জুলাইয়ের প্রথম নারী শহীদ নাঈমা, বিচারের অপেক্ষায় পরিবার

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

নাঈমা সুলতানা। স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছে শিক্ষার্থীরা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ শহীদ হন আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী। তবু ঘরে আটকে রাখা যাচ্ছে না কাউকে। যাদেরকে আটকে রাখা গেছে, তাঁরা সক্রিয় হন অনলাইনে। যে যেভাবে পারছে, আন্দোলেনে সক্রিয় হচ্ছে। তেমনই একজন নাঈমা সুলতানা। তখন, ২০২৪ সালে তিনি উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১০ম শ্রেণিতে পড়তেন।

নাঈমার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুর দিকেই আন্দোলনে যুক্ত হন নাঈমা সুলতানা। তবে আবু সাঈদের মৃত্যুর পর তাঁকে আর বের হতে দেয়নি পরিবার। তখন অনলাইনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। নিজের আঁকা ছবি, প্রতিবাদী পোস্টার শেয়ার করা শুরু করেন ফেসবুকে। তবে ঘরে আটকে রেখেও তাঁকে বাঁচাতে পারেনি পরিবার। নিজের বাসার বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তিনি জুলাই আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ। তবে হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পার হয়ে গেলেও এখনও বিচার পায়নি পরিবার। এখনও বিচারের অপেক্ষায় আছেন বাবা-মা।

নিজের আঁকা ছবি, প্রতিবাদী পোস্টার নাঈমা শেয়ার করেন ফেসবুকে। সংগৃহীত ছবি
নিজের আঁকা ছবি, প্রতিবাদী পোস্টার নাঈমা শেয়ার করেন ফেসবুকে। সংগৃহীত ছবি

রাজধানীর উত্তরায় ৯ নম্বর সেক্টরে থাকে নাঈমার পরিবার। চারতলার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, নাঈমা নেই- শুধু তাঁর স্মৃতি রয়ে গেছে ঘরজুড়ে। নাঈমার ছবি, তাঁর আঁকা চিত্রশিল্প, রঙতুলি, জামা-কাপড়। এসব স্মৃতির মাঝেই বেঁচে আছে তাঁর পরিবার।

পরিবার জানায়, নাঈমার বাবা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। বাবার পেশা ও ছিন্নমূল মানুষের কষ্ট দেখে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন নাঈমা। স্বপ্ন বাস্তবায়নে সারথি হয়ে পাশে দাঁড়ায় পরিবার। চাঁদপুর থেকে ঢাকা এসে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে মেয়েকে ভর্তি করান। তবে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার আগেই থেমে যায় নাঈমার জীবন।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আবু সাঈদ। এতে ভীষণ কষ্ট পান নাঈমা। ওইদিন নিজের ফেসবুকে ‘আন্দোলন হবে এবার রং তুলিতে। কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক’ ক্যাপশনে শেকল ভাঙার একটি ছবি পোস্ট দেয় সে। নিজের আঁকা প্রতিবাদী পোস্টারের ভাষা, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’, ‘তোমরা কে, রাজাকার’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’।

সহপাঠীদের সঙ্গে নাঈমা সুলতানা। সংগৃহীত ছবি
সহপাঠীদের সঙ্গে নাঈমা সুলতানা। সংগৃহীত ছবি

নাঈমার মা আইনুন নাহার স্ট্রিমকে বলেন, ‘কোনোভাবেই আটকানো যাচ্ছিল না মেয়েকে। যেকোনো মূল্যে সে যোগ দেবে আন্দোলনে। কিন্তু কি হলো? ঘরে আটকে রেখেও মেয়েকে বাঁচাতে পারিনি। নাঈমা সব সময় আন্দোলনে যাওয়ার কথা বলত। আবু সাঈদের কথা বলত। আর বলত আমি যদি আন্দোলনে মারা যাই, তাহলে দুঃখ কর না। শুধু বলবা, আলহামদুলিল্লাহ। আমার মেয়ে শহীদ হয়েছে।’

আইনুন নাহার বলেন, ‘১৯ জুলাই সারা দিন নাঈমা আমার সঙ্গে বাসায় ছিল। বিকেলের দিকে বারান্দা থেকে কাপড় আনতে যায়। তখন বাসার নিচে আন্দোলন চলছিল। গোলাগুলি হচ্ছিল। ওর পেছন পেছন আমিও বারান্দায় যাই। হঠাৎ দেখলাম বারান্দার রশি থেকে কাপড় নামানোর সময় জানালার গ্রিল ধরে ঢলে পড়ছে।’

নাঈমা সুলতানার মা আইনুন নাহার। সংগৃহীত ছবি
নাঈমা সুলতানার মা আইনুন নাহার। সংগৃহীত ছবি

নাঈমার মা বলেন, ‘নাঈমাকে ধরতে গিয়ে দেখি গুলি লেগে মগজ ছিটকে পড়েছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে, ভেসে যাচ্ছে বারান্দা। আমি কিন্তু গুলির শব্দ পাইনি। গুলিটা এত গভীরে, মনে হয়েছে স্নাইপারের।’

কাঁদতে কাঁদতে আইনুন নাহার বলেন, ‘আমার মেয়েটা ডাক্তার হতে চাইত। বলত, বড় ডাক্তার হয়ে ফ্রিতে গরিব মানুষের চিকিৎসা করব। আমার মেয়েটা মরে গেল, এখন বিচারটা দেখে আমি মরতে চাই।’

আইনুন নাহার বলেন, ‘নাঈমাকে যারা গুলি করেছে, আমার কাছে তাঁদের ভিডিও ফুটেজ আছে। সেই ফুটেজ দেখে ১০ থেকে ১২ জনকে শনাক্ত করতে পেরেছি। তাঁদের আসামি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছি। মামলার চার্জশিট গঠন করা হলেও এখনও বিচার শেষ হয়নি। আমার আর কোনো চাওয়া নেই। মেয়ে হত্যার বিচার দেখে মরতে চাই।’

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত