রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের সাক্ষাৎকার

মেগা প্রকল্পের নামে ‘গিগা দুর্নীতি’ আর নয়, ঋণ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আসছে বড় সংস্কার

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন বিশ্লেষক ও গবেষক। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক চেয়ারম্যান। আসন্ন জাতীয় বাজেট, সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, পঞ্চবার্ষিক কৌশলপত্রসহ অর্থনীতির নানা দিক নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। স্ট্রিম ছবি

স্ট্রিম: আপনি ‘অর্থনীতির গণতান্ত্রিকায়ন’-এর কথা বলেছেন। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকেও এই ভাষ্যটি গ্রহণ করা হয়েছে। এই বাজেটে অর্থনীতির গণতান্ত্রিকায়নের কী কী ছাপ বা প্রতিফলন আমরা দেখতে পাব?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: পতিত সরকারের সময়কার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ছিল সম্পূর্ণ গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। এটি ছিল অলিগার্কিক। সেখানে সর্বসাধারণের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। মূলত কিছু মানুষ নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে, স্বজনপ্রীতি করতে এবং নিজেদের পৃষ্ঠপোষকদের সুবিধা দিতেই ওই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ইতিহাস বলে, এ ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একটা পর্যায়ে এসে এটি ভেঙে খানখান হয়ে গেছে। এখন এর পুরো বোঝাই জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। অপরাধীদের দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে।

ঠিক এসব কারণেই অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন জরুরি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। 'সবার জন্য বাংলাদেশ' যদি গড়ে তুলতে হয়, অর্থাৎ অর্থনীতিতে যদি সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হয়, তবে সেই অলিগার্কিক বা গোষ্ঠীতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতেই হবে। অর্থনীতির এই উত্তরণ কেন প্রয়োজন? অর্থনীতির সুফল যদি সবার দোরগোড়ায় না-ই পৌঁছায়, তবে এই প্রবৃদ্ধির অর্থ কী? প্রবৃদ্ধির সুফল কে ভোগ করবে? দেশের প্রতিটি গৃহস্থালি ও প্রতিটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এই প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছে দিতে হবে। সরকারের মূল লক্ষ্যই হলো জনকল্যাণ নিশ্চিত করা, যাতে সরকার স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো জনবান্ধব পরিষেবাগুলো সবার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে। এর মাধ্যমেই কর্মসংস্থান তৈরি হবে, মানুষের মধ্যে কর্মস্পৃহা জাগবে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবে এবং নিজের ন্যায্য মজুরি পাবে। যার যা প্রাপ্য, তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে আমাদের একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

স্ট্রিম: ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ বা সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার যে রূপরেখা আপনি দিলেন, সেখানে আমাদের দেশের বিশাল জনসংখ্যা বা ডেমোগ্রাফিক কাঠামোকে কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমরা বলছি, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে হলে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন অপরিহার্য। আমাদের যুবসমাজের মাধ্যমে যে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশ অর্জনের কথা ছিল, সেটি তো হয়নি। এই সুযোগ যেকোনো দেশের জীবনে একবারই আসে। বর্তমানে এই সুযোগ কাজে লাগানোর সম্ভাবনা রয়েছে আমাদের প্রায় ৪০ শতাংশের মতো। অন্যদিকে, সমাজের সকল স্তরের মানুষ, বিশেষ করে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও জরুরি। কারণ, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। তাই আমাদের ‘লংজিভিটি ডিভিডেন্ড’ বা দীর্ঘায়ুর লভ্যাংশও কাজে লাগাতে হবে। অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করা গেলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের পাশাপাশি লংজিভিটি ডিভিডেন্ডও অর্জিত হতো। এর সম্মিলিত ফল হিসেবে আমরা একটি ‘ডেমোক্রেটিক ডিভিডেন্ড’ বা গণতান্ত্রিক লভ্যাংশ পেতাম।

সোজা কথায়, অর্থনীতিতে সবার অংশগ্রহণ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি খাত এবং প্রতিটি অঞ্চলের জন্য সমান সুযোগ থাকতে হবে, নারী-পুরুষের সমতা বিধান করতে হবে। এটিই মূলত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা—সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার। অতীতে কেবল চেতনা বিক্রি করা হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। এই পটভূমিতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র’ গঠনের কথা বলেছেন। এর আলোকেই আগামী বাজেট প্রণীত হতে যাচ্ছে।

স্ট্রিম: পঞ্চবার্ষিক কর্মকৌশল প্রণয়নের কাজ প্রায় শেষের দিকে। হয়তো বাজেটের সাথেই আমরা সেটি পেয়ে যাব। আসন্ন বাজেটে সেই কর্মকৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ থাকছে?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: বাজেটে অবশ্যই জনরায়ের প্রতিফলন ঘটবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। পরবর্তীতে সেই পরিকল্পনাগুলো কর্মসূচি আকারে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অধ্যায়ে বিন্যস্ত করে নির্বাচনী ইশতেহারে উপস্থাপন করা হয়। এই পাঁচটি অধ্যায় হলো: রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার; বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন; ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন; সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন; এবং ক্রীড়া, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতির মাধ্যমে সমাজে বিভাজনের বিপরীতে সংহতি অর্জন। এর মূল সুরই হলো একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন। এটি আমাদের ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতি ছিল। জনগণ আমাদের ম্যান্ডেট বা জনাদেশ দিয়েছে। তাই সেই ম্যান্ডেটের আলোকেই এই পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি ইতোমধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় উপস্থাপিত ও অনুমোদিত হয়েছে।

গণতান্ত্রিক মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত জরুরি, তেমনি সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষাও অত্যাবশ্যক। আবার বিনিয়োগকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন, যা স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে পারে। দক্ষ জনশক্তি ছাড়া কোনোভাবেই শিল্পায়ন বা প্রযুক্তিগত উত্তরণ ঘটবে না।

এই কৌশলে আমরা ত্রিমাত্রিক কৌশলের কথা বলেছি। আমাদের লক্ষ্য হলো ‘ভঙ্গুরতা থেকে সমৃদ্ধি’। এই কৌশলের ধাপগুলো হলো—পুনরুদ্ধার; স্থিতিশীলতা আনয়ন; এবং তৃতীয়ত, পুনর্গঠন। কেন এই পুনর্গঠন? সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য। অর্থাৎ, ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন’। এর আলোকেই বাজেট প্রণীত হচ্ছে। তার মানে, প্রথমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’, সেখান থেকে নির্বাচনী ইশতেহার, ইশতেহার থেকে পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশল এবং চূড়ান্তভাবে বাজেট—এই প্রতিটি স্তরের মধ্যে একটি চমৎকার সমন্বয় সাধন করা হয়েছে।

এই সমন্বয়ের ফলে একদিকে যেমন একটি মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো থাকছে, তেমনি ‘মিডিয়াম টার্ম বাজেটারি ফ্রেমওয়ার্ক’-এর আলোকে বাজেট প্রণীত হচ্ছে। আমাদের সামষ্টিক কৌশলে ২০৩৪ সালের মধ্যে একটি ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কৌশলের আওতায় খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সংস্কারের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এগুলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির ওপর ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, পরিচালন ব্যয় এবং কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ সার্বিক উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে চরম সংকটকালীন একটি অর্থনীতি পেয়েছি। আমরা মনে করি, এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতেই হবে। এই বিষয়ে বর্তমান সরকারের ওপর মানুষের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।

স্ট্রিম: সরকারের প্রতি মানুষের আস্থার কথা বললেন। বিএনপি সরকারের প্রতি মানুষের এই আস্থার ভিত্তি আসলে কী? কেন মানুষ আপনাদের ওপর এই আস্থা রাখছে?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: কারণ, অতীতে দেশের প্রতিটি বড় সংকট বিএনপি সরকারই সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দুর্ভিক্ষপীড়িত অর্থনীতি, চরম মূল্যস্ফীতি এবং বিশ্বব্যাপী তেলের সংকট—এমন এক টালমাটাল সময়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেন। তখন বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বা বাস্কেট কেস বলে তাচ্ছিল্য করা হতো। তিনি সেই অবস্থা থেকে দেশটিকে একটি সক্ষম ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। আমাদের অর্থনীতির মূল প্রাণশক্তিগুলোর সূচনা কিন্তু তাঁর সময়েই হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ রেমিট্যান্সের কথা বলা যায়। সেই সময়ের ভয়াবহ তেল সংকটের মুখে সাধারণ চিন্তাধারায় বলা হতো কৃচ্ছ্রসাধন করতে কিংবা আইএমএফ-এর বেইল আউট প্যাকেজের শরণাপন্ন হতে। কিন্তু তিনি ভিন্ন পথে হাঁটলেন। তিনি খেয়াল করলেন, মধ্যপ্রাচ্য বা উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিপুল উদ্বৃত্ত পুঁজি পুঞ্জীভূত হচ্ছে, আর আমাদের হাতে রয়েছে বিশাল উদ্বৃত্ত জনশক্তি। তিনি আমাদের দেশোপযোগী নিজস্ব কৌশলে সেখানে জনশক্তি রপ্তানি ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা করলেন, যার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ ফিরে এসেছিল।

দ্বিতীয়ত, তিনি দেশে একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি করেছিলেন। যখন ‘মাল্টি ফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্ট’-এর অধীনে তৈরি পোশাক শিল্পে কোটা সুবিধা ছিল, তখন তিনি একদল মানুষকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠান। তাদের হাত ধরেই আজকের বাংলাদেশের এই বিশাল শিল্পোদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে উঠেছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ‘বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ’ বা বেপজা তাঁর সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয়। বৈদেশিক বিনিয়োগ আইন প্রণয়ন এবং বিনিয়োগকে কীভাবে উৎসাহিত করা যায়, সেই কাঠামোগুলোও তাঁর আমলেই গড়ে উঠেছিল।

মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া উত্তরাধিকার সূত্রে এমন এক অর্থনীতি পেয়েছিলেন যা পুরোপুরি বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর ছিল। তিনি সেখান থেকে দেশকে স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। প্রথমত, দেশের ইতিহাসে তাঁর শাসনামলেই দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি কমেছিল। দ্বিতীয়ত, তাঁর সময়ে শ্রমবাজারে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। এর ফলে শিল্প খাতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায় এবং উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে ওঠার মাধ্যমে অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আসে। জিডিপিতে কৃষিকে ছাড়িয়ে শিল্প খাত বড় অবদান রাখতে শুরু করে। পাশাপাশি কৃষিতেও যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে, দানাদার শস্য উৎপাদনে দেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও অভাবনীয় অগ্রগতি সাধিত হয়। এককথায়, তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতির আধুনিকীকরণ করেছিলেন।

অতীত সাফল্যের এই ট্র্যাক রেকর্ড থেকেই সাধারণ মানুষ আস্থা পেয়েছে যে, বিএনপি সরকার গঠন করলে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’-এর অধীনে যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য। এই প্রগাঢ় আস্থার কারণেই আমরা দেখছি, নির্বাচনের পর থেকেই একের পর এক কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি গণজাগরণের সৃষ্টি হয়েছে যে, আমরা এই বর্তমান সংকট থেকে অবশ্যই উত্তরণ ঘটাতে পারব। জনগণের এই আস্থাকে ধারণ করে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার সুস্পষ্ট কর্মকৌশলই আসন্ন বাজেটে প্রতিফলিত হবে।

স্ট্রিম: দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের একটি বাজেট আসতে যাচ্ছে, যার আকার প্রায় ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অথচ আমাদের রাজস্ব আদায় এখনও ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায়নি। এমন পরিস্থিতিতে এত বিশাল আকারের বাজেটের অর্থায়ন কৌশল আপনারা কীভাবে নির্ধারণ করছেন?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমরা প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছি। প্রথমত, বাজেটের অর্থায়ন কীভাবে হবে বা অভ্যন্তরীণ সম্পদ কীভাবে সংগ্রহ করা হবে এবং কর কাঠামোতে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে। সারা বিশ্বেই রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য দুটি কৌশল স্বীকৃত। এর মধ্যে প্রথম কৌশলটি হলো সংকুচিত অর্থনীতিকে সম্প্রসারিত করা। অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলে কর্মসংস্থান বাড়বে। আর কর্মসংস্থান বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই আয়করের পরিধি বাড়বে। অর্থনীতি সম্প্রসারণের ফলে মানুষের ভোগ ও ব্যয় বাড়বে, যার অর্থ হলো মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আদায় বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হলে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক থেকেও সরকারের আয় বাড়বে।

দ্বিতীয় কৌশলটি হলো বিদ্যমান করজাল বা ক্ষেত্র থেকে আয় বাড়ানো। বিগত সরকারের আমলে যে লুটপাট, অপচয়, কর ফাঁকি ও কর জালিয়াতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এই লক্ষ্যে আমরা পুরো রাজস্ব ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজ করার উদ্যোগ নিয়েছি। পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ‘ক্যাশলেস’ বা নগদবিহীন লেনদেনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এক্ষেত্রে উৎসাহ দিচ্ছে এবং আগামী ১লা জুলাই থেকে ‘বাংলা কিউআর’-এর মাধ্যমে লেনদেনের দিকে আমাদের যেতে হবে। এই ক্যাশলেস ও ডিজিটাল সোসাইটি গড়ে তোলার মাধ্যমে কর ফাঁকির পরিমাণ অনেকাংশে কমে যাবে। এছাড়া অযৌক্তিক কর অব্যাহতি বা ট্যাক্স এক্সেমপশন কমানো প্রয়োজন। আগে কেবল গোষ্ঠীতন্ত্রকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এসআরও জারির মাধ্যমে কর অব্যাহতি দেওয়া হতো। আমরা এই অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসব। এখন প্রণোদনা দেওয়া হবে সর্বজনীন কল্যাণের স্বার্থে, বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে নয়। কর ফাঁকি ও জালিয়াতির প্রবণতা কঠোরভাবে রোধ করা হবে। এর সুফল ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে আমাদের সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে রাজস্ব আয়ের ঊর্ধ্বমুখী গতিপ্রকৃতি দেখলেই বুঝতে পারবেন যে আমাদের রাজস্ব আদায় বাড়ছে।

সোজা কথায়, অর্থনীতিতে সবার অংশগ্রহণ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি খাত এবং প্রতিটি অঞ্চলের জন্য সমান সুযোগ থাকতে হবে, নারী-পুরুষের সমতা বিধান করতে হবে। এটিই মূলত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা—সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার।

আমাদের অর্থনীতির দ্বিতীয় প্রধান সংকট হলো পাহাড়সম ঋণের বোঝা। এই বিপুল ঋণের ভারে জাতি আজ নুয়ে পড়েছে। নিজেদের পৃষ্ঠপোষকতার অপসংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে পতিত সরকার একের পর এক অপরিকল্পিত ঋণ নিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বর্তমানে বাজেটের পরিচালন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণ পরিশোধ। তবে আমাদের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলে ঋণের এই আনুপাতিক ভার কমে আসবে। পতিত সরকার দেশের সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে, আমরা সেই পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। কিন্তু গৃহীত ঋণ তো আমাদের পরিশোধ করতেই হবে। তারা ঋণের পরিমাণ এতটাই বাড়িয়েছে যে, কেবল বৈদেশিক ঋণই ৩২২ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। তাই ভবিষ্যতে ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমাদের মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। নতুন করে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা কিছু সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি বা নির্দেশক নির্ধারণ করেছি। যেমন: গৃহীত ঋণের 'ভ্যালু ফর মানি' (অর্থের যথাযথ ব্যবহার) নিশ্চিত হতে হবে, বিনিয়োগের ওপর রিটার্ন বা ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ (বহুমাত্রিক প্রভাব) থাকতে হবে, এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি হতে হবে এবং পরিবেশের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেটি বিবেচনা করে ঋণের প্রকল্প নির্বাচন করতে হবে। দেখতে হবে ঋণের মেয়াদ কত এবং সুদের হার কেমন। ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা ঋণ ব্যবস্থাপনায় একটি আমূল পরিবর্তন আনব।

তৃতীয়ত, আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার আরেকটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো—সরকারের পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অথচ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার কমে গেছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক রোগ থেকেও আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কীভাবে প্রকল্প চিহ্নিত করতে হবে এবং প্রোগ্রামিংয়ের ক্ষেত্রে কী ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে, সে বিষয়ে আমরা সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিচ্ছি। প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নে ব্যাপক সংস্কার করা হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে, যাতে প্রতি প্রান্তিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রকৃত অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা যায়। কারণ, মেগা প্রকল্পের নামে ‘গিগা দুর্নীতি’ করার চর্চা আর চলতে দেওয়া হবে না। যেকোনো প্রকল্প হতে হবে একান্তই জনকল্যাণমুখী। সংক্ষেপে বলতে গেলে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমরা তিনটি মূল কৌশল নিয়ে এগোচ্ছি—প্রথমত, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধির কৌশল; দ্বিতীয়ত, ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশল; এবং তৃতীয়ত, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন কৌশল।

স্ট্রিম: বিগত সরকারের অনেক প্রকল্প আপনারা অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও অনেকগুলো প্রকল্প স্থগিত করেছিল। যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। যার প্রধান হিসেবে আপনি দায়িত্ব পালন করছেন। আপনাদের কমিটি এ পর্যন্ত কতগুলো এরকম প্রকল্প চিহ্নিত করেছে?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: প্রকল্পগুলো নিয়ে আমরা মূলত তিনটি কাজ করছি। প্রথমত, আমরা দেখছি প্রকল্পগুলোর জনস্বার্থে প্রয়োজনীয়তা আছে কি না। দ্বিতীয়ত, এসব প্রকল্পের কতদূর পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছি। আর তৃতীয়ত, আমরা লক্ষ্য করছি প্রকল্পগুলো আমাদের পঞ্চম বার্ষিকী অর্থনৈতিক কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায় কি না, এগুলোকে পুনর্নির্ধারণ করা যায় কি না এবং রি-স্কোপিংয়ের কোনো সুযোগ আছে কি না। অথবা যেসব প্রকল্প একেবারেই শুরু হয়নি, সেগুলোকে আমাদের কৌশলের সাথে মিল রেখে নতুনভাবে নিয়ে আসা যায় কি না, তা ভাবছি। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানো। চারটি ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটলেই কেবল তা সম্ভব।

প্রথমত, বিনিয়োগ বাড়লে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ঘটবে। দ্বিতীয়ত, ভোগ ব্যয় বাড়াতে হবে। অর্থাৎ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে মানুষের হাতে টাকা আসবে। তখনই তারা ভোগ ব্যয়ের দিকে ঝুঁকবেন। তৃতীয়ত, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা অন্যান্য সরকারি ব্যয় যদি মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট তৈরি করতে পারে। চতুর্থত, যদি রপ্তানি বাড়ানো ও আমদানি হ্রাস করা যায়। মূলত এই চারটি ক্ষেত্রেই উন্নতি প্রয়োজন। আর বর্তমান সরকার এই চারটি লক্ষ্যকে সামনে রেখেই কাজ করে যাচ্ছে।

স্ট্রিম: উল্লিখিত চারটি লক্ষ্যের মধ্যে অন্যতম প্রধান শর্তটিই হলো বিনিয়োগ বাড়ানো। তবে বিগত সরকারের আমলে দেশে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে আপনারা বলে থাকেন। এই স্থবিরতা কাটিয়ে দেশে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে আসন্ন বাজেটে আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো কৌশল বা মডেল থাকছে কি? উদ্যোক্তাদের আস্থার সংকট কাটাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমরা এখন একটি নতুন মডেলের দিকে যাচ্ছি। বাজেটে তারই প্রতিফলন ঘটবে। এই মেডেলের মূল বিষয় হলো বিনিয়োগ বাড়ানো। বিনিয়োগ কেন বাড়াতে হবে? কারণ কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। আর কর্মসংস্থান বাড়লেই মানুষের ভোগ ব্যয় বাড়বে। অর্থাৎ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি বড় সম্পর্ক রয়েছে। বিনিয়োগ নিজেই জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন বাড়াবে। আবার কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের ভোগ ব্যয় বাড়বে, যা পরোক্ষভাবে জিডিপি বাড়াতে সহায়তা করবে। তাই আমরা বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। যেকোনো উদ্যোক্তাকে জিজ্ঞেস করলেই জানবেন যে অতীতের পতিত সরকারের সময় কী হয়েছে। তখন একদিকে যেমন ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছে। অন্যদিকে বন্ধ হয়ে গেছে শিল্প-কলকারখানাগুলো। অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি সার্বিক বেকারত্ব, বিশেষ করে যুব, নারী ও শিক্ষিত বেকারত্ব মারাত্মকভাবে বেড়েছে। এ কারণেই আমরা বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন মডেলের কথা বলছি। বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন বাড়বে এবং উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ব্যক্তির সার্বিক কল্যাণ—উভয়ই নিশ্চিত হবে। উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, আগামী বাজেটে আমরা সেগুলোই প্রতিফলিত করার চেষ্টা করছি।

উদ্যোক্তাদের প্রথম চাওয়া হলো নীতির ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ, তারা যেন মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন। এক্ষেত্রে তাদের দাবি, বিশেষ করে কর কাঠামো যেন অন্তত পাঁচ বছরের জন্য স্থিতিশীল থাকে। দ্বিতীয়ত, কোনো উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অফিসে ঘুরে যেসব অনুমতি নিতে হয় বা গণমাধ্যমের ভাষায় যেটিকে ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্য’ বলা হয়, তারা এর অবসান চান। তারা চান ডি-রেগুলেশন বা বিনিয়ন্ত্রণ হোক। এবারের বাজেটে আমরা এ ধরনের বেশ কিছু বিনিয়ন্ত্রণের বিষয় উপস্থাপন করব।

তৃতীয়ত, তারা চান সহজলভ্য অর্থায়ন। কারণ বর্তমানে সুদের হার যেমন, তাতে বিনিয়োগ বাড়া কঠিন। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আবার এ ধরনের নীতি সুদের হার বজায় রাখাও জরুরি। আমরা মনে করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং পরিস্থিতির আলোকেই তারা তাদের নীতি সুদের হার নির্ধারণ করবে। কিন্তু আমাদের বিনিয়োগকারীদের জন্য এমন অর্থায়ন প্রয়োজন, যেখানে সুদের হার তুলনামূলক কম থাকবে। পাশাপাশি তারা যেন পুঁজিবাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন, আমরা সে ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছি।

চতুর্থত, তাদের প্রয়োজন জ্বালানি নিরাপত্তা। কারণ নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না থাকলে বিনিয়োগকারীরা কীভাবে বিনিয়োগ করবেন? এবং পঞ্চমত, দেশে সুশাসন থাকতে হবে। সব ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও নীতির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। মূলত এই পাঁচটি বিষয়ই আগামী বাজেটে প্রতিফলিত হবে।

স্ট্রিম: আমাদের দেশে দেশীয় বিনিয়োগের প্রধান উৎস এখনো ব্যাংক খাত, আর দ্বিতীয় উৎস হলো পুঁজিবাজার। কিন্তু বিগত সময়ে আমরা পুঁজিবাজারে নানা ধরনের সংকট দেখেছি, এটি একটি লুটপাটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ব্যাংক খাতেও লুটপাট হয়ে অধিকাংশ ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলোকে পুনরায় সবল করে উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার পর্যায়ে নেওয়ার জন্য আপনারা বাজেটে কি রিফাইন্যান্সিং বা এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: হ্যা। আমাদের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আর সেটি দেশের উপযোগী পদ্ধতিতেই করতে হবে যাতে দেশীয় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন। আমরা ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনরুদ্ধার বা রিফাইন্যান্সিং স্কিম হাতে নিয়েছি। সেখানে বন্ধ কলকারখানা চালু এবং নতুন উদ্যোগের ক্ষেত্রে কী পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হবে, তা আমরা নির্দিষ্ট করে দিয়েছি। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকার ক্ষেত্রে সরকার ভর্তুকি দেবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে। এক্ষেত্রে আমরা একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রয়োগ করেছি। অধিক তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো থেকে তারল্য-সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো যেন তহবিল সংগ্রহ করে বিনিয়োগ করতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার ধরনটি হলো: যে ব্যাংক আমানত সংগ্রহ করে, তাদের একটি ‘কস্ট অফ ফান্ড’ থাকে এবং তাদের কিছুটা লাভও করতে হয়। তাই যে ব্যাংক তারল্য সরবরাহ করবে, তাকে ১০ শতাংশ হারে সুদ দেওয়া হবে। আর যে ব্যাংক তহবিলটি গ্রহণ করে ঋণ দেবে, তারা নিজেদের জন্য মাত্র ৩ শতাংশ নেবে। তাহলে মোট হলো ১৩ শতাংশ। এর বাইরে বাকি যে ৭ শতাংশ থাকবে, সেই টাকাটা রাজস্ব খাত থেকে, অর্থাৎ সরকার ভর্তুকি হিসেবে দেবে।

স্ট্রিম: এই ৭ শতাংশ যে সরকার দেবে, তাতে তো ব্যাংক রেট ১০ শতাংশই থাকছে। সেক্ষেত্রে এই আর্থিক চাপ তো সরকারের ঘাড়েই আসবে এবং আপনাদের রেভিনিউ কস্ট বেড়ে যাবে, তাই না?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: হ্যাঁ, আমরা হিসেব করে দেখেছি, সরকার যে ব্যয় করবে তার তুলনায় এর মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট বা গুণক প্রভাব অনেক বেশি হবে। কারণ এখানে হিসাব করতে হবে যে, সরকার ভর্তুকিটা কি ভোগের জন্য দিচ্ছে নাকি বিনিয়োগের জন্য দিচ্ছে এবং তা কোনো গুণক প্রভাব তৈরি করছে কি না। বন্ধ কলকারখানা চালুর ক্ষেত্রে আরও কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যেমন: সরকারের বেশ কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান অনেকদিন ধরে বন্ধ পড়ে আছে। এরকম পাঁচটি কর্পোরেশন রয়েছে—জুট বা পাট কর্পোরেশন, টেক্সটাইল বা বস্ত্র কর্পোরেশন, স্টিল কর্পোরেশন, কেমিক্যাল কর্পোরেশন এবং সুগার মিল কর্পোরেশন। এগুলোর অধীনে থাকা কলকারখানাগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকলেও তাদের অবকাঠামো ও জমি রয়ে গেছে। দেশে নতুন কারখানার জন্য জমি পাওয়া একটি বড় সমস্যা। তাই আমরা চাচ্ছি এসব অব্যবহৃত জমিতে ব্যক্তি খাতের উদ্যোগে নতুন কলকারখানা স্থাপিত হোক। আমরা তাদের উৎসাহিত করছি। তার মানে, আমরা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছি। তবে এই বিনিয়োগ হতে হবে উৎপাদনমুখী, অর্থাৎ শিল্পায়নকেন্দ্রিক।

বর্তমান বিশ্ব অনেক বেশি অনিশ্চিত। এখানে নানা ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কা আসে। যেকোনো সময় সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করা তখনই সম্ভব হবে, যখন আমাদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়বে এবং ব্যাপক শিল্পায়ন ঘটবে। এ কারণেই আমরা বিনিয়োগকে শুধুমাত্র বিনিয়োগ হিসেবে না দেখে উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন হিসেবে দেখছি, যাতে দেশে টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এটি আমাদের জন্য একটি বড় ধরনের পরিবর্তন। এর মাধ্যমে আমাদের আরেকটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যও অর্জিত হবে। আর তা হলো অর্থনীতির বহুমুখীকরণ। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে যাবে, তখন তাকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার এই সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের এই উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন উত্তরণকালে ব্যাপক সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

আমরা যে সমৃদ্ধির কথা বলছি, সেই সমৃদ্ধি সম্পূর্ণ রেকর্ড ও তথ্যনির্ভর। খেয়াল করলে দেখবেন, দেশের ইতিহাসে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হার অতীতের তুলনায় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনা মাত্র দুটি সময়ে ঘটেছে। প্রথমবার এটি ঘটেছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে এবং দ্বিতীয়বার ২ শতাংশীয় পয়েন্ট প্রবৃদ্ধি হয়েছিল মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে। বিগত সময়ে যারা 'উন্নয়নের বয়ান' তৈরি করেছিল, তাদের কিন্তু এই সঠিক তথ্যের বিষয়ে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।

স্ট্রিম: আপনারা আগামী বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কত ধরছেন?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমরা আগামী বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরছি ৬.৫ শতাংশ। বর্তমানে এটি হয়তো ৪ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। সেখান থেকে আমাদের ২.৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়াতে হবে। এই প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উৎসগুলোর কথা আগেই বলেছি—বিনিয়োগ বাড়লে জিডিপি বাড়বে; কর্মসংস্থান তৈরি হলে মানুষের ভোগ ব্যয় বেড়ে জিডিপি বাড়াবে। এছাড়া মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট তৈরি হলে জিডিপি বাড়বে। রপ্তানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। এসব কারণে আমরা মনে করছি, চলতি জুন মাস শেষে প্রবৃদ্ধি যদি ৪ বা ৪.২ শতাংশও হয়, আগামী বছরে তা ৬.৫ শতাংশে পৌঁছাবে। এর পেছনে প্রধান চারটি কারণ হলো—বিনিয়োগ বাড়ানো, ভোগ বাড়ানো, সরকারি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা এবং রপ্তানি খাতে জোর দেওয়া।

রপ্তানি খাতের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের একটি দাবি রয়েছে যে, যারা রপ্তানি করবেন তারা সবাই যেন সমান সুযোগ বা সমধর্মী প্রণোদনা পান। সে লক্ষ্যে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর ফলে যেকোনো পণ্যই রপ্তানি করা হোক না কেন, সবাই সমান সুযোগ পাবেন। মূলত প্রণোদনা ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটানো হচ্ছে।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমরা প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছি। প্রথমত, বাজেটের অর্থায়ন কীভাবে হবে বা অভ্যন্তরীণ সম্পদ কীভাবে সংগ্রহ করা হবে এবং কর কাঠামোতে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে। সারা বিশ্বেই রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য দুটি কৌশল স্বীকৃত। এর মধ্যে প্রথম কৌশলটি হলো সংকুচিত অর্থনীতিকে সম্প্রসারিত করা।

আগামী বাজেটে আরও যে বড় ধরনের পরিবর্তনের বিষয়টি প্রতিফলিত হবে, তা হলো স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আর স্বাস্থ্যখাতের বিষয়টি হলো—সুস্থ দেহ ও সুস্থ মন থাকলে এবং শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করলেই কেবল কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখিতা নিশ্চিত হবে। অতীতের পতিত সরকারের সময় পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা যে ও কতটা করুণ তা একটি পরিসংখ্যান দিলেই বোঝা যায়। এই খাতে মানুষের পকেট থেকে খরচ বা 'আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার' ৭৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।

আমাদের সংবিধানে ‘জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’র কথা বলা থাকলেও বাস্তবে আমরা এমন কোনো ব্যবস্থা দেখিনি। তৃণমূল পর্যায়ে না আছে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী, না আছে ডাক্তার। আমরা একদিকে যেমন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করব, একইসাথে প্রায় ৫,০০০ ডাক্তারও নিয়োগ করব, যাতে তৃণমূলে সবার জন্য ডাক্তারের সেবা নিশ্চিত হয়। উপজেলা পর্যায়ে বিপুল জনসংখ্যার বিপরীতে না আছে পর্যাপ্ত শয্যা, না আছে নার্স বা চিকিৎসক। অথচ বিশেষ করে শিশুদের জন্য সেখানে চিকিৎসক থাকা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া স্ত্রী, প্রসূতি ও প্রজননতন্ত্রের জটিল চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং ফিজিওথেরাপিস্ট থাকাও প্রয়োজন। এর মানে হলো, আমরা শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসকের সংখ্যাও বাড়াব। জেলা পর্যায়ে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন করোনারি কেয়ার ইউনিট, কিডনি ডায়ালিসিস ইউনিট এবং জটিল স্ত্রীরোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এগুলো নিশ্চিত করা গেলেই একটি প্রকৃত জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উল্লিখিত 'গণতান্ত্রিক মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র'-এর ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবশ্যই একটি কার্যকর জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং আমরা সেদিকেই এগোচ্ছি।

স্ট্রিম: স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পাশাপাশি এই কল্যাণ রাষ্ট্র নিশ্চিতে দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আগামী বাজেটে আপনাদের কী ধরনের পরিকল্পনা থাকছে?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: কল্যাণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দারিদ্র্য বিমোচন। দেশে যে দারিদ্র্য বেড়ে গেছে, তা কমানোর জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার চেয়েও একটি টেকসই সমাধান বেশি প্রয়োজন। কারণ আমরা দেখছি, মাঝে মাঝেই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত নানা সংকট তৈরি হচ্ছে। যেমন, কোভিডের মতো মহামারির কথা কেউ চিন্তাই করেনি। আবার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা সংকটের কারণেও একটি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হচ্ছে। তাই আমাদের টেকসই সমাধানের দিকেই যেতে হবে। এই টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে হলে বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তা জালের ধারণাকে পরিবর্তন করে একটি সর্বজনীন কাঠামোর দিকে এগোতে হবে এবং সেই কাঠামোটি হতে হবে ‘পূর্ণ জীবনচক্র ভিত্তিক’। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কল্যাণ রাষ্ট্রের যে রূপরেখা দিয়েছেন, তার ভিত্তিতেই এবারের বাজেটে আমরা সর্বজনীন পূর্ণ জীবনচক্র ভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের দিকে যাচ্ছি। এখানে মা, শিশু, কিশোর, যুবক, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী এবং বিধবা নারী—সবার জন্যই সুযোগ থাকবে। তারা নিছক 'উপকারভোগী' হিসেবে নয়, বরং 'অধিকারভোগী' হিসেবে এই সম্মিলিত সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের আওতাভুক্ত হবেন। স্বাধীনতার মূল ভিত্তি ছিল সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার, যা একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। অতীতে কেবল চেতনার ফেরি করা হয়েছে, চেতনা বিক্রি করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। এই বাজেটের মাধ্যমেই তা বাস্তবায়ন শুরু হবে।

পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। একজন বিনিয়োগকারী তখনই বিনিয়োগ করবেন, যখন তিনি জানবেন দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিরাপত্তা রয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আমি মূলত ৫টি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করতে পারি। প্রথমত, ‘এনার্জি মিক্স’ বা জ্বালানি মিশ্রণে পরিবর্তন আনা হবে। অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানিকে মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে রাখতে হবে। মানে, মানুষের আয়ের সাথে যেন জ্বালানির ট্যারিফ বা মূল্যের সামঞ্জস্য থাকে। তৃতীয়ত, শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য গ্যাসের প্রয়োজন। কিন্তু বিগত সময়ে গ্যাস অনুসন্ধান বা উত্তোলনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে বিদেশি সংস্থার মাধ্যমে অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পাশাপাশি দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থাও বাজেটে রাখা হবে। চতুর্থত, আমরা যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছি, সেখানে নিশ্চিত করতে হবে যেন সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বা পিভি বাংলাদেশেই উৎপাদিত হয়। আপনারা ইতোমধ্যেই লক্ষ করেছেন, দেশে এ ধরনের কারখানা স্থাপনের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পঞ্চমত, জ্বালানির ক্ষেত্রে আমাদের কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমরা ক্রমশ আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছি, অথচ দেশে পর্যাপ্ত এলএনজি স্টেশন, রিফাইনারি বা এফএসআরইউ গড়ে ওঠেনি। তাই জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা কৌশলগত মজুত গড়ে তুলব। তখন দেখা যাবে, জ্বালানি খাতের এই স্থিতিশীলতার কারণে সার্বিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এর মানে হলো, গণতান্ত্রিক মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত জরুরি, তেমনি সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষাও অত্যাবশ্যক। আবার বিনিয়োগকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন, যা স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে পারে। দক্ষ জনশক্তি ছাড়া কোনোভাবেই শিল্পায়ন বা প্রযুক্তিগত উত্তরণ ঘটবে না। এই জায়গাটিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিটি বিষয়ের জন্যই সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আর এ কারণেই আমরা বিশ্বাস করি এবং জনগণও আস্থা রাখে যে, আগামী বছর জিডিপিতে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জিত হবে।

স্ট্রিম: বাজেটের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ব্যয় হয় অনুন্নয়ন খাতে। আপনি শুরুতেই বলছিলেন যে, বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই বা স্ক্রিনিং করে অনুন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে আনা হবে। এ ধরনের কোনো উদ্যোগ কি বাজেটে থাকছে? কারণ প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার বিশাল একটি অংক তো এই খাতেই ব্যয় হবে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: ব্যয়ের বিষয়ে আমরা বলছি যে, রাজস্ব ব্যয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে। বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ক্ষেত্রে এটি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে। পাশাপাশি, উৎপাদন বা শিল্পায়নের ক্ষেত্রে আমরা ব্যক্তি খাতের বড় উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছি। উদাহরণস্বরূপ, ইলেকট্রিক ভেহিকেলের কথা বলা যায়। দেশীয় উদ্যোগে ইলেকট্রিক ভেহিকেল উৎপাদনকে সমর্থন জানাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ব্যবস্থার কথা বলেছেন। অর্থাৎ, একটি গণতান্ত্রিক মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যত ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তার সবই নেওয়া হবে। একই সাথে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক সংস্কার আনা হচ্ছে। সেটি ব্যয় ব্যবস্থাপনা হোক বা ঋণ ব্যবস্থাপনাই হোক—পরিচালন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে হ্রাস করতে হবে এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় বাড়াতে হবে। সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকেই নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। সেই অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, কর্মসূচি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্ট্রিম: এবারের বাজেটকে আপনি কী ধরনের বাজেট বলবেন? সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে...

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমরা বলছি, এটি 'সবার জন্য বাজেট'। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ এবং সবার জন্যই এই বাজেট।

স্ট্রিম: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ ঢাকা স্ট্রিমের দর্শক-শ্রোতাদেরকেও।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত