
বিয়ের বাজারে পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতনের বেসরকারি চাকরিজীবীর চেয়ে ২০ হাজার টাকা বেতনের সরকারি চাকরিজীবী পাত্রের ‘দর’ বেশি। কারণ বেসরকারি চাকরির বেতন যাই হোক, মানুষ সেটিকে সুনিশ্চিত ও স্থায়ী মনে করে না। সরকারি চাকরিতে বেতন কম হলেও আছে নানা সুযোগ-সুবিধা, পদোন্নতি, অবসরের পর পেনশন এবং সামাজিক ক্ষমতা। ফলে সরকারি চাকরি বরাবরই আকর্ষণীয়।
সেই সোনার হরিণ ধরতে চাকরিপ্রার্থীদের কঠিন প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। তেমনি ছোটখাটো সরকারি পদে চাকরির জন্যও মোটা অঙ্কের ঘুষ দেওয়ার প্রচলন দীর্ঘদিনের। আর চাকরি পেতে ঘুষ দিলে সেই টাকা উসুল করার ব্যাপার আছে। তখন সেটা দুর্নীতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। আবার ঘুষ ছাড়াই চাকরি পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও কেউ কেউ সরকারি চাকরিকে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। মোদ্দা কথা, সরকারি চাকরির আকর্ষণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শুধু নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নয়, দুর্নীতির সুযোগের ধারণাও।
সম্প্রতি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য যে নবম পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে—সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আগ্রহ ও প্রতিযোগিতা কি আরও বাড়বে? আর প্রতিযোগিতা বাড়লে সরকারি চাকরি পেতে ঘুষের রেটও কি বাড়বে?
গত ২৭ জুন প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি সংবাদ শিরোনামে নজর দেওয়া যাক—‘এসএসসি যোগ্যতার অফিস সহায়ক পদে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএ পাসসহ উচ্চশিক্ষিতরা।’ খবরে বলা হয়, পাবনা জেলা প্রশাসনের অফিস সহায়ক পদে মাধ্যমিক পাসের যোগ্যতার নিয়োগ পরীক্ষায় চাকরিপ্রাপ্ত ১৮ জনের ১৭ জনই উচ্চশিক্ষিত। কেউ বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, কেউ এমবিএ, কেউবা স্নাতকোত্তর পাস।
এটি কি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দৈন্যদশার চিত্র? নাকি সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের অদম্য আগ্রহ এবং দেশে শিক্ষিত বেকারের ভয়াবহ সংকট—দুটিই এর মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে? একটি নিয়োগের ঘটনা দিয়ে পুরো দেশের চিত্র আঁকা যাবে না। কিন্তু সরকারি চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা যে কতটা তীব্র, এটি তার একটি প্রতীকী চিত্র।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানও শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, নানা কোটার কারণে সরকারি চাকরির একটি বড় অংশ প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে থেকে যায়। মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। সেই আন্দোলন একপর্যায়ে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। শেষে আওয়ামী লীগের পতন ঘটে।
কিন্তু কোটা সংস্কারের দাবিতে যে তরুণরা রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের সবাই কি সরকারি চাকরি পেয়েছেন? না। এটা বাস্তবসম্মতও নয়। কিন্তু সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আগ্রহ কমেনি। বরং প্রবলই রয়েছে। তা বোঝা যায় অন্য একটি ঘটনায়।
জুলাই অভ্যুত্থানের মাস দুই আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে প্রবেশের জন্য ব্যাগ রেখে রাত ১২টা থেকে সিরিয়াল দেওয়ার একটি ছবি গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। লাইব্রেরি খোলে সকাল ৮টায়। কিন্তু তার আট ঘণ্টা আগে থেকেই আসন দখলের লাইন। একি শুধুই পড়াশোনা বা গবেষণার জন্য? এর বড় একটি অংশ ছিল বিসিএসসহ সরকারি চাকরির প্রস্তুতি।
চাকরিপ্রার্থীদের বিরাট অংশ কেন বিসিএস, বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডারে চাকরির জন্য ‘হাঁসফাঁস’ করেন? নিরাপদ জীবন, সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা এবং অবসরের পরের নিশ্চয়তা—এসব তো আছেই। এর সঙ্গে যদি সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকার ধারণাটিও যুক্ত হয়, তাহলে সরকারি চাকরি যে তরুণদের কাছে সোনার হরিণ হয়ে উঠলে আশ্চর্য কী?
কিন্তু এখানেই বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে ঘুষের সম্পর্কের প্রশ্নটি আসে। বেতন বাড়লেই ঘুষের রেট বাড়বে—এমন সরল সমীকরণ অবশ্যই নেই। বরং ভালো বেতন একজন কর্মচারীর দুর্নীতির প্রণোদনা কমাতে পারে। কিন্তু সরকারি চাকরির ‘বাজারমূল্য’ শুধু বেতনে নির্ধারিত হয় না। এর সঙ্গে চাকরির নিরাপত্তা, পেনশন, সামাজিক মর্যাদা, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং অবৈধ আয় করার সম্ভাবনাও যুক্ত।
ফলে একটি সরকারি পদ পাওয়ার জন্য যখন যোগ্য প্রার্থীর তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যা বহুগুণ বেশি, আর সেই পদে ঢোকার পরও দুর্নীতির সুযোগ থেকে যায়, তখন বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে চাকরিটির আকর্ষণ আরও বাড়তে পারে। নিয়োগব্যবস্থায় দুর্নীতি থাকলে সেই বাড়তি আকর্ষণ ঘুষের বাজারকেও আরও চড়া করার প্রণোদনা তৈরি করতে পারে।
সরকারি চাকরি পেতে ঘুষের অঙ্ক যে কেবল মুখে মুখে শোনা কথা নয়, তার উদাহরণও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রায় ১,৮০০ জনের একটি নিয়োগে নিয়োগ কমিটির দুই সদস্যই অভিযোগ করেছিলেন, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রার্থীদের একটি অংশের কাছ থেকে জনপ্রতি ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে (প্রথম আলো, ১২ এপ্রিল ২০২১)। একই উৎস থেকে ১১ জুলাই ২০২৪) জানা যায়, দুদক মাদারীপুরের সাবেক পুলিশ সুপারসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছিল পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে। ১৭ প্রার্থীর কাছ থেকে মোট ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ ছিল। দুদকের তদন্তে নিয়োগ পরীক্ষার খাতায় অনিয়ম ও অতিমূল্যায়নের প্রমাণও পাওয়া যায়। এখন এই টাকার পরিমান হয়তো সেই ঘুষের পরিমাণ আরও বেশি ঠেকবে—এমন আশঙ্কা তাই তৈরি হতে পারে।
চাকরিপ্রার্থীদের কেউ কেউ জায়গা-জমি বিক্রি করে কিংবা ঋণ করে সেই টাকা জোগাড় করতে পারেন। আর যিনি চাকরি পেতে বড় অঙ্কের ঘুষ দেন, তাঁর মধ্যে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত নিয়োগব্যবস্থা ভবিষ্যতের দুর্নীতিরও একটি উৎস হয়ে উঠতে পারে। তাই আসল প্রশ্ন শুধু ঘুষের রেট বাড়বে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সঙ্গে নাগরিক সেবার মান এবং জবাবদিহিও বাড়বে কি না।
সরকারি চাকরি যখন আকর্ষণীয় ছিল না বা বেতন ও সুযোগ-সুবিধা কম ছিল, তখনকার তুলনায় এখন সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে মানুষের হয়রানি বেড়েছে, না কমেছে? বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর সঙ্গে সেবার মান বৃদ্ধির যে প্রত্যাশা থাকে, সেটি কি দৃশ্যমান? বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ বাড়ানোর পর রাষ্ট্র কি নিশ্চিত করতে পারবে যে নাগরিকরা সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিনা ঘুষে, বিনা হয়রানিতে ও বিনা কালক্ষেপণে সেবা পাবেন?
এটা ঠিক যে কম বেতনের চাকরিজীবীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদের জীবন কষ্টের। একজন-দশজন অসৎ কর্মচারীর অপরাধের কারণে একজন সৎ কর্মচারীকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীদের একটি অংশের সম্পদ ও জীবনযাপন নিয়েও যে প্রশ্ন সমাজে আছে, সেটিও উপেক্ষা করা যায় না। বৈধ আয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা যাচাই করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, বড় পদের চাকরিজীবীরা বেতনের বাইরেও নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। ফলে তাঁদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু বেসরকারি খাতের সঙ্গে তুলনা করলেই হবে না। দায়িত্ব, ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা ও জবাবদিহিও বিবেচনায় নিতে হবে।
অনেকে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতনের সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের তুলনা করে বলেন, এখনও সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কম। কিন্তু শুধু মাসিক বেতনের অঙ্ক দিয়ে দুই ধরনের চাকরির প্রকৃত আর্থিক মূল্য তুলনা করা যায় না। সরকারি চাকরির পেনশন, চাকরির নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধার কাঠামো অধিকাংশ বেসরকারি চাকরির মতো নয়। ফলে বেসরকারি চাকরির বেতন বেশি হলেই যে সেটি সরকারি চাকরির চেয়ে বেশি নিরাপদ বা আকর্ষণীয়, এমন নয়।
সুতরাং সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে—এটি নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হবে তখনই, যখন বেতন বাড়বে কিন্তু নাগরিক সেবার মান বাড়বে না; বেতন বাড়বে কিন্তু নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ হবে না; বেতন বাড়বে কিন্তু জবাবদিহি বাড়বে না।
সরকারি চাকরিজীবীদের সম্মানজনক বেতন দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু তার বিনিময়ে নাগরিকের জন্য ভালো সেবা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মানুষ যদি সরকারি অফিসে গিয়ে বিনা ঘুষে, বিনা হয়রানিতে দ্রুত তার কাঙ্ক্ষিত সেবা পায়, তাহলে বেতন দশ শতাংশ বাড়ল নাকি একশো শতাংশ—তা নিয়ে মানুষের আপত্তি থাকার কথা নয়।
কিন্তু সেটি নিশ্চিত করা না গেলে প্রশ্নটি থেকেই যাবে—সরকারি চাকরির বেতন বাড়ল, নাকি সরকারি চাকরিটি জোগারের জন্য খরচের দরও বাড়ল?
.png)

দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো কারণ দিন দিন কমছেই। সহজ কথায়, কাউকে দশ টাকা ঋণ দিলে ছয় টাকা ফেরত পাওয়ারও নিশ্চয়তা নেই। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতি ভালোর দিকে যাওয়ার বদলে কেবল খারাপই হচ্ছে।
৩৩ মিনিট আগে
সরকার ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে ‘দেশব্যাপী বইপড়া কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম ২০২৬’ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। পাঠ্যবইয়ের বাইরে নানা ধরনের বই পড়ার সুযোগ তৈরি করার এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক ও পাঠমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৪ ঘণ্টা আগে
আনন্দবাজার পত্রিকার দফতরে কিছু গেরুয়া পরিহিত মানুষজন বিক্ষোভ দেখালেন। শুধু বিক্ষোভ নয়, দেখা গেল তার মধ্যে বেশ কিছু বিক্ষোভকারী আনন্দবাজারের উদ্দেশ্যে স্লোগান দিল হিন্দিতে যে ওই পত্রিকার যারা সাংবাদিক তাঁরা সবাই 'দিমাগি নকশাল'। বিষয়টি সেখানেই থামল না।
৪ ঘণ্টা আগে
শকুন হচ্ছে প্রকৃতির ধাঙড়। এরা খুব দ্রুত মরা আবর্জনা খেয়ে প্রাকৃতিকভাবেই পরিষ্কার রাখে। অ্যানথ্রাক্সের মত জীবাণু খেয়ে মহামারি থেকে আমাদের রক্ষা করে। মরা পচা খেয়ে ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করার মাধ্যমে এরা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে।
৫ ঘণ্টা আগে