়কর্মী জানান, তাদের কাছে মাত্র একটি ইরানি কার্পেট আছে।

তবে অনলাইনে কয়েকটি প্ল্যাটফর্মে ইরানি কার্পেট বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়। এমনই একটি প্ল্যাটফর্ম আলাদিন কার্পেটসবিডি। ফেসবুকে তাদের ৫৩ হাজারের বেশি অনুসারী রয়েছে। তারা পার্সিয়ান ও তুর্কি হ্যান্ডমেড কার্পেট বিক্রি করে। ইসফাহান, কাশান এবং তাবরিজ অঞ্চলের কার্পেট তাদের প্রধান পণ্য। তারা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে বিক্রি পরিচালনা করে।

প্রতিষ্ঠানটির হোয়াটসঅ্যাপে অ্যাকাউন্টে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, তাদের শোরুম মূলত দুবাই থেকে পরিচালিত হয়। সেখান থেকে তারা অর্ডার নিয়ে বাংলাদেশে কার্পেট সরবরাহ করে। বাংলাদেশের মধ্যে ফ্রি ডেলিভারির সুবিধাও রয়েছে।

বেডিং বিডি নামের আরেকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও ‘ইরানি কার্পেট’ নামে একটি আলাদা ক্যাটাগরি রয়েছে। তারা দাবি করে যে এসব কার্পেট শতাব্দী প্রাচীন পার্সিয়ান ঐতিহ্যের অংশ। গ্রাহকদের কাছে এগুলোকে সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্রিমিয়াম বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান আলমেইডা রাগসও বাংলাদেশে অনলাইনে কার্পেট বিক্রি করে। পার্সিয়ান ১২০০ রিড কালেকশন তাদের বিশেষ পণ্য।

ইউবাই বাংলাদেশ ও দারাজ এই দুটি ই-কমার্স মার্কেটপ্লেস আন্তর্জাতিক বিক্রেতাদের মাধ্যমে পার্সিয়ান কার্পেট সরবরাহ করে। এখানে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্য পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে কার্পেট ক্রেতাদের ধরন সময়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। অতীতে প্রধানত ধনী ও উচ্চবিত্ত মানুষরাই পার্সিয়ান কার্পেট কিনতেন। তবে গত এক দশকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে কার্পেট ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা এখন গৃহসজ্জার অংশ হিসেবে কার্পেট কিনছেন।

বৈশ্বিক পর্যায়েও ইরানের কার্পেট শিল্প ভয়াবহ পতনের মুখে পড়েছে। তিন দশক আগে যেখানে রপ্তানি আয় ছিল ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি, সেখানে তা বর্তমানে ৪০ মিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরানের চেম্বার অব কমার্সের কার্পেট ও হস্তশিল্প কমিশনের চেয়ারম্যান মরতেজা হাজি আগামিরি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশটির সংবাদ মাধ্যম ইরান ফোকাসকে বলেন, গত ছয় বছর ধরে রপ্তানি ১০০ মিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে। তিনি এটিকে কার্যত শূন্যের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি তাদের আন্তর্জাতিক বাজার হারিয়েছে।

বাজারে প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভারত, তুরস্ক এবং চীনসহ বিভিন্ন দেশ ইরানি নকশার কার্পেট উৎপাদন করছে।

ইরানি কার্পেট ব্যবসায়ী হামেদ নবিজাদেহ জানান, ইরান এখন নিজ দেশেও বিদেশি কার্পেটের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়েছে। ভারত, তুরস্ক এবং চীন থেকে আমদানি করা কার্পেট স্থানীয় বাজারেও বিক্রি কমিয়ে দিচ্ছে।

চীন, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান কম খরচে ইরানি ডিজাইনের কার্পেট তৈরি করছে। তারা বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে বাংলাদেশে, দামের প্রতি সংবেদনশীল ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে।

সম্পর্কিত