সোনাকান্দা জলদুর্গ এখন ময়লার ভাগাড়, অবহেলায় মোগল ঐতিহ্য

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নারায়ণগঞ্জ

সোনাকান্দা দুর্গের দেয়াল ঘেঁসে জমে থাকা ময়লার স্তূপ। সংগৃহীত ছবি
সোনাকান্দা দুর্গের দেয়াল ঘেঁসে জমে থাকা ময়লার স্তূপ। সংগৃহীত ছবি

জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে তৎকালীন মুঘল রাজধানী ঢাকাকে রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা কাঠামো ছিল নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা দুর্গ। প্রায় সাড়ে চার শ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন ময়লা-আবর্জনা, দুর্গন্ধ ও অব্যবস্থাপনার কারণে সংকটের মুখে।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে সোনাকান্দা দুর্গ সপ্তদশ শতকের আগে গড়ে ওঠা তিনটি জলদুর্গ বা ‘ট্রায়াঙ্গেল অব ওয়াটার ফোর্ট’-এর অন্যতম বলে ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেন। তবে বর্তমানে দুর্গের ভেতর ও আশপাশে জমে থাকা বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য এবং অপর্যাপ্ত তদারকির কারণে এর পরিবেশ ও ঐতিহ্যগত মূল্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৬৬০ সালে বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মীর জুমলা জলদস্যুদের লুটতরাজ ঠেকাতে ঢাকার চারপাশে কয়েকটি জলদুর্গ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সোনাকান্দা দুর্গও আনুমানিক ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ সালের মধ্যে নির্মিত হয় বলে ধারণা করা হয়। স্বর্ণময়ী বা সোনা বিবির কিংবদন্তি এবং লালবাগ কেল্লার সঙ্গে কথিত গোপন সুড়ঙ্গের গল্পও স্থানীয় লোককাহিনির অংশ হয়ে আছে বহুদিন ধরে।

সোনাকান্দা দুর্গের একটি ফটক। সংগৃহীত ছবি
সোনাকান্দা দুর্গের একটি ফটক। সংগৃহীত ছবি

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, দুর্গের দেয়াল ঘেঁষে বিভিন্ন স্থানে মায়লা পানি ও ময়লার স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পলিথিন, ফল ও গাছের বর্জ্য, কাঠের টুকরা, সেলুনের ফেলে দেওয়া চুল, প্লাস্টিক, ভাঙা ককশিট, নির্মাণসামগ্রীর ধ্বংসাবশেষ এবং কিছু মেডিকেল বর্জ্যও।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের লোকজন রাস্তার ময়লা পরিষ্কার করলেও দুর্গের পাশে যে ময়লা আবর্জনা থাকে সেগুলো তারা পরিষ্কার করে না।

তারা আরও অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ময়লা ফেলতে ফেলতে দুর্গসংলগ্ন একটি পুকুর প্রায় সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে এবং বর্ষা মৌসুমে বেড়েছে মশার উপদ্রব।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. পাবেল বলেন, অনেক দর্শনার্থী দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসেন। কিন্তু ময়লার দুর্গন্ধের কারণে বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না। আমরা চাই, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি পরিচ্ছন্ন ও সংরক্ষিত থাকুক।

দুর্গের পূর্ব পাশের বাসিন্দা মো. রাসেল বলেন, এই কেল্লার মাঠে এলাকার শিশুরা খেলাধুলা করে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় পরিবেশের অবনতি ঘটছে। সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে এটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে রুহুল আমিন নামে এক বাসিন্দার অভিযোগ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও তদারকির অভাবে রাতের বেলায় দুর্গ এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যায়।

অবহেলায় সোনাকান্দা দুর্গ। সংগৃহীত ছবি
অবহেলায় সোনাকান্দা দুর্গ। সংগৃহীত ছবি

নাতি-নাতনিদের নিয়ে দুর্গে ঘুরতে আসা আলী আজগর বলেন, ‘আগে এখানে অনেক সুন্দর পরিবেশ ছিল। এখন চারপাশে ময়লা আর দুর্গন্ধ। এমন একটি জাতীয় ঐতিহ্যের জায়গা এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকা দুঃখজনক।’

সোনাকান্দা দুর্গের বর্তমান অবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংস্কার ও সংরক্ষণে ধাপে ধাপে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে হাজীগঞ্জ দুর্গ এবং পরে সোনাকান্দা দুর্গের সংস্কার ও সুরক্ষার কাজ হাতে নেওয়া হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজগুলো সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হবে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, জেলার ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে জেলা প্রশাসন কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, সোনাকান্দা ও হাজীগঞ্জ দুর্গের উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দুর্গের মূল ঐতিহাসিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কার কাজ পরিচালনার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত