গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ঘোষিত ফলাফলে ২৯৭ আসনে বিজয়ীদের মধ্যে ২২৭ জন অর্থাৎ ৭৬ শতাংশই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ১৪৮ জন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৬৩ জন এবং অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী ২০ জনের মধ্যে ১৬ জন।
এত বিপুল সংখ্যক নতুন সদস্যের এক সঙ্গে এমপি পদে নির্বাচিত হওয়াটা আনন্দের। খানিকটা উদ্বেগেরও। তরুণদের স্বপ্ন ও লক্ষ্য থাকবে উপরমুখী, উদ্যম ও উচ্ছ্বাস থাকবে বাধভাঙা। সাধারণভাবে লোভ ও লালসা থেকে তাদের মুক্ত থাকবার সম্ভাবনা বেশি। মোটকথা, এমপি হিসেবে তরুণদের ব্যাপক সংখ্যায় নির্বাচিত হয়ে আসাটা জাতীয় সংসদের জন্য একটি বিরাট শক্তি।
অন্যদিকে উদ্বেগ এ কারণে যে, সংসদীয় কার্যক্রমের ব্যাপারে নতুন এই বিশাল সংখ্যক এমপির কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই। ফলে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি মেনে সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সেখানে তাঁরা কে কতোটা অবদান রাখতে পারবেন, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তদুপরি, ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের একটি বড় অংশ দুর্নীতি ও লোভ-লালসায় জড়িয়ে কদর্যতাপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
এসব তরতাজা ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব নতুন এমপিদের ওপর গিয়ে পড়ে কিনা, সে ব্যাপারে সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক ভীতি, সন্দেহ ও আশঙ্কা রয়েছে। নতুন এমপিদেরও কেউ কেউ যদি হাঁসের মাংস খাওয়ার জন্য রাত-বিরাতে পূর্বাচলের তিন শ ফুটে কিংবা অনুরূপ কোথাও ঘুরে বেড়ান, তাতে মোটেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে তেমনটি যাতে না ঘটে, সেটিই জনগণের প্রত্যাশা। অধিকন্তু সংসদ সদস্যের দায়িত্ব ও কার্যাবলি নিয়ে রাষ্ট্রযাত্রার একেবারে গোড়া থেকেই দেশে একটি ত্রুটিপূর্ণ চর্চা চালু রয়েছে। এমপিগণ নিজেদেরকে আইনপ্রণেতা ভাবার চেয়ে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি ভাবতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এর অনিবার্য নেতিবাচক প্রভাব বর্তমান সংসদ সদস্যদের উপরও পড়তে বাধ্য।
আগামী ১২ মার্চ শুরু হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। এমনি পরিস্থিতিতে এমপিদের নিয়ে দলীয় উদ্যোগে ৫ থেকে ৭ দিনের একটি ওরিয়েন্টেশন কোর্স আয়োজনের প্রস্তাব করছি।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ-ব্যবস্থা অনেকটা ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই গড়ে তোলা হয়েছে। তাই এই দেশের নবনির্বাচিত এমপিরা যাতে সংসদের সকল কাজে দক্ষতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে পারেন, সেজন্য সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা খোঁজার চেষ্টা করা যেতে পারে। সেখানকার এই জাতীয় বহু ঘটনার একটির কথা এখানে উল্লেখ করি। ব্রিটেনের ১৯৯৭-এর সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে সেখানকার প্রায় সকল জনমত জরিপের ফলাফলই আভাস দিচ্ছিল যে, লেবার পার্টিই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করে পরবর্তী সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। দীর্ঘ আঠারো বছর (১৯৭৯-১৯৯৭) ক্ষমতার বাইরে ছিল তারা। এমনি পরিস্থিতিতে দলটির তৎকালীন নেতা টনি ব্লেয়ার সরকার পরিচালনার প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে সর্বাগ্রে তাঁর ছায়া মন্ত্রিপরিষদের সকল সদস্যকে অক্সফোর্ড বিজনেস স্কুলে একমাসের প্রশিক্ষণে পাঠিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতার সঙ্গে সরকার পরিচালনার ব্যাপারে নিজেদেরকে গড়ে তোলা। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে অংশ নিতে যাওয়া দলগুলো কি অন্তত ৭ দিনের জন্য হলেও তাদের এমপিদেরকে নিয়ে এ ধরনের একটি প্রশিক্ষণ কোর্স আয়োজনের কথা ভাববে?
সবচেয়ে ভালো হতো, প্রশিক্ষণ কোর্সটি ১২ মার্চ তারিখে প্রথম অধিবেশন শুরুর আগেই আয়োজন করতে পারলে। কিন্তু সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হতে আর মাত্র সপ্তাহ-দুয়েক বাকি। ফলে এ সময়ের মধ্যে এ রকম একটি গভীরতাপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রশিক্ষণ কোর্স আয়োজন একটি দুঃসাধ্য কাজ। তাই প্রস্তাবিত কোর্সটি প্রথম অধিবেশন শুরুর আগে না হোক, অন্তত সংসদের প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশনের মধ্যকার বিরতিতে করতে পারলে খুবই ভালো হয়।
নতুন এমপিদেরও কেউ কেউ যদি হাঁসের মাংস খাওয়ার জন্য রাত-বিরাতে পূর্বাচলের তিন শ ফুটে কিংবা অনুরূপ কোথাও ঘুরে বেড়ান, তাতে মোটেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে তেমনটি যাতে না ঘটে, সেটিই জনগণের প্রত্যাশা।
রীতি অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশন সংক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনাই সর্বাধিক। সে ক্ষেত্রে কোর্সটি মার্চের শেষার্ধে অথবা এপ্রিলের প্রথমার্ধে আয়োজন করা যেতে পারে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের আওতায় ইতিপূর্বে বাংলাদেশ সংসদীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পার্লামেন্টারি স্টাডিজ- বিআইপিএস) নামক যে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করা হয়েছিল, তার কোনো কর্মকাণ্ডের কথা এখন আর শোনা যায় না। প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকলে সংসদ সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ কোর্স আয়োজনের কাজটি বিআইপিএসও করতে পারতো। আর এটি টিকে বা কার্যকর না থাকলেও এটিকে পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন।
তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় অনুমান করা চলে যে, বিআইপিএস হয়তো এই মুহূর্তে প্রশিক্ষণ কোর্সটি আয়োজনের অবস্থায় নেই। সে ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ কোর্স আয়োজন করতে হলে তা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোকেই করতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নিজ নিজ দলের এমপিদের প্রশিক্ষণ দলীয় ভিত্তিতে আলাদা আলাদা হবে বলেই ধারণা করা চলে। দলগুলোর কাছে অনুরোধ, তারা যেন এ প্রশিক্ষণ কোর্স শুধুমাত্র অন্ধ দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আয়োজন না করে রাষ্ট্র ও জনগণের প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণের জন্য জাতীয় সংসদের কার্যক্রম কিভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, সে অনুযায়ী ও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে করেন। তারা যেন তাদের সংসদ সদস্যদের মধ্যে এই বোধও জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেন যে, বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়-- প্রতিপক্ষের কারো প্রস্তাব ন্যায্য বা যৌক্তিক হলে তারা যেন জাতীয় সংসদ যেয়ে সেটিরও পক্ষে দাঁড়ান। এবং সেটি বিল পাস সংক্রান্ত কোনো বিষয় না হলে এ ধরনের সমর্থন বা অসমর্থনের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ (দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিতে না পারা) কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। বরং এ ধরনের ন্যায্যতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে ৭০ অনুচ্ছেদের উপস্থিতিই বহুলাংশে অকার্যকর হয়ে পড়বে।
প্রস্তাবিত প্রশিক্ষণ কোর্সের বিষয়বস্তু কী হবে, সে নিয়ে এখানে খানিকটা আলোকপাত করা যেতে পারে। কোর্সের আওতায় যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে তারমধ্যে রয়েছে সংবিধান, মৌলিক অধিকারের সাথে সম্পর্কিত আইন ও বিধানাবলী, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও মন্ত্রণালয়ের সাথে উক্ত কমিটির সম্পর্ক, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি, নির্বাহী বিভাগের কর্মপদ্ধতি, বাজেটে অর্থ বরাদ্দকরণের পদ্ধতি ও এর প্রভাব ইত্যাদি। আর প্রশিক্ষণ কোর্সের আওতায় তাদেরকে এই ধারণাটিও দিতে হবে যে, সংসদ সদস্যের কাজ ও স্থানীয় সরকারের কাজের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে এবং তাঁদের উচিত হবে এ পার্থক্য মেনে চলা। অর্থাৎ সংসদ সদস্যগণ কর্তৃক নিজেদের দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ডের পরিধিকে সচেতনভাবে আইন, বিধি ও নীতি প্রণয়ন সংশ্লিষ্ট কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
প্রশিক্ষণ কোর্সটি আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষক হিসেবে শুধুমাত্র নিজদলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ব্যক্তিদেরকে যুক্ত না করে সত্যিকারের বিযয় বিশেষজ্ঞদেরকে অন্তর্ভুক্ত করাটাই সমীচীন হবে। তবে সংসদে ন্যায্যতাপর্ণ উপায়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত রাখার জন্য তারা কী করবেন, সে বিষয়গুলো নিজ দলীয় সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা করে ঠিক করা যেতে পারে-- এমপিগণের জন্য আয়োজিতব্য প্রশিক্ষণ কোর্সের আওতায় নয়। সারল্য ও স্বচ্ছতার সাথে মনে রাখতে হবে যে, প্রশিক্ষণ হচ্ছে বর্ধিত জ্ঞান ও তথ্যদনের মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার উন্নয়ন। এর বাইরে নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা ও দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে চাইলে তা স্বতন্ত্র দলীয় প্রশিক্ষণ আয়োজনের মাধ্যমে করা যেতে পারে।
জাতীয় সংসদকে দক্ষতার সাথে ও জনগণের স্বার্থের অনুগামীরূপে পরিচালনা করতে হলে প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক ধারণা ও দক্ষতাসম্পন্ন একগুচ্ছ এমপি। তাদের কাছে অন্ধ দলীয় আনুগত্যের চেয়ে ন্যায়নীতি, আদর্শিক চিন্তাভাবনা ও মানুষের প্রতি মমতা হবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
- আবু তাহের খান: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়