মক্কা চুক্তি

সব মুসলিম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কেন সম্মিলিত প্রতিরক্ষার আওতায় থাকা উচিত

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ৪৬
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি মুসলিম বিশ্বের কৌশলগত ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। চুক্তির মূল নীতিটি একদম স্পষ্ট। তা হলো—তিন রাষ্ট্রের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে, তাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা হবে।

চুক্তিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এতে আরও রাষ্ট্রের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। যেহেতু এটি সম্মিলিত বা যৌথ প্রতিরক্ষার একটি নতুন নীতি চালুর কথা বলছে, তাই এর সামনে আরও বৃহত্তর একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা প্রয়োজন। তা হলো- এই সম্মিলিত প্রতিরক্ষা আসলে কাদের জন্য?

চুক্তির আসল উদ্দেশ্য যদি মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা, প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং স্থিতিশীলতা বাড়ানো হয়, তবে তা শুধু স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এর লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও বড়। এমন একটি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে যেকোনো মুসলিম দেশ বাইরের শত্রুর অবৈধ হামলার শিকার হলে সাহায্য পায়। পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা যেন যৌথ রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা পাওয়ার অধিকার রাখে। এর মধ্যে ইসরায়েলের বেআইনি এবং উসকানিমূলক হামলাও যুক্ত থাকবে। নৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে এটিই হওয়া উচিত মক্কা চুক্তির আসল বা অলিখিত অঙ্গীকার।

তবে এর মানে এই নয় যে চুক্তিটি কেবল একটি ‘ইসরায়েলবিরোধী জোটে’ পরিণত হবে। এমনটা হওয়া উচিতও নয়। কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে স্থায়ী বিবাদ তৈরি করাও এর লক্ষ্য হতে পারে না। একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা কাঠামোকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে। সেখানে আগ্রাসন বা হামলার স্পষ্ট সংজ্ঞা থাকতে হবে। পাশাপাশি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটিও হতে হবে পরিমিত ও নিয়মতান্ত্রিক।

অন্যদিকে, কোনো দেশ যখন সশস্ত্র হামলার শিকার হয়, তখন নিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে চুপ থাকাও কোনো কাজের কথা নয়। এটি কোনো কার্যকর নিরাপত্তা নীতি হতে পারে না।

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে দেখা যায়, মুসলিম দেশগুলো অনেক দূর থেকেও সামরিক হামলার মুখে পড়তে পারে। এর থেকে আমাদের শুধু এই শিক্ষাই নিলে চলবে না যে, প্রতিটি দেশের বিমান প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, গোয়েন্দা ব্যবস্থা বা নৌবাহিনী আরও শক্তিশালী করতে হবে। এর চেয়েও বড় শিক্ষা হলো—নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি বিচ্ছিন্ন বা আলাদা থাকে, তবে তা শত্রুকে আগ্রাসনের সুযোগ করে দেয়।

কোনো মুসলিম দেশের ওপর হামলার পর যদি সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়া কেবল কয়েকটি কূটনৈতিক বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকে তবে হামলাকারী দেশ একভাবে চিন্তা করবে। কিন্তু সে যদি জানে যে, একটি দেশের ওপর হামলা করলে সবার সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে, তখন তার হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। এটাই হলো প্রতিরোধ ক্ষমতার মূল কথা।

ভবিষ্যতে এই চুক্তিটি মুসলিম দেশগুলোর জন্য একটি সম্মিলিত ‘নিরাপত্তা-গ্যারান্টি’ বা নিশ্চয়তা তৈরির দিকে এগোতে পারে। এর আওতায় চুক্তিতে থাকা যেকোনো মুসলিম দেশের ওপর বাইরের হামলাকে যৌথ উদ্বেগ হিসেবে ধরা হবে। তবে এমন নিরাপত্তা-নিশ্চয়তার মানে এই নয় যে, সবাইকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে।

মক্কা চুক্তি ইতিমধ্যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি নিয়েছে। তারা মেনে নিয়েছে যে, এক সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা। এখন পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়া উচিত এই নীতির আওতা বা পরিধি আরও পরিষ্কার করা।

ভবিষ্যতে এই চুক্তিটি মুসলিম দেশগুলোর জন্য একটি সম্মিলিত ‘নিরাপত্তা-গ্যারান্টি’ বা নিশ্চয়তা তৈরির দিকে এগোতে পারে। এর আওতায় চুক্তিতে থাকা যেকোনো মুসলিম দেশের ওপর বাইরের হামলাকে যৌথ উদ্বেগ হিসেবে ধরা হবে। তবে এমন নিরাপত্তা-নিশ্চয়তার মানে এই নয় যে, সবাইকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে।

প্রথম ধাপে এর আওতায় বেশ কিছু বিষয় থাকতে পারে। যেমন—পারস্পরিক পরামর্শ, সম্মিলিত কূটনৈতিক পদক্ষেপ, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, বিমান প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহায়তা, মানবিক সাহায্য এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া। তবে কোনো হামলা যদি স্পষ্টতই অবৈধ সশস্ত্র হামলা হয়, তবে আক্রান্ত দেশকে প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সংবিধান মেনে প্রয়োজনে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।

এতে মক্কা চুক্তির কৌশলগত পরিচয় আরও শক্তিশালী হবে। আর এখানেই বাংলাদেশের অবস্থান নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।

মক্কা চুক্তিকে শুধু অন্যদের কাছ থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার সুযোগ হিসেবে ঢাকার দেখা উচিত নয়। বরং বাংলাদেশের উচিত নিজেকে এমন একটি দেশ হিসেবে তুলে ধরা, যে এই বৃহত্তর মুসলিম নিরাপত্তা কাঠামো তৈরিতে স্বতন্ত্র ও বাস্তব অবদান রাখতে পারে।

কারণ, এই নতুন কৌশলগত সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চল এখনও অনুপস্থিত। সৌদি আরব উপসাগর ও লোহিত সাগরের কৌশলগত দিকটি সামলায়। তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করে; পাশাপাশি তাদের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা-শিল্প রয়েছে। পাকিস্তান আরব সাগর ও দক্ষিণ এশিয়াকে যুক্ত করার পাশাপাশি পারমাণবিক ক্ষমতার জোর বাড়ায়। আর বাংলাদেশ যুক্ত করতে পারে বঙ্গোপসাগর ও পূর্ব ভারত মহাসাগরকে। ভৌগোলিক দিক থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্মুখভাগে অবস্থিত। আমাদের সমুদ্রবন্দর, সমুদ্রপথ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং জাহাজ নির্মাণের দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। এর সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা মিলে সামরিক আকারের চেয়েও বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে বাংলাদেশ এর চেয়েও বড় একটি অবদান রাখতে পারে। সেটি হলো—মুসলিম সম্মিলিত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ‘সামুদ্রিক ধারণা’ যুক্ত করা।

নিরাপত্তাকে এখন আর শুধু স্থলসীমান্ত ও সেনাবাহিনীর মাঝে আটকে রাখা যায় না। এর সঙ্গে সমুদ্রপথ, বন্দর, সমুদ্রসম্পদ, সাবমেরিন ক্যাবল, জ্বালানি সরবরাহ, মৎস্যসম্পদ এবং নির্বিঘ্নে নৌচলাচলের স্বাধীনতাও জড়িত। তাই বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে চারটি প্রধান পিলারের প্রস্তাব দিতে পারে। এগুলো হলো: বহিঃশক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা-শিল্প ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং মানবিক সুরক্ষা।

মুসলিম বিশ্বে সামরিক শক্তির ঘাটতি নেই। ঘাটতি রয়েছে যথেষ্ট মাত্রার কৌশলগত সমন্বয়ের। তুরস্কের রয়েছে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। পাকিস্তানের রয়েছে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সক্ষমতা। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল আর্থিক সম্পদ ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব। আর বাংলাদেশের রয়েছে সামুদ্রিক ভূগোল, বিপুল মানবসম্পদ, শান্তিরক্ষা অভিজ্ঞতা এবং বঙ্গোপসাগরের প্রবেশাধিকার।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হতে হবে ধারণাগত। চুক্তির মূল নীতিটি এখন হলো, ‘এক সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’। ধীরে ধীরে একে আরও উন্নত করে এমন নীতি করা উচিত যে—‘চুক্তিতে থাকা কোনো মুসলিম দেশের ওপর অবৈধ সামরিক হামলা সবার জন্যই একটি যৌথ নিরাপত্তা-উদ্বেগ।’ এটি হবে অনেক বেশি অর্থবহ একটি প্রস্তাব।

একই সঙ্গে এটি ইসরায়েলকে একটি স্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসবে। তাদের জন্য কোনো বিশেষ ব্যতিক্রম নীতি থাকবে না। কোনো মুসলিম দেশের ওপর ইসরায়েলি বাহিনী অবৈধ হামলা চালালে, তাকে অন্য যেকোনো দেশের হামলার মতোই বিচার করতে হবে। অর্থাৎ, চুক্তিটির নীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে হবে না; নীতিটি হবে যেকোনো আগ্রাসন বা হামলার বিরুদ্ধে। চুক্তির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য এই পার্থক্যটি খুবই জরুরি।

যে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সংগঠন কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে স্থায়ী শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে, সেটি সহজেই আরেকটি ভূরাজনৈতিক জোটে পরিণত হতে পারে। কিন্তু যে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামো আগ্রাসনকেই সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে, সেটি অনেক বিস্তৃত আন্তর্জাতিক বৈধতা দাবি করতে পারে। বাংলাদেশের উচিত এই পার্থক্যের ওপর জোর দেওয়া।

ঢাকার অবস্থান হওয়া উচিত এমন: আমরা যুদ্ধ চাই না, সংঘাতও চাই না। আমরা মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তাকে সমর্থন করি। আমরা জাতিসংঘ সনদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা সশস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার অধিকারকে স্বীকার করি। এবং আমরা বিশ্বাস করি, আগ্রাসনের মুখে কোনো রাষ্ট্রকে একা না রেখে সম্মিলিতভাবে কাজ করলে বৈধ আত্মরক্ষার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়।

এমন অবস্থান একই সঙ্গে নীতিনিষ্ঠ এবং দায়িত্বশীল। এটি বাংলাদেশের সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয়।

প্রশ্ন আসতে পারে, বঙ্গোপসাগর থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার দরকার কী? এর কারণ হলো, বাংলাদেশের নিরাপত্তা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বাংলাদেশের বাণিজ্য যে সমুদ্রপথ দিয়ে হয়, তা আরব সাগর, উপসাগর এবং লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের অর্থনীতিও একই জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তাই মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সামরিক বা সামুদ্রিক অস্থিরতা দেখা দিলে তার ধাক্কা দক্ষিণ এশিয়াতেও লাগে। এতে আমাদের পণ্য পরিবহন, জ্বালানির দাম, সরবরাহ, সাইবার নেটওয়ার্ক ও বিশ্ববাণিজ্যে প্রভাব পড়ে।

সুতরাং একটি বিস্তৃত কৌশলগত স্থিতিশীলতা কাঠামোর প্রতি বাংলাদেশের বৈধ জাতীয় স্বার্থ রয়েছে। তবে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিষ্ক্রিয় হওয়া চলবে না।

ঢাকার উচিত সমমর্যাদা, সমান নিরাপত্তা-নিশ্চয়তা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সমান অধিকার দাবি করা। এর বিনিময়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব সক্ষমতাগুলো চুক্তিতে যুক্ত করতে পারে। যেমন—সামুদ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, নৌবাহিনীর সহযোগিতা, উদ্ধার কার্যক্রম, মানবিক ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়তা, শান্তিরক্ষার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো, বন্দর সুবিধা, সামুদ্রিক প্রশিক্ষণ, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত এবং সাইবার নিরাপত্তা। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক সামরিক মহড়াতেও অংশ নিতে পারে।

বাংলাদেশ এমনকি একটি ‘মক্কা মেরিটাইম সিকিউরিটি ফোরাম’ বা সামুদ্রিক নিরাপত্তা ফোরাম তৈরির প্রস্তাবও দিতে পারে। এর ফলে উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগর একটি যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আসবে। এটি মক্কা চুক্তিকে শুধু স্থলভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে বের করে একটি ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোতে রূপান্তরিত করতে পারে।

মুসলিম বিশ্বে সামরিক শক্তির ঘাটতি নেই। ঘাটতি রয়েছে যথেষ্ট মাত্রার কৌশলগত সমন্বয়ের। তুরস্কের রয়েছে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। পাকিস্তানের রয়েছে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সক্ষমতা। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল আর্থিক সম্পদ ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব। আর বাংলাদেশের রয়েছে সামুদ্রিক ভূগোল, বিপুল মানবসম্পদ, শান্তিরক্ষা অভিজ্ঞতা এবং বঙ্গোপসাগরের প্রবেশাধিকার।

মক্কা চুক্তিকে শুধু অন্যদের কাছ থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার সুযোগ হিসেবে ঢাকার দেখা উচিত নয়। বরং বাংলাদেশের উচিত নিজেকে এমন একটি দেশ হিসেবে তুলে ধরা, যে এই বৃহত্তর মুসলিম নিরাপত্তা কাঠামো তৈরিতে স্বতন্ত্র ও বাস্তব অবদান রাখতে পারে।

এই সক্ষমতাগুলোর একে অপরের দারুণ পরিপূরক হতে পারে। তাই, ‘বাংলাদেশকে বাঁচানোর জন্য অন্য কারও দরকার আছে কি না’—এমন প্রশ্ন তোলা ঠিক নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘এমন একটি ব্যবস্থা তৈরিতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত, যেখানে বাইরের আগ্রাসনের মুখে কোনো মুসলিম দেশ আর একা থাকবে না?’

এটি নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী একটি প্রস্তাব। এবং এর জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন কৌশলগত পরিপক্বতা। এর উদ্দেশ্য ভারতবিরোধী হওয়া নয়। ইরানবিরোধী হওয়া নয়। ইসরায়েলবিরোধী রাষ্ট্রীয় জোট গঠনও নয়। কোনো সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘটিত প্রতিটি সংঘাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়াও নয়।

একটি স্পষ্ট সীমারেখা বা 'রেড লাইন' থাকতে হবে। তা হলো—বাইরের শক্তির সশস্ত্র আগ্রাসন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর অবৈধ সামরিক হামলা। এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হতে হবে পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্মিলিত ও পরিমিত। এটি অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন এবং দেশের সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। তবেই এই উদ্যোগটি সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক মহলেও গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

মক্কা চুক্তি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সদস্যপদের মানদণ্ড এবং কার্যকরী প্রক্রিয়াগুলো এখনও বিকশিত হচ্ছে। তুরস্ক ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে এই কাঠামো ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে। ঠিক এ কারণেই বাংলাদেশের এখনই এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত, পরে নয়।

ঢাকার উচিত নীরবে রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের সঙ্গে পরামর্শ শুরু করা। তবে আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের কেবল সদস্য হওয়ার আবেদন করলে চলবে না, একটি শক্ত প্রস্তাবও থাকতে হবে।

বাংলাদেশের প্রস্তাবটি হতে পারে এমন: ভবিষ্যতের মক্কা নিরাপত্তা কাঠামোতে মুসলিম দেশগুলোর ওপর বাইরের শক্তির অবৈধ হামলার ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে। এর মধ্যে ইসরায়েলের বেআইনি ও উসকানিমূলক হামলাও যুক্ত থাকবে। তবে আগ্রাসনের মানদণ্ড হতে হবে সর্বজনীন। অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।

আর এই নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরকে যুক্ত করবে।

এর ফলে উপসাগরের সঙ্গে আরব সাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের একটি দারুণ যোগসূত্র তৈরি হবে। একই সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষার সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং মানবিক সুরক্ষারও একটি বড় মেলবন্ধন ঘটবে।

এর চূড়ান্ত লক্ষ্য কোনো ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠন হওয়া উচিত নয়। বরং এর লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও দায়িত্বশীল ও দীর্ঘস্থায়ী কিছু তৈরি করা। এমন একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো গড়তে হবে, যেখানে চুক্তিতে থাকা প্রতিটি মুসলিম দেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সবার কাছেই সমান গুরুত্ব পাবে। বাংলাদেশের এই কাঠামোর অংশ হওয়া উচিত। বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য অন্যের সাহায্য দরকার—বিষয়টি এমন নয়। বরং বাংলাদেশ নিজেই সবার নিরাপত্তার জন্য একটি ঢাল তৈরিতে বড় অবদান রাখতে পারে।

মক্কা চুক্তি যদি সত্যিই একটি যৌথ প্রতিরক্ষার চুক্তি হতে চায়, তবে এর চূড়ান্ত প্রশ্নটি এটি হওয়া উচিত নয় যে—কে আগে স্বাক্ষর করেছে। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—বিপদ বা হামলা যখন দরজায় কড়া নাড়বে, তখন কে কার পাশে দাঁড়াবে। এটিই মক্কা চুক্তির অলিখিত অঙ্গীকার। বাংলাদেশের উচিত অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে এই বিষয়টি সবার সামনে তুলে ধরা।

  • কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

সব মুসলিম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কেন সম্মিলিত প্রতিরক্ষার আওতায় থাকা উচিত