ড. খালিদুর রহমান

বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো একক ঘটনা বা এক প্রজন্মের কৃতিত্বের ইতিহাস নয়। এটি দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, অর্জন, ভুল, সংশোধন এবং পুনর্জাগরণের ধারাবাহিক পথচলার ইতিহাস। এই ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে নিজস্ব ভূমিকা রেখেছে। তাই একটি অধ্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটিকে ছোট করা কিংবা ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত করা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রেরই ক্ষতি করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে ইতিহাসকে ঘিরে এক ধরনের প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক পক্ষ নিকট অতীতের বিতর্ক থেকে মনোযোগ সরাতে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে সামনে নিয়ে আসে। অন্য পক্ষ আবার সাম্প্রতিক জুলাই গণআন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অবস্থানকে তুলনামূলকভাবে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করে। উভয় প্রবণতাই ইতিহাসের প্রতি অবিচার। কারণ ইতিহাস কোনো প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি ধারাবাহিকতা।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের পথ শুরু হয়নি ১৯৭১ সালে, আবার সেখানেই শেষও হয়ে যায়নি। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করেছে। একইভাবে স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, সুশাসন, জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতার দাবিতে সংঘটিত বিভিন্ন আন্দোলন রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ও গণমুখী করার প্রয়াস হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এই ধারাবাহিকতাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার অর্থ জাতীয় ইতিহাসকে অসম্পূর্ণ করে ফেলা।
মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। এটি শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার ইতিহাস নয়, বরং আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা, সাম্য এবং মানবিক মর্যাদার জন্য একটি জাতির আত্মত্যাগের ইতিহাস। এই সত্য কখনো ম্লান হওয়ার নয়। একইভাবে স্বাধীনতার পর নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে সংঘটিত আন্দোলনগুলোও স্মরণযোগ্য। কারণ স্বাধীনতা অর্জনের মতোই সেই স্বাধীনতার আদর্শকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করাও একটি চলমান দায়িত্ব।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণআন্দোলনকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কোনো যুক্তি নেই। একটি রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস, অন্যটি সেই রাষ্ট্রকে আরও ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং গণতান্ত্রিক করার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। একটি অন্যটির বিকল্প নয়। বরং উভয়ই বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক সুবিধার জন্য একটি অধ্যায়কে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করানো হয়। এতে সাময়িকভাবে জনসমর্থন আদায় করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় ঐক্য দুর্বল হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয় এবং সমাজে পারস্পরিক অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। ইতিহাসের উদ্দেশ্য বিভাজন সৃষ্টি করা নয়, বরং শিক্ষা প্রদান করা।
বিশ্বের অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি শুধু নিজের পুনর্গঠন করেনি, নাৎসি অতীতের অপরাধও স্বীকার করেছে। অপরাধের স্মৃতি মুছে না ফেলে শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাসের অন্ধকার দিক সম্পর্কেও জানিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ অবসানের পর সত্য ও পুনর্মিলন কমিশনের মাধ্যমে প্রতিশোধের পরিবর্তে সত্য প্রকাশ ও পুনর্মিলনের পথ বেছে নেওয়া হয়। রুয়ান্ডা গণহত্যার পরও জাতীয় পুনর্গঠনের জন্য অতীতের বিভাজনকে স্থায়ী না করে পুনর্মিলনের সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সে নিজের গৌরবের পাশাপাশি নিজের ভুলের প্রতিও সৎ থাকে।
বাংলাদেশেও ইতিহাসের প্রতি এমন সততা প্রয়োজন। ইতিহাসকে দলীয় সম্পত্তি বানানো যেমন অনুচিত, তেমনি কোনো একটি রাজনৈতিক প্রজন্মকে পুরো ইতিহাসের একমাত্র নির্মাতা হিসেবে উপস্থাপন করাও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস বহু মানুষের, বহু আন্দোলনের এবং বহু প্রজন্মের সম্মিলিত উত্তরাধিকার।
আজকের তরুণ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বেড়ে উঠছে। তথ্যের প্রাচুর্য যেমন বেড়েছে, তেমনি বিভ্রান্তির সুযোগও বেড়েছে। রাজনৈতিক প্রচারণা প্রায়ই ইতিহাসকে বেছে বেছে উপস্থাপন করে। ফলে একটি অংশ অতিরঞ্জিত হয়, অন্য অংশ আড়ালে চলে যায়। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় চেতনাকে দুর্বল করে এবং সমাজকে বিভক্ত করে।
ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার অর্থ কেবল অতীতের গৌরব স্মরণ করা নয়। এর অর্থ অতীতের ভুলগুলোকেও সাহসের সঙ্গে স্বীকার করা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি ঘটেছে। এসব ঘটনার দায় কোনো না কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়। ইতিহাসের স্বার্থে সেই বাস্তবতাও অস্বীকার করা উচিত নয়।
একটি পরিণত গণতন্ত্রে আত্মসমালোচনা দুর্বলতার পরিচয় নয়, বরং নৈতিক শক্তির প্রকাশ। যে ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল নিজের সাফল্যের পাশাপাশি নিজের ব্যর্থতার কথাও বলতে পারে, জনগণ তার প্রতিই বেশি আস্থা রাখে। কারণ মানুষ জানে, ভুল অস্বীকার করলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকে না। কিন্তু ভুল স্বীকার করলে ভবিষ্যতের জন্য নতুন পথ তৈরি হয়।
ক্ষমা চাওয়ার সংস্কৃতি আমাদের রাজনৈতিক জীবনে প্রায় অনুপস্থিত। অথচ উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজে এটি একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক চর্চা। ভুল সিদ্ধান্ত, অন্যায় আচরণ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা প্রার্থনা নেতৃত্বকে ছোট করে না, বরং তার নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে। জনগণ নিখুঁত নেতৃত্ব চায় না, তারা জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব চায়।
বাংলাদেশের সামনে এখনো গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান কেবল নতুন স্লোগানে হবে না। প্রয়োজন অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতার মূল্য শিখিয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী আন্দোলনগুলো আমাদের শিখিয়েছে যে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ প্রতিষ্ঠা করতে হলে নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হয়। এই দুই শিক্ষা একে অপরের পরিপূরক।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর, যেখানে ইতিহাসকে প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, শিক্ষা ও আত্মসমালোচনার উৎস হিসেবে দেখা হবে। কোনো দল, কোনো নেতা কিংবা কোনো প্রজন্ম বাংলাদেশের ইতিহাসের একক মালিক নয়। এই ইতিহাস সমগ্র জাতির যৌথ সম্পদ। তাই এর গৌরবও সবার, এর ভুল থেকেও শিক্ষা নেওয়ার দায়ও সবার।
সবশেষে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবাই নিজেদের অবদানকে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরতে চাই। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একটি পরিণত জাতির পরিচয় কেবল নিজের গৌরব প্রচারে নয়, নিজের ভুল স্বীকার করার মধ্যেও নিহিত। ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্র কিংবা সামাজিক সংগঠন যদি নিজেদের ইতিবাচক অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি নিজেদের কৃত অন্যায়, সীমাবদ্ধতা ও অপকর্মও সৎভাবে স্বীকার করে, সেসবের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ভবিষ্যতে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার অঙ্গীকার করে, তবে জাতি নিঃসন্দেহে অনেক বেশি উপকৃত হবে।
ঐক্য কখনো কেবল বিজয়ের স্মৃতির ওপর দাঁড়ায় না। ঐক্য গড়ে ওঠে সত্য স্বীকার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আত্মসমালোচনা এবং ভবিষ্যতের প্রতি যৌথ দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে। ইতিহাসকে ছোট বড় করার প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত কাউকেই বিজয়ী করে না। বিজয়ী হয় কেবল বিভাজন। আর ইতিহাসকে সত্য, ন্যায় ও আত্মসমালোচনার আলোয় দেখার সাহসই পারে একটি জাতিকে আরও পরিণত, আরও আত্মবিশ্বাসী এবং আরও ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে। বাংলাদেশেরও সেই পথেই এগিয়ে যাওয়া উচিত।

বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো একক ঘটনা বা এক প্রজন্মের কৃতিত্বের ইতিহাস নয়। এটি দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, অর্জন, ভুল, সংশোধন এবং পুনর্জাগরণের ধারাবাহিক পথচলার ইতিহাস। এই ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে নিজস্ব ভূমিকা রেখেছে। তাই একটি অধ্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটিকে ছোট করা কিংবা ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত করা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রেরই ক্ষতি করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে ইতিহাসকে ঘিরে এক ধরনের প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক পক্ষ নিকট অতীতের বিতর্ক থেকে মনোযোগ সরাতে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে সামনে নিয়ে আসে। অন্য পক্ষ আবার সাম্প্রতিক জুলাই গণআন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অবস্থানকে তুলনামূলকভাবে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করে। উভয় প্রবণতাই ইতিহাসের প্রতি অবিচার। কারণ ইতিহাস কোনো প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি ধারাবাহিকতা।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের পথ শুরু হয়নি ১৯৭১ সালে, আবার সেখানেই শেষও হয়ে যায়নি। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করেছে। একইভাবে স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, সুশাসন, জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতার দাবিতে সংঘটিত বিভিন্ন আন্দোলন রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ও গণমুখী করার প্রয়াস হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এই ধারাবাহিকতাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার অর্থ জাতীয় ইতিহাসকে অসম্পূর্ণ করে ফেলা।
মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। এটি শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার ইতিহাস নয়, বরং আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা, সাম্য এবং মানবিক মর্যাদার জন্য একটি জাতির আত্মত্যাগের ইতিহাস। এই সত্য কখনো ম্লান হওয়ার নয়। একইভাবে স্বাধীনতার পর নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে সংঘটিত আন্দোলনগুলোও স্মরণযোগ্য। কারণ স্বাধীনতা অর্জনের মতোই সেই স্বাধীনতার আদর্শকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করাও একটি চলমান দায়িত্ব।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণআন্দোলনকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কোনো যুক্তি নেই। একটি রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস, অন্যটি সেই রাষ্ট্রকে আরও ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং গণতান্ত্রিক করার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। একটি অন্যটির বিকল্প নয়। বরং উভয়ই বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক সুবিধার জন্য একটি অধ্যায়কে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করানো হয়। এতে সাময়িকভাবে জনসমর্থন আদায় করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় ঐক্য দুর্বল হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয় এবং সমাজে পারস্পরিক অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। ইতিহাসের উদ্দেশ্য বিভাজন সৃষ্টি করা নয়, বরং শিক্ষা প্রদান করা।
বিশ্বের অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি শুধু নিজের পুনর্গঠন করেনি, নাৎসি অতীতের অপরাধও স্বীকার করেছে। অপরাধের স্মৃতি মুছে না ফেলে শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাসের অন্ধকার দিক সম্পর্কেও জানিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ অবসানের পর সত্য ও পুনর্মিলন কমিশনের মাধ্যমে প্রতিশোধের পরিবর্তে সত্য প্রকাশ ও পুনর্মিলনের পথ বেছে নেওয়া হয়। রুয়ান্ডা গণহত্যার পরও জাতীয় পুনর্গঠনের জন্য অতীতের বিভাজনকে স্থায়ী না করে পুনর্মিলনের সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সে নিজের গৌরবের পাশাপাশি নিজের ভুলের প্রতিও সৎ থাকে।
বাংলাদেশেও ইতিহাসের প্রতি এমন সততা প্রয়োজন। ইতিহাসকে দলীয় সম্পত্তি বানানো যেমন অনুচিত, তেমনি কোনো একটি রাজনৈতিক প্রজন্মকে পুরো ইতিহাসের একমাত্র নির্মাতা হিসেবে উপস্থাপন করাও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস বহু মানুষের, বহু আন্দোলনের এবং বহু প্রজন্মের সম্মিলিত উত্তরাধিকার।
আজকের তরুণ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বেড়ে উঠছে। তথ্যের প্রাচুর্য যেমন বেড়েছে, তেমনি বিভ্রান্তির সুযোগও বেড়েছে। রাজনৈতিক প্রচারণা প্রায়ই ইতিহাসকে বেছে বেছে উপস্থাপন করে। ফলে একটি অংশ অতিরঞ্জিত হয়, অন্য অংশ আড়ালে চলে যায়। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় চেতনাকে দুর্বল করে এবং সমাজকে বিভক্ত করে।
ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার অর্থ কেবল অতীতের গৌরব স্মরণ করা নয়। এর অর্থ অতীতের ভুলগুলোকেও সাহসের সঙ্গে স্বীকার করা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি ঘটেছে। এসব ঘটনার দায় কোনো না কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়। ইতিহাসের স্বার্থে সেই বাস্তবতাও অস্বীকার করা উচিত নয়।
একটি পরিণত গণতন্ত্রে আত্মসমালোচনা দুর্বলতার পরিচয় নয়, বরং নৈতিক শক্তির প্রকাশ। যে ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল নিজের সাফল্যের পাশাপাশি নিজের ব্যর্থতার কথাও বলতে পারে, জনগণ তার প্রতিই বেশি আস্থা রাখে। কারণ মানুষ জানে, ভুল অস্বীকার করলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকে না। কিন্তু ভুল স্বীকার করলে ভবিষ্যতের জন্য নতুন পথ তৈরি হয়।
ক্ষমা চাওয়ার সংস্কৃতি আমাদের রাজনৈতিক জীবনে প্রায় অনুপস্থিত। অথচ উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজে এটি একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক চর্চা। ভুল সিদ্ধান্ত, অন্যায় আচরণ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা প্রার্থনা নেতৃত্বকে ছোট করে না, বরং তার নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে। জনগণ নিখুঁত নেতৃত্ব চায় না, তারা জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব চায়।
বাংলাদেশের সামনে এখনো গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান কেবল নতুন স্লোগানে হবে না। প্রয়োজন অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতার মূল্য শিখিয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী আন্দোলনগুলো আমাদের শিখিয়েছে যে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ প্রতিষ্ঠা করতে হলে নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হয়। এই দুই শিক্ষা একে অপরের পরিপূরক।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর, যেখানে ইতিহাসকে প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, শিক্ষা ও আত্মসমালোচনার উৎস হিসেবে দেখা হবে। কোনো দল, কোনো নেতা কিংবা কোনো প্রজন্ম বাংলাদেশের ইতিহাসের একক মালিক নয়। এই ইতিহাস সমগ্র জাতির যৌথ সম্পদ। তাই এর গৌরবও সবার, এর ভুল থেকেও শিক্ষা নেওয়ার দায়ও সবার।
সবশেষে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবাই নিজেদের অবদানকে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরতে চাই। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একটি পরিণত জাতির পরিচয় কেবল নিজের গৌরব প্রচারে নয়, নিজের ভুল স্বীকার করার মধ্যেও নিহিত। ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্র কিংবা সামাজিক সংগঠন যদি নিজেদের ইতিবাচক অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি নিজেদের কৃত অন্যায়, সীমাবদ্ধতা ও অপকর্মও সৎভাবে স্বীকার করে, সেসবের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ভবিষ্যতে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার অঙ্গীকার করে, তবে জাতি নিঃসন্দেহে অনেক বেশি উপকৃত হবে।
ঐক্য কখনো কেবল বিজয়ের স্মৃতির ওপর দাঁড়ায় না। ঐক্য গড়ে ওঠে সত্য স্বীকার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আত্মসমালোচনা এবং ভবিষ্যতের প্রতি যৌথ দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে। ইতিহাসকে ছোট বড় করার প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত কাউকেই বিজয়ী করে না। বিজয়ী হয় কেবল বিভাজন। আর ইতিহাসকে সত্য, ন্যায় ও আত্মসমালোচনার আলোয় দেখার সাহসই পারে একটি জাতিকে আরও পরিণত, আরও আত্মবিশ্বাসী এবং আরও ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে। বাংলাদেশেরও সেই পথেই এগিয়ে যাওয়া উচিত।
.png)

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুক্তবাজার অর্থনীতি মানে শুধু উন্নয়ন নয়; একইসঙ্গে অসমতার দ্রুত বিস্তার। শহরের গ্লাস টাওয়ার আর গ্রামের অনিশ্চিত শ্রম—এই দুই বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু কখনো একই ফ্রেমে সমানভাবে ধরা পড়ে না। উন্নয়ন হয় ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন হলো—কার জন্য?
৮ ঘণ্টা আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়েছে আজ। আইন প্রণয়নমূলক কাজের পাশাপাশি এই অধিবেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠন করা। নতুন সংসদের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে এসব কমিটি কতটা স্বাধীন, সক্রিয় ও কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম তার ওপর।
২৭ আগস্ট ২০২৬
পৃথিবীর ৬০ ভাগেরও বেশি কৃষি জমি কীটনাশক দূষণের ঝুঁকিতে এবং ৩০ ভাগেরও বেশি জমি উচ্চ ঝুঁকিতে। এইসব কীটনাশক ব্যবহারের নীতিমালা থাকলেও অধিকাংশ কৃষক তা জানে না এবং মানে না।
২৭ আগস্ট ২০২৬
বিটিভির নতুন মহাপরিচালক কাজী জেসিন সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে দীর্ঘ বিবরণ লিখেছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, আওয়ামী শাসনামলে সরকারি দলের এবং ফ্যাসিবাদের প্রচার যন্ত্র হিসেবে বিটিভিকে ব্যবহার করা হয়েছে। বিটিভি অতীতেও ক্রেডিবিলিট
২৭ আগস্ট ২০২৬