বাংলাদেশে করপোরেট সম্প্রসারণের সীমা কোথায়?

স্ট্রিম গ্রাফিক

অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে বলা হয়, মুক্ত বাজার প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করে এবং প্রতিযোগিতা মূল্য কমায়, মান বাড়ায় ও উদ্ভাবন ঘটায়। কিন্তু এই তত্ত্ব কার্যকর থাকে কেবল তখন, যখন বাজারে অনেক প্রতিযোগী সমানভাবে লড়তে পারে। বাস্তবে বড় কর্পোরেট গ্রুপের সুবিধাগুলো এতটাই অপ্রতিসম যে শুধু ‘ভালো পণ্য বা সেবা’ দিয়ে ছোট উদ্যোক্তারা টিকতে পারেন না। এই বাস্তবতা এখন বাংলাদেশের জন্য ক্রমে আশু বিবেচনার বিষয় হয়ে উঠছে।

একটি উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলাদেশের করপোরেট জগতে দীর্ঘকালের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি হল প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ থেকে যাত্রা শুরু করে আজ তারা প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক্স, আসবাবপত্র, প্রসাধনী, সাইকেল, মোবাইল ফোন, অনলাইন বাণিজ্য, সুপারশপ, ফাস্টফুড, মিষ্টান্ন এমনকি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ও পা রেখেছে। সম্প্রতি ‘টুকটুক এক্সপ্রেস’ নামে থাই রেস্তোরাঁ চালু করার খবর নতুন করে একটি পুরনো প্রশ্নকে সামনে এনেছে— একটি করপোরেট গ্রুপ ঠিক কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে? আর রাষ্ট্রের কি এই বিস্তারে কোনো সীমা নির্ধারণ করা উচিত? তারা চাইলেই কি সবকিছু করে ফেলতে পারে, বা পারবে বা পারতে দেওয়া উচিত? এই প্রশ্ন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ নয়। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কাঠামো, প্রতিযোগিতার স্বাস্থ্য এবং লাখ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার অস্তিত্ব নিয়ে একটি বৃহত্তর বিতর্ক।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিস্তার নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের শিল্প ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ৮,০০০-এর বেশি পণ্য, ১০০-এরও অধিক ব্র্যান্ড, প্রায় দেড়শ দেশে রপ্তানি এবং বিলিয়ন ডলার ক্লাবে স্থান পাওয়া। এ অর্জন ছোট নয়। তারা তরুণের কর্মসংস্থান করেছে, গ্রামাঞ্চলে আধুনিক সাপ্লাই চেইন গড়ে তুলেছে, কৃষকদের সংগঠিত করেছে এবং বাংলাদেশের পণ্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিচিত করিয়েছে। এই সাফল্য অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু সাফল্যের এই উজ্জ্বল দিকটির বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি বাস্তবতা। যখন একই গ্রুপ খাবার উৎপাদন করে, দোকান চালায়, রেস্তোরাঁ পরিচালনা করে, অনলাইনে ডেলিভারি দেয়, কৃষিপণ্য নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভোক্তাপণ্যের প্রতিটি স্তরে উপস্থিত থাকে, তখন প্রশ্ন জাগে—অর্থনীতির কতটা অংশ একক গোষ্ঠীর হাতে থাকা নিরাপদ? এই প্রশ্নটি বিশ্বের যেকোনো পরিণত অর্থনীতিতেই গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়।

প্রাণ-আরএফএলের মতো গ্রুপের কাছে রয়েছে ৩,০০০-এরও বেশি আউটলেটের বিতরণ নেটওয়ার্ক, বিশাল বিজ্ঞাপন বাজেট, ব্যাংকিং সুবিধা ও সস্তায় কাঁচামাল পাওয়ার সক্ষমতা, শক্তিশালী ব্র্যান্ড পরিচিতি এবং দীর্ঘদিনের গ্রাহক আনুগত্য। একজন নতুন উদ্যোক্তা যখন রেস্তোরাঁ খুলতে চান, তাকে কেবল সুস্বাদু খাবার তৈরি করলেই চলে না। তাকে একই সাথে একটি বহুজাতিক গ্রুপের লয়্যালটি প্রোগ্রাম, সাপ্লাই চেইন সুবিধা, কেন্দ্রীয় মার্কেটিং এবং ব্র্যান্ড পাওয়ারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। এই লড়াই থেকে কে জিতবে, তা সহজেই অনুমেয়।

এই প্রবণতাকে অর্থনীতিবিদরা বলেন ‘কর্পোরেট কেন্দ্রীকরণ’। এটি কেবল ছোট উদ্যোক্তাদের সমস্যা নয়, দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো অর্থনীতির স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। কারণ একবার প্রতিযোগিতা কমে গেলে, বড় গ্রুপগুলো মূল্য নির্ধারণে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারে, উদ্ভাবনের তাগিদ কমে যায় এবং কর্মসংস্থানের বৈচিত্র্য হ্রাস পায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কোনো প্রান্তিক ভূমিকায় নেই। তারা মূলধারা। এসএমই ফাউন্ডেশনের দেওয়া তথ্যমতে, এটি দেশের জিডিপিতে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং অকৃষি খাতে মোট কর্মসংস্থানের ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশ অবদান রাখে। অন্যান্য দেশের তুলনায় কম হলেও বাংলাদেশের জিডিপিতে তাদের সরাসরি অবদান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। তুলনামূলক এই কম অবদানের আংশিক কারণ তারা পর্যাপ্ত নীতি সহায়তা পান না।

প্রবৃদ্ধির সুফল গুটিকয়েক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হলে জিডিপি বাড়লেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। প্রকৃত উন্নয়ন মানে হলো সুযোগের সুষম বণ্টন, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং এমন একটি পরিবেশ যেখানে একজন তরুণ উদ্যোক্তা জানেন যে পরিশ্রম ও উদ্ভাবন দিয়ে তিনি টিকে থাকতে পারবেন।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনীতি সচল রাখেন, স্থানীয় বৈচিত্র্য ধরে রাখেন এবং নতুন ব্যবসায়িক ধারণার উৎস হন। একটি পাড়ার ছোট রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষতি শুধু মালিকের নয়; সঙ্গে এর কর্মীদের, পরিবারের, স্থানীয় সরবরাহকারীদের এবং পুরো এলাকার অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্যে প্রভাব পড়ে। এই ক্ষতি জিডিপির সংখ্যায় তাৎক্ষণিক দেখা যায় না। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকে ক্ষয় করে।

আরও গভীর সমস্যা হলো উদ্যোক্তা হওয়ার আকাঙ্ক্ষার ক্ষয়। যখন একজন তরুণ দেখে, কোনো খাতে একটি বড় গ্রুপ এসে বাজারটি দখল করে নিয়েছে, তখন তার নতুন কিছু শুরু করার সাহস কমে যায়। উদ্যোক্তা মানসিকতার এই ক্ষয় একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উদ্ভাবন শক্তিকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশ এ সমস্যায় একা নয়। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে স্যামসাং, হুন্দাই, এলজির মতো বড় শিল্পগোষ্ঠী দ্রুত শিল্পায়ন ঘটিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সুলভ ঋণের বিনিময়ে তারা বিশ্ব বাজারে কোরিয়াকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু ১৯৯৭ সালের এশিয়ান আর্থিক সংকটে স্পষ্ট হয়ে গেল যে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর, অসম্পর্কিত খাতে বিস্তৃত এই গোষ্ঠীগুলো কতটা ভঙ্গুর। দাইউ গ্রুপ ভেঙে পড়েছিল। অন্যরা পড়েছিল গুরুতর সংকটে। এরপর থেকে কোরিয়া সরকার এদের ক্রস-ওনারশিপ সীমিত করে। পারিবারিক শাসন কাঠামোয় স্বচ্ছতা এনে এসএমই সুরক্ষায় মনোযোগ দেওয়া শুরু করেছে। সমস্যা এখনও পুরোপুরি মেটেনি। কিন্তু শিক্ষাটি স্থায়ী।

যুক্তরাষ্ট্র একশ বছরেরও বেশি আগে বুঝেছিল যে নিয়ন্ত্রণহীন বাজার শেষ পর্যন্ত মুক্ত বাজারকেই ধ্বংস করে। ১৯১১ সালে তেল শিল্পে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করা স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানিকে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে ৩৪টি পৃথক প্রতিষ্ঠানে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। শেরম্যান এন্টিট্রাস্ট অ্যাক্ট ও ক্লেইটন অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সুরক্ষার যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, আজ তা ডিজিটাল যুগেও প্রযোজ্য। গুগল, অ্যাপল, অ্যামাজন ও মেটার বিরুদ্ধে বাজার আধিপত্যের অভিযোগে মামলা চলছে। ফেডারেল ট্রেড কমিশন সক্রিয়ভাবে মার্জার ও অধিগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরও এক ধাপ এগিয়ে। ২০২২ সালে চালু হওয়া ডিজিটাল মার্কেট অ্যাক্ট সরাসরি নির্দিষ্ট করে দিয়েছে কোন কোম্পানিগুলো ‘গেটকিপার’ এবং তাদের আচরণে কী কী বিধিনিষেধ প্রযোজ্য। গুগলকে ইউরোপে বহুবার শত কোটি ইউরো জরিমানা দিতে হয়েছে। এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বড় কোম্পানিকে ধ্বংস করতে নয়—বরং বাজারে সুষম প্রতিযোগিতার মাঠ তৈরি করতে।

বাংলাদেশে প্রতিযোগিতা সংরক্ষণের জন্য ২০১২ সালে কম্পিটিশন অ্যাক্ট প্রণীত হয়েছে এবং বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন (বিসিসি) গঠিত হয়েছে। কিন্তু কমিশনটি যে শক্তি নিয়ে কাজ করার কথা, তা আজও গড়ে ওঠেনি। পর্যাপ্ত বাজেট নেই, দক্ষ জনবল সীমিত, মার্জার ও অধিগ্রহণ নিয়ন্ত্রণের কাঠামো দুর্বল এবং বড় শিল্পগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাব তদন্তকে কঠিন করে তোলে। ফলাফল: আইনটি কাগজে আছে, বাস্তবে তার প্রভাব সীমিত।

এর সাথে যোগ হয় মিডিয়া নির্ভরতার সমস্যা। বড় করপোরেট গ্রুপগুলো দেশের প্রধান বিজ্ঞাপনদাতাদের অন্যতম। অনেক মিডিয়া হাউজের মালিক তারা। ফলে প্রচারমাধ্যমেও তাদের সমালোচনা কম জায়গা পায়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সংগঠনগুলো দুর্বল। তাদের কণ্ঠ নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছায় না। এই কাঠামোগত অসমতা সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।

প্রাণ-আরএফএলের রেস্তোরাঁ ব্যবসায় প্রবেশটিকে আলাদাভাবে দেখার কারণ আছে। রেস্তোরাঁ শিল্প বাংলাদেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাবুর্চি, একটি পরিবার, একটি এলাকার মানুষ—এরা ছোট ছোট রেস্তোরাঁ চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। এই খাতে যখন বিশাল কর্পোরেট নেটওয়ার্ক প্রবেশ করে সাপ্লাই চেইন সুবিধা, কেন্দ্রীয় রান্নাঘর এবং ব্র্যান্ড পাওয়ার নিয়ে, তখন ছোট রেস্তোরাঁগুলোর অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ে।

এখানে প্রশ্নটা পণ্যের মানের নয়। হয়তো ‘টুকটুক এক্সপ্রেস’ সত্যিই সুস্বাদু থাই খাবার পরিবেশন করবে। কিন্তু যে প্রশ্নটা করা দরকার তা হলো—এই প্রতিযোগিতা কি সমান মাঠে হচ্ছে? একটি ছোট রেস্তোরাঁ মালিক কি একইভাবে সরবরাহ, বিজ্ঞাপন, প্রযুক্তি এবং মূল্য নির্ধারণের সুবিধা পান?

সমাধান বড় কোম্পানিকে থামিয়ে দেওয়া নয়। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলে যে সমাধান হলো, সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, শক্তিশালী প্রতিযোগিতা কমিশন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সুরক্ষামূলক নীতি এই তিনটি মিলিয়ে একটি সুষম পরিবেশ তৈরি করা।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা, প্রয়োজনীয় সম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্তের ক্ষমতা দিতে হবে। একটি করপোরেট গ্রুপ কতগুলো অসম্পর্কিত খাতে বিস্তৃত হতে পারবে এবং কোনো একক বাজারের কত শতাংশ দখলে রাখতে পারবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। ক্রস-ওনারশিপ ও মার্জার নিয়ন্ত্রণে দৃঢ়তা আনতে হবে।

একই সাথে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য কম সুদে ঋণ, বাজারে প্রবেশের সুযোগ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাদের সংগঠনগুলোকে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অর্থবহভাবে যুক্ত করতে হবে। উন্নয়ন করতে হবে কর্পোরেট গভর্ন্যান্স ও স্বচ্ছতার মান যাতে শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ওপর জনগণের জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকে।

প্রবৃদ্ধির সুফল গুটিকয়েক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হলে জিডিপি বাড়লেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। প্রকৃত উন্নয়ন মানে হলো সুযোগের সুষম বণ্টন, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং এমন একটি পরিবেশ যেখানে একজন তরুণ উদ্যোক্তা জানেন যে পরিশ্রম ও উদ্ভাবন দিয়ে তিনি টিকে থাকতে পারবেন।

বড় করপোরেট গ্রুপ ও সচল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা দুটি পরস্পরবিরোধী নয়। এরা বরং পরস্পরের পরিপূরক। কিন্তু এই সমন্বয় আপনা-আপনি হয় না। এর জন্য প্রয়োজন সচেতন নীতি, সক্রিয় নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি। টুকটুক এক্সপ্রেসের থাই খাবারের আলাপটি তাই আসলে একটি বড় প্রশ্নের ছোট্ট উপলক্ষ মাত্র। প্রশ্নটি হলো, আমরা কেমন অর্থনীতি চাই এবং সেই অর্থনীতি গড়তে আমরা কতটা সত্যিকারের প্রস্তুত।

লেখক: সাংবাদিক

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত