জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ভালো রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা সংসদ থেকে শুরু করতে চাই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬, ২৩: ০৫
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত

বিগত সরকারের আমলের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অধ্যায় পেছনে ফেলে দেশে একটি সুস্থ ও উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা জাতীয় সংসদ থেকেই শুরু করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো নতুন সংসদে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে। তবে দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে রাতারাতি আন্তর্জাতিক মানের মানবাধিকার নিশ্চিত করা বা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সম্ভব নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক ও পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও গণ মামলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

আজ বুধবার (১১ মার্চ) রাজধানীর বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘নাগরিক প্ল্যাটফর্ম-রিফর্ম ওয়াচ’ আয়োজিত ‘মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫: নতুন সংসদের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব বিষয় তুলে ধরেন।

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে এই সংলাপে অংশ নেন ব্যারিস্টার এ. এম. মাহবুব উদ্দিন খোকন এমপি, অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান এমপি, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এমপি, অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান এমপি, অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, ব্যারিস্টার সারা হোসেন এবং নারীনেত্রী খুশী কবির প্রমুখ।

দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ভালো প্র্যাকটিসগুলো চর্চা করার মাধ্যমে অতীতের খারাপ সংস্কৃতি দূর করে একটি উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি সৃজন ও লালন করতে চায় সরকার। আর এই চর্চাটি নতুন জাতীয় সংসদ থেকেই শুরু করার প্রত্যাশা করছি।’

অতীত শাসনামলে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর মাধ্যমে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট রেজিমে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই অভিজ্ঞতার আলোকেই সরকার সংবিধানে উল্লিখিত মৌলিক মানবাধিকার সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নির্বাচনী ইশতেহার ও দলের ৩১ দফার আলোকে ভবিষ্যতে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে।’

মানবাধিকার বাস্তবায়নে বাস্তবতার দিকটি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার মান ও সূচককে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্য থাকলেও তা ধাপে ধাপে অর্জন করতে হবে। দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আচার-ঐতিহ্যের কারণে অনেক বিষয় রাতারাতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।’

উদাহরণ হিসেবে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে জানান, রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে কখনো কখনো প্রতিরক্ষা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়, যা মানবাধিকার প্রশ্নে জটিলতা তৈরি করতে পারে।

গুমসংক্রান্ত আইনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশে গুমের সংস্কৃতি কেউ চায় না। তবে এ সংক্রান্ত আইনে “সুপিরিয়র লায়াবিলিটি” নির্ধারণের ক্ষেত্রে কারা অন্তর্ভুক্ত হবেন, সে বিষয়ে আরও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পাসের বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংসদ অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যে এসব অধ্যাদেশ পাস, সংশোধন বা বাতিল করতে হবে। তবে সাপ্তাহিক ও জাতীয় ছুটির কারণে এই সময়সীমার মধ্যে সবগুলো অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা করা কঠিন হতে পারে। সেক্ষেত্রে কিছু অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ল্যাপস হয়ে গেলেও পরবর্তী অধিবেশনে সেগুলো বিল আকারে আনা হবে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের ধ্যান-ধারণায় জারি করা অধ্যাদেশগুলোর অধিকাংশই হুবহু গ্রহণ করা হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা ও সংশোধনীর প্রয়োজন রয়েছে।’

অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটি সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যেই বিবেচনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। শ্রম আইন সম্পর্কিত অপর এক অধ্যাদেশ নিয়ে তিনি জানান, এ বিষয়ে সরকারের কোনো সংরক্ষণ নেই, তবে সার্বভৌম সংসদে আলোচনার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।

‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং জুলাই যোদ্ধাদের’ দেওয়া ইনডেমনিটি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, ‘এই ইনডেমনিটি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সমর্থন করা হয়েছে এবং এটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ।’

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, ‘সংঘাত বা যুদ্ধের ময়দানে বিরোধীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে “এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার” নীতিটি বিবেচনায় নিয়েই ইনডেমনিটি সমর্থন করা হয়েছে।’

তবে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি সুস্পষ্টভাবে জানান, এই ইনডেমনিটি কেবল ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রযোজ্য। ৬ আগস্ট থেকে সংঘটিত কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন বা অপরাধ এই ইনডেমনিটির আওতায় পড়বে না।

সংবিধান সংস্কার, উচ্চকক্ষ গঠন এবং সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে চলমান বিতর্কের বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের ক্ষেত্রে অর্থবিল, আস্থাভোট, সংবিধান সংশোধনী এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি এই চারটি বিষয় ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত দেওয়ার পক্ষে তাদের অবস্থানের কথা জানান তিনি।

সংসদের ১০০ আসনের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে তারা সংসদের আসনের অনুপাতে আসন বণ্টন এবং উচ্চকক্ষকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতার বাইরে রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।

এছাড়া, জোরপূর্বক শপথ নেওয়াকে জবরদস্তিমূলক আখ্যা দিয়ে তিনি গণতান্ত্রিক চর্চাকে সংসদের ভেতরে তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন।

দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন বা জাতীয় পুনর্মিলনের অপরিহার্যতা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে লক্ষ লক্ষ মামলাবাজির মধ্য দিয়ে কোনো শান্তি স্থাপন করা যাবে না।’

দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ কমিশনের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে একটি রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের অঙ্গীকার তাদের ৩১ দফার মধ্যেই ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। পুরো সত্য উদ্ঘাটন সবসময় সম্ভব না হলেও আংশিক সত্য প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা জাতীয় ঐক্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ জাতি এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছাড়া কোনো খাতেই দেশের প্রগতি বা অগ্রগতি সম্ভব নয়।’

সম্পর্কিত