আইফোনের জন্য খুন ও এজলাসে সামাজিক বন্দোবস্ত

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

১৩ বছরের একটা ছেলেকে খুন করা হয়েছে একটি ‘আইফোনের জন্য’। ঘটনাটি কুমিল্লার কোটবাড়ির। জড়িত সন্দেহে পুলিশ এরই মধ্যে আটক করেছে চারজনকে। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২১ ঘণ্টা পর লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিমের মাথায় আঘাত পাওয়া নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আজ জানাজাও হয়ে গেল।

এই খুনের ঘটনার পরবর্তী ধাপগুলো ইদানীং আমাদের কাছে খুব চেনা হয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে পুলিশি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ছেলেটির মরদেহ উদ্ধারের আগের দিন নিখোঁজের ঘটনায় পরিবার জিডি করলেও পুলিশের তৎপরতা যদি তাৎক্ষণিক হতো, হয়তো স্বস্তিদায়ক ফল পাওয়া যেত, যেহেতু সঙ্গে একটি মোবাইল ফোন ছিল।

ডাক্তার আসিবার আগে রোগীর মৃত্যু নিয়ে প্রবাদের অকার্যকারিতাও প্রমাণ করা যাচ্ছে না কিছুতেই যেন! এই বিষফোড়া গভীর, যেন চিকিৎসার উর্ধ্বে, ধনন্তরি বিদ্যাও অকার্যকর।

ইতিমধ্যে হত্যা মামলা হয়েছে। কিন্তু মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আগাম কেউ কিছু বলতে পারবে না। কারণ এই পোড়ার দেশে খুনের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শত বারেরও বেশি তারিখ চাওয়ার নজির রয়েছে। আবার আদালতের পরবর্তী তারিখও খুব একটা কাছে থাকে না, দূরের বাদ্যের মতোই!

অপ্রতিমের পরিবারের কী হবে? মামলার তদন্তের ধীরগতি, সাক্ষীদের গরহাজিরা আর বিচারিক দীর্ঘসূত্রতাই সম্ভাব্য ফল। পাঁচ-সাত বছর পর জামিন পেয়ে আসামিরা একসময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরেও যাবে। কিন্তু যে মায়ের কোল খালি হলো, তাঁর সান্ত্বনা কী?

শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে? আসামিরা যেহেতু বয়সে তরুণ, খুব সম্ভবত প্রচলিত শিশু আইনের অধীনেই বিচার এগোবে। সেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে কয়েক বছরের আটকাদেশ। আবার দেশে ‘দেখাব আলোর পথ’ বলে যেন চোখেমুখে অন্ধকার দেখানোর ঘটনাও কম না। বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা—প্রবাদের মতো সমাজেই যেন অন্তর্লীন হয়ে আছে এক সম্ভাব্য আগামবার্তা। সব কিছু জানা আমাদের! কিশোর সংশোধনের কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ উন্নয়নের দিকে না ঠেলে কিছুটা ত্যাড়া পথে এগোয় বলেও মনে করি। এটা যেন আরেকটি অপরাধের পাঠশালা পরিচিতি পেয়ে আছে। কতজন সংশোধন হলো সে পরিসংখ্যান কেউ করে না। কাজীর গরুর হিসাবটাই যেন জরুরত, গোয়ালে ভ্রুক্ষেপ করে না কেউ।

অপ্রতিমের পরিবারের কী হবে? মামলার তদন্তের ধীরগতি, সাক্ষীদের গরহাজিরা আর বিচারিক দীর্ঘসূত্রতাই সম্ভাব্য ফল। পাঁচ-সাত বছর পর জামিন পেয়ে আসামিরা একসময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরেও যাবে। কিন্তু যে মায়ের কোল খালি হলো, তাঁর সান্ত্বনা কী?

