গুম প্রতিকার ও মানবাধিকার বিল: যুগান্তকারী পদক্ষেপ, তবে প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য

আনিসুর রহমান
আনিসুর রহমান

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ১৭
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

জাতীয় সংসদে ‘মানবাধিকার কমিশন’ ও ‘গুম প্রতিকার’ নামে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি আইনের অপেক্ষায় ছিলেন। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে দেশের হাজার হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ঘটেছে অনেক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। এসব ঘটনা দেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।

রাষ্ট্রের ক্ষমতার এমন ভয়ংকর অপব্যবহারের কারণে সমাজে একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। এই ভয় থেকে মানুষকে মুক্ত করা খুব দরকার ছিল। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে একটি শক্তিশালী আইন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। এই দিক থেকে চিন্তা করলে, বিল দুটি পাস হওয়া একটি যুগান্তকারী ঘটনা।

তবে, আইনটি পাস হওয়ার পর রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কারণ, এই আইনের মাধ্যমে তাদের সব প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। তারপরও নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে দেখা যায়, এই আইনের বেশ কিছু ইতিবাচক ও সময়োপযোগী দিক রয়েছে। এগুলো আমাদের স্বীকার করতেই হবে।

প্রথমত, এই আইনে গুমের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন আইনে গুমকে একটি আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, অপরাধীদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ও বড় অঙ্কের জরিমানার কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো বাহিনীর অতি-উৎসাহী সদস্যদের এমন অপরাধ থেকে দূরে রাখতে এটি একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইনটি যথেষ্ট সংবেদনশীল। গুম হওয়া ব্যক্তিকে খুঁজতে তল্লাশি পরোয়ানা জারি করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বিধানও রয়েছে। এর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দিকটি হলো ‘গুম সনদ’। কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার ৫ বছর পর সম্পত্তি ভাগাভাগির সুবিধার্থে তার পরিবারকে এই সনদ দেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর আইনি ও সামাজিক সংকট কাটাতে এটি একটি মানবিক পদক্ষেপ।

রাষ্ট্রের ক্ষমতার এমন ভয়ংকর অপব্যবহারের কারণে সমাজে একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। এই ভয় থেকে মানুষকে মুক্ত করা খুব দরকার ছিল। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে একটি শক্তিশালী আইন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। এই দিক থেকে চিন্তা করলে, বিল দুটি পাস হওয়া একটি যুগান্তকারী ঘটনা।

তৃতীয়ত, তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করা হয়েছে। অতীতে দেখা যেত, যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারাই তদন্ত করছে। কিন্তু নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে তারা নিজেরা এর তদন্ত করতে পারবে না। এর বদলে অন্য কোনো বাহিনী বা একাধিক বাহিনী মিলে তদন্ত করবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এটি একটি ভালো উদ্যোগ।

চতুর্থত, মানবাধিকার কমিশনের বাছাই কমিটিতে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। কমিটিতে শুধু রাজনীতিক বা আমলাদের রাখা হয়নি। এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) মনোনীত অধ্যাপক, সাংবাদিক প্রতিনিধি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের রাখার কথাও বলা হয়েছে। সমাজের বিভিন্ন অংশের এই অংশগ্রহণ কমিশনের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

এসব ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি আইনের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিকটি নিয়েও আলোচনা করা জরুরি। আমার মতে, এই আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব। কোনো আইন কখনোই নির্দিষ্ট কোনো দল বা গোষ্ঠীর জন্য তৈরি হয় না। আইন তৈরি হয় রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মঙ্গলের জন্য। তাই গুমের মতো একটি জাতীয় ও স্পর্শকাতর বিষয়ে সব মহলের মতৈক্য থাকা খুব প্রয়োজন ছিল।

এ ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই আরও বেশি উদ্যোগী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিল পাস করলেই হবে না। আইনটির পুরোপুরি কার্যকারিতা ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা দরকার। এর জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। একটি গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

গুমমুক্ত ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে শুধু কাগজে-কলমে আইন থাকলেই চলবে না। এর জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জাতীয় ঐক্য এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ। তবেই অতীতের অন্ধকার অধ্যায় পার হয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার সুরক্ষার এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারবে।

  • আনিসুর রহমান: শিক্ষক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), এসএসএইচএল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত