leadT1ad

সাদ্দামের প্যারোল: রাজনীতির কাঠামোগত সন্ত্রাস কি বদলাবে

লাশের কি কোনো রাজনীতি আছে? ৯ মাসের শিশুর লাশের গায়ে কি দলীয় লেবেল সাঁটা সম্ভব? বাগেরহাটের মর্মান্তিক ঘটনা ও কারাবন্দীর প্যারোল অধিকার প্রসঙ্গে লিখেছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মারুফ ইসলাম।

বাগেরহাট সদর ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামকে দেখিয়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে স্ত্রী-সন্তানের লাশ নিয়ে ফিরছেন স্বজন। স্ট্রিম ছবি

বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রাম থেকে আসা স্থিরচিত্রটি কি আপনি দেখেছেন? যদি না দেখে থাকেন, তবে আপনি এখনো মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার গ্লানি থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। আর যদি দেখে থাকেন, তবে আপনার রাতের ঘুম উধাও হওয়ার কথা। একটি নিথর দেহ ২২ বছরের তরুণী সুবর্ণার, আর তাঁর ৯ মাসের এক দুগ্ধপোষ্য শিশু সেজাদ হাসানের। মৃত্যু কতখানি নিষ্ঠুর হলে এমন দৃশ্য রচনা করে, তা আমরা জানি না। কিন্তু রাষ্ট্র কতখানি অমানবিক হলে এই লাশের সামনে এক জোড়া হাতকড়া খুলে দিতে কার্পণ্য করে, তা গত শুক্রবার আমরা আবারও দেখলাম।

গ্রিক পুরাণে আন্তিগোনের কথা কি মনে পড়ে? রাজা ক্রেয়ন ঘোষণা করেছিলেন, রাষ্ট্রের শত্রুর দাফন হবে না, তার মৃতদেহ পড়ে থাকবে শকুনের জন্য। আজকের এই তথাকথিত ‘নতুন বাংলাদেশে’ আমরা কি রাজা ক্রেয়নের চেয়েও কঠোর কোনো অধ্যাদেশের নিচে বাস করছি?

এই অমানবিকতার নাম রাজনীতি। এই অমানবিকতার নাম আমাদের মজ্জাগত ঘৃণা। সুবর্ণার স্বামী এবং সেজাদের পিতা জুয়েল হাসান সাদ্দাম এখন কারাগারে। অপরাধ? তিনি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। রাজনীতির ময়দানে তিনি হয়তো অনেকের কাছেই ‘ভিলেন’ ছিলেন, হয়তো অনেক অন্যায়ের সহযোগী ছিলেন। কিন্তু সেই বিচার তো আদালতের। আজ যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হলো, লাশের কি কোনো রাজনীতি আছে? ৯ মাসের শিশুর লাশের গায়ে কি কোনো দলীয় লেবেল সাঁটা সম্ভব?

পুরাণের সিসিফাসকে দেওয়া হয়েছিল এক অন্তহীন পাথর ঠেলার সাজা। জুয়েল হাসান সাদ্দামদের সাজা যেন তার চেয়েও বড়। তাঁর পাথরটি পাথরের নয়, তাঁরই প্রিয় স্ত্রী-সন্তানের মরা মুখ। এই সন্তানের মুখ তিনি জন্মের পর থেকে দেখেননি। আর যখন দেখলেন, তখন সে এক শীতল মাংসখণ্ড। অথচ রাষ্ট্র তাকে একবেলার জন্য প্যারোল দিতে পারল না!

সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, গত শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে জুয়েল হাসানের বাড়ি থেকে তাঁর স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ এবং ৯ মাস বয়সী ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। এই সন্তানের জন্মের আগে থেকে জুয়েল কারাগারে রয়েছেন।

জুয়েলের বাড়ি বাগেরহাটে হলেও তিনি এখন আছেন যশোর কারাগারে, স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় তিনি থাকতে পারেননি। পরে স্বজনেরা গতকাল শনিবার দুপুরে মা ও ছেলের মরদেহ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেন, জুয়েল সেখানে স্ত্রী-সন্তানকে শেষবারের মতো দেখেন।

২০১৬ সালের ১ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে ‘প্যারোল মুক্তি-সংক্রান্ত নীতিমালা’ জারি করেছিল, তাতে স্পষ্ট বলা আছে—মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তান বা ভাই-বোনের মৃত্যুতে একজন বন্দী সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোল মুক্তি পেতে পারেন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের।

আহা রে! অজস্র প্রাণের বিনিময়ে আমরা মাত্রই একটি গণঅভ্যুত্থান করেছি। রাজপথ রক্তে ভাসিয়ে দিয়েছি এই আশায় যে, পুরনো সেই পচা-গলা অমানবিক ব্যবস্থার চিরতরে দাফন হবে। কিন্তু হায়! ব্যবস্থা বদলায় না, শুধু শাসকের গায়ের রঙ বদলায়। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে আমরা দেখেছি, বিরোধী মতের মানুষের জানাজা পড়ার অধিকারটুকু পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হতো। আজ ‘নতুন বাংলাদেশ’ ও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গড়ার স্লোগানের আড়ালে যদি সেই একই দৃশ্য মঞ্চস্থ হয়, তবে আমাদের এই বিপুল আত্মত্যাগের মহিমা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?

জুয়েল হাসান সাদ্দামের মতো কর্মীরা আজ অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পচছেন। তাদের পরিবারগুলো আজ পথে বসেছে। অথচ যে নেতা বা যে দলের নির্দেশে তারা একদিন রাজপথ দাপিয়ে বেড়াতেন, সেই তথাকথিত ‘প্রিয় আপা’ বা ‘শীর্ষ নেতারা’ এখন কোথায়? তারা সপরিবারে বিদেশের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে আরাম-আয়েশের জীবন কাটাচ্ছেন। দিল্লি বা নিউ ইয়র্কের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ড্রয়িংরুমে বসে তারা ফেসবুকে বড় বড় হুংকার ছাড়ছেন। তারা কীভাবে বিদেশে পালালেন, কে তাদের পালাতে সাহায্য করল, সেসব প্রশ্নে রাষ্ট্র বড় নীরব।

অন্যদিকে দেশের মাটিতে সাদ্দামদের মতো সাধারণ পরিবারগুলো উকিল-আদালতের ফি জোগাতে নিজের শেষ জমানো সঞ্চয়টুকুও শেষ করছে। মানুষের দ্বারে দ্বারে ধারদেনা করে বেড়াতে হচ্ছে তাদের। সেই দুর্দিনে কোনো ‘আপা’ কোনো ‘বড় ভাই’ তাদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে না। রাজনীতির এই চরম সুবিধাবাদ ও নিষ্ঠুরতার শিকার আজ সুবর্ণা আর সেজাদরা। সাদ্দাম-সুবর্ণা-সেজাদরা যে কাঠামোবদ্ধ রাজনীতির সন্ত্রাসের শিকার, সেই প্রশ্নও তুলছে না কেউ।

রাজনীতির রুই-কাতলারা যাবতীয় অপকর্ম করে বিদেশে পালিয়ে যায়, আর জীবন দিয়ে খেসারত দেয় চুনোপুটি সাদ্দামেরা। এ এক জটিল চক্র। এ এক জটিল কাঠামো। এই কাঠামোবদ্ধ সন্ত্রাসের কি বদল হবে না?

জুয়েলের চাচাতো ভাই সাগর ফারাজী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সুবর্ণা ও সেজাদের মৃত্যুর পর তারা কারাগারে যোগাযোগ করেছিলেন। জুয়েলের মামা হেমায়েত উদ্দিন প্যারোল মুক্তির জন্য আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু প্রশাসনের সাড়া মেলেনি।

প্রশাসন অবশ্য বলছে ভিন্ন কথা। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসন বলছে, তাদের কাছে একটি আবেদন এলেও তারা সেটি যশোরে জমা দিতে বলেছিলেন জুয়েলের পরিবারকে। যশোরের কারা কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁদের কাছে আবেদনটি আসেনি। কেন? সম্ভবত ‘সাপ্তাহিক ছুটি’। আমলাতন্ত্রের মারপ্যাঁচে আটকে গেল একজন পিতার প্রথম ও শেষবারের মতো নিজ সন্তানের কপালে চুম্বন দেওয়ার অধিকার।

সাদ্দামের কান্না, সুবর্ণা আর সেজাদের নিথর দেহের সেই ছবি আমাদের দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে, আমরা কতটা দেউলিয়া হয়ে গেছি। কারাগারের গরাদে মাথা কুটে মরা সেই পিতার আর্তি যদি এই রাষ্ট্র শুনতে না পায়, তবে বুঝতে হবে আমাদের সংবিধানের পাতাগুলো আজ রক্তে নয়, কালিতে নয়, বরং চরম অমানবিকতায় ভিজে গেছে।

মৃত্যু কি ছুটির দিন দেখে আসে? মৃত্যুর ফেরেশতা কি পঞ্জিকা দেখে হানা দেন? মানুষের প্রাণ যখন যায়, তখন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা আমলারা ছুটিতে থাকেন বলে কি একজন বন্দীর মানবিক অধিকার স্থগিত হয়ে যাবে?

২০১৬ সালের ১ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে ‘প্যারোল মুক্তি-সংক্রান্ত নীতিমালা’ জারি করেছিল, তাতে স্পষ্ট বলা আছে—মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তান বা ভাই-বোনের মৃত্যুতে একজন বন্দী সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোল মুক্তি পেতে পারেন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের।

প্যারোল মুক্তির এই বিধিব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। একজন মানুষের নিকটাত্মীয় মারা গেলে তাকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য কেন একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে? যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশগুলোতে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা থাকে স্বাধীন বোর্ড ও আদালতের হাতে। প্রকৃতপ্রস্তাবে এই ক্ষমতা থাকা উচিত সরাসরি জেল কর্তৃপক্ষের হাতে। জেল সুপার বা আইজি প্রিজন জরুরি বিবেচনায় তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেবেন। এটাই হওয়া উচিত মানবিক রাষ্ট্রের ধর্ম। প্রশাসনিক জটিলতা আর আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা যেন কোনো পিতার কান্নার চেয়ে দীর্ঘ না হয়।

সাদ্দামের কান্না, সুবর্ণা আর সেজাদের নিথর দেহের সেই ছবি আমাদের দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে, আমরা কতটা দেউলিয়া হয়ে গেছি। কারাগারের গরাদে মাথা কুটে মরা সেই পিতার আর্তি যদি এই রাষ্ট্র শুনতে না পায়, তবে বুঝতে হবে আমাদের সংবিধানের পাতাগুলো আজ রক্তে নয়, কালিতে নয়, বরং চরম অমানবিকতায় ভিজে গেছে।

সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ—আইন সংশোধন করুন। মানবিকতাকে আমলাতন্ত্রের শেকল থেকে মুক্ত করুন। তা না হলে এই বিপ্লব, এই নতুন ভোরের সূর্য আমাদের কাছে স্রেফ একটা নিষ্ঠুর কৌতুক হয়েই থেকে যাবে। সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের বিদেহী আত্মা হয়তো আমাদের ক্ষমা করবে না। ইতিহাস কি ক্ষমা করবে? ইতিহাস তো হাতকড়া পরা সেই পিতার অশ্রু আর ওই নিথর দেহের হাহাকার লিখে রাখছে। সেই বিচার বড় কঠিন।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত