গুম ও মানবাধিকার কমিশন বিল: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বড় ব্যবধান রয়ে গেছে

নূর খান লিটন
নূর খান লিটন

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯: ০২
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

জাতীয় সংসদে মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিকার বিল পাস হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমরা দীর্ঘদিন ধরে গুমের মতো ভয়ংকর অপরাধের বিচার ও প্রতিকারের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু পাস হওয়া বিল দুটি সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির এক বিশাল ব্যবধান রয়ে গেছে।

বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ও আইনি ফাঁকফোকরের কারণে আইনটি গুমের শিকার পরিবারগুলোকে কতটুকু ন্যায়বিচার দিতে পারবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।

আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, গুম সংক্রান্ত অভিযোগে তদন্তের পূর্ণ দায়িত্ব যেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়। যদি সরাসরি কমিশনের নিজস্ব জনবল দিয়ে এই তদন্ত করানো সম্ভব না-ও হয়, তবে অন্তত পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীর সদস্যদের প্রেশনে মানবাধিকার কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করা হোক। এই প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার কমিশন তদন্ত কার্যক্রম তদারক করবে এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে।

এই দাবির পেছনে জোরালো যুক্তি রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য বা পুরো একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে যখন গুমের অভিযোগ ওঠে, তখন সেই ঘটনার তদন্ত কোনোভাবেই সেই বাহিনী বা অন্য কোনো সমজাতীয় বাহিনীর পক্ষে নিরপেক্ষভাবে করা সম্ভব নয়। প্রথমত, নিজ বাহিনীর সদস্যদের বাঁচানোর একটি সহজাত প্রবণতা থাকে। দ্বিতীয়ত, গুমের ঘটনা যখন প্রাথমিকভাবে ঘটে, তখন সেটি ঠিক কোন বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হয়েছে, তা তদন্তের আগে জানা যায় না।

মানবাধিকার কমিশনের যদি দক্ষতা বা সামর্থ্যের ঘাটতি থাকে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সেনাবাহিনীর দক্ষ কর্মকর্তাদের প্রেশনে এনে সেই শূন্যস্থান পূরণ করা যেত। এতে অন্তত তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা বজায় থাকত।

এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ সাম্প্রতিক মিরাজ শেখের ঘটনা। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, এই ঘটনায় কোস্টগার্ড যুক্ত। পুলিশ এ নিয়ে জিডি গ্রহণ করে গত তিন-চার মাস ধরে অনুসন্ধান করছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত জনগণকে কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেনি।

এর অর্থ দাঁড়ায়, এক বাহিনী ঘটনা ঘটালে আরেক বাহিনী তার বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত করবে—এমনটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। মিরাজ শেখের ঘটনাই প্রমাণ করে, বাহিনীর দ্বারা বাহিনীর তদন্ত কখনো নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সুতরাং যে বা যারা এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে, তাদের হাতেই তদন্তের ভার তুলে দেওয়াটা প্রকারান্তরে ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার শামিল। মানবাধিকার কমিশনের যদি দক্ষতা বা সামর্থ্যের ঘাটতি থাকে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সেনাবাহিনীর দক্ষ কর্মকর্তাদের প্রেশনে এনে সেই শূন্যস্থান পূরণ করা যেত। এতে অন্তত তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা বজায় থাকত। কিন্তু বিলে সেই জায়গাটি রাখা হয়নি, যা এই আইনের অন্যতম প্রধান ত্রুটি।

এই আইনের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ত্রুটি হলো 'মিথ্যা অভিযোগে' শাস্তির বিধান। আইনে বলা হয়েছে, গুমের ঘটনা মিথ্যা প্রমাণ হলে অভিযোগকারীর পাঁচ বছরের শাস্তি হবে। আমরা বিগত বছরগুলোতে গুমের যে চরিত্র দেখেছি, তাতে দেখা যায়—অনেক গুম হওয়া ব্যক্তি ফিরে আসার পর ভয়ে একটি কথাও বলেননি। তৎকালীন সরকার তখন নির্লজ্জভাবে দাবি করেছে তারা গুম হয়নি, বরং স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করেছিল। এখন এই আইনের কারণে গুমের শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবার ভয়ে পুলিশের কাছে বা আদালতে অভিযোগ নিয়েই যাবে না। কারণ তদন্ত করবে সেই বাহিনীই, যাদের প্রতি মানুষের আস্থা নেই। তারা সহজেই প্রতিবেদন দিয়ে দেবে যে, অভিযোগটি মিথ্যা। ফলে ভুক্তভোগী পরিবার উল্টো পাঁচ বছরের জেলের ভয়ে চুপ থাকতে বাধ্য হবে এবং প্রকৃত অপরাধীরা বিচারের ঊর্ধ্বে থেকে যাবে।

তৃতীয়ত, মানবাধিকার কমিশনের কাছে অভিযোগ আসার পর করণীয় অংশে বড় ধরনের আইনি ফাঁক রাখা হয়েছে। কমিশন যদি কোনো বাহিনীর কাছে কোনো গুমের বিষয়ে চিঠি দিয়ে বা লিখিতভাবে প্রতিবেদন চায়, তবে সেই প্রতিবেদন কতদিনের মধ্যে জমা দিতে হবে—তার কোনো সময়সীমা আইনে নির্ধারণ করা হয়নি। অতীতে আমরা মানবাধিকার কমিশনে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, জবাব চেয়ে চিঠি দেওয়ার পর পাঁচ, সাত বা দশ বছর পেরিয়ে গেলেও বাহিনীর তরফ থেকে কোনো জবাব আসে না।

আইনের দ্বিতীয় ধাপে বলা হয়েছে, বাহিনীগুলোর দেওয়া প্রতিবেদন যদি কমিশনের কাছে সন্তোষজনক মনে না হয়, তবে কমিশন ৪৫ দিনের মধ্যে পুনরায় জবাব চাইতে পারবে। মুশকিল হলো, প্রথম ধাপে প্রতিবেদন দেওয়ার যেহেতু কোনো সময়সীমা নেই, তাই বছরের পর বছর প্রতিবেদন না দিলে দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার সুযোগই তৈরি হবে না। এটি কার্যত তদন্ত প্রক্রিয়াকে অনন্তকাল ঝুলিয়ে রাখার হাতিয়ার।

এই আইন পাসের সময়কাল ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও কথা বলা প্রয়োজন। মানবাধিকারের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে আইন পাসের সময় বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে। যেকোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা আইন পাসের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐকমত্যের বিকল্প নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে ঐকমত্যের জায়গাটি সবসময়ই দুর্বল।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য বা পুরো একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে যখন গুমের অভিযোগ ওঠে, তখন সেই ঘটনার তদন্ত কোনোভাবেই সেই বাহিনী বা অন্য কোনো সমজাতীয় বাহিনীর পক্ষে নিরপেক্ষভাবে করা সম্ভব নয়।

মন্ত্রী শুরুতে বলেছিলেন আইনটি ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের চেয়েও শক্তিশালী হবে। এখন তিনি সুর পাল্টে বলছেন, এটি ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার আইনের চেয়ে শক্তিশালী। এই ধরনের বক্তব্য আমাদের হতাশ করে।

অবশ্য আইন যেমনই হোক, এর প্রয়োগ অনেকটা নির্ভর করে কাদের দিয়ে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে তার ওপর। আইনটি দুর্বল হলেও হাতিয়ারটি চালানোর জন্য মানবাধিকার কমিশনে যদি সাহসী, দক্ষ ও সৎ মানুষদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে তারা নানান কৌশলে ন্যায়বিচারের পথ প্রশস্ত করতে পারেন। কিন্তু সেখানেও যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে তা হবে চরম দুর্ভাগ্যজনক।

এমন যেন না হয়, পাঁচ সদস্যের কমিশনে তিনজন রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পেলেন এবং বৈধতা ও আস্থা অর্জনের কৌশল হিসেবে লোকদেখানো দুজন মানবাধিকার কর্মী রাখা হলো। এমন হলে মেজরিটির অভাবে ভালো কোনো সিদ্ধান্ত কখনোই আলোর মুখ দেখবে না।

যেহেতু আইনটি পাস হয়ে গেছে, তাই এই মুহূর্তে সরকারের ওপর আস্থা রাখা এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আইনের কোনো দুর্বলতা প্রতীয়মান হলে তা সংশোধন করা হবে। যদিও বারবার আইন নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা যৌক্তিক নয়, তবুও আমরা আশা করব বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বলতাগুলো সামনে এলে সরকার দ্রুত তা সংশোধনের উদ্যোগ নেবে।

আপাতত আমাদের কাজ অপেক্ষা করা। সরকার কেমন ভূমিকা নেবে, আইনের বাস্তব প্রয়োগ কেমন হয় এবং সর্বোপরি মানবাধিকার কমিশনের চেহারা কেমন দাঁড়ায়—তা না দেখে চূড়ান্ত হতাশ হতে চাই না। আগামী দিনগুলোই বলে দেবে, আমরা গুমমুক্ত বাংলাদেশের দিকে হাঁটছি, নাকি পুরোনো বৃত্তেই আটকে থাকছি।

  • নূর খান লিটন: মানবাধিকার কর্মী

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত