নবম জাতীয় পে-স্কেল: যৌক্তিকতা ও চ্যালেঞ্জ

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকার ‘নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬’ চূড়ান্ত করেছে। সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের জন্য এটি বড় স্বস্তির খবর। তবে বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের রাজস্ব ঘাটতির বাস্তবতায় এই পে-স্কেল অর্থনীতিতে ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলবে— তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি মনে করি, নতুন পে-স্কেলের যৌক্তিকতা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি এর বাস্তবায়নে কিছু সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ ও সতর্কতার জায়গা রয়েছে।

প্রথমেই আসা যাক বৈষম্য কমানোর প্রসঙ্গে। সরকার জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের মধ্যকার যে অনুপাত বা বৈষম্য ছিল, তা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে থাকা কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি হারে বাড়বে। এটি নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। কারণ, গত কয়েক বছর ধরে দেশে যে পৌনঃপুনিক মূল্যস্ফীতি আমরা দেখছি এবং সার্বিকভাবে মূল্যস্তর যেভাবে ওপরে উঠে গেছে— তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এই কম আয়ের মানুষই। তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং জীবনমানের চরম অবনমন ঘটেছে। তাই নিচের দিকের আয়ের মানুষের বেতন বেশি হারে বাড়িয়ে বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ সময়োপযোগী। আমার মতে, ভবিষ্যতে এই পার্থক্য আরও কমিয়ে আনার দিকে নজর দেওয়া উচিত।

আমাদের অর্থনীতি এখন প্রায় ৬০ লক্ষ কোটি টাকার। সরকার পে-স্কেলটি একবারে না দিয়ে চারটি স্তরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে এর ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন হয়, তবে বাজারে আসবে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা। ৬০ লক্ষ কোটি টাকার অর্থনীতিতে এই পরিমাণ অর্থ খুব বড় কোনো অভিঘাত সৃষ্টি করবে না।

নতুন পে-স্কেলের যৌক্তিকতা বুঝতে হলে গত ১১ বছরের মূল্যস্ফীতির দিকে তাকাতে হবে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রতি বছরই কমপক্ষে ৬-৭ এবং শেষের দিকে ৯-১০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ছিল। যদিও সরকারি চাকরিজীবীদের বেসিক বা মূল বেতন প্রতি বছর ৫ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু তা মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে অনেক কম ছিল। ফলে আমরা যদি পুরো ১১ বছরের হিসাব কষি, তাহলে দেখব এই সময়ে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে গেছে। ক্রয়ক্ষমতার এই বিপুল অবনমনের প্রেক্ষাপটে তাদের বেতন বৃদ্ধির দাবিটি শতভাগ যৌক্তিক। এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকারের সুযোগ নেই।

তবে প্রশ্ন সরকারের সামর্থ্য নিয়ে। রাজস্ব আহরণের অবস্থা খুব সন্তোষজনক নয়। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণের হার মাত্র ৭-৮ শতাংশ। ঠিক এ জায়গাতেই সরকারের সামর্থ্যের ঘাটতি দেখা যায় এবং নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তার ওপর বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হয়। তাই বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের সম্পদ ও রাজস্ব আহরণের প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে।

যাদের বেতন বাড়ছে, তাদের একটি বড় অংশই কিন্তু সরকারের রাজস্ব আহরণ, সেবা প্রদান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। আমরা প্রত্যাশা করব, বেতন বৃদ্ধির এই প্রণোদনার ফলে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে, সরকারের পক্ষ থেকেও এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এটি অর্থনীতির জন্য কোনো বড় সংকট সৃষ্টি না করেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

অনেকের মনেই শঙ্কা কাজ করছে, ২৩-২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং ৮-৯ লাখ পেনশনভোগীর হাতে যখন একযোগে অনেক টাকা আসবে; তখন বাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে কিনা। বাস্তবে বিষয়টি এতটা আতঙ্কের নয়। আমাদের অর্থনীতি এখন প্রায় ৬০ লক্ষ কোটি টাকার। সরকার পে-স্কেলটি একবারে না দিয়ে চারটি স্তরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে এর ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন হয়, তবে বাজারে আসবে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা। ৬০ লক্ষ কোটি টাকার অর্থনীতিতে এই পরিমাণ অর্থ খুব বড় কোনো অভিঘাত সৃষ্টি করবে না। সবচেয়ে বড় কথা, সরকার এই টাকা অতিরিক্ত ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ছে না; বরং বাজেটের শৃঙ্খলার ভেতরে থেকেই এক খাতের বরাদ্দ অন্য খাতে সমন্বয়ের মাধ্যমে এর সংকুলান করছে।

সরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধির এই প্রভাব অনিবার্যভাবেই বেসরকারি খাতে পড়বে। বেসরকারি খাতে কর্মরত শ্রমিক, চাকরিজীবীদেরও জীবনমানের অবনমন হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ তাদের ওপরও সমানে পড়েছে। ফলে তাদের দিক থেকেও নিম্নতম মজুরি বা বেতন পুনর্নির্ধারণের যৌক্তিক দাবি উঠবে।

তাছাড়া বাজারে যখন মানুষের হাতে টাকা আসে এবং চাহিদা বাড়ে, তখন কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থাতেও ইতিবাচক সাড়া পড়ে। বর্ধিত চাহিদার যোগান দিতে উৎপাদন বাড়ে, যা অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সাহায্য করে। তবে আমাদের দেশে একটি মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা রয়েছে, যেটিকে অর্থনীতিতে আমরা বলি ‘এক্সপেক্টেশনাল ইনফ্লেশন’। অর্থাৎ সরকারি বেতন বাড়ছে— শুধু এই খবর শুনেই অনেক অসাধু ব্যবসায়ী জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেন, যেখানে বাস্তবে দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। এ ধরনের মূল্যস্ফীতি রোধে সরকারকে কঠোর নজরদারি ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

সরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধির এই প্রভাব অনিবার্যভাবেই বেসরকারি খাতে পড়বে। বেসরকারি খাতে কর্মরত শ্রমিক, চাকরিজীবীদেরও জীবনমানের অবনমন হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ তাদের ওপরও সমানে পড়েছে। ফলে তাদের দিক থেকেও নিম্নতম মজুরি বা বেতন পুনর্নির্ধারণের যৌক্তিক দাবি উঠবে। তবে বেসরকারি খাতের বেতন বৃদ্ধি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের লভ্যতা ও সক্ষমতার ওপর। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অবশ্য জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে বেতন বাড়ায়; সেখানে চাপ কম পড়বে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা যদি ভালো থাকে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত হয়, তবে বেসরকারি খাতের জন্যও এই দাবি মেটানো সহজ হবে।

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে অবশ্যই ব্যয়ের অগ্রাধিকারগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। বেতন-ভাতা বাড়াতে গিয়ে যেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক সুরক্ষার মতো জরুরি খাতগুলোর বরাদ্দ কমে না যায়, সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, অপচয় রোধ এবং দুর্নীতি দমনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি যেমন যৌক্তিক অধিকার, তেমনি জনগণের করের টাকায় প্রাপ্ত সেই বেতনের প্রতি সুবিচার করে জনগণকে দুর্নীতিমুক্ত, দ্রুত, উন্নত সেবা প্রদানও তাদের নৈতিক দায়িত্ব। সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলেই নবম পে-স্কেল অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।

  • অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত