কারিকুলামেও আসছে এআই, ব্যবহার নীতিমালা চূড়ান্ত করার তাগিদ
স্ট্রিম প্রতিবেদকঢাকা

কয়েক ঘণ্টার কাজ কয়েক মিনিটেই শেষ করতে এখন অনেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার করছেন। কেউ লেখার কাঠামো তৈরি করছেন, কেউ গবেষণার প্রাথমিক তথ্য খুঁজছেন, আবার কেউ পুরো উত্তর তৈরি করে সেটি নিজের নামে জমা দিচ্ছেন। শিক্ষাঙ্গন তো বটেই, কর্মক্ষেত্রসহ নানা পর্যায়ে ব্যবহার হচ্ছে এআই।
সরকারের পক্ষ থেকেও এআই সম্পর্কে ধারণা তৈরির উদ্যোগ শুরু হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড সূত্র বলছে, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, মেশিন লার্নিং ও সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয় যুক্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু এআই প্রযুক্তি শেখানো নয়, এর দায়িত্বশীল ব্যবহার, তথ্য যাচাই এবং নৈতিক বিষয়গুলোও শিক্ষার অংশ হওয়া প্রয়োজন। এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও এর সীমা, গ্রহণযোগ্যতা এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে এখনো নীতিমালা চূড়ান্ত হয়নি। ফলে এআই শেখার পদ্ধতি সহজ করার পাশাপাশি সততা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
বিশেষ করে শিক্ষা ও গবেষণায় এআই ব্যবহারের অভিন্ন নীতিমালার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, কোন কাজে এআই ব্যবহার করা যাবে, কোথায় যাবে না এবং কোন ক্ষেত্রে ব্যবহারের বিষয়টি প্রকাশ করতে হবে—নীতিমালায় এসব বিষয় স্পষ্ট থাকতে হবে। এআই শিক্ষা ও গবেষণার কাজ দ্রুত করতে পারে, তবে এটি ভুল তথ্য, ভুল সূত্র এবং পক্ষপাতপূর্ণ ফলাফল তৈরি করতে পারে। এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব ব্যবহারকারীর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু লেখার সহায়ক নয়, গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়েও ব্যবহৃত হচ্ছে এআই। সাহিত্য পর্যালোচনা, তথ্য সাজানো, ভাষাগত সংশোধন, গবেষণার ধারণা তৈরি—এসব কাজে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করে থাকেন।
শিক্ষকরা অবশ্য বলছেন, যাচাই ছাড়া এআইয়ের তৈরি লেখা বা তথ্য ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব বিশ্লেষণী ক্ষমতা কমতে পারে। পাশাপাশি গবেষণাপত্রে এআইয়ের ব্যবহার প্রকাশ না করলে একাডেমিক সততার প্রশ্নও তৈরি হয়।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ২০২৪ সালের এক জরিপে বাংলাদেশের ১২ শ ৫৩ জন প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকের এআই বিষয়ে ধারণা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন এআই প্রাথমিক শিক্ষায় উপকারী হতে পারে। তবে একই গবেষণায় শিক্ষকরা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো এবং অনলাইন নিরাপত্তার মতো চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেন।
এডিবির ওই জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, এআই ব্যবহারের জন্য শুধু প্রযুক্তি দিলেই হবে না; শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো এবং স্থানীয় ভাষাভিত্তিক এআই টুল প্রয়োজন।
চলতি বছর উচ্চশিক্ষায় এআইয়ের প্রভাব নিয়ে ডিসকভার এডুকেশন জার্নালে ‘ফ্যাক্টরস অ্যাফেক্টিং ইনোভেটিভ টিচিং মেথডস উইথ এআই ট্রানসন্যাশনাল হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা বাংলাদেশের পাঁচটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯৪ শিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, এআই টুলের ধরন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা এবং শিক্ষকের প্রস্তুতি শিক্ষাদানের কার্যকারিতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা ছাড়া শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না বলে ওই গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকদের সুপারিশ হলো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত এআই প্রশিক্ষণ, স্পষ্ট নীতিমালা এবং এআই ব্যবহারের মূল্যায়ন কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া।
এআই ব্যবহারের উদ্বেগের জায়গায় রয়েছে গবেষণা ও একাডেমিক সততা। ইউজিসি চেয়ারম্যানও সতর্ক করে বলেছেন, এআই ব্যবহার করে কেউ কেউ নিম্নমানের বা প্রিডেটরি জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করছেন এবং ভুয়া তথ্য-উপাত্ত তৈরি করছেন।
গতবছর ইউনেস্কোর আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এআই সংযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। এআই নিয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ থাকলেও কাঠামোবদ্ধ এআই কারিকুলাম ও এথিক্যাল এআই এডুকেশন এখনো সীমিত। দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের জন্য নীতি, তথ্য সুরক্ষা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেছে ইউনেস্কো।
সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এআই ব্যবহার একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে ‘বাংলাদেশ জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা (২০২৬-২০৩০)’-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে এ খসড়া প্রকাশের পর জনমতও নেওয়া হয়। তবে নীতিমালাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
খসড়া নীতিমালায় এআই ব্যবহারে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের তত্ত্বাবধান, তথ্যের সুরক্ষা এবং অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত মোকাবিলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
খসড়া নীতিমালায় শিক্ষা ও গবেষণাকে এআই ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে এআই শিক্ষা যুক্ত করার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এআই বিষয়ে মানসম্মত পাঠ্যক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে জেনারেটিভ এআইয়ের অপব্যবহার, একাডেমিক জালিয়াতি ও অতিরিক্ত নির্ভরতা ঠেকাতে একাডেমিক সততা কাঠামো আধুনিক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এ বিষয়ে বলেন, এআই আমাদের জন্য অপরিহার্য। আমরা এটাকে সুযোগ হিসেবে দেখতে চাই। সামনে জাতীয় পর্যায়ে এআই পলিসি ইন্ট্রোডিউস করা হবে। এর পজিটিভিটির ওপর ভিত্তি করে আমরা গভর্মেন্টের সার্ভিস কিভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, আরও জনমুখী করা যায়, আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায় সেগুলো নিয়ে কাজ করছি।
.png)




-178766-256x144.webp)

