বিশ্বকাপে ছাদ থেকে স্ক্রিন—পতাকার পলিটিক্যাল-ইমোশনাল বাজার

বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে পতাকা ওড়ানোর উন্মাদনা কি কেবল আবেগ, নাকি এর ভেতরে কাজ করে সামাজিক পরিচয়, সমর্থক মনস্তত্ত্ব এবং এক ধরনের “ইমোশনাল ইনভেস্টমেন্ট” লজিক? এই আলোচনায় ফুটবল ফ্যানডম, পতাকার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অর্থ এবং ভক্তিবাদের অদৃশ্য অর্থনীতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও নিউ মিডিয়া গবেষক রাজীব নন্দী।

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৬, ১৫: ০৭
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

সোশ্যাল মিডিয়া আসার আগেও বিশ্বকাপ সিজনে এই সমাজে পতাকা-উন্মাদনা ছিল এবং সেটি কোনোভাবেই কম তীব্র ছিল না। অনেক ক্ষেত্রেই সেটা ছিল আরও ‘ফিজিক্যাল’, আরও দৃশ্যমান, আরও রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক সামাজিক পারফরম্যান্স।

বিশ্বকাপ এলে ছাদ, বারান্দা, গলিপথ—সব জায়গাই তখন একেকটা অস্থায়ী স্টেডিয়াম হয়ে উঠত। পতাকা ছিল সরাসরি উপস্থিতির ভাষা—যেখানে দরদ দেখাতে স্ক্রিন দরকার হতো না, দরকার ছিল শুধু কাপড় আর জায়গা। এখন মোবাইল স্ক্রিন সেই আবেগের একটা নতুন এক্সটেনশন তৈরি করেছে। লাইক, স্টোরি, পোস্টে সমর্থন দেখানোর সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে একটা প্রশ্নও উঁকি দেয়—ভার্চুয়াল দরদ যত সহজ হয়েছে, বাস্তব স্পেসে পতাকা টাঙানোর সেই আগের স্পন্টেনিয়াস তাগিদটা কি খানিকটা সরে গেছে? নাকি এখন উচ্ছ্বাসটা বিভক্ত হয়ে গেছে দুই দুনিয়ায়—একটা ছাদে, আরেকটা ফিডে?

পতাকা একটি চিহ্ন। একটি দেশের পরিচয়, ইতিহাস ও রাজনৈতিক অর্থ বহনকারী দৃশ্যমান প্রতীক। বাতাসে উড়লে যে শব্দের অনুরণন তৈরি হয়, ‘পত পত’—সেখান থেকে ‘পতাকা’ নামটি এসেছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে পতাকার আরেক নাম কেতন; আর বিজয়ের পর উড়ানো পতাকা হয়ে ওঠে বিজয়-কেতন। রবীন্দ্রনাথ তরুণদের উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘মরুবিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে হে প্রবল প্রাণ।’

কিন্তু সেই কেতনের ধারণা আজ যেন অন্য বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছে। মরুবিজয় নয়, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এখন ভিনদেশি পতাকা উড়াচ্ছে ঘরে-বাইরে। উপলক্ষ বিশ্বকাপ ফুটবল। পতাকা নিয়ে হুজুগের প্রবণতা এখন অনেকটাই ‘রিয়েল-টাইম ভাইরাল কালচার’-এর অংশ হয়ে গেছে। বিশ্বকাপ এলেই ছাদ, বারান্দা, রাস্তার মোড়—সব জায়গা যেন একেকটা অস্থায়ী ফ্যান জোনে পরিণত হয়। কে কত বড় পতাকা টাঙাতে পারে, কে কত উঁচুতে ঝুলাতে পারে—এটাই যেন সমর্থনের নতুন মেট্রিক। এখানে আবেগ দ্রুত লেভেল আপ হয়, কিন্তু বোঝাপড়া বা কনটেক্সট একই গতিতে বাড়ে না। ফলে পতাকা অনেক সময় পরিচয়ের চিহ্ন না হয়ে ‘স্ট্যাটাস আপডেট’ বা ‘কালেক্টিভ হাইপ’-এর ভিজ্যুয়াল প্রম্প হয়ে দাঁড়ায়।

সমস্যাটা তখনই শুরু হয় যখন এই হুজুগ থামে না, বরং ম্যাচের ফলের সঙ্গে মুডও আপডেট হয়। জিতলে পতাকা ‘গর্বের আইকন’, হারলে সেটাই আবার অবহেলা বা রাগের টার্গেট। অর্থাৎ প্রতীকটা স্থির থাকে না, আবেগের ওঠানামায় বারবার রি-ডিফাইন হয়। এই দ্রুত বদলে যাওয়া প্রতিক্রিয়া-সংস্কৃতিতে পতাকার মতো গভীর প্রতীকের অর্থও অনেক সময় হালকা হয়ে যায়—যেখানে সম্মান বা ইতিহাস নয়, ট্রেন্ডই শেষ কথা বলে।

পতাকা উড়ানো মূলত কোনো দল বা দেশের প্রতি সমর্থনের প্রকাশ। কিন্তু বাংলাদেশে এই সমর্থন বহু আগেই সাধারণ আবেগের সীমা ছাড়িয়ে এক ধরনের সামাজিক উন্মাদনায় পরিণত হয়েছে।

বিশ্বকাপ এলে পতাকা ওড়ানোকে যদি একটু মজা করে ‘ইমোশনাল ইনভেস্টমেন্ট’ ধরি, তাহলে এর পেছনে আসলে পুরো একটা সাপোর্টার সাইকলজি কাজ করে—আর সঙ্গে আছে আমাদের ক্রনিক ‘আমরা কার দলে আছি?’ টাইপ সামাজিক পরিচয়ের খোঁজ। মানে শুধু খেলা দেখা না, পতাকা তুলে ধরার মাধ্যমে মানুষ একটা বড় ফ্যান-স্কোয়াডে ঢুকে পড়ে—যেখানে সবচেয়ে সহজ আইডেন্টিটি কোড হচ্ছে ‘আমি ব্রাজিল/আর্জেন্টিনা’। এতে আলাদা করে নিজের পরিচয় ব্যাখ্যা করতে হয় না, পতাকাই সব বলে দেয়।

সোশ্যাল আইডেন্টিটি থিওরি অনুযায়ী, মানুষ নিজের পরিচয় একটু স্ট্রং করতে দল বানায়, গ্রুপে ঢোকে, আর তারপর সেই দলের জয়-পরাজয়কে নিজের পার্সোনাল ইমোশনের সাথে ফুল মিক্সড আপ করে ফেলে—একদম ‘আমার দল হারছে মানে আমারই ব্রেকআপ হয়ে গেছে’ টাইপ অবস্থা। আর এই সিজনে তো ব্রাজিল ফ্যান ক্লাব বা আর্জেন্টিনা সাপোর্টার গ্রুপে যা হয় সেটা একদম আলাদা ইউনিভার্স—সদস্য ফর্ম ছাড়া কাউকে ঢোকানো, আবার হঠাৎ কাউকে ‘তুই আর আমাদের না” বলে বহিষ্কার, পরে আবার “গণক্ষমা ঘোষণা’—সবই চলে ফুল অন হিউম্যান ড্রামা মোডে। রসিক বাঙালি এই পুরো ‘ফ্যানডম’কে এমনভাবে চালায় যে, মনে হয় ফুটবল না, একটা চলমান সোশ্যাল রিয়েলিটি শো চলছে।

এই প্রক্রিয়ায় পতাকা হয়ে ওঠে এক ধরনের আবেগগত বিনিয়োগের মাধ্যম। এখানে টাকা নয়, বিনিয়োগ করা হয় অনুভূতি, সময় এবং সামাজিক উপস্থিতি। আর এর “রিটার্ন” পাওয়া যায় গর্ব, উত্তেজনা, দলীয় সংযোগ এবং সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমে—যেমন বন্ধুদের মধ্যে আলোচনা, অনলাইন পোস্ট বা সাময়িক জনপ্রিয়তা। কিন্তু এই রিটার্ন স্থায়ী নয়; ম্যাচের ফলের সঙ্গে সঙ্গে আবেগও ওঠানামা করে—জিতলে আনন্দের উল্লাস, হারলে হতাশার পতন। ফলে পতাকা ওড়ানো এখানে এক ধরনের অস্থায়ী, কিন্তু তীব্র আবেগনির্ভর বিনিয়োগ, যেখানে লাভ-লোকসান মাপা হয় অর্থে নয়, অনুভূতির ওঠানামায়।

পতাকা উড়ানো মূলত কোনো দল বা দেশের প্রতি সমর্থনের প্রকাশ। কিন্তু বাংলাদেশে এই সমর্থন বহু আগেই সাধারণ আবেগের সীমা ছাড়িয়ে এক ধরনের সামাজিক উন্মাদনায় পরিণত হয়েছে। যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় সংবাদ শিরোনামে—‘ব্রাজিলের জন্য তিন হাজার ফুট লম্বা ভালোবাসা’, ‘বিশ্বকাপ উন্মাদনা: শত ফুট পতাকা নিয়ে শোডাউন’—আবার একই মৌসুমে পড়তে হয়—‘পতাকা লাগাতে গিয়ে যুবকের মৃত্যু’। এই বাক্যগুলো আর অবাক করে না; বরং বিশ্বকাপ মৌসুমে এগুলো প্রায় স্বাভাবিক সংবাদ-রুটিনে পরিণত হয়েছে। ফুটবলকে কেন্দ্র করে বাঙালির আবেগের বিস্ফোরণ নতুন নয়। বহু বছর ধরে জার্সি, পতাকা, রং ও পরিচয়ের রাজনীতির ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ এই অম্ল-মধুর আবেগ-দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে।

বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসর খুব কমই আছে। অলিম্পিক এবং ক্রিকেটের বাইরে ফুটবলই সবচেয়ে বড় জন-উৎসব। এর সহজ নিয়ম, সহজ সরঞ্জাম এবং সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা এটিকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করেছে। ফলে সমর্থক পরিচয় এখানে শুধু খেলা-সংক্রান্ত নয়; এটি আবেগ, সংস্কৃতি এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিচয়ের এক ধরনের মানচিত্র।

বাংলাদেশে এই মানচিত্র আরও জটিল। বিশ্বকাপে নিজ দেশের অংশগ্রহণ না থাকলেও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকায় দেশ কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যেন এটি কেবল ফুটবল নয়, এক ধরনের প্রতীকী মেরুকরণ—যেখানে আবেগ দলীয় পরিচয়ের মতোই তীব্র। এই সময়ে একটি প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে—পতাকা কত বড় হলো, কে কতটা উঁচুতে ঝুলাতে পারল। অর্থাৎ সমর্থনের জায়গা থেকে প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই প্রবণতাকে অনেকে ‘হুজুগ’ বা গণউন্মাদনা বলেন। তবু এটিকে পুরোপুরি অস্বীকার করাও কঠিন, কারণ এই উন্মাদনার ভেতরেই কখনও কখনও ইতিবাচক সামাজিক সংযোগও তৈরি হয়।

এই পতাকা-ভিত্তিক হুজুগকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম-এর ‘সমষ্টিগত উচ্ছ্বাস’ বা কালেক্টিভ এফারভেসেন্স ধারণা দিয়ে। ডুর্খেইমের মতে, যখন একটি সমাজের অনেক মানুষ একই সময়ে একই ঘটনা, প্রতীক বা আবেগকে কেন্দ্র করে একত্রিত হয়, তখন ব্যক্তির ব্যক্তিগত অনুভূতি ছাপিয়ে একটি যৌথ আবেগের স্রোত তৈরি হয়। এই অবস্থায় মানুষ আলাদা ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহৎ ‘সমষ্টিগত আবেগের শরীরের’ অংশ হিসেবে আচরণ করে। বিশ্বকাপের সময় পতাকা ঠিক এই কাজটিই করে—এটি শুধু একটি রাষ্ট্রের প্রতীক থাকে না, বরং মানুষের আবেগ, উত্তেজনা এবং পরিচয়ের অনুভূতিকে একসাথে কেন্দ্রীভূত করার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সমষ্টিগত উচ্ছ্বাস আরও তীব্র হয়, কারণ এখানে জাতীয় দলের সরাসরি উপস্থিতি না থাকায় সেই শূন্যতা ভিনদেশি দলের প্রতি আবেগ দিয়ে পূরণ করা হয়। ফলে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা অনেক সময় একটি ‘ধার করা পরিচয়ের আচার’-এ পরিণত হয়। মানুষ নিজেদের সামাজিক উত্তেজনা, দলীয়তা এবং অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি এই প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করে। কিন্তু এই উচ্ছ্বাস সাধারণত স্থায়ী জ্ঞান বা গভীর সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ায় রূপ নেয় না; এটি থাকে ক্ষণস্থায়ী, ঘটনার ওপর নির্ভরশীল এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল—ম্যাচের ফলাফলের সাথে সাথে যার আবেগও ওঠানামা করে।

ইতিহাসে দেখা গেছে, পতাকা কেবল ক্রীড়া বা পরিচয়ের প্রতীক নয়, বরং রাজনৈতিক সংহতির ভাষাও হতে পারে। ইরাক আক্রমণের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরাকি পতাকা নিয়ে শান্তিকামী মিছিল হয়েছিল। বাংলাদেশেও সীমিত পরিসরে এমন সংহতি দেখা গেছে। যদিও তা কোনো বৈশ্বিক শক্তির নীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে না, তবুও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকে মানুষের চেতনায়। এই ধরনের পতাকা-রাজনীতি মানুষের ভেতরে দায়বোধ তৈরি করে। নিপীড়ন, যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে পতাকা তখন কেবল কাগজ-রঙের বস্তু থাকে না; এটি হয়ে ওঠে নৈতিক অবস্থান।

বিশ্বকাপের সময় ভিনদেশি পতাকা যখন বাংলাদেশে উড়তে দেখি, তখন শুধু খেলার কৌশল নয়, সেই দেশগুলোর ইতিহাসও অচেতনভাবে সামনে চলে আসে। কিন্তু সমস্যা হলো—এই সংযোগটি খুব কম ক্ষেত্রেই গভীর হয়। নিজ দেশের দল না থাকলেও বাংলাদেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার আবেগে বিভক্ত থাকে। এটি অনেকটা প্রতীকী ঠাণ্ডা যুদ্ধের মতো, যেখানে আবেগ দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে যায়। এই সময়টায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পতাকা ঝুলে থাকে ছাদে, দেয়ালে, দোকানে—কিন্তু সেই পতাকা-চিহ্নিত দেশগুলোর ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া কতটা গভীর, সেই প্রশ্ন থেকে যায়।

প্রকৃত অর্থে পতাকার মর্যাদা রক্ষা করতে হয় আচরণ, জ্ঞান এবং সম্মানের মধ্য দিয়ে। বিশ্ব ফুটবলের উন্মাদনা আমাদের দেখায়—বাংলাদেশ শুধু খেলা দেখে না, প্রতীকও ধারণ করে। কিন্তু সেই প্রতীক ধারণ কতটা সচেতন, কতটা জ্ঞানভিত্তিক—সেটিই আসল প্রশ্ন।

এখানেই শিক্ষা ও দায়িত্বের জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি শিশু যখন জিজ্ঞেস করে, ব্রাজিলের পতাকায় মাঝখানের প্রতীকটি কী, বা জার্মানির পতাকার রঙের অর্থ কী—তখন সেটি শুধু কৌতূহল নয়, বরং একটি শিক্ষাগত সুযোগ। এই প্রশ্নকে এড়িয়ে না গিয়ে, প্রতিটি পতাকার পেছনের রাষ্ট্রগঠন, উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা জরুরি। এবারের বিশ্বকাপে পতাকা আর শুধু আবেগের প্রতীক নেই—এটা একটা ছোটখাটো ভক্তিবাদের রাজনৈতিক-অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। কোন পতাকা কোথায় উঠবে, কত বড় হবে, কতটা দৃশ্যমান হবে—এসবই এখন অনেকটাই বাজার, প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন। স্থানীয় ব্যবসা থেকে শুরু করে অনলাইন শপ—সবাই এই ‘ফ্যান ইকোনমি’কে ক্যাশ করছে: পতাকা, ব্যানার, জার্সি, এমনকি রঙিন ডেকোরেশনও এক ধরনের মৌসুমি বাজার তৈরি করে। আবার একইসাথে এর ভেতরে আছে প্রতীকী ক্ষমতার রাজনীতি—কে কোন দলের সমর্থক, সেটি অনেক সময় পরিচয়ের মতো কাজ করে, যা সামাজিক কথোপকথন, গ্রুপিং এমনকি অনানুষ্ঠানিক স্ট্যাটাস-হায়ারার্কিও নির্ধারণ করে। অর্থাৎ পতাকা এখানে শুধু কাপড় না—এটা একদিকে কনজাম্পশন অবজেক্ট, অন্যদিকে সোশ্যাল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের টুল।

নইলে পতাকার প্রতি সম্মান শুধু আবেগে সীমাবদ্ধ থাকে, জ্ঞানে রূপ নেয় না। এবং তখনই দেখা যায়—হার-জিতের ভিত্তিতে কোনো পতাকাকে মুহূর্তেই অপমান করা হচ্ছে, যেটি একটি পরিণত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবকে নির্দেশ করে। স্বাধীনতা মানে শুধু পতাকা উড়ানো নয়; এটি সেই পতাকা বহনের সক্ষমতা ও দায়িত্বও বোঝায়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শক্তি।’ অর্থাৎ পতাকা কোনো সহজ প্রতীক নয়—এটি একটি দায়িত্বের ভার। হাজার ফুট লম্বা পতাকা তৈরি করা বা শহরজুড়ে রঙে রঙে ঢেকে দেওয়া হয়তো ভালোবাসার প্রকাশ, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। প্রকৃত অর্থে পতাকার মর্যাদা রক্ষা করতে হয় আচরণ, জ্ঞান এবং সম্মানের মধ্য দিয়ে। বিশ্ব ফুটবলের উন্মাদনা আমাদের দেখায়—বাংলাদেশ শুধু খেলা দেখে না, প্রতীকও ধারণ করে। কিন্তু সেই প্রতীক ধারণ কতটা সচেতন, কতটা জ্ঞানভিত্তিক—সেটিই আসল প্রশ্ন।

কারণ শেষ পর্যন্ত, পতাকা শুধু ওড়ানোর বিষয় নয়। পতাকা বহনের বিষয়। আর সেই বহনের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি জাতির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পরিপক্বতা। পতাকা এখানে শুধু কাপড় না—এটা একটা মুড, একটা ভাইরাল আবেগের শর্টকাট। বিশ্বকাপ এলেই আমরা যে উন্মাদনা দেখি, সেটা একদিকে আনন্দের, সংযোগের, একসাথে থাকার এক অদ্ভুত সামাজিক মুহূর্তও বটে। কিন্তু সেই মুহূর্তের ভেতরেই প্রশ্নটা থেকে যায়—আমরা কি প্রতীকটা বুঝে ধারণ করছি, নাকি শুধু ট্রেন্ড হিসেবে ব্যবহার করছি? কারণ, হাইপ যত দ্রুত ওঠে, তত দ্রুতই নেমেও যায়। আর তখন পতাকা আর আবেগ নয়—শুধু একটা ডেকোরেশন হয়ে পড়ে। তাই আসল চ্যালেঞ্জটা হয়তো উচ্ছ্বাস থামানো না, বরং উচ্ছ্বাসের ভেতর একটু বোঝাপড়া যোগ করা। নাহলে পতাকা থাকবে, কিন্তু তার মানে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে—ফিল্টারড ফিডে যেমন অনেক কিছু থাকে, কিন্তু গভীরতা থাকে না।

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

সম্পর্কিত