অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে আমরা বেদনাবিদ্ধ, উদ্বিগ্ন

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ৫৪
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের ছেলে ইশায়েক শাহরিয়ার অপ্রতিমের নাম এখন সবার জানা। ১৩ বছরের মিষ্টিমুখ এ বাচ্চাটিকে নৃশংসভাবে খুন করে জঙ্গলে ফেলে রাখার খবর ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বাইরেও। আমরা এই ঘটনায় বেদনাবিদ্ধ, উদ্বিগ্ন।

মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে বেরিয়ে অপ্রতিম আর ঘরে ফিরতে পারেনি। দামি ফোন ছিনিয়ে নিতে গিয়ে এক কিংবা একাধিক ব্যক্তি তাকে হত্যা করেছে বলে প্রাথমিক ধারণা। সিসিটিভিতে এক তরুণের সঙ্গে তাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেলেও এখনো অস্পষ্ট, কারা ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। নাগরিক সমাজে আলোড়ন তোলা এমন ঘটনায় পুলিশ স্বভাবতই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

ঘটনাটি নিছক আইফোন কেড়ে নেওয়া সম্পর্কিত কিনা, সেই প্রশ্নও উঠবে। মাদক সেবনকারী অপরাধীরা অবশ্য এর চাইতে কম আকর্ষণীয় কারণেও নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাতে দ্বিধা করে না। তথ্যপ্রযুক্তি দ্রুত সহজলভ্য হওয়ার সময়টায় উঠতি বয়সীরা না বুঝেও এমন অনেক কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে যায়, যেখানে তারা হয় ঘৃণ্য অপরাধীদের শিকার। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে আগাম মন্তব্যের সুযোগ নেই। কোনো পক্ষ থেকেই যেন সেটি করা না হয়। তার বদলে ভয়াবহভাবে সন্তান হারানো মা-বাবার পাশে সহমর্মিতা নিয়ে দাঁড়ানোটাই এ মুহূর্তে জরুরি। আর সম্মিলিতভাবে এই দাবি জানাতে হবে যে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত খুঁজে বের করা হোক।

দ্রুত বিচার করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হলেও শিশুটির মা-বাবা, স্বজন এবং বন্ধুদের মনের ক্ষত সহজে দূর হবে না। অপ্রতিমের হাজারো স্মৃতি এবং তাকে অকল্পনীয়ভাবে হারানোর ঘটনা তাদের তাড়া করে ফিরবে। তা সত্ত্বেও এসব ঘটনায় অপরাধী চিহ্নিতকরণ, কারণ নির্ণয় এবং তাদের যথাযথ শাস্তি চাই এ কারণে যে, এ ধরনের অপরাধ আমরা কমিয়ে আনতে চাই। কোনো সমাজকেই পুরোপুরি অপরাধমুক্ত করা সম্ভব নয়। তবে কিছু অপরাধের ঘটনা মনকে এত পীড়িত করে যে, আমরা কিছুতেই আর শান্তি খুঁজে পাই না। পরিণতিতে ওইসব ঘটনা আমাদের হৃদয়কে রক্তাক্ত করতে থাকে।

শিশু-কিশোরদের ওপর লোমহর্ষক অপরাধ হালে বেড়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। প্রতিদিন না হলেও দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিকারহীনভাবেই যেন এসব ঘটে চলেছে। সমাজে বেড়ে চলা অস্থিরতার এক ধরনের প্রকাশ এসব ঘটনায় রয়েছে বললে ‘সরলীকরণ’ হয় কিনা, সেটা অপরাধবিজ্ঞানীরা বলতে পারবেন। তবে সাদা চোখে আমরা দেখছি, শিশু-কিশোরদের ওপর অপরাধসহ সামাজিক অপরাধ দ্রুত বাড়ছে। রাষ্ট্র তাদের রক্ষায় অসহায় হয়ে পড়ছে কিনা, এমন প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।

গণঅভ্যুত্থানে ভেঙে পড়া পুলিশ যে গুছিয়ে তার কার্যক্রমে ফিরতে পারেনি, সেটা সবারই জানা। তবে দুই বছর চলে গেলেও এবং নির্বাচিত সরকার কাজ শুরু করলেও সেটি হয়নি কেন, এর সদুত্তর নেই। র‌্যাবের জায়গায় আরেকটি এলিট ফোর্সকে সক্রিয় করে তোলার দায়িত্বও সরকারের সামনে রয়েছে। শিশু-কিশোরদের ওপর চলমান নৃশংসতার মতো বিশেষ ধারার অপরাধ দমনে তাদেরকে দ্রুত নিয়োজিত করা যায় কিনা, সেটাও ভেবে দেখা জরুরি।

অপ্রতিম কিংবা তার মতো আরও যাদেরকে মর্মান্তিকভাবে হারিয়েছি, তারা আমাদের স্মৃতির মধ্যে থেকে যাবে এবং এই শপথ আমরা নেব যে, পরিবার থেকে নিয়ে সম্ভাব্য সবখানে তাদেরকে পরম যত্নে রক্ষার কাজে আমরা আরও বেশি মনোনিবেশ করব।

পরিবারের বাইরে বেড়ে ওঠা ছিন্নমূল শিশু-কিশোরও কম নেই। তারাও অনেক সময় হয় ভয়াবহ অপরাধের শিকার। মাদকের বিস্তারসহ নানা কারণে বিকারগ্রস্ত অপরাধীও অনেক বেড়ে গেছে, যাদের ওপর নজরদারি কম। এখন সরকারকে সর্বান্তকরণে সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে আইনশৃঙ্খলায় উন্নতি ঘটানোর অংশ হিসেবে শিশু-কিশোরদের ওপর সংঘটিত অপরাধ কমিয়ে আনতে হবে। বিশেষ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এলে সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলায় উন্নতি নিশ্চিত করাটাও সহজতর হওয়ার কথা।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত