রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি

ড. আমেনা মহসিন
ড. আমেনা মহসিন

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ৩২
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

রোহিঙ্গা সংকটের উদ্ভব বাংলাদেশে হয়নি, আর এর চূড়ান্ত সমাধানও এককভাবে বাংলাদেশের হাতে নেই। এটি সম্পূর্ণভাবে মিয়ানমারের তৈরি করা একটি বহুমুখী সমস্যা। রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারেই ফিরে যেতে হবে, এবং সেখানে তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করেই পাঠাতে হবে। বাংলাদেশ কেবল মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু এই সংকটের বোঝা অনন্তকাল ধরে বহন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই যখন বলা হয় ‘সমাধান হয়নি’, তখন বুঝতে হবে এটি সমাধান করার মূল দায়িত্ব মিয়ানমার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথে একটি বড় বাধা হলো বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং ভূ-অর্থনীতি। আমরা যদি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার দিকে তাকাই, তবে দেখব মানবাধিকারের চেয়ে ভূ-কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থই পরাশক্তিগুলোর কাছে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। চীন, ভারত বা সিঙ্গাপুরের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মিয়ানমারে বিশাল বিনিয়োগ এবং কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্ব বা বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছে নানা সংঘাতে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আমেরিকা, ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের মনোযোগ এখন আর রোহিঙ্গা সংকটে নিবদ্ধ নেই।

এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে, এমনকি দাতাগোষ্ঠীদের মধ্যেও একধরনের 'ফ্যাটিগ' বা ক্লান্তি চলে এসেছে। আন্তর্জাতিক আদালত (আইসিজে) বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) এটি যে ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যা, তা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও মিয়ানমারের ওপর কোনো কার্যকর চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের এই নীরবতা বা উদাসীনতার বিপরীতে আমাদের বিকল্প ভাবতে হবে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে বিশ্ব জনমতের একটি বিরাট ভূমিকা রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার হয়তো খুব বেশি কিছু করবে না, কিন্তু তাদের দেশের নাগরিক সমাজকে কাজে লাগানো যেতে পারে। সবচেয়ে আশার কথা হলো, ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যেও এখন একটি ‘ডিজিটাল জেনারেশন’ বা প্রযুক্তি-সচেতন প্রজন্ম তৈরি হয়েছে।

বৈশ্বিক সম্প্রদায় বা বিভিন্ন দেশ যদি মিয়ানমারে বিনিয়োগ করতে চায়, তবে বাংলাদেশের উচিত কূটনৈতিকভাবে এই দাবি তোলা যেন সেই বিনিয়োগের শর্ত হিসেবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ, "উন্নয়ন ও বিনিয়োগের বিপরীতে রোহিঙ্গাদের ধাপে ধাপে ফিরিয়ে নিতে হবে"—এমন একটি নীতি আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।

এই তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হচ্ছে। তাদের এই যুব আন্দোলন এবং সচেতনতা বৈশ্বিক নাগরিক সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মিয়ানমারের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া মিয়ানমারের যে বুদ্ধিজীবীরা বর্তমানে নির্বাসনে আছেন, তাদের সঙ্গেও যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক মহলে আওয়াজ তোলা প্রয়োজন।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যেও উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। বৈশ্বিক সম্প্রদায় বা বিভিন্ন দেশ যদি মিয়ানমারে বিনিয়োগ করতে চায়, তবে বাংলাদেশের উচিত কূটনৈতিকভাবে এই দাবি তোলা যেন সেই বিনিয়োগের শর্ত হিসেবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ, "উন্নয়ন ও বিনিয়োগের বিপরীতে রোহিঙ্গাদের ধাপে ধাপে ফিরিয়ে নিতে হবে"—এমন একটি নীতি আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।

গত নয় বছর ধরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থান করছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামেও এর প্রভাব পড়ছে। এতে আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের প্রায় ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলার তহবিলের প্রয়োজন হলেও, আন্তর্জাতিক সাহায্য ক্রমশ কমছে। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের একার পক্ষে এই চাপ সামলানো অসম্ভব।

তাই যতদিন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আছে, তাদের শুধু বসে না খাইয়ে বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা দক্ষতা উন্নয়নমূলক কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। আইটি প্রশিক্ষণ বা কুটির শিল্পের মতো কাজে তাদের যুক্ত করলে তারা আর আনস্কিলড বা পুরোপুরি পরনির্ভরশীল থাকবে না। এই দক্ষতা তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির মাধ্যমে যেমন নিজেদের আয়ের পথ তৈরি করবে, তেমনি মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পরও তাদের জীবন জীবিকায় সহায়ক হবে।

রোহিঙ্গাদের মধ্যেও এখন একটি ‘ডিজিটাল জেনারেশন’ বা প্রযুক্তি-সচেতন প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। এই তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হচ্ছে। তাদের এই যুব আন্দোলন এবং সচেতনতা বৈশ্বিক নাগরিক সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মিয়ানমারের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি ‘হোলিস্টিক অ্যাপ্রোচ’ বা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি। আমাদের কূটনীতিতে সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো গবেষণার অভাব। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত বাংলাদেশ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে, কিন্তু আমরা কেবল ঘটনার পর ‘রিঅ্যাক্ট’ বা প্রতিক্রিয়া জানাই।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে এমন স্বাধীন ‘রিসার্চ সেল’ বা থিংক ট্যাংক থাকা উচিত, যারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি নিয়ে নির্মোহভাবে গবেষণা করবে। অতীতে আমাদের দেশের থিংক ট্যাংকগুলোকে দলীয়করণ করা হয়েছে; সরকার যা শুনতে চায়, তারা কেবল সেটাই বলেছে। ফলে প্রকৃত চিত্র বা সঠিক পরামর্শ উঠে আসেনি।

স্বাধীন গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তরুণ গবেষকরা যখন বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নীতি-নির্ধারণী পরামর্শ দেবেন, তখন সেই পররাষ্ট্রনীতি অনেক বেশি কার্যকর হবে। রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে রাখাইনের স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা অবকাঠামো খাতে কী ধরনের উন্নয়ন প্রয়োজন—তা নিয়ে এখনই যৌথ গবেষণা শুরু করা দরকার।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারে যারা পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি দেখভাল করছেন, তাদের জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোতে কাজ করার বিশাল অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই ইতিবাচক দিকটিকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। শুধু কথায় নয়, সুনির্দিষ্ট গবেষণা, দক্ষ কূটনীতি এবং বৈশ্বিক নাগরিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে এগোলেই রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের পথ উন্মুক্ত হতে পারে।

  • ড. আমেনা মহসিন: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত