স্ট্রিম ডেস্ক

দেশের ছাত্ররাজনীতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির—দুটি বহুল আলোচিত সংগঠন। কখনো তারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে পাশাপাশি অবস্থান নিয়েছে, কখনো একই রাজনৈতিক জোটের অংশ হয়েছে, আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। ফলে তাদের সম্পর্ককে এক কথায় বন্ধুত্ব বা শত্রুতা—কোনোটিই বলা যায় না। গত প্রায় পাঁচ দশকের ইতিহাস বলছে, এই সম্পর্ক কখনো সহযোগিতার, কখনো প্রতিযোগিতার, আবার কখনো প্রকাশ্য সংঘাতের।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গসংগঠন হিসেবে পরিচিত এই ছাত্রসংগঠনের লক্ষ্য ছিল ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করা। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিবির সদস্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ এবং শৃঙ্খলাভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি ক্যাম্পাসে তাদের শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয়।
অন্যদিকে ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বিএনপির ছাত্রসংগঠন হিসেবে জন্ম নেওয়া ছাত্রদলের মূল আদর্শ ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। রাজনৈতিকভাবে এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে ওঠে।
শুরু থেকেই দুই সংগঠনের আদর্শগত পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। তবে সেই পার্থক্য শুরুর দিকে প্রকাশ্য বৈরিতায় রূপ নেয়নি। কারণ আশির দশকের শুরুতে দুই সংগঠনের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করা। একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার চেয়ে তারা তখন বেশি ব্যস্ত ছিল নিজ নিজ অবস্থান সুসংহত করতে।
১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন যত জোরালো হতে থাকে, ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকাও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সময় থেকেই ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে প্রথম বড় ধরনের রাজনৈতিক নৈকট্য তৈরি হয়।
২০১৯ সালে নিউ এজ পত্রিকায় প্রকাশিত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের নিবন্ধ থেকে জানা যায়, আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির নেতৃত্বে ৭-দলীয় জোট গঠিত হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামী সেই জোট যোগ দেয়নি। তারা পৃথকভাবে এরশাদবিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করেছে। তবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিএনপির সঙ্গে সমন্বয় করত জামায়াতে ইসলামী। ফলে সেই আন্দোলনে ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের যৌথ প্ল্যাটফর্ম ছিল না। এমনকি ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে গঠিত ২২-দলীয় সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যেও ছাত্রশিবির অংশ নেয়নি। সেখানে ছাত্রদল অংশ নিয়েছিল।

১৯৯১: জাতীয় রাজনীতি বদলাল, সম্পর্কও বদলাতে শুরু করল
১৯৯১ সাল ছিল ছাত্রদল-শিবির সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সে বছর বিএনপি সরকার গঠন করলেও জামায়াতে ইসলামী সরকারে অংশ নেয়নি। তবে সংসদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তারা বিএনপিকে সমর্থন দেয়। জাতীয় রাজনীতির এই নৈকট্যের প্রভাব ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতিতেও পড়তে শুরু করে। ফলে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত বিএনপির মেয়াদে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির বড় ধরনের সংঘাতে জড়ায়নি। তবে মাঝে মাঝে বিভিন্ন ইস্যুতে দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা দেখা গেছে।
১৯৯৭ সালের মার্চে ঢাকা কুরিয়ারে প্রকাশিত নিবন্ধে লেখক আফসান চৌধুরী লিখেছেন, ছাত্রদল তখন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছিল। আর শিবির ব্যস্ত ছিল নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার কাজে। তবে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ও বাম ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে কৌশলগতভাবে একই অবস্থানে থেকেছে ছাত্রদল ও শিবির। আবার নেতৃত্ব, হল নিয়ন্ত্রণ, ছাত্রসংসদ নির্বাচন ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে কখনো কখনো নিজেদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব জড়িয়েছে এই দুই ছাত্র সংগঠন।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। এই জোটের অন্যতম শরিক ছিল জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় রাজনীতিতে এটিই ছিল বিএনপি ও জামায়াতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সময়। এর প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রসংগঠনেও পড়ে।
বিভিন্ন জেলায় সরকারপক্ষের রাজনৈতিক কর্মসূচি, সমাবেশ কিংবা সরকারবিরোধী কর্মসূচি মোকাবিলায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরকে প্রায়ই একই বলয়ে দেখা যেত। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই সংগঠনের স্থানীয় নেতারাও নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতেন। তবে জাতীয় রাজনীতিতে তারা মিত্র হলেও ছাত্রসংগঠন হিসেবে দুটিই নিজেদের স্বাধীন সংগঠন। ফলে একই ক্যাম্পাসে কে বেশি শক্তিশালী, কে বেশি সদস্য সংগ্রহ করবে, কোন হলে কার প্রভাব থাকবে—এসব প্রশ্নে প্রতিযোগিতা থেকেই যায়।
দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০১ সালে বিএনপি–জামায়াত জোট সরকার গঠনের পর ধারণা করা হয়েছিল যে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির যৌথভাবে প্রভাব বিস্তার করবে। বাস্তবে কিছু ক্যাম্পাসে তারা সমন্বয় করলেও, বিশেষ করে যেখানে ছাত্রশিবির আগে থেকেই শক্তিশালী ছিল, সেখানে আধিপত্য, হল নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার, ভর্তি-বাণিজ্য ও সাংগঠনিক প্রভাব নিয়ে দুই সংগঠনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল।
একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে জিততে জোট করলেও একটি ছাত্রসংগঠনকে প্রতিদিন ক্যাম্পাসে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। নতুন শিক্ষার্থীকে সংগঠনে আনা, আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ, কমিটি গঠন, মিছিল-মিটিংয়ের নেতৃত্ব—এসবই ছাত্রসংগঠনের শক্তির মাপকাঠি। ফলে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই সংগঠনই শক্তিশালী ছিল, সেখানে প্রতিযোগিতা অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এই সময় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। ওই সময়ের সংবাদপত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পরও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সম্পর্ক শান্ত ছিল না। ২০০৩ সালের শেষ দিক থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত এ দুটি সংগঠন বেশ কয়েকবার সংঘর্ষে জড়িয়েছিল।

২০০৪ সালের জানুয়ারিতে দুই সংগঠনের মধ্যে দিনব্যাপী সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে অন্তত ৫০ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এরপর একই বছরের মার্চে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাজনৈতিক মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা দিলেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির উভয়েই সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কর্মসূচি পালন করে।
অক্টোবরে আবারও বড় সংঘর্ষ হয়। এতে প্রায় ২০০ জন আহত হন, শিক্ষক ও সাংবাদিকও হামলার শিকার হন। ঘটনার পর বহু শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হন এবং বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ সময় অচল হয়ে পড়ে।
২০০৩ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের এক নেতা ছাত্রশিবিরের এক কর্মীকে চড় মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি অবস্থান নেয় উভয় পক্ষ।
এ ছাড়াও ২০০৪ সালে ছাত্রসংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের জেরে ছাত্রশিবির অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডাকে এবং কলেজ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ওই সময়ে এক সম্পাদকীয়তে দ্য ডেইলি স্টার লিখেছিল, ক্ষমতাসীন জোটের দুই ছাত্রসংগঠনের সংঘর্ষই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র এক ছিল না। কোথাও দুই সংগঠন সমঝোতার মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়েছে, আবার কোথাও সংঘর্ষ হয়েছে।
২০০৩ সালে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতাদের বৈঠকে বসতে হয়। কারণ দুই সংগঠনের মধ্যে ধারাবাহিক সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটছিল। যেমন, ২০০১ সালের ডিসেম্বর থেকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষে উভয় সংগঠনের অন্তত দুই কর্মী (প্রতিটি সংগঠনের একজন করে) নিহত হন। আহত হন প্রায় ২০০ জন। এছাড়া ২০০৩ সালের অক্টোবরে কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদল–ছাত্রশিবিরের বন্দুকযুদ্ধে ছাত্রশিবিরের এক কর্মী নিহত হন এবং বহু জন আহত হন
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০০৩ সালের ২৬ অক্টোবর ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতারা ঢাকায় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল দুই সংগঠনের মধ্যে চলমান সংঘর্ষ বন্ধ করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শান্তি ফিরিয়ে আনা। বৈঠকে দুই সংগঠনের নেতারা ‘আর সংঘর্ষে জড়াবেন না’ বলে সমঝোতায় পৌঁছান। তবে ডেইলি স্টারের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সমঝোতা কার্যকর হয়নি। পরের সপ্তাহেই ঢাকা, রংপুর ও খুলনায় তিনটি সংঘর্ষে ৭০ জনের বেশি আহত হন।
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো ছাত্ররাজনীতিও বড় ধাক্কা খায়। দুই সংগঠনই সাংগঠনিকভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম কমে আসে। ফলে ছাত্রদল-শিবির সম্পর্কও এক ধরনের স্থবিরতার মধ্যে চলে যায়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০০৮ বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনৈতিক মিছিল, সমাবেশ ও দলীয় কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মতো জামায়াতও সাংগঠনিকভাবে চাপে পড়ে। ফলে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির—উভয় সংগঠনের প্রকাশ্য কার্যক্রমও অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়।
এই স্থবিরতা অবশ্য বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির সমীকরণ আবার বদলে যায়। বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলই বিরোধী অবস্থানে চলে যায়। ফলে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সম্পর্কও নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলই বিরোধী অবস্থানে চলে যায়। এর ফলে জাতীয় রাজনীতিতে আবারও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরকে অনেক ইস্যুতে একই পাশে দেখা যেতে থাকে। সরকারবিরোধী কর্মসূচি, হরতাল, অবরোধ কিংবা বিভিন্ন আন্দোলনে দুই সংগঠনের অবস্থান অনেক সময় এক ছিল।

এই সময় জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার, একের পর এক শীর্ষ নেতার বিচার ও দণ্ড, পরে দলটির নিবন্ধন বাতিলের মতো ঘটনাগুলো জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক বাস্তবতাকে বদলে দেয়। অনেক ক্যাম্পাসে শিবির প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম কমিয়ে দেয়, আবার কোথাও কৌশল পরিবর্তন করে।
অন্যদিকে ছাত্রদলও সহজ সময় পার করেনি। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে সংগঠনের ভেতরে নেতৃত্বের সংকট, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে দুই সংগঠনই একই সরকারের বিরোধিতা করলেও তাদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এক ছিল না।
স্কলার্স অ্যাট রিস্ক নেটওয়ার্কের গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের পর ছাত্রলীগ কার্যত অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংগঠনিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির—উভয় সংগঠনই বহু ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক নিষেধাজ্ঞা, গ্রেপ্তার, হামলা বা ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধার মুখে পড়ে। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ছাত্রলীগ, একে অপর নয়।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতির পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিরও একটি বড় মোড়। সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন বিভিন্ন মাত্রায় অংশ নেয়। সরকার পরিবর্তনের পর দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধরে একক প্রভাবের অভিযোগে থাকা ছাত্রলীগের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়লে ক্যাম্পাসে নতুন করে সাংগঠনিক জায়গা তৈরির সুযোগ তৈরি হয়। এই নতুন বাস্তবতায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির—দুই সংগঠনই দ্রুত নিজেদের বিস্তারে মনোযোগ দেয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর কিছু ইস্যুতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সমন্বয় দেখা গেলেও খুব দ্রুতই তারা ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হল কমিটি, নতুন শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো, সাংগঠনিক কর্মসূচি ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই সংগঠনের মধ্যে টানাপোড়েনের খবর প্রকাশ হতে থাকে।
সম্প্রতি রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।
দেশের ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সম্পর্ক কখনোই পুরোপুরি বন্ধুত্বের ছিল না, আবার সব সময় শত্রুতারও ছিল না। সময়, রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং ক্যাম্পাসের বাস্তবতা—এই তিনটি বিষয়ই তাদের সম্পর্কের চরিত্র নির্ধারণ করেছে। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে কৌশলগত সহযোগী হলেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তারা বরাবরই সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বী।

দেশের ছাত্ররাজনীতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির—দুটি বহুল আলোচিত সংগঠন। কখনো তারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে পাশাপাশি অবস্থান নিয়েছে, কখনো একই রাজনৈতিক জোটের অংশ হয়েছে, আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। ফলে তাদের সম্পর্ককে এক কথায় বন্ধুত্ব বা শত্রুতা—কোনোটিই বলা যায় না। গত প্রায় পাঁচ দশকের ইতিহাস বলছে, এই সম্পর্ক কখনো সহযোগিতার, কখনো প্রতিযোগিতার, আবার কখনো প্রকাশ্য সংঘাতের।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গসংগঠন হিসেবে পরিচিত এই ছাত্রসংগঠনের লক্ষ্য ছিল ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করা। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিবির সদস্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ এবং শৃঙ্খলাভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি ক্যাম্পাসে তাদের শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয়।
অন্যদিকে ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বিএনপির ছাত্রসংগঠন হিসেবে জন্ম নেওয়া ছাত্রদলের মূল আদর্শ ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। রাজনৈতিকভাবে এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে ওঠে।
শুরু থেকেই দুই সংগঠনের আদর্শগত পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। তবে সেই পার্থক্য শুরুর দিকে প্রকাশ্য বৈরিতায় রূপ নেয়নি। কারণ আশির দশকের শুরুতে দুই সংগঠনের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করা। একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার চেয়ে তারা তখন বেশি ব্যস্ত ছিল নিজ নিজ অবস্থান সুসংহত করতে।
১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন যত জোরালো হতে থাকে, ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকাও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সময় থেকেই ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে প্রথম বড় ধরনের রাজনৈতিক নৈকট্য তৈরি হয়।
২০১৯ সালে নিউ এজ পত্রিকায় প্রকাশিত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের নিবন্ধ থেকে জানা যায়, আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির নেতৃত্বে ৭-দলীয় জোট গঠিত হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামী সেই জোট যোগ দেয়নি। তারা পৃথকভাবে এরশাদবিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করেছে। তবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিএনপির সঙ্গে সমন্বয় করত জামায়াতে ইসলামী। ফলে সেই আন্দোলনে ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের যৌথ প্ল্যাটফর্ম ছিল না। এমনকি ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে গঠিত ২২-দলীয় সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যেও ছাত্রশিবির অংশ নেয়নি। সেখানে ছাত্রদল অংশ নিয়েছিল।

১৯৯১: জাতীয় রাজনীতি বদলাল, সম্পর্কও বদলাতে শুরু করল
১৯৯১ সাল ছিল ছাত্রদল-শিবির সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সে বছর বিএনপি সরকার গঠন করলেও জামায়াতে ইসলামী সরকারে অংশ নেয়নি। তবে সংসদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তারা বিএনপিকে সমর্থন দেয়। জাতীয় রাজনীতির এই নৈকট্যের প্রভাব ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতিতেও পড়তে শুরু করে। ফলে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত বিএনপির মেয়াদে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির বড় ধরনের সংঘাতে জড়ায়নি। তবে মাঝে মাঝে বিভিন্ন ইস্যুতে দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা দেখা গেছে।
১৯৯৭ সালের মার্চে ঢাকা কুরিয়ারে প্রকাশিত নিবন্ধে লেখক আফসান চৌধুরী লিখেছেন, ছাত্রদল তখন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছিল। আর শিবির ব্যস্ত ছিল নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার কাজে। তবে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ও বাম ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে কৌশলগতভাবে একই অবস্থানে থেকেছে ছাত্রদল ও শিবির। আবার নেতৃত্ব, হল নিয়ন্ত্রণ, ছাত্রসংসদ নির্বাচন ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে কখনো কখনো নিজেদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব জড়িয়েছে এই দুই ছাত্র সংগঠন।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। এই জোটের অন্যতম শরিক ছিল জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় রাজনীতিতে এটিই ছিল বিএনপি ও জামায়াতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সময়। এর প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রসংগঠনেও পড়ে।
বিভিন্ন জেলায় সরকারপক্ষের রাজনৈতিক কর্মসূচি, সমাবেশ কিংবা সরকারবিরোধী কর্মসূচি মোকাবিলায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরকে প্রায়ই একই বলয়ে দেখা যেত। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই সংগঠনের স্থানীয় নেতারাও নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতেন। তবে জাতীয় রাজনীতিতে তারা মিত্র হলেও ছাত্রসংগঠন হিসেবে দুটিই নিজেদের স্বাধীন সংগঠন। ফলে একই ক্যাম্পাসে কে বেশি শক্তিশালী, কে বেশি সদস্য সংগ্রহ করবে, কোন হলে কার প্রভাব থাকবে—এসব প্রশ্নে প্রতিযোগিতা থেকেই যায়।
দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০১ সালে বিএনপি–জামায়াত জোট সরকার গঠনের পর ধারণা করা হয়েছিল যে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির যৌথভাবে প্রভাব বিস্তার করবে। বাস্তবে কিছু ক্যাম্পাসে তারা সমন্বয় করলেও, বিশেষ করে যেখানে ছাত্রশিবির আগে থেকেই শক্তিশালী ছিল, সেখানে আধিপত্য, হল নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার, ভর্তি-বাণিজ্য ও সাংগঠনিক প্রভাব নিয়ে দুই সংগঠনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল।
একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে জিততে জোট করলেও একটি ছাত্রসংগঠনকে প্রতিদিন ক্যাম্পাসে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। নতুন শিক্ষার্থীকে সংগঠনে আনা, আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ, কমিটি গঠন, মিছিল-মিটিংয়ের নেতৃত্ব—এসবই ছাত্রসংগঠনের শক্তির মাপকাঠি। ফলে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই সংগঠনই শক্তিশালী ছিল, সেখানে প্রতিযোগিতা অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এই সময় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। ওই সময়ের সংবাদপত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পরও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সম্পর্ক শান্ত ছিল না। ২০০৩ সালের শেষ দিক থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত এ দুটি সংগঠন বেশ কয়েকবার সংঘর্ষে জড়িয়েছিল।

২০০৪ সালের জানুয়ারিতে দুই সংগঠনের মধ্যে দিনব্যাপী সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে অন্তত ৫০ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এরপর একই বছরের মার্চে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাজনৈতিক মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা দিলেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির উভয়েই সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কর্মসূচি পালন করে।
অক্টোবরে আবারও বড় সংঘর্ষ হয়। এতে প্রায় ২০০ জন আহত হন, শিক্ষক ও সাংবাদিকও হামলার শিকার হন। ঘটনার পর বহু শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হন এবং বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ সময় অচল হয়ে পড়ে।
২০০৩ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের এক নেতা ছাত্রশিবিরের এক কর্মীকে চড় মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি অবস্থান নেয় উভয় পক্ষ।
এ ছাড়াও ২০০৪ সালে ছাত্রসংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের জেরে ছাত্রশিবির অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডাকে এবং কলেজ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ওই সময়ে এক সম্পাদকীয়তে দ্য ডেইলি স্টার লিখেছিল, ক্ষমতাসীন জোটের দুই ছাত্রসংগঠনের সংঘর্ষই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র এক ছিল না। কোথাও দুই সংগঠন সমঝোতার মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়েছে, আবার কোথাও সংঘর্ষ হয়েছে।
২০০৩ সালে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতাদের বৈঠকে বসতে হয়। কারণ দুই সংগঠনের মধ্যে ধারাবাহিক সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটছিল। যেমন, ২০০১ সালের ডিসেম্বর থেকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষে উভয় সংগঠনের অন্তত দুই কর্মী (প্রতিটি সংগঠনের একজন করে) নিহত হন। আহত হন প্রায় ২০০ জন। এছাড়া ২০০৩ সালের অক্টোবরে কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদল–ছাত্রশিবিরের বন্দুকযুদ্ধে ছাত্রশিবিরের এক কর্মী নিহত হন এবং বহু জন আহত হন
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০০৩ সালের ২৬ অক্টোবর ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতারা ঢাকায় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল দুই সংগঠনের মধ্যে চলমান সংঘর্ষ বন্ধ করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শান্তি ফিরিয়ে আনা। বৈঠকে দুই সংগঠনের নেতারা ‘আর সংঘর্ষে জড়াবেন না’ বলে সমঝোতায় পৌঁছান। তবে ডেইলি স্টারের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সমঝোতা কার্যকর হয়নি। পরের সপ্তাহেই ঢাকা, রংপুর ও খুলনায় তিনটি সংঘর্ষে ৭০ জনের বেশি আহত হন।
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো ছাত্ররাজনীতিও বড় ধাক্কা খায়। দুই সংগঠনই সাংগঠনিকভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম কমে আসে। ফলে ছাত্রদল-শিবির সম্পর্কও এক ধরনের স্থবিরতার মধ্যে চলে যায়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০০৮ বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনৈতিক মিছিল, সমাবেশ ও দলীয় কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মতো জামায়াতও সাংগঠনিকভাবে চাপে পড়ে। ফলে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির—উভয় সংগঠনের প্রকাশ্য কার্যক্রমও অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়।
এই স্থবিরতা অবশ্য বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির সমীকরণ আবার বদলে যায়। বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলই বিরোধী অবস্থানে চলে যায়। ফলে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সম্পর্কও নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলই বিরোধী অবস্থানে চলে যায়। এর ফলে জাতীয় রাজনীতিতে আবারও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরকে অনেক ইস্যুতে একই পাশে দেখা যেতে থাকে। সরকারবিরোধী কর্মসূচি, হরতাল, অবরোধ কিংবা বিভিন্ন আন্দোলনে দুই সংগঠনের অবস্থান অনেক সময় এক ছিল।

এই সময় জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার, একের পর এক শীর্ষ নেতার বিচার ও দণ্ড, পরে দলটির নিবন্ধন বাতিলের মতো ঘটনাগুলো জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক বাস্তবতাকে বদলে দেয়। অনেক ক্যাম্পাসে শিবির প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম কমিয়ে দেয়, আবার কোথাও কৌশল পরিবর্তন করে।
অন্যদিকে ছাত্রদলও সহজ সময় পার করেনি। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে সংগঠনের ভেতরে নেতৃত্বের সংকট, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে দুই সংগঠনই একই সরকারের বিরোধিতা করলেও তাদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এক ছিল না।
স্কলার্স অ্যাট রিস্ক নেটওয়ার্কের গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের পর ছাত্রলীগ কার্যত অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংগঠনিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির—উভয় সংগঠনই বহু ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক নিষেধাজ্ঞা, গ্রেপ্তার, হামলা বা ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধার মুখে পড়ে। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ছাত্রলীগ, একে অপর নয়।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতির পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিরও একটি বড় মোড়। সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন বিভিন্ন মাত্রায় অংশ নেয়। সরকার পরিবর্তনের পর দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধরে একক প্রভাবের অভিযোগে থাকা ছাত্রলীগের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়লে ক্যাম্পাসে নতুন করে সাংগঠনিক জায়গা তৈরির সুযোগ তৈরি হয়। এই নতুন বাস্তবতায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির—দুই সংগঠনই দ্রুত নিজেদের বিস্তারে মনোযোগ দেয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর কিছু ইস্যুতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সমন্বয় দেখা গেলেও খুব দ্রুতই তারা ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হল কমিটি, নতুন শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো, সাংগঠনিক কর্মসূচি ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই সংগঠনের মধ্যে টানাপোড়েনের খবর প্রকাশ হতে থাকে।
সম্প্রতি রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।
দেশের ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সম্পর্ক কখনোই পুরোপুরি বন্ধুত্বের ছিল না, আবার সব সময় শত্রুতারও ছিল না। সময়, রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং ক্যাম্পাসের বাস্তবতা—এই তিনটি বিষয়ই তাদের সম্পর্কের চরিত্র নির্ধারণ করেছে। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে কৌশলগত সহযোগী হলেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তারা বরাবরই সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বী।
.png)

কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান একাধিকবার যুদ্ধে জড়িয়েছে। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের রাজনৈতিক সমস্যা এতদিন আড়ালেই ছিল। এখন সেই চিত্র বদলেছে, মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে, যা পাকিস্তান সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
০৪ আগস্ট ২০২৬
বিহারের বাঙ্কিপুর বিধানসভা আসনে ১৯৯৫ সালের পর একবারও হারেনি বিজেপি। তবে ৩০ বছর পর সেই ছন্দে পতন হয়েছে। বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতীন নবীনের ছেড়ে দেওয়া আসনটিতে উপনির্বাচনে হেরে গেছে তারই দলের প্রার্থী নীরাজ কুমার। অথচ কেন্দ্রের পাশাপাশি বিহার রাজ্যসভায়ও ক্ষমতায় বিজেপি।
০৪ আগস্ট ২০২৬
শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা, বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দা, উচ্চ সুদহার, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং রপ্তানির ওপর বাড়তি চাপের মধ্যে দেশের অর্থনীতি কঠিন সময় পার করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ প্রণোদনা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
০৩ আগস্ট ২০২৬
ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদা যখন ১৯৯৪ সালে লিখেছিলেন, ‘বন্ধুরা শোনো, আসলে বন্ধু বলে কিছু নেই’, তখন হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি, তিন দশক পর এই একই প্রশ্ন আমাদের ফোনের স্ক্রিনে, সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডে আর রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে নতুন করে ফিরে আসবে। বন্ধুত্বকে যতই রাজনীতির বাইরের বিষয় ভাবা হোক না কেন, তা কখনো
০২ আগস্ট ২০২৬