মেস ম্যানেজারের ভাত খাওয়ায় পিটিয়ে ছাদ থেকে ফেলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে হত্যা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
খুলনা

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১: ৪৫
খুলনা নগরীতে মারধরের পর ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ায় নিহত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আজমুল হোসেন। স্ট্রিম গ্রাফিক্স
খুলনা নগরীতে মারধরের পর ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ায় নিহত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আজমুল হোসেন। স্ট্রিম গ্রাফিক্স

খুলনা নগরীতে একটি ছাত্রমেসের ম্যানেজারের খাবার চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মারধরের পর ছাদ থেকে ফেলে আজমুল হোসেন (২১) নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে নগরীর ইসলাম নগর রোডের একটি চারতলা মেসে এ ঘটনা ঘটে। পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। এতে গত দুই মাসে খুলনা নগরীতে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠল।

নিহত আজমুল হোসেন (২১) খুলনা নগরীর বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন। সেই সুবাদে প্রায় এক বছর আগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনের ওই মেসের চারতলার ডি-৮ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন তিনি। আজমুল চুয়াডাঙ্গার দর্শনার বড় শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিন ও আসমা বেগমের ছেলে। দুই ছেলের মধ্যে তিনি বড়।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পড়ালেখার জন্য এক বছর আগে খুলনায় আসেন আজমুল। গত বছর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। ১০ দিন আগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে বাড়ি ফিরে যান। গতকাল শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে খুলনায় আসে।

স্থানীয়রা জানান, ইসলাম নগর রোডের ওই চারতলা ভবন পুরোটা ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্র থাকেন। প্রায় এক বছর আগে চারতলায় আটটি কক্ষের মধ্যে ডি-৮ নম্বর কক্ষটি ভাড়া নেন আজমুল। এর পাশের ডি-২ কক্ষে থাকেন গোপালগঞ্জ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ও মেসের ম্যানেজার মেহেদী।

মেস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার রাতে ছাত্রমেসের ম্যানেজার মেহেদীর ভাত খেয়ে ফেলেন আজমুল। এতে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে তাকে ছাদে নিয়ে মারধর করেন মেহেদীসহ মেসের ও বহিরাগত কয়েকজন। পরে ছাদ থেকে কিছু একটা নিচে পড়ার শব্দ শুনে গিয়ে গলিতে আজমুলকে পড়ে থাকতে দেখেন আশপাশের বাসিন্দারা।

এদিকে আজমুলকে উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান মেসের ছাত্ররাই। তবে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করলে জরুরি বিভাগের সামনে থেকে তারা দ্রুত চলে যান বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক জানান, আজমুলের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার দুই পাও ভাঙা ছিল।

মেসের বুয়া ফাতেমা বললেন, শুক্রবার রাতে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মেসের ছাত্র ও বহিরাগতরা আজমুল মারধর করেন। তিনি নিষেধ করলেও তারা শোনেননি। পরে তিনি জানতে পারেন, আজমুল মারা গেছেন।

মেসের পেছনের ভবনের বাসিন্দা এক নারী জানান, শুক্রবার রাত ১টার দিকে তিনি জোরে একটি শব্দ শুনতে পান। এ সময় বাড়ির সামনের গলিতে একটি ছেলেকে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে মেসের ছাত্ররা অ্যাম্বুলেন্স এনে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।

আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘রাত ৯টার দিকে ফোনে সে বলেছিল, আমি ভালো আছি, আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। কিন্তু রাত ১২টার পরে আমার ছেলের মোবাইল ফোন দিয়ে অন্য একটি ছেলে ফোন দিয়ে বলে, আপনার ছেলে ঝামেলা করেছে। তাকে পেতে হলে দ্রুত ১ লাখ টাকা নিয়ে আসেন। টাকা না আনলে আপনার ছেলেকে পাবেন না। আমি বলি, আমরা গরিব মানুষ, এক লাখ টাকা কোথায় পাব? আমি কৃষিকাজ করি। তখন সেই ছেলে আবার বলে, আপনি দ্রুত চলে আসেন। তারপর সকালে এসে দেখি, আমার ছেলে আর বেঁচে নেই।’

কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘আমি কার কাছে এ বিচার দিব? আমি কারো কাছে বিচার দিব না। আমরা গরিব মানুষ। বাড়ি অনেক দূরে। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।’

নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর আজমুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছে কর্তৃপক্ষ। তাদের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. সালাউদ্দিন জানান, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে ঘটেছে, তাই সেখানে সরাসরি আমাদের কোনো এখতিয়ার নেই। তবে আমরা ঘটনাটি জানার পর থেকে পুলিশ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছি।

হরিণটানা থানায় ওসি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, আজমুলের মৃত্যুর ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশ। তার বাবা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইনগতভাবে যা যা করা যায়, আমরা তাই করব।

এর আগে চলতি বছরে ১৭ আগস্ট শিশু অপহরণকারী সন্দেহে মো. রাজু (২৬) নামে একজন পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরে ৫ সেপ্টেম্বর রাতে নগরীর কুয়েট রোডে চুরির অভিযোগে সাজমীর (২৪) নামে আরেকজনের সঙ্গে একই ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গতকাল রাতে একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আজমুল নিহত হন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত