বিদেশ ভ্রমণে ব্যয়ের সীমা ১৮ হাজার ডলার

যে নীতি প্রমাণ করে, বাংলাদেশে সংস্কার আর সুশাসন এক বিষয় নয়

নুরুল ইসলাম বিপ্লব
নুরুল ইসলাম বিপ্লব

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হলো নীতিগ্রহণ। শীর্ষ পর্যায়ে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়, অনেক টাকা-শ্রম খরচ হয়, কিন্তু দিনশেষে তা মানুষের কোনো কাজে আসে না। উল্টো দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা আর ফাঁকিবাজদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়। সমস্যাটা নীতি প্রণয়নের নয়, বরং নীতি প্রণয়ন প্রায়শই মাঠ পর্যায়ের ও নাগরিক পর্যায়ের দৈনন্দিন সংকটগুলো ঠিক মতো ধরতে পারে না। নীতি বানানোর পর সেটা বাস্তবে কার্যকর করার জায়গায় অনেক বাধা থেকে যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের নীতিটা তেমনই একটি উদাহরণ। এই একটা নীতি ঠিকমতো বুঝতে পারলে গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকটটা বোঝা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেটাকে ওপর থেকে দেখলে ভালো সংস্কার মনে হবে। বিদেশ ভ্রমণে বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের সীমা ১২ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৮ হাজার ডলার করা হয়েছে। শুনতে ভালো লাগে, মনে হয় বিদেশে খরচের সুযোগ বাড়ল, ভ্রমণ-চিকিৎসা-পড়াশোনা সহজ হলো।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ১৮ হাজার ডলার দিয়ে একজন বাংলাদেশি নাগরিক যিনি বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তিনি বিদেশে সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোই করতে পারবেন না। কেন পারবেন না, সেটা বলার আগে দেখা দরকার আমরা বিদেশে টাকা খরচ করি কীভাবে। বিদেশে টাকা খরচের উপায় মূলত দুটো নগদ আর কার্ড। ব্যাংক থেকে নগদ ডলার কিনলে সেটা পাসপোর্টে এনডোর্স করা হয়, হিসাব থাকে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ মানি এক্সচেঞ্জ থেকে ডলার কেনে, যেখানে কোনো এনডোর্সমেন্ট ছাড়াই ৫, ১০, ২০ হাজার ডলার কিনে ফেলা যায়, কোনো বাধা নেই। এই মাত্রাতিরিক্ত নগদ ডলার নিয়ে কেউ বিদেশ গেলে তাকে ধরার মতো কোনো ব্যবস্থা রাষ্ট্রের নেই। বিমানবন্দরে এলোমেলোভাবে কাউকে থামিয়ে তল্লাশি করলে সেটা আলাদা ঘটনা, কিন্তু সিস্টেমেটিক কোনো নজরদারি নেই।

এই কারণেই পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্র নগদ-নির্ভরতা কমাতে চায়। নগদ লেনদেন যাচাই করা কঠিন, ট্রেস করা কঠিন, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কার্ড আর ডিজিটাল লেনদেন নগদ লেনদেনের ঠিক উল্টো কে, কবে, কোথায়, কত টাকা খরচ করল, সব রেকর্ডে থাকে। তাই স্মার্ট পলিসি হচ্ছে মানুষকে নন-ক্যাশ লেনদেনে উৎসাহিত করা, সুবিধা দেওয়া, ইনসেনটিভ দেওয়া।

সমস্যাটা নীতি প্রণয়নের নয়, বরং নীতি প্রণয়ন প্রায়শই মাঠ পর্যায়ের ও নাগরিক পর্যায়ের দৈনন্দিন সংকটগুলো ঠিক মতো ধরতে পারে না। নীতি বানানোর পর সেটা বাস্তবে কার্যকর করার জায়গায় অনেক বাধা থেকে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো দেখলে মনে হতে পারে, বাংলাদেশ ব্যাংক তো ঠিক এই কাজটাই করার চেষ্টা করছে, বাংলা কিউআর কোড, ক্যাশলেস ইকোনমি, ডিজিটাল পেমেন্ট, কার্ড ব্যবহারে উৎসাহ। ব্যাপারটা এক অর্থে সত্যি, দেশের ভিতরে নানান উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে ক্যাশলেস লেনদেন উৎসাহ দেয়ার জন্য। ক্যাশলেস ইকোনমি একটা রাজনৈতিক এজেন্ডাও বটে, রাজনীতিবিদেরা এটা চান, তাই আমলারাও ওপরে ওপরে এতে সায় দেন। কিন্তু বাস্তবে এমন সব খুঁটিনাটি বাধা রেখে দেওয়া হয়, তাতে মূল উদ্যোগটাই কার্যত অচল হয়ে পড়ে। নিজের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার আলোকে পলিসি ও বাস্তবতার ফারাকটা তুলি ধরি।

