বিদেশে আরএসএসের মুখে ‘ভালোবাসার’ বাণী, দেশে খ্রিস্টানদের ওপর হামলা!
লেখা:স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরের একটি গ্রামীণ এলাকা সুতাহাটা। গত মে মাসের (২০২৬) রাজ্য নির্বাচনের পর থেকে এই রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এই সুতাহাটারই রানিচক গ্রামে গত ২৬ আগস্ট এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। গৌতম বেরা নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে সেদিন প্রায় ৫০ জন মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল—ঘরোয়া পরিবেশে বাইবেল পাঠ ও প্রার্থনা করা। উপস্থিতদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী, মূলত বেরা পরিবারের বন্ধু ও পরিচিতজন।
কিন্তু এই প্রার্থনার খবর পৌঁছে যায় উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর কানে। তাদেরই একজন গৌতম বেরার বাড়ির দিকে যাওয়ার পথে ফেসবুকে লাইভ ভিডিও শুরু করে। সে দাবি করে, এক খ্রিষ্টান যাজক নাকি হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করতে সেখানে গেছেন। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘চলুন দেখি ওরা কী করছে।’
সেখানে পৌঁছানোর আগেই তার অন্যান্য সঙ্গীরা ওই বাড়িতে হাজির হয়ে যায়। তারা জোর করে বাড়িতে ঢোকে, উপস্থিত মানুষদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। হামলাকারীদের হাতে ছিল গেরুয়া পতাকা। তারা অত্যন্ত রুক্ষভাবে প্রার্থনায় আসা মানুষদের ‘হরে কৃষ্ণ’, ‘হরে রাম’ এবং ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে বাধ্য করে।
হামলাকারীদের একজনকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ‘তোমরা হিন্দু। তোমাদের ঘরে হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি আছে। তোমরা কীভাবে একজন ফাদারকে ডেকে এনে খ্রিষ্টান ধর্ম পালন করছ? এরা এখন যিশুর কারবার শুরু করেছে। দেখো, আমরা একটা বাইবেল পেয়েছি! ভগবান, এদের কাছে বাইবেল আছে!’
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ এসে প্রার্থনায় আসা মানুষদের গাড়িতে তুলছে। তখন ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ কেউ চিৎকার করে বলছে, ‘মার ওদের, মার!’
ওই দিন বাইবেল পাঠ করছিলেন যাজক জয় কুমার ঘুঘু। তাঁর মতে, পুলিশ প্রথমেই তাঁকেসহ ১৭ জনকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। এরপর সুতাহাটা থানায় নিয়ে গিয়ে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সবার মোবাইল ফোন চেক করা হয়। রাত ৮টার দিকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
জয় কুমার বলেন, আমরা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি অভিযোগ করিনি। কারণ, যিশু আমাদের ক্ষমা করতে শিখিয়েছেন। আমরা তাদের মঙ্গলের জন্যই প্রার্থনা করব। তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে সবাইকে স্বাধীনভাবে নিজ ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার দেওয়া হয়েছে। তাহলে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারে বাধা দেওয়া হবে কেন? তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘আমরা কাউকে খ্রিষ্টান হওয়ার জন্য টাকা দিচ্ছি না।’
আরএসএস সংযোগ এবং লুকোচুরি
বিজেপির শীর্ষ নেতা অমিত মালব্য এই ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, স্থানীয়ভাবে কিছু আপত্তি উঠেছিল, যা পুলিশ শান্তিপূর্ণভাবে মিটিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প বলছে।
হামলাকারীরা নিজেদের ‘শ্রীরাম জন্মোৎসব সমিতি’-এর সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। এই সংগঠনটি আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কথা মোটেও গোপন রাখে না। তাদের ফেসবুক পেজে নিয়মিত আরএসএস এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র শেয়ার করা হয়।
সুতাহাটার ওই ঘটনায় ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তি নিজেকে ভিএইচপি-র সদস্য বলে দাবি করেছে। যাজক ও আয়োজকদের ভিডিও দেখিয়ে সে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেছে, ‘এদের যেখানেই দেখবেন, ঝাঁটাপেটা করবেন। এরা সন্ত্রাসবাদীদের চেয়েও খারাপ।’ বজরং দলের একটি পেজে আপলোড করা অন্য একটি ভিডিওতে বলা হয়েছে, ‘সনাতন ধর্ম হলো বিশ্বের সেরা ধর্ম। আমাদের ভিডিওতে যাদের দেখলেন, তাদের কোথাও দেখলে আমাদের খবর দিন।’
কয়েক ঘণ্টা পর ওই সমিতির ফেসবুক পেজে হুমকি দিয়ে লেখা হয়, ‘যারা ঈশ্বরের নামে ধর্মান্তকরণের কাজ করছে, তাদের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। যদি আমাদের হাতে ধরা পড়ো, তবে পরিণতি খুব খারাপ হবে।’
এসব কর্মকাণ্ডের কারণেই সম্প্রতি একটি ডাটাবেসে আরএসএস ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোকে (সঙ্ঘ পরিবার) ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উগ্র ডানপন্থী নেটওয়ার্ক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী মোদি আরএসএস-কে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘এনজিও’ বা বেসরকারি সংস্থা বলে থাকেন। আর এই বৈপরীত্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল সত্য। বিদেশে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে আরএসএস যে কতটা মরিয়া, তা তাদের শীর্ষ নেতার কথা থেকেই স্পষ্ট।
বিদেশে এক রূপ, দেশে আরেক
গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্য সফরে যান। সেখানে তিনি হিন্দু সভ্যতার পরিচয়ের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘বৈচিত্র্য আর ঐক্য একসঙ্গেই থাকতে পারে। আমরা যে এক, তা ভুলে গেলে চলবে না।’
৬ সেপ্টেম্বর লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে ভাগবত বলেন, “অনেকে বলে আমাদের কাজের মূল ভিত্তি হলো তীব্র ঘৃণা। কিন্তু সত্যটা ঠিক উল্টো। আমাদের কাজের ভিত্তি হলো ‘শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেম’ বা পবিত্র ভালোবাসা।” এর আগে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে তিনি বলেছিলেন, ‘নিজেকে হিন্দু বলতে হলে বিশ্বাস করতে হবে যে সব পথ একই গন্তব্যে পৌঁছায়। প্রতিটি মানুষের মর্যাদা রয়েছে, মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। বৈচিত্র্য হলো আমাদের জন্মগত ঐক্যের অলংকার। একে সম্মান ও রক্ষা করতে হবে।’
কী চমৎকার আর শান্তির কথা, তাই না? কিন্তু বাস্তবতা হলো—ভাগবত যখন বিদেশে বসে ভালোবাসা আর ঐক্যের বাণী শোনাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়েই পশ্চিমবঙ্গের বুকে তাঁর সংগঠনের লোকজন খ্রিষ্টানদের প্রার্থনা সভায় একের পর এক হামলা চালাচ্ছিল।
কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
২৩ আগস্ট: হাওড়ার উলুবেড়িয়ায় একটি গির্জায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। একই দিনে বজরং দলের কর্মীরা মগরাহাটে একটি ঘরোয়া প্রার্থনা সভা বন্ধ করে দেয়।
৩০ আগস্ট: দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারুইপুরে এক আইনজীবীর বাড়িতে খ্রিষ্টান প্রার্থনার কারণে তাঁকে মারধর করা হয়। হাওড়া ও উত্তর চব্বিশ পরগনাতেও প্রার্থনা সভা ভাঙচুর করা হয়।
১ সেপ্টেম্বর: আরএসএসের আরেক শাখা ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চ’ হাসনাবাদে খ্রিষ্টানদের পরিচালিত একটি স্কুল তালাবন্ধ করে দেয়। তাদের প্রশ্ন ছিল, ‘স্কুলে কেন যিশুর ছবি থাকবে? কেন বাচ্চাদের যিশুর জীবনী পড়ানো হবে? এই স্কুল বন্ধ করতে হবে।’
৭ ও ৯ সেপ্টেম্বর: হাওড়া ও মগরাহাটে ভিএইচপি ও বজরং দলের পরিচয়ে একদল লোক প্রার্থনায় বাধা দেয় এবং যিশুর উপাসনা নিয়ে আক্রমণাত্মক জিজ্ঞাসাবাদ করে।
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর: ক্যানিংয়ে ভিএইচপি কর্মীরা প্রার্থনা সভায় ঢুকে যিশুর ছবি ছিঁড়ে ফেলার নির্দেশ দেয়। তারা হুমকি দিয়ে বলে, ‘যার কাছে খুশি নালিশ করো, আমরা ভিএইচপি আর বজরং দল থেকে এসেছি। দেখি কার কত ক্ষমতা!’ অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারীরা ঈশ্বরের ওপর লেখা বইপত্র ছিঁড়ে ফেলছে এবং চিৎকার করে বলছে, ‘গীতা পড়ো না কেন? হরে কৃষ্ণ বলো না কেন?’
নতুন এক আতঙ্ক
২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিষ্টানবিরোধী হামলা বেড়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে এটি একেবারেই নতুন ঘটনা। এই রাজ্যে খ্রিষ্টানদের সংখ্যা মাত্র ০.৭২ শতাংশ। তারা মূলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দাতব্য কাজ করে থাকে।
বঙ্গীয় খ্রিষ্টীয় পরিষেবার (বিসিপি) সম্পাদক হেরোদ মল্লিকের কণ্ঠে কিছুটা হতাশা আর কিছুটা আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘মোহন ভাগবত বিদেশে যেসব কথা বলেছেন, তাতে আমরা আশাবাদী হতে চাই। আমরা চাই প্রশাসন সেই ভালোবাসা আর সম্প্রীতির কথাগুলো বাস্তবে রূপ দিক।’ কিন্তু তিনি এও জানেন যে, বহু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা ভয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগই করেন না। আর অভিযোগ করলেও পুলিশ হামলাকারীদের না ধরে উল্টো ভুক্তভোগীদেরই হয়রানি করে।
এই হামলাগুলো মূলত ছোট ছোট ঘরোয়া প্রার্থনা সভা বা ‘হাউস চার্চ’গুলোকে লক্ষ্য করে হচ্ছে। সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিমের মতে, এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল রয়েছে। ছোট জায়গাগুলোতে হামলা চালালে তা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজরে পড়বে না। বড় গির্জায় হামলা হলে বিদেশে খবর হয়ে যাবে। তাই নীরবে সাধারণ খ্রিষ্টানদের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়াই এদের মূল লক্ষ্য।
সুতাহাটার ঘটনার একটি ভিডিওতে এক হামলাকারীকে বলতে শোনা যায়, ‘রাজ্যে সরকার বদলের পরও এরা অন্য ধর্ম প্রচার করছে। তাই এদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি।’ এই একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয়, ক্ষমতার পালাবদল কীভাবে উগ্রবাদীদের মনে সাহস জুগিয়েছে।
(দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে লেখাটি ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)
.png)









