সমুদ্রপথে ইরানের ‘টোল ডিপ্লোম্যাসি’ কি বৈশ্বিক ঝুঁকি বয়ে আনছে

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৬: ২১
স্ট্রিম গ্রাফিক

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র কেবল সীমানা পরিবর্তনের সাক্ষী নয়, বরং বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনি হিসেবে পরিচিত সমুদ্রপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও এক ভয়াবহ লড়াই শুরু হয়েছে। এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, যা এখন কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং রূপ নিয়েছে এক জটিল ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’।

ইরানের এই আগ্রাসী কৌশলের মূলে রয়েছে হরমুজ প্রণালিকে নিজস্ব সার্বভৌম এলাকা দাবি করে প্রতিটি জাহাজ থেকে ‘টোল’ বা শুল্ক আদায়ের প্রয়াস, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। ফুজায়রা বন্দরের কৌশলগত পতন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রাজনীতির টানাপোড়েন এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। যদি ইরানের এই ‘টোল ডিপ্লোম্যাসি’ সফল হয়, তবে এর সংক্রামক প্রভাব বাব-এল-মান্দেব থেকে মালাক্কা প্রণালি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সমুদ্রপথের এই সম্ভাব্য ‘বলকানাইজেশন’ মুক্ত বাণিজ্যের চিরাচরিত ধারণাকে ধ্বংস করে বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত জিম্মিদশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ওপেক থেকে ইউএই-এর বিচ্ছেদ: একটি অনিবার্য পরিণতি

সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ওপেকের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সুপ্ত মতবিরোধ এখন প্রকাশ্য এক ভূ-রাজনৈতিক ফাটলে রূপ নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তেল-পরবর্তী বৈচিত্র্যময় অর্থনীতির আধুনিকায়ন এবং একইসাথে আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে প্রতিরক্ষা খাতে ইউএই-এর ব্যয় ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলায় আমেরিকার 'থাড' ও প্যাট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিজস্ব 'এজ' গ্রুপের মাধ্যমে উন্নত ড্রোন ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি গড়ে তুলতে যে বিশাল অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন, তা ওপেকের বর্তমান উৎপাদন কোটা দিয়ে মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

এই আর্থিক চাপ মোকাবিলায় দেশটি এখন ওপেকের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে তেলের দাম নির্ধারণ ও উত্তোলন বাড়িয়ে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনে মরিয়া। ইউএই মনেকরে ওপেকের কঠোর সীমাবদ্ধতা তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক আধুনিকায়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করছে, যার ফলে নিজস্ব সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষা করা এখন অস্তিত্বের প্রশ্ন।

তেলের এই অতিরিক্ত উৎপাদন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে নিজেদের শীর্ষস্থানে রাখার একটি অপরিহার্য কৌশলগত হাতিয়ার। ওপেকের সম্মিলিত স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে স্বাধীনভাবে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের এই প্রবণতা সংস্থাটি থেকে দেশটির চূড়ান্ত বিচ্ছেদকে ক্রমেই অনিবার্য করে তুলছে।

ফুজায়রা বন্দর: ধ্বংসের মুখে কৌশলগত লাইফলাইন

২০২৬ সালের ১৫ মার্চ দিবাগত গভীর রাতে ইরানের 'রেভল্যুশনারি গার্ডস' পরিচালিত একটি বিধ্বংসী ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ফুজায়রা বন্দর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 'অপারেশন মার্টিয়ার সুলেমানি-২' ছদ্মনামের এই সুপরিকল্পিত আক্রমণে বন্দরের মূল তিনটি তেল লোডিং টার্মিনাল এবং কৌশলগত স্টোরেজ ট্যাংকের প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এই অতর্কিত হামলা কেবল ভৌত অবকাঠামোই ধ্বংস করেনি, বরং হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিকল্পহীন নিরাপত্তা বলয় নিয়ে ইউএই-এর দীর্ঘদিনের কৌশলগত অহংকারকেও চুরমার করে দিয়েছে।

ফুজায়রার এই বিপর্যয় আবুধাবিকে লজিস্টিক্যালি পঙ্গু করে দিয়ে পুনরায় ইরানের সরাসরি ভৌগোলিক ও নজরদারি নিয়ন্ত্রণের অধীনে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। বর্তমানে এই বিকল্প রুটের কার্যকারিতা হারানো মানেই হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রাজনীতির সার্বভৌমত্ব এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত হওয়া। এর ফলে বাধ্য হয়েই এখন ইউএই-এর তেলবাহী জাহাজগুলোকে পুনরায় ইরানের 'টোল ডিপ্লোম্যাসি'র শিকার হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রণালিটি ব্যবহার করতে হচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ ফাটল: ফুজায়রা কি ইউএই থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাচ্ছে

ফুজায়রা বন্দরের এই বিপর্যয় কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই আনেনি, বরং ফেডারেশনের অন্দরে ‘রিলিজিয়াস পলিটিক্স’ ও ভূ-রাজনৈতিক অসন্তোষের এক নতুন গুঞ্জন ছড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু ও ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ফুজায়রার স্থানীয় নেতৃত্ব আবুধাবির নিরাপত্তা নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বলে শোনা যাচ্ছে। যুদ্ধের এই চরম মুহূর্তে ফুজায়রা যদি ফেডারেশন থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বা ভিন্ন কোনো কৌশল গ্রহণের পথে হাঁটে, তবে তা সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য এক ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের জন্ম দেবে। যদিও এই বিচ্ছিন্নতাবাদের বিষয়টি এখন পর্যন্ত জোরালো গুজব হিসেবেই সীমাবদ্ধ, তবুও অবকাঠামো হারিয়ে ফুজায়রার ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ অভ্যন্তরীণ ফাটলকে আরও গভীর করে তুলছে।

সমুদ্রপথের এই নব্য ‘বলকানাইজেশন’ বিশ্বসভ্যতার অবাধ বাণিজ্য নীতির ওপর এক চরম আঘাত। ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালিতে প্রবর্তিত ‘টোল ডিপ্লোম্যাসি’ যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতায় বৈধতা পায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাব-এল-মান্দেব থেকে মালাক্কা পর্যন্ত প্রতিটি সামুদ্রিক মোড় একেকটি অর্থনৈতিক ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে।

ফেডারেশনের অন্য আমিরাতগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা এই অঞ্চলটি যদি শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ অস্বীকার করে, তবে তা হবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক ভূমিকম্প। বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং সার্বভৌমত্বের ঝুঁকিকে হালকাভাবে দেখার আর কোনো সুযোগ নেই।

ইরানের ‘টোল ডিপ্লোম্যাসি’ ও হরমুজের শৃঙ্খল

সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশলগত বিকল্প ফুজায়রা বন্দর অকেজো হওয়ার সুযোগে ইরান হরমুজ প্রণালিকে তাদের সার্বভৌম এলাকা দাবি করে এক নজিরবিহীন ‘টোল ডিপ্লোম্যাসি’ শুরু করেছে। বর্তমানে ২০২৬ সালের এপ্রিলের বাজার দর অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি ১০৮.৬৮ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ৯৬.৯৬ ডলারে পৌঁছালেও, এই বর্ধিত মূল্যের সুফল আবুধাবির পকেটে যাচ্ছে না। ইরান প্রতি ব্যারেলে ৩ থেকে ৫ ডলার পর্যন্ত ‘ট্রানজিট টোল’ ধার্য করায় ইউএই-এর নিট মুনাফা ব্যারেল প্রতি প্রায় ৪% থেকে ৬% কমে যাচ্ছে। এই অর্থ মূলত ইরানের যুদ্ধকালীন অর্থনীতি সচল রাখতে সহায়তা করছে।

আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইরান হরমুজকে একটি লাভজনক ‘অর্থনৈতিক ফাঁদে’ পরিণত করেছে, যেখানে তেল উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়লে লাভবান হচ্ছে কেবল তেহরান। কূটনৈতিক আলোচনা অচলাবস্থায় থাকায় এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিকারক দেশগুলোর ওপরও বিমা ও শিপিংয়ের অতিরিক্ত ব্যয় চেপে বসছে। এই কৌশলগত শৃঙ্খল ইউএই-এর জন্য এমন এক পঙ্গুত্ব তৈরি করেছে যে, হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানির আর কোনো বাস্তবসম্মত পথ তাদের সামনে খোলা নেই।

ডোমিনো ইফেক্ট: বাব-এল-মান্দেব থেকে মালাক্কা

ইরানের এই ‘টোল আদায়ের মডেল’ যদি সফল হয়, তবে তা বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথের অবাধ স্বাধীনতার ধারণাকে সমূলে বিনাশ করে একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে। এই প্রথাটি একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান ‘চোক পয়েন্ট’ বা জাহাজ চলাচলের সংকীর্ণ পথগুলো কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত নয়, বরং একেকটি লাভজনক রাজস্ব আদায়ের কেন্দ্রে পরিণত হবে। এভাবে এক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য অন্য অঞ্চলের শক্তিগুলোকেও একইভাবে বাণিজ্যকে জিম্মি করার পথে উৎসাহিত করবে, যার প্রভাব পড়বে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে:

বাব-এল-মান্দেব: হুতিদের বাণিজ্যিক জিম্মিদশা

লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বাব-এল-মান্দেব প্রণালীতে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ইতিমধ্যেই অত্যন্ত প্রভাবশালী। তারা যদি দেখে ইরান সফলভাবে হরমুজে টোল আদায় করছে, তবে তারাও সুয়েজ খালগামী জাহাজগুলোর ওপর ‘নিরাপত্তা ট্যাক্স’ বা ‘ট্রানজিট ফি’ আরোপ করতে প্রলুব্ধ হবে। এর ফলে ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যকার বাণিজ্যের খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে এবং লোহিত সাগর কার্যত একটি উচ্চমূল্যের টোল-রুটে পরিণত হবে।

মালাক্কা প্রণালি: ইন্দোনেশিয়ার পরিবেশ সারচার্জের ফাঁদ

এশিয়ার লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত মালাক্কা প্রণালিতে ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া এই ‘ইরানি মডেল’ থেকে প্রেরণা নিতে পারে। তারা সরাসরি যুদ্ধের পথে না গিয়েও ‘পরিবেশ সুরক্ষা সারচার্জ’ বা ‘জলসীমা সংরক্ষণ ফি’-এর নামে প্রতিটি জাহাজের ওপর উচ্চ শুল্ক ধার্য করতে পারে। এটি হবে চীনের এনার্জি সিকিউরিটি এবং ভারতের সমুদ্র বাণিজ্যের জন্য এক বিশাল হুমকি, যা মুক্ত সমুদ্রের অধিকারকে একটি আইনি মোড়কে খর্ব করবে।

সমুদ্রপথের এই নব্য ‘বলকানাইজেশন’ বিশ্বসভ্যতার অবাধ বাণিজ্য নীতির ওপর এক চরম আঘাত। ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালিতে প্রবর্তিত ‘টোল ডিপ্লোম্যাসি’ যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতায় বৈধতা পায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাব-এল-মান্দেব থেকে মালাক্কা পর্যন্ত প্রতিটি সামুদ্রিক মোড় একেকটি অর্থনৈতিক ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বর্তমান সংকট প্রমাণ করে যে, কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি বা বিকল্প বন্দর নির্মাণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং প্রয়োজন একটি সমন্বিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো।

এই জিম্মিদশা থেকে উত্তরণে বিশ্বশক্তিগুলোকে অবিলম্বে ‘ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য ল অফ দ্য সি’-এর কার্যকারিতা কঠোরভাবে পুনরুদ্ধার করতে হবে। একইসাথে ইউএই-এর মতো রাষ্ট্রগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ সংহতি বৃদ্ধি এবং ওমান বা সৌদি আরবের স্থলপথ ব্যবহার করে নতুন কোনো ‘ট্রান্স-পেনিনসুলার’ করিডোর গড়ে তোলার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে। তা না হলে খণ্ডিত স্বার্থ আর ভৌগোলিক আধিপত্যের এই লড়াই বিশ্ব অর্থনীতিকে এক দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করবে। তাছাড়া সমুদ্রের স্বাধীনতা রক্ষা করা কেবল কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, বরং এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি অলিখিত চুক্তি যা লঙ্ঘন করলে এর মাশুল প্রতিটি জাতিকেই দিতে হবে। তাই আগামীর ঝুঁকি এড়াতে কূটনীতি ও সামরিক প্রতিরক্ষার ভারসাম্যই হতে পারে একমাত্র কার্যকর পথ।

  • সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

সম্পর্কিত