গতমাসে একটা কনফারেন্সে জুরিখ যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল সুইস সরকারের আমন্ত্রণে। বিমান ভাড়া, হোটেল খরচ সুইস সরকার বহন করবে। আমি খরচ করে বিল জমা দিলে তারা দিয়ে দিবে। ইতিহাদ এয়ারলাইন্সের ওয়েবসাইট থেকে ঢাকা- জুরিখ রিটার্ন ফ্লাইট বুক করতে চাইলাম নিজে নিজে। ইতিহাদের ওয়েবসাইটে থেকে টিকেট কিনলে আবুধাবিতে দুই রাত স্টপওভারের সুযোগ ছিল। দুই রাত ফ্রি হোটেল, সঙ্গে এক্সপ্রেস ভিসা সাপোর্ট। কিন্তু ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি টিকেট কাটতে পারলাম না, কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ৩০০ ডলারের বেশি অনলাইন পেমেন্ট করার নিয়ম নেই। কিন্তু টিকেটের দাম প্রায় ১১০০ ডলার।

আমি ব্যাংকে ফোন করলাম, যে তারা টিকেট কেনার জন্য সাময়িকভাবে আমার লেনদেনের সীমা বাড়াতে পারবে কিনা। ব্যাংক জানাল, বাংলাদেশ থেকে শুরু হয় বা বাংলাদেশে শেষ হয়— এমন কোনো ফ্লাইটের টিকিটে তারা সীমা বাড়াতে পারবে না। কিন্তু যে টিকেট বাংলাদেশের বাইরে থেকে শুরু হয়ে বাইরেই শেষ হয়, তাতে চাইলে সীমা বাড়ানো সম্ভব।

মানে ঢাকা-জুরিখ টিকিটে আমার সীমা বাড়বে না, কিন্তু জুরিখ-প্যারিস টিকেট কাটলে বাড়বে। এটা একটা চরম অবিচার। যে লেনদেনটা একজন বাংলাদেশির আসলেই সবচেয়ে বেশি দরকার—নিজের দেশ থেকে বিদেশে যাওয়া, ঠিক সেই লেনদেনটাই সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত রাখা হয়েছে। শেষে বাধ্য হয়ে বুকিং এজেন্টের মাধ্যমে টিকেট নিতে হলো, তারা টিকেটের একই দাম রাখলেও স্টপওভার সুবিধা দিতে পারলো না। একই ভ্রমণে ইউরোপে ঘোরার জন্য একটা ইউরেইল গ্লোবাল পাস কিনতে চেয়েছিলাম, লোকাল-রিজিওনাল ট্রেনে চলাফেরার জন্য। সেটাও কেনা গেল না ৩০০ ডলারের সীমার কারণে।

এই ৩০০ ডলারের সীমা নতুন কিছু না। ২০১৩ সালে সীমা ছিল ১০০ ডলার, ২০১৬ সালে বাড়িয়ে ৩০০ ডলার করা হয় মূলত সফটওয়্যার, ই-বুক, ম্যাগাজিন সাবস্ক্রিপশনের মতো ছোট ডিজিটাল কেনাকাটার কথা মাথায় রেখে। ২০২০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক আবার স্পষ্ট করে জানায় অনলাইনে একসঙ্গে ৩০০ ডলারের বেশি খরচ করা যাবে না। এক দশকের বেশি সময় ধরে দুনিয়া বদলে গেছে, এখন ফ্লাইট টিকেট, হোটেল, ট্রান্সপোর্ট পাস সবই অনলাইনে কেনা হয় কিন্তু নিয়মটা সেই ২০১৬ সালের জায়গাতেই আটকে আছে।

ফল কী দাঁড়ায়? হাতে বার্ষিক ১৮ হাজার ডলারের সুযোগ থাকলেও, প্রতিটা লেনদেনে ৩০০ ডলারের বেড়া থাকায় বাস্তবে সেই টাকা কার্ডে ব্যবহারই করা যায় না। যা করতে বাধ্য হতে হয়, তা হলো মানি এক্সচেঞ্জ থেকে নগদ ডলার কিনে বিদেশে নিয়ে যাওয়া, ঠিক সেই ট্রেসবিহীন, নিয়ন্ত্রণহীন চ্যানেল, যেটা থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল নীতিটার।

বাংলাদেশ ব্যাংক কাগজে-কলমে ক্যাশলেস ইকোনমির পক্ষে, স্বচ্ছতার পক্ষে। কিন্তু যে নিয়ম কার্ড ব্যবহারকে বাস্তবে অচল করে রেখেছে, সেটা বছরের পর বছর অপরিবর্তিত থাকে আর ঠিক বিপরীত দিকে, নগদ ডলার কেনায় কার্যকর কোনো সীমাই নেই।

এখানেই আসল প্যাঁচ। বাংলাদেশ ব্যাংক কাগজে-কলমে ক্যাশলেস ইকোনমির পক্ষে, স্বচ্ছতার পক্ষে। কিন্তু যে নিয়ম কার্ড ব্যবহারকে বাস্তবে অচল করে রেখেছে, সেটা বছরের পর বছর অপরিবর্তিত থাকে আর ঠিক বিপরীত দিকে, নগদ ডলার কেনায় কার্যকর কোনো সীমাই নেই। যে চ্যানেল সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, যার প্রতিটা লেনদেনের হিসাব ব্যাংকের খাতায়-কার্ড নেটওয়ার্কে-রিজার্ভ হিসাবে থেকে যায়, সেটাকেই সবচেয়ে বেশি বেঁধে রাখা হয়েছে। আর যে চ্যানেল সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ, যেখানে কে কত ডলার নিয়ে দেশ ছাড়ল তার কোনো কেন্দ্রীয় হিসাবই নেই, সেটা কার্যত খোলা।

এটা কাকতালীয় নয়। এটা এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ নাটক—কাগজে কড়াকড়ি দেখানো হয়, যাতে মনে হয় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আছে। বাস্তবে টাকা দেশ ছাড়ার সবচেয়ে বড় পথ ‘মানি এক্সচেঞ্জের ক্যাশ ডলার’—একদম অরক্ষিত থেকে যায়। এই ব্যবস্থায় লাভবান হয় মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী, হুন্ডি নেটওয়ার্ক, বড় অঙ্কের টাকা নিয়মের ফাঁক গলিয়ে সরাতে চাওয়া মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ যিনি সৎ পথে নিজের কার্ড দিয়ে একটা টিকেট কিনতে চান বা হোটেল বুকিং করতে চান।

একটা নিয়ম যদি প্রায় এক দশক ধরে বাস্তবতার সঙ্গে সাযুজ্যহীন থেকে যায়, শুধু "আমলাতান্ত্রিক জড়তা" বলে পার পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছা করলে কালই কার্ডের লেনদেন-সীমা বার্ষিক কোটার সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পারে। করে না কারণ এই ব্যবস্থা কারও কারও জন্য সুবিধাজনক, আর যাদের জন্য অসুবিধাজনক, তাদের কণ্ঠস্বর নীতি-নির্ধারণী টেবিলে পৌঁছায় না।

এটা শুধু একটা কার্ড-লিমিটের গল্প নয়, এটা বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার একটা প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনা। ওপরের স্তরে একটা ঘোষণা আসে বার্ষিক কোটা বাড়ল, এটা সংস্কার। সংবাদ হয়, বাহবা পাওয়া যায়। কিন্তু নিচের স্তরে, যেখানে আসল বাস্তবায়ন হয়, পুরোনো একটা প্রশাসনিক নিয়ম অপরিবর্তিত থেকে যায়, যা ঘোষণাটাকেই অকার্যকর করে দেয়। কাগজে সংস্কার হয়, বাস্তবে কিছু বদলায় না। ঢাকা থেকে বিদেশ যেতে চাওয়া মানুষটাকে আগের মতোই এজেন্টের পিছনে ঘুরতে হয়, মানি এক্সচেঞ্জের কাউন্টারে লাইন দিতে হয়, নয়তো হুন্ডির ওপর নির্ভর করতে হয়।

সমাধান জটিল কিছু না। কার্ডের প্রতি-লেনদেন সীমা বার্ষিক কোটার বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে বাড়ানো। ফ্লাইট-হোটেল-ট্রান্সপোর্টের মতো প্রয়োজনীয় খাতে আলাদা ছাড় দেওয়া, আর নিয়মিত বিরতিতে এসব প্রশাসনিক সীমা পর্যালোচনা করার একটা বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া তৈরি করা এসবই সম্ভব, আর ব্যয়বহুলও না।

কিন্তু তার জন্য দরকার মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা সম্পর্কে জানাশোনা এবং জনগণের কাজে আসবে এমন নীতি প্রণয়নে বদ্ধপরিকর থাকা। সংস্কার মানে শুধু একটা নীতি ঘোষণা করা নয়, সংস্কার মানে সেই ঘোষিত নীতি পথে থাকা অসংখ্য ছোট ছোট প্রশাসনিক বেড়া ডিঙিয়ে কীভাবে মানুষের কাজে লাগবে সেটা নিশ্চিত করা।

  • নুরুল ইসলাম বিপ্লব: নৃবিজ্ঞানী ও উন্নয়ন গবেষক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত