আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভব্য প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই চলছে। যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ২০ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে। এই যাচাই-বাছাইয়ের সময়ে নির্বাচনি হাওয়ায় সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো—প্রার্থীরা হলফনামায় যে তথ্য দিয়েছেন, তা বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য? ইতিমধ্যেই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় নানা অসঙ্গতি সামনে আসতে শুরু করেছে। ফলে নির্বাচন শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রেই নয়, বরং স্বচ্ছতার প্রশ্নেও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। আর এই নিয়ে মানুষের মধ্যে চলছে বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রার্থীদের সম্পদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রদান আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ প্রায়শই প্রশ্নের মুখে পড়ে। প্রার্থীদের ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত নয়; সেখানে অস্বচ্ছতা ও অসঙ্গতি চোখে পড়ে। হলফনামায় সম্পদ গোপন করা বা কম করে দেখানোর পেছনে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানা কারণ কাজ করে। অনেক সময় ব্যক্তি ও পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা, ঈর্ষা, বৈরিতা কিংবা শত্রুতার আশঙ্কাও এই গোপন প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনা অনুযায়ী প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়ের উৎস, ঋণসংক্রান্ত তথ্য, সম্পদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং মামলার তথ্যসহ হলফনামা দাখিল করা বাধ্যতামূলক। যাচাইয়ে এসব তথ্য অসত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শুধু তা-ই নয়, কেউ যদি হলফনামায় মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন, সে ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ‘কাউন্টার এফিডেভিট’ দাখিলের আইনগত বিধানও রয়েছে।
তবে সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রার্থীর হলফনামায় দেখা যাচ্ছে, অনেক প্রার্থী ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত হলেও হলফনামায় তাদের বার্ষিক আয় কিংবা মোট সম্পদের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম দেখিয়েছেন। আবার কোনো কোনো প্রার্থী নিজের নামে বাড়ি বা গাড়ি নেই বলে উল্লেখ করলেও তাদের স্ত্রীদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের বিবরণ উঠে এসেছে। এতে সাধারণ মানুষের কৌতূহল ও প্রশ্ন আরও বেড়ে গেছে। এ ছাড়া অভিযোগ উঠেছে, বেশ কয়েকজন প্রার্থী জমি ও স্থাবর সম্পত্তির মূল্য বর্তমান বাজারদরের তুলনায় কয়েকগুণ কম দেখিয়েছেন। এসব অসঙ্গতি প্রার্থীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নকে নির্বাচনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
অতিরিক্ত ধনসম্পদকে আমাদের সমাজে প্রায়শই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। সমাজে এই ধারণাটি বেশ প্রচলিত যে, অতিরিক্ত ধনী মানেই দুর্নীতিবাজ। অতিরিক্ত ধনী হিসেবে পরিচিত হলে ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা থেকেই অনেক প্রার্থী সচেতনভাবে নিজের আর্থিক সক্ষমতাকে আড়াল করেন। এর মাধ্যমে তারা ভোটারদের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করেন এবং নিজেকে সাধারণ মানুষের একজন হিসেবে উপস্থাপন করেন।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষমতার ভিন্ন রূপ প্রদর্শনের অভিপ্রায় থেকেও প্রার্থীরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্মতা দেখাতে চান। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা রক্ষার লক্ষ্যেই তারা নিজেকে মধ্যবিত্ত বা সাধারণ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেন। অর্থ কিংবা বিত্ত নয়—বরং জনপ্রিয়তা, নেতৃত্ব এবং ত্যাগী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করাই এখানে মুখ্য হয়ে ওঠে। আত্মসম্মান ও মর্যাদাবোধ থেকেও অনেকেই মনে করেন, সম্পদের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেলে তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হতে পারে। ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে মূল্যায়ন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও এই প্রবণতাকে উসকে দেয়।
শ্রেণি দূরত্ব কম দেখানোর উদ্দেশ্য থেকেও সম্পদ কম উল্লেখ করার প্রবণতা দেখা যায়। এটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কৌশল। ‘আমি আপনাদেরই একজন’—ভোটারদের কাছে এমন বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা থাকে। দরিদ্র বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভোটারদের সঙ্গে একাত্মতা প্রদর্শনের জন্য প্রার্থীরা সচেতনভাবেই নিজেকে মধ্যবিত্তের কাছাকাছি দেখাতে চান। এই কৌশলের ভেতরে এক ধরনের প্রতীকী রাজনীতি কাজ করে, যেখানে সম্পদের চেয়ে পরিচয়ের গুরুত্ব বেশি।
অনেক সময় প্রার্থীরা সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় নিজেদের সম্পদের প্রকৃত মালিকানা গোপন রাখেন। বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ক্ষমতার জোরে অর্জিত অবৈধ সম্পদের ক্ষেত্রে ট্যাক্স ফাঁকি বা আইনি ঝুঁকি এড়ানোর উদ্দেশ্যে হলফনামায় তা প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকেন। সম্পদের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ পেলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এতে অতীতে কর ফাঁকি, অবৈধ আয়ের উৎস কিংবা অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা প্রার্থীর জন্য গুরুতর আইনগত ও রাজনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
সম্পদের উৎস পুরোপুরি স্বচ্ছ না হলে ব্যক্তিমানুষের ভেতরে অপরাধবোধ কাজ করে। এই অপরাধবোধ থেকেই অনেক প্রার্থী সম্পদ কম দেখিয়ে নিজের সঙ্গে নিজের একধরনের নৈতিক সমঝোতায় পৌঁছান।
মানুষ স্বভাবতই ঝুঁকি নিতে চায় না। বেশি সম্পদের তথ্য প্রকাশ পেলে সামাজিক ঈর্ষা, বিদ্বেষ এবং হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক কর্মী, স্থানীয় প্রভাবশালী বা বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছ থেকে আর্থিক চাপ আসার সম্ভাবনাও থাকে। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষার তাগিদে অনেক প্রার্থী সম্পদের প্রকৃত তথ্য গোপন করেন। সম্পদের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ মানে ব্যক্তিগত আর্থিক জীবনের ওপর জনসাধারণের নজরদারি বৃদ্ধি পাওয়া, যা অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর ও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।
এখন প্রশ্ন হলো—হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেওয়া বা তথ্য গোপন করা দেশের আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রমাণিত হলে প্রার্থিতা বাতিল, জরিমানা কিংবা কারাদণ্ডও হতে পারে। তবে বাস্তবে হলফনামা যাচাই ও শাস্তির প্রয়োগ অনেক সময় দুর্বল হওয়ায় প্রার্থীরা এই ঝুঁকি নিতে সাহস পান। আইন থাকা সত্ত্বেও তার কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতি এই প্রবণতাকে প্রশ্রয় দেয়।
হলফনামায় তথ্য গোপনের প্রবণতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়ায় তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। এর মূল কারণ আইনি ফাঁকফোকর এবং শাস্তির দুর্বল প্রয়োগ। এ ছাড়া হলফনামার তথ্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে প্রার্থীরা মনে করেন, অসত্য তথ্য দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তা খুব একটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে না। এই আইনি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সমষ্টিই হলফনামায় তথ্য গোপনের সংস্কৃতিকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে।
ইউরোপে হলফনামায় তথ্য গোপনের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী আইনগত কাঠামো, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সচেতন ভোটার এবং ভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সেখানে আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে মনোনয়ন বাতিল, জরিমানা বা কারাদণ্ড বাস্তবভাবে কার্যকর হয়। নির্বাচন কমিশন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আইন প্রয়োগে পর্যাপ্ত সক্ষমতা রয়েছে।
ইউরোপীয় সমাজে প্রার্থীরা সাধারণত স্বচ্ছতা ও সততার মূল্যকে উচ্চমাত্রায় ধারণ করেন। রাজনৈতিক জবাবদিহিতা সেখানে একটি প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতি। ভোটাররাও প্রার্থীর আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে সচেতন। ফলে কোনো প্রার্থী তথ্য গোপন করলে তা দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্ক ও ঝুঁকিতে পরিণত হয়।
ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে নাগরিকদের সকল তথ্য সাধারণত একটি ডাটাবেজে থাকে। ফলে তথ্য গোপন করার সুযোগ খুবই কম।
আমাদের প্রার্থীদের কাছ থেকে আমরা সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা আশা করতে পারি। তবে এই প্রত্যাশার বাস্তব ভিত্তিও তৈরি করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন আইনি ফাঁকফোকর দূরীকরণ, প্রশাসনিক দুর্বলতার সমাধান, সামাজিক-রাজনৈতিক চাপ কমানো এবং ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক মানসিকতার পরিবর্তন। এই পরিবর্তন ছাড়া হলফনামার স্বচ্ছতা কেবল নৈতিক আহ্বানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
একটি সমাজ ও রাষ্ট্রে যদি আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকে, যদি স্বচ্ছতা অনুপস্থিত থাকে এবং প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়, তাহলে ‘ভালো’ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। প্রার্থীরাও তো এই সমাজ ও রাষ্ট্রেরই নাগরিক। তারা একই সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকেই উঠে আসেন। ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রার্থীদের হলফনামায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে—এমন আশা অবাস্তব। প্রার্থীদের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করা যাবে তখনই, যখন আমাদের সামগ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে কাঠামোগত ও মানসিক পরিবর্তন ঘটবে।
এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি হলেও অসম্ভব নয়। প্রথমত প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ, যাতে আইন লঙ্ঘনের শাস্তি বাস্তবায়িত হয়। পাশাপাশি শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে মূল্যবোধের বিকাশ জরুরি। এই সমন্বিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই প্রার্থীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর ফলেই একটি শক্তিশালী, দায়বদ্ধ ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে।
হানিফ রাশেদীন: কবি ও কথাসাহিত্যিক