
একটি ঘটনায় এক পুলিশ সদস্যকে ঢাকার সাভারে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দারুস সালামে বাসার জানালা দিয়ে আসা গুলিতে আহত গৃহবধূ। গেন্ডারিয়ায় মাদক ব্যবসা নিয়ে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন নিরীহ মানুষ। একজন স্কুলশিক্ষিকা চোখের চিকিৎসা করাতে ঢাকায় এসে রিকশায় যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রাস্তায় পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
সাম্প্রতিক এসব খবরকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবার কারণ নেই। এগুলো ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক একটি প্রকাশ। ঢাকাসহ সারা দেশে এসব ঘটছে এবং জনমনে বাড়ছে আতঙ্ক। চট্টগ্রামের রাউজানের মতো কোনো কোনো অঞ্চলে রাজনৈতিক পরিচয়ে খুনের ঘটনা ঘটেই চলেছে আর সেটা অন্তর্বর্তী শাসনামল থেকে।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে প্রায় এক লাখ মামলা রেকর্ড হয়েছে, যার মধ্যে হত্যা মামলা ১ হাজার ৭৯১টি। আগের ছয় মাসের তুলনায় মামলা বেড়েছে প্রায় ১১ হাজার। নারী ও শিশু নির্যাতনে মামলা ১১ হাজারেরও বেশি।
এগুলো বাস্তবিক অপরাধের পূর্ণ চিত্র নয়। কারণ একটি অংশের আদৌ মামলা হচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা থানায় গেলে মামলার বদলে জিডি নেওয়া হচ্ছে; ছিনতাইয়ের ঘটনা নথিভুক্ত হচ্ছে ‘মুঠোফোন হারানো’ হিসেবে।
শুধু ছিনতাই বা হত্যাকাণ্ড নয়; সামাজিক অপরাধেও ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। চাঁদাবাজি যেন রুটিন ব্যাপার। ফুটপাতের দোকান থেকে কর্পোরেট অফিস, কাঁচাবাজার থেকে নির্মাণাধীন ভবন চাঁদার দাবি থেকে রেহাই পাচ্ছে না। আর বিদেশি দূতাবাসে চাঁদা চেয়ে ই-মেইল পাঠানোকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। এটি দেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।
জায়গায় জায়গায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাও মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষ হচ্ছে আবাসিক এলাকায়। এটা মাদকের বিস্তার প্রমাণ করে। জমি, শপিং সেন্টার, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টাও কম চলছে না। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারকারীরা এসব অপরাধ চালাচ্ছে প্রায় নির্বিঘ্নে।
পুলিশের চলমান ব্যর্থতার দিকটি আলোচিত হলেও এখান থেকে উন্নতির লক্ষণ নেই। এ অবস্থায় মামলা না নেওয়া কিংবা অপরাধকে হালকাভাবে নথিভুক্ত করার প্রবণতা শুধু ভুক্তভোগীর প্রতি অবিচার নয়; এটি অপরাধীদের উৎসাহিত করে। জামিনে বেরিয়ে আসামি আরও হিংস্র হয়ে ওঠার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতাও স্পষ্ট। আদালতে জামিনের বিরোধিতা করার কথা অবশ্য বলছে পুলিশ। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণেও অপরাধী ছাড়া পাওয়ার ঘটনা কম নয়।
পুলিশ কমিশনার কিশোর গ্যাং শূন্য করার ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগেও এমন ঘোষণা এসেছে; কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। মানুষ এখন ফল দেখতে চায়। অপরাধপ্রবণ এলাকায় পুলিশের কার্যকর উপস্থিতি, মামলা নথিভুক্তিতে জবাবদিহি, গ্রেপ্তার আসামিদের দ্রুত বিচার এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দল নির্বিশেষে পদক্ষেপ—এসব নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি পাল্টানো সম্ভব।
বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে মানুষ এমনিতেই বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় রাস্তায় বের হলে ছিনতাই, বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদার হুমকি, ঘরের ভেতর গুলিবিদ্ধ হওয়া—এসব অপরাধ প্রবণতা শান্তিপ্রিয় মানুষের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব নাগরিকের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেটি পালনে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাই ভেঙে পড়ে। সেই পরিণতি ঠেকানোর দায়িত্ব সরকারের। নির্বাচিত সরকার এলে রাজনৈতিক ও সামাজিক অপরাধ নির্বিশেষে আইনশৃঙ্খলায় উন্নতি ঘটবে, এমনটাই ছিল সাধারণ প্রত্যাশা। এটা নিশ্চিত করা না গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য আর বিনিয়োগ পরিস্থিতিও ইতিবাচক হবে না।
.png)