আইনের এই সীমাবদ্ধতার চেয়েও বড় সংকট তৈরি হয়েছে আমাদের ঘরের ভেতরে। আইন মূল্যবোধের কথা বলে, ন্যায়পরায়ণতার কথা বলে। উই ওয়ান্ট জাস্টিস বলা মানুষেরা মুখ ফিরিয়ে আগের পথে হাটে। জগদ্দল পাথর কেউ সরাতে চায় না। ভেতর থেকে তাগিদ না থাকলে শুধু উপরিতলের কাঠামোতে কতটা শক্তভাবে বাঁধা যায়, হিসেব করা শিখতে হয়। কিন্তু কে শেখাবে? ‘দে ডু নাথিং টু গেট জাস্টিস’—দীর্ঘশ্বাসের আক্ষেপও কম নয়।

কিশোরদের মধ্যে হিংস্রতা বেড়ে চলার কারণ খুঁজলে সামাজিক মূল্যবোধের ভেঙে পড়াকেই আগে দেখতে হবে। পরিবার ও সমাজে সাফল্য যে পাল্লায় মাপা হয়, একই পাল্লায় নীতি-নৈতিকতা-আচার-ব্যবহার ইত্যাদি মানবীয় গুনাবলী মাপা হয় না। মাপা যে হবে, সেই আশাও সুদূরপরাহত। আজকাল সত্য ওজনদরে মাপা যাচ্ছে, মানবিকতাও দেখানো যাচ্ছে বাহারি পথে। মনের খবর কেউ রাখে না। আর যারা রাখতে চায়, তারা হয় কোনঠাসা, বেশি কথা বলা লোক। এই ‘বেশি কথা’ বলতে গিয়েই কতজন কাঠগড়ায় চলে গেল, ক্রুশবিদ্ধ হলো! আজ মানবিক মূল্যায়ন যেন ‘কথার কথা’।

কার হাতে দামি গ্যাজেট, কার প্রভাব কতটা—এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বড়রাই ছোটদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। বড়দের দায় নিতে হবে। সহমর্মিতা, অন্যের ক্ষতি না করার শিক্ষা কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চর্চা পরিবার থেকে হারিয়ে গেছে।

কার হাতে দামি গ্যাজেট, কার প্রভাব কতটা—এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বড়রাই ছোটদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। বড়দের দায় নিতে হবে। সহমর্মিতা, অন্যের ক্ষতি না করার শিক্ষা কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চর্চা পরিবার থেকে হারিয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সেই শিক্ষক নেই। যার মনটা নরম, তার মেধাটা কি একটু কম? হয়তো মেধামাপার মাপকাঠিটা আরেকবার পরখ করা দরকার। কিন্তু বন্দোবস্ত তো একসনা নয়, কায়েমি ব্যবস্থা ভাঙা জরুরি, ন্যায়প্রতিষ্ঠাও জরুরি। যুগে যুগে এজন্য যারা আসেন, আজ তারা কাগজেই যেন চলে গেছেন। অধিকাংশের প্রাত্যহিক জীবনে তারা নেই। সেই সুযোগে একশ্রেণির কিশোরের কাছে মানুষের জীবনের মূল্যের চেয়ে একটি দামি ডিভাইসের মালিক হওয়া বড় হয়ে উঠেছে। যে বয়সে খেলার মাঠে থাকার কথা, সেই বয়সে তারা পণ্যের মোহে খুন করতে দ্বিধা করছে না।

অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের পর সন্তান হারানো মাকে সান্ত্বনা দিতে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। মা নাহিদা বেগম সংসদ সদস্যের কাছে কোনো বিচার চাননি। সন্তানহারা মা জানতে চেয়েছেন, তাঁর ছেলে কী অপরাধ করেছিল? এটা কোন দেশ?

আবার একই সময়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমলকে চুরির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার পর তাঁর বাবার বক্তব্যটি সামনে এসেছে। তিনি কোনো আইনি ঝামেলায় না গিয়ে বলেছিলেন, বিচার তিনি ওপরওয়ালার কাছে ছেড়ে দিয়েছেন। এসবই গণমাধ্যম সূত্রের খবর। কিন্তু প্রশ্নটা আরও গভীর। সাধারণ মানুষের এই অনীহা একদিনে তৈরি হয়নি। মানুষ দেখেছে, রাষ্ট্রের এজলাসে গিয়ে বিচারের আশায় দিন গুনতে গুনতে জীবন পার হয়ে যায়, অথচ অপরাধী কোনো না কোনো ফাঁক দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়।

অপরাধ ঘটার পর তাকে সাজা দেওয়ার মেকানিজমের নাম আইন, কিন্তু মানুষের ভেতরের অপরাধপ্রবণতা থামানোর দায়টা আসলে কার? তালাশ ও উপলব্দি জরুরি।

  • মাইনুল শাহিদ: কবি ও সাংবাদিক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত