রোহিঙ্গা সংকট: বাংলাদেশের সামনে কোন পথ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ২১: ৫৭
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

রোহিঙ্গা সংকট নয় বছরে পা দিল। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে বাংলাদেশে আসা তরুণের আজ সন্তান জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশের ক্যাম্পে। তাদের ভবিষ্যৎ কোথায়—এই প্রশ্ন এখন শুধু রোহিঙ্গাদের নয়, বাংলাদেশেরও।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মানুষের দুর্দশার মূল্য যে সবসময় সমান নয়, তার নির্মম উদাহরণ ফিলিস্তিন। ভূরাজনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর দুর্দশা দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। ২০১৭ সালে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া হলেও নয় বছর পরও কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান আসেনি।

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে স্থায়ী হতে চায় না। তারা নিজেদের দেশে ফিরতে চায়। কিন্তু যে মিয়ানমারে তারা ফিরবে, সেই মিয়ানমার আর আগের মিয়ানমার নেই। রাখাইনের পরিবর্তিত নিয়ন্ত্রণ, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত এবং নতুন আঞ্চলিক ভূরাজনীতি প্রত্যাবাসনকে আগের চেয়ে অনেক জটিল করেছে।

বাংলাদেশ কি এই নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত?

নয় বছর ধরে আমাদের নীতি ছিল মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং প্রত্যাবাসনের তালিকা প্রস্তুত করা। কিন্তু শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনা যথেষ্ট নয়। মিয়ানমার কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে যাচাই করার কথা বললেও যাচাই মানেই প্রত্যাবাসন নয়। তারা কোথায় থাকবে, নাগরিকত্ব ও জমির অধিকার কী হবে, নিরাপত্তা কে দেবে—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া মানুষকে ফেরানো হবে অনিরাপদ ভূখণ্ডে পাঠানো।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রস্তুতির প্রশ্নও জরুরি। ২০২৫ সালের মার্চে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আশাবাদ জানিয়েছিলেন, রোহিঙ্গারা পরের ঈদ নিজেদের দেশে করতে পারবেন। ২০২৬ সালের ঈদও চলে গেছে। সেই আশাবাদের ভিত্তি কী ছিল? মিয়ানমারের কোনো নিশ্চয়তা, নাকি আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিশ্রুতি? কূটনীতিতে ভিত্তিহীন আশাবাদ রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে। শরণার্থীদের মধ্যেও হতাশা বাড়ায়।

বাংলাদেশ কি কিছু সুযোগও হারিয়েছে? ২০১৭ সালের পর আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ও সহায়তা বেশি ছিল। আন্তর্জাতিক সহানুভূতির সেই সময়টিতে বাংলাদেশ কি যথেষ্ট কূটনৈতিক পুঁজি তৈরি করতে পেরেছিল? ২০১৮ সালের কৌশল কি আজকের রাখাইনের বাস্তবতায়ও কার্যকর? এখন গাজা, ইউক্রেনসহ নানা বৈশ্বিক সংকটে রোহিঙ্গা ইস্যু আড়ালে পড়েছে। কমছে অর্থায়নও।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হবে ধরে নেওয়া যে রোহিঙ্গারা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেই থেকে যাবে। দীর্ঘ ক্যাম্পজীবন, নতুন প্রজন্মের জন্ম এবং মিয়ানমারের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা তাদের এক অনিশ্চিত মধ্যবর্তী পরিচয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর মানবিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। এই বাস্তবতা প্রত্যাবাসনের দাবিকে আরও জরুরি করে তোলে।

তাই প্রয়োজন নতুন কূটনৈতিক কৌশল। মিয়ানমারের পাশাপাশি রাখাইনের বাস্তব ক্ষমতাধর পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ; এবং চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, আসিয়ান ও জাতিসংঘকে নিয়ে বহুপাক্ষিক ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। চীনের প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডরও বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক দরকষাকষির একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র। এই করিডরকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিনিময় হিসেবে নয়, বরং চীনের সঙ্গে বৃহত্তর কৌশলগত দরকষাকষির একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। তবে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

একই সঙ্গে আত্মসমালোচনা জরুরি। ২০১৮ সালের কূটনৈতিক কৌশল কি আজও কার্যকর? গত নয় বছরে আমরা কি শুধু অপেক্ষাই করেছি?

রোহিঙ্গারা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। কিন্তু মূল্যটা বাংলাদেশই সবচেয়ে বেশি দিচ্ছে। স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও জননিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়ছে। তাই আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্যাম্পে শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে দুটি ভুল পথ—বাস্তবতা যাচাই না করে প্রত্যাবাসনের আশ্বাস দেওয়া অথবা স্থায়ী ক্যাম্পবাস্তবতা মেনে নেওয়া। প্রয়োজন তৃতীয় পথ: প্রত্যাবাসনের অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতার প্রস্তুতি।

কারণ সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু রোহিঙ্গারা ফিরতে না পারা নয়। তারা যদি একদিন আর ফেরার মতো কোনো দেশই না পায়, তখন বাংলাদেশ কী করবে? সেই প্রশ্নের উত্তর এখনই খুঁজতে হবে। আগামী ঈদের আশ্বাস দিয়ে নয়। আগামী দশকের বাস্তবতার প্রস্তুতি নিয়ে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত