
দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো কারণ দিন দিন কমছেই। সহজ কথায়, কাউকে দশ টাকা ঋণ দিলে ছয় টাকা ফেরত পাওয়ারও নিশ্চয়তা নেই। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতি ভালোর দিকে যাওয়ার বদলে কেবল খারাপই হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মাত্র তিন মাস আগে, মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা বা ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরের ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা থেকে ছয় মাসে বেড়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। এসব পরিসংখ্যানই দেখায়, দেশের ব্যাংকিং খাত এখন কতটা চাপে রয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এই বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ কি হঠাৎ আকাশ থেকে নেমে এসেছে? আমি বলব, একেবারেই না। এটি বহুদিন ধরে চাপা থাকা এক সংকট, যা নানা নীতিগত ছাড় আর হিসাবি কৌশলের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। পূর্ববর্তী সরকারের সময় খেলাপি ঋণ কম দেখাতে নানা কৌশল নেওয়া হয়েছিল। বিশেষ ব্যবস্থায় পুনঃতফসিল থেকে শুরু করে আদায় না হলেও ঋণ নিয়মিত দেখানো হতো। ২০১৯ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে খেলাপি হিসেবে দেখানোর সময়সীমা ছয় মাস বাড়ানো হয়।
২০০৯ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকায়। সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তা আরও বেড়ে হয় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এরপর ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত চিত্র ধীরে ধীরে সামনে আসতে থাকে।
২০২৫ সালের জুনে দেশে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। পরের প্রান্তিকে তা আরও বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুনঃতফসিলের সুযোগ দিলেও তাতে স্থায়ী সমাধান হয়নি। কারণ, পুনঃতফসিল ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়ায় না, শুধু পরিশোধের সময় বাড়ায়। ২০২১ সালে পুনঃতফসিল করা ঋণ ছিল ২৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, চার বছরে যা বেড়ে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে সমস্যাটি এখন শুধু ব্যাংকের নয়, পুরো অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।
মূলধনের চিত্রটাও উদ্বেগজনক। ব্যাংক খাতের ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন অনুপাত বা সিআরএআর একসময় ইতিবাচক অবস্থানে থাকলেও এখন ঋণাত্মক জায়গায় নেমে গেছে। এর সরল অর্থ হলো, দেশের ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধনটুকু ধরে রাখার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে।
সম্পদের বিপরীতে আয় আর ইকুইটির বিপরীতে আয়, দুটো সূচকই বহু ব্যাংকে সম্পূর্ণ ঋণাত্মক। গাণিতিক হিসাবে দেশের প্রতি তিনটি তফসিলি ব্যাংকের একটি আজ কার্যত দেউলিয়া সমতুল্য সংকটে। এটা কোনো বিমূর্ত পরিসংখ্যান নয়, এর অর্থ হলো এই ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা নেই, বিনিয়োগ থমকে আছে, আর সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন সেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যাদের হাত ধরেই অর্থনীতির প্রকৃত কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
সরকারের ভূমিকার কথাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তা প্রশংসনীয়। ১৮০ দিনের বদলে ৯০ দিনে ঋণ খেলাপি হিসেবে গণ্য করা এবং লুকানো মন্দ ঋণ প্রকাশ্যে আনার মতো পদক্ষেপ ছিল সাহসী। একই সঙ্গে শিল্প টিকিয়ে রাখা ও বন্ধ কারখানা সচল করতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি ঋণ আদায়, ব্যাংক পরিচালনায় শৃঙ্খলা ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারই ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে।
তুলনামূলকভাবে দেখলে বাংলাদেশের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট। ভারত, পাকিস্তান ও সংকট কাটিয়ে ওঠা শ্রীলঙ্কা ব্যাংকিং খাতে কঠোর শৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে মূলধন শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের নানা ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই ছাড়ের সংস্কৃতিই আজকের সংকটকে গভীর করেছে। এটি কোনো এক সরকারের সময়ের সমস্যা নয়, দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ফল।
এই সংকটের প্রভাব ব্যাংকের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অর্থনীতিতে। খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকের মুনাফা কমেছে। ২০২৫ সালে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৬টি লভ্যাংশ দিতে পেরেছে। ২০২৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ম আরও কঠোর করে বলেছে, খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি বা পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার কম হলে নগদ লভ্যাংশ দেওয়া যাবে না। নিয়মটি ইতিবাচক হলেও বড় ঋণে দীর্ঘমেয়াদি গ্রেস পিরিয়ডের সুযোগ থাকায় নীতির মধ্যে কিছুটা অসঙ্গতি দেখা দেয়। এতে আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের কাছে ব্যাংক খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তাহলে উত্তরণের পথ কী? আমার মনে হয়, শুরুটা করতে হবে ঋণ আদায়ের জট খুলে। বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকলে খেলাপি ঋণ কমবে না। অর্থঋণ আদালতে বিচারক ও জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করা জরুরি। দুর্বল ব্যাংককে বারবার করদাতার টাকায় টিকিয়ে রাখার বদলে প্রয়োজনে একীভূতকরণের পথে যেতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শুধু তালিকায় রাখলেই হবে না, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আর পুনঃতফসিল বা প্রণোদনার আগে দেখতে হবে, প্রতিষ্ঠানটি সত্যিই ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রাখে কি না। সবশেষে ঋণ দেওয়া থেকে শুরু করে তদারকি পর্যন্ত ব্যাংকের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকিং খাতকে বাঁচাতে এখন আর সাময়িক স্বস্তি নয়, দরকার মূল সমস্যায় হাত দেওয়া।
ব্যাংক হলো অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা। মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই পড়বে। বর্তমান সরকার প্রকৃত চিত্র সামনে আনার ক্ষেত্রে যে স্বচ্ছতা দেখিয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে শুধু সংখ্যা প্রকাশ করলেই হবে না, খেলাপি ঋণের পেছনের কাঠামোগত দুর্বলতাও দূর করতে হবে। এ সংকট থেকে বের হতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা। ব্যাংকিং খাতকে টেকসই করতে এর কোনো বিকল্প নেই।
.png)

পুরাকালে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির এক মহাদুর্যোগপূর্ণ রাতে যমুনার দুই পাড়ে জন্ম নেয় দুই ভিন্ন মায়ের দুই সন্তান—কৃষ্ণ ও যোগমায়া। মথুরার কারাগারে দেবকীর কোলে শ্রীকৃষ্ণ, আর ওপারে গোকুলে যশোদার ঘরে যোগমায়া। আজ তাঁদের জন্মদিন।
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রুর ধারণায় আবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান। তাই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে আলোচিত– বাংলাদেশে
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বায়োগ্যাস প্লান্ট—বর্জ্যকে প্রথমে শক্তিতে এবং শেষ পর্যন্ত খাবারে রূপান্তর করার এক অসাধারণ প্রক্রিয়া। একইসঙ্গে এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মৎস্য চাষ, প্রাণিসম্পদ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে এক সুতোয় গেঁথেছে।
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বেতন বৃদ্ধির অর্থ জোগাতে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় ও অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ বাড়বে। আর সেখানেই নতুন অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে—যা বেতন বৃদ্ধির দুর্নীতিবিরোধী যুক্তিকেই শেষ পর্যন্ত দুর্বল করে দিতে পারে।
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