সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত হাওরাঞ্চলে যে ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢল নেমে এসেছে, তা আবারও আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও হাওর ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। প্রতি বছরই বোরো মৌসুমের শেষ দিকে এসে হাওরের কৃষকদের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এ বছর হাওরের কৃষকরা প্রায় ৬০ শতাংশ ধান ঘরে তুলতে পারলেও, বাকি ৪০ শতাংশ ধান তলিয়ে গেছে পাহাড়ি ঢলের পানিতে। এই ক্ষতি কেবল ব্যক্তি কৃষকের নয়, বরং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সম্ভাব্য সংকট।
হাওর অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে দেখা যায়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি জেলা— সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জুড়ে এর বিস্তৃতি। এই অঞ্চলের প্রধান এবং একমাত্র ফসল হলো বোরো ধান। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে এই হাওর অঞ্চল থেকে। জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই বিশাল পরিমাণ ধানের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু ফ্লাশ ফ্লাড বা হড়পা বান বা পাহাড়ি ঢলের কারণে প্রায় বছরই এই ধান কৃষকের গোলায় তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
সর্বশেষ ২০২২ সালে হড়পা বানে হাওরের ফসল সম্পূর্ণ তলিয়ে গিয়েছিল; ফলে সে বছর দেশে চালের দামে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হয় এবং সরকারকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে চাল আমদানি করতে হয়েছিল। এবার সরকার থেকে আগাম সতর্কতা দেওয়া হলেও, ধান কাটার শ্রমিকের অভাব এবং যান্ত্রিকীকরণে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে কৃষকরা যথাসময়ে ধান কাটতে পারেননি। ফলে চেষ্টার পরও ফসল রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
ছয় মাস পানিতে নিমজ্জিত ও ছয় মাস শুকনো হাওরের দুই প্রধান ফসল মাছ ও ধান। প্রধানমত বোরো ধান। সেখানে বন্যা না হলে যেমন মাছের উৎপাদন কমে যায়, তেমনই আগাম বন্যা ধান খেয়ে যায়। ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয় রাজ্য থেকে নেমে আসা সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইন, যাদুকাটা, মগরা, কংস, মনু, খোয়াই, ভোগাই প্রভৃতি আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো দিয়ে আসা ঢল মাছ ও ধানের এই প্রতিবেশ ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করে।
প্রাকৃতিকভাবে, হড়পা বান নদীপথে এসে একদিন বা দুদিনের মধ্যে নদীপথেই নেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু মুশকিল হলো, নদীগুলোর সেই আগের মতো পানি ধারণ বা দ্রুত নিষ্কাশনের ক্ষমতা আর নেই। ফলে বন্যা তৈরি হয় এবং ধানের ক্ষেত নিমজ্জিত হয়। এর পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, উজানে ভারতের মেঘালয় ও আসামে ব্যাপক হারে বৃক্ষনিধন, খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং পাহাড় কাটার কারণে বিপুল পরিমাণ পলি বৃষ্টির পানির সঙ্গে নেমে এসে আমাদের নদীগুলোকে ভরাট করে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, দেশের ভেতরে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর প্রাকৃতিক জলকাঠামো বা মরফোলজি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রকৃতির ওপর মানুষের এই বিরূপাচরণের পাশাপাশি আমাদের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাও এই সংকটের জন্য সমানভাবে দায়ী। প্রতি বছর হাওরে বোরো ফসল রক্ষার জন্য নদীর পাড়ে যে অস্থায়ী মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়, তা সাধারণত ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই সময়সীমা কখনোই মানা হয় না। গত কয়েক বছর বড় কোনো বন্যা না হওয়ায় এ বছর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শিথিলতা ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাঁধ নির্মাণে ‘ধ্রুপদী দুর্নীতি’। নিয়ম অনুযায়ী দূর থেকে মাটি এনে বাঁধ নির্মাণের কথা থাকলেও, ঠিকাদাররা বাঁধের একেবারে কাছ থেকেই মাটি কেটে বাঁধ তৈরি করেন। ফলে বাঁধের উচ্চতা ও স্থায়িত্ব দুটোই দুর্বল থেকে যায়।
সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিশেষ ব্যবস্থায় আর্থিক সহায়তা বা ত্রাণ দেওয়ার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা সাময়িকভাবে কৃষকের কষ্ট লাঘব করবে এবং এটি সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি কোনোভাবেই জাতীয় সমস্যার সমাধান নয়।
সংকট সমাধানে অনেক সময় কংক্রিটের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কথা বলা হলেও, হাওরের প্রতিবেশ ব্যবস্থার জন্য এটি হবে আত্মঘাতী। হাওরে আমাদের যেমন ধান প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন মাছের। কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইনে নির্মিত বড় সড়কের কারণে ইতোমধ্যেই ওই অঞ্চলের স্বাভাবিক প্রতিবেশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। স্থায়ী বাঁধ দিলে হাওরে স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। অন্যদিকে, অনেকেই নদীগুলোর নাব্যতা ফেরাতে ড্রেজিং বা খননের কথা বলেন। কিন্তু হাওরের নদীগুলোতে ড্রেজিং করা বিপুল ব্যয়বহুল এবং এটি দুর্নীতির আরেকটি বড় আখড়ায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর চেয়ে বরং অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণে যদি শতভাগ সুশাসন নিশ্চিত করা যায়, তবে পাহাড়ি ঢলের যে প্রচণ্ড স্রোত, সেই স্রোতের তোড়েই নদী তার নিজস্ব গতিপথ পরিষ্কার করে নিতে পারবে। প্রকৃতিকে তার নিজের মতো কাজ করতে দিলে এবং আমরা যদি তাতে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি না করি, তবে ফ্লাশ ফ্লাডের পানি দ্রুতই নেমে যেতে সক্ষম।
সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিশেষ ব্যবস্থায় আর্থিক সহায়তা বা ত্রাণ দেওয়ার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা সাময়িকভাবে কৃষকের কষ্ট লাঘব করবে এবং এটি সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি কোনোভাবেই জাতীয় সমস্যার সমাধান নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, সরকারি সহায়তা বিতরণে প্রান্তিক পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। অনেক সময়ই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সহায়তা পৌঁছায় না।
এর চেয়েও বড় শঙ্কা হলো, হাওরের ধান আমাদের জাতীয় সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনের অংশ। হাওরের তলিয়ে যাওয়া ধান কোনো না কোনো কৃষকের মালিকানাধীন হলেও, দিন শেষে তা আমাদের জাতীয় খাদ্য উৎপাদানের অংশ। কৃষকদের নগদ টাকা দিয়ে হয়তো তাদের সাময়িক ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব, কিন্তু পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান তো আর গুদামে বা বাজারে ফেরানো সম্ভব নয়। ফলে দেশের মোট ধান বা চাল উৎপাদনে যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা দেশের সামগ্রিক খাদ্য মজুতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তখন বাধ্য হয়ে সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভেঙে চাল আমদানি করতে হবে। বাজারে চালের সরবরাহ কমে গেলে বা আমদানি করতে হলে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ ভোক্তাকে চড়া দামে চাল কিনতে হবে। অর্থাৎ, হাওরের একটি ফসলহানির চক্রাকার প্রভাব পড়ে পুরো দেশের অর্থনীতির ওপর।
এটাও বলতে হবে, হাওরে হড়পা বানের সমস্যাটি কেবল প্রাকৃতিক নয়, এটি মানবসৃষ্ট প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতির ফসল। যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে দ্রুত ধান কাটার জন্য কৃষকদের সুলভ মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং ফেব্রুয়ারির আগেই দুর্নীতিমুক্তভাবে বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করতে হবে। আর ক্ষতিপূরণ বা ত্রাণ কখনোই খাদ্যের বিকল্প হতে পারে না। সুশাসন ব্যতিরেকে হাওরের প্রায় বার্ষিক এই কান্নার অবসান ঘটবে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও এখন বৈশাখের আগেই বৃষ্টিপাত শুরু হচ্ছে; আগাম বন্যাও আগের চেয়ে আগে আসছে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে আমাদের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাকেও ঢেলে সাজাতে হবে।
- শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক; নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপলের প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব।
(এই নিবন্ধ ঢাকা স্ট্রিমে সম্প্রচারিত লেখকের আলোচনার ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত)