হোসেন জিল্লুর রহমানের সাক্ষাৎকার

রাষ্ট্র এখন অনুপস্থিত নয়, দুর্যোগ মোকাবিলার মূল দায়িত্ব সরকারেরই

হোসেন জিল্লুর রহমান বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। দায়িত্ব পালন করছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার’ (পিপিআরসি)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং ব্র্যাকের চেয়ারম্যান হিসেবে। দেশের সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি, অর্থনীতি ও কৃষিখাতে এর প্রভাব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের ভূমিকা নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুজাহিদুল ইসলাম।

হোসেন জিল্লুর রহমান।

স্ট্রিম: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কয়েকটি উপজেলা সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে এবং প্রায় দশ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও পানি বাড়ছে এবং কোথাও কোথায় ইতিমধ্যে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতির উপর এর কেমন প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে আসছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এসব বিপর্যয়ের ধরন, মাত্রা ও তীব্রতায় এখন ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, চীন, ভারতসহ বিশ্বজুড়েই অতিবৃষ্টি, বন্যা, দাবদাহ বা খরার মতো চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে। তাই এসব দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন এমন অনেক জায়গায় বন্যা হচ্ছে, যেখানে আগে কখনো হতো না; যেমন—ফেনী বা নোয়াখালী। এসব অঞ্চলের মানুষের বন্যা মোকাবিলার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় দুর্ভোগ আরও বেশি হচ্ছে। এমনিতেই আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা কিছুটা ধীর, তার ওপর এই বন্যা অর্থনীতিতে একটি বড় ধাক্কা।

তবে শুধু অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না; এই মুহূর্তে মানুষের মানবিক কষ্টটাই প্রধান। ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ছে, আবার বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর মূল সংকট আরও প্রকট হবে। চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজেলাগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অন্যদিকে, আগামী মাসে উজানের ঢল নেমে এলে উত্তরবঙ্গও বড় ধরনের বিপদে পড়তে পারে।

স্ট্রিম: মানুষের এই মানবিক সংকটের পাশাপাশি আমাদের কৃষিখাত বা খাদ্য নিরাপত্তায় এই বন্যার কেমন প্রভাব পড়তে পারে? আর এই সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের করণীয় কী?

হোসেন জিল্লুর রহমান: কৃষিতেও এর বড় প্রভাব পড়বে। বোরো ধান কাটা হয়ে গেলেও আউশ এবং নতুন আমন রোপণ ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এটি মোকাবিলায় আমাদের কয়েকটি স্তরে কাজ করতে হবে: প্রথমত, মানুষের তাৎক্ষণিক কষ্ট লাঘব; দ্বিতীয়ত, বিপর্যস্ত কৃষিকে পুনরুদ্ধার; এবং তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান।

এমন অনেক জায়গায় বন্যা হচ্ছে, যেখানে আগে কখনো হতো না; যেমন—ফেনী বা নোয়াখালী। এসব অঞ্চলের মানুষের বন্যা মোকাবিলার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় দুর্ভোগ আরও বেশি হচ্ছে। এমনিতেই আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা কিছুটা ধীর, তার ওপর এই বন্যা অর্থনীতিতে একটি বড় ধাক্কা।

অনেক সময় আমাদের অপরিকল্পিত উন্নয়নই বিপর্যয়কে ডেকে আনে। হাওরে বড় স্থাপনা নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। জলাভূমি ভরাট করার কারণে ঢাকা শহর সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায়। নদীগুলোও মরে যাচ্ছে। তাই খণ্ডিত বা সাময়িক পদক্ষেপে আর কাজ হবে না। আমাদের দেশে 'প্রকল্প প্রীতি'র কারণে শুধু প্রকল্পই নেওয়া হয়, কিন্তু কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। এই সমীকরণ ভাঙাটা এখন অত্যন্ত জরুরি।

স্ট্রিম: সরকারি প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ইতিমধ্যে জলাবদ্ধ। আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজিক্ষেত মারাত্মক ক্ষতির মুখে। সব মিলিয়ে কৃষিপণ্যের উৎপাদনে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা দেখেন কি?

হোসেন জিল্লুর রহমান: আমরা সাধারণত ক্ষতির দিকটাই বেশি দেখি। কিন্তু আমাদের দেশের কৃষকদের ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য ক্ষমতা রয়েছে। ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী বন্যার পরও আমরা দেখেছি, মানুষ বারবার বীজতলা নষ্ট হওয়ার পরও নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এই ক্ষতি কৃষকরা কতটা পুষিয়ে নিতে পারবেন, সেটাই এখন বিবেচ্য বিষয়। ক্ষতি তো অবধারিতভাবেই হবে, তবে তা মোকাবিলার মাত্রাটাই আসল।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক পরিসংখ্যান। চমক সৃষ্টির জন্য বা খণ্ডিত তথ্যের ভিত্তিতে কথা বললে চলবে না। কোথায়, কী ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা নির্ধারণে সঠিক ডেটা অপরিহার্য। কিন্তু আমাদের দেশে পরিসংখ্যানের বিষয়ে যথেষ্ট মনোযোগ নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের মধ্যে প্রায়ই গড়মিল দেখা যায়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আমি নিজে বিবিএস-কে শক্তিশালী করার জন্য একটি টাস্কফোর্সের প্রধান হিসেবে সুনির্দিষ্ট কিছু পরামর্শ দিয়েছিলাম, কিন্তু সেগুলোর তেমন কোনো বাস্তবায়ন দেখিনি। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ অনেক সমীক্ষা পরিচালনার জন্য সরকারি তহবিল বরাদ্দ থাকে না, দাতাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। কোথায় এবং কতটুকু ত্রাণ বা সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণে নির্ভুল পরিসংখ্যান অত্যন্ত জরুরি।

স্ট্রিম: বাজার ও খাদ্যপণ্যের দামে এই বন্যার প্রভাব পড়ার কোনো আশঙ্কা আছে কি? থাকলে তা মোকাবিলায় এখনই কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

হোসেন জিল্লুর রহমান: এক্ষেত্রে আগাম সমাধানের কিছু নেই। তবে বাজারে সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় দু'ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। প্রথমত, পণ্য থাকলেও দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া এবং দ্বিতীয়ত, বাজারে পণ্যের চরম ঘাটতি দেখা দেওয়া।

উদাহরণস্বরূপ গ্রীষ্মকালীন সবজির কথা বলা যায়। উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই সময়ে প্রচুর সবজি আসে। বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়ার অর্থ হলো, একদিকে বাজারে সবজির সরবরাহ কমে যাবে, অন্যদিকে এর ওপর নির্ভরশীল কৃষক পরিবারগুলোর আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিষয়টিকে এই দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে।

এখন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ফিরে এসেছে। রাষ্ট্র এখন অনুপস্থিত নয়, বরং প্রবলভাবে উপস্থিত। সরকার, সরকারি দল ও বিরোধী দল—সবাই এখন দৃশ্যমান। ফলে দুর্যোগ মোকাবেলার মূল দায়িত্বটি এখন নির্বাচিত সরকারের ওপরই বর্তায় এবং মানুষও সেটাই প্রত্যাশা করে।

আগাম কিছু করার সুযোগ না থাকলেও, দুর্যোগের এই সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু চক্র যাতে পণ্যের অতিরিক্ত দাম আদায় করতে না পারে, সেজন্য বাজার মনিটরিং বা তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে মনে করি।

স্ট্রিম: বন্যা কবলিত এলাকাগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি পুনরুদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত?

হোসেন জিল্লুর রহমান: প্রথমত, আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানগত চিত্র প্রয়োজন। কোথায়, কার এবং কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে—তার ওপর ভিত্তি করে একটি শক্তিশালী ‘র‍্যাপিড অ্যাসেসমেন্ট’ বা দ্রুত মূল্যায়ন জরুরি। বাজেটে থোক বরাদ্দ হিসেবে বড় একটি অংশ রাখা হয়েছে, পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনার কথা বলা হয়েছে। এসব খাত থেকে অর্থায়নের পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে।

মূল বিষয় হলো, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি অনুদান, স্বল্পমেয়াদী ঋণ অথবা বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা। বন্যা যেহেতু সারা দেশে একসাথে হয় না, তাই এলাকাভিত্তিক ক্ষতির মাত্রা বিবেচনা করে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

স্ট্রিম: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য অনেক দেশে আলাদা তহবিল রাখা হয়। বাজেটের একটা অংশ আলাদা করে রাখা হয়। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হলেও আমাদের দেশে এমন ব্যবস্থা নেই কেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: আমাদের যে একেবারে কোনো বরাদ্দ থাকে না, বিষয়টি তেমন নয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট প্রকল্প ও বাজেট খাত আমাদের রয়েছে। দুর্যোগ বলতে আমরা কেবল ফসলের ক্ষতির কথা ভাবি, কিন্তু বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসে পানি ব্যবস্থাপনা এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ভেঙে পড়ে। মানুষের মানসম্মত জীবনযাপনের জন্য আনুষঙ্গিক আরও অনেক কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাজেটে যে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ রাখা হয়, তা মূলত এসব জরুরি ও আকস্মিক প্রয়োজন মেটানোর জন্যই রাখা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা প্যাকেজটিও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কথা মাথায় রেখেই করা হয়েছিল। এই তহবিলের একাংশ দ্রুততম সময়ে দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

স্ট্রিম: উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী কিংবা দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, সাতক্ষীরা—প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পুনর্বাসনের জন্য যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়, সেগুলোকে কি আপনি যথেষ্ট মনে করেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: আমাদের সম্পদ সীমিত, তাই কোনো কিছুই আসলে ‘যথেষ্ট’ নয়। ‘যথেষ্ট’ হওয়ার এই ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে; বরং আমাদের দেখতে হবে আমরা পরিস্থিতি কতটা সামাল দিতে পারছি।

মানুষ অনুদান বা ভিক্ষা চায় না, তারা চায় দুর্যোগ কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সহায়তা। আমি মনে করি, পরিসংখ্যান ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন সারা দেশই দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। একসময় শুধু খুলনা-সাতক্ষীরা বা উপকূলীয় অঞ্চলকে দুর্যোগপ্রবণ মনে করা হলেও, এখন বাঁশখালী, সাতকানিয়া বা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো এলাকাগুলোও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ফলে, ঝুঁকি মোকাবেলায় এখন সমগ্র দেশকে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে হবে।

মানুষ মূলত অনুদান বা ভিক্ষা চায় না, তারা চায় দুর্যোগ কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সহায়তা। আমি মনে করি, পরিসংখ্যান ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন সারা দেশই দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। একসময় শুধু খুলনা-সাতক্ষীরা বা উপকূলীয় অঞ্চলকে দুর্যোগপ্রবণ মনে করা হলেও, এখন বাঁশখালী, সাতকানিয়া বা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো এলাকাগুলোও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ফলে, ঝুঁকি মোকাবেলায় এখন সমগ্র দেশকে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে হবে।

স্ট্রিম: ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বন্যায় সারা দেশের মানুষের মধ্যে যে অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ততা ও জাতীয় ঐক্য দেখা গিয়েছিল, মানুষ যেভাবে সহযোগিতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল—আজ ২০২৬ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের চার উপজেলায় প্রায় দশ লাখ মানুষ পানিবন্দি থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে সেই মাত্রার মনোযোগ বা উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে না। একজন উন্নয়ন কর্মী হিসেবে মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক বা সামাজিক পরিবর্তনের কারণ কী বলে মনে করেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: এই পরিবর্তনের পেছনের ব্যাখ্যাটি বেশ পরিষ্কার। ২০২৪ সালের আগস্টের প্রেক্ষাপটটি ভিন্ন ছিল। তখন একটি সরকারের পতন হয়েছিল এবং রাষ্ট্রযন্ত্র এক প্রকার অনুপস্থিত ছিল। কারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, সেটিও তখনো নির্ধারিত হয়নি। এই শূন্যতা বা ‘ভ্যাকিউম’ পূরণ করতেই সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছিল। এমনকি ঢাকা শহরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও তখন মানুষ নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিল। এর পাশাপাশি একটি আবেগের জায়গাও ছিল—দেশ, রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুন করে বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা। সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় অংশীদার হওয়ার তাগিদ থেকেই মানুষ সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

গত দুই বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ফিরে এসেছে। রাষ্ট্র এখন অনুপস্থিত নয়, বরং প্রবলভাবে উপস্থিত। সরকার, সরকারি দল ও বিরোধী দল—সবাই এখন দৃশ্যমান। ফলে দুর্যোগ মোকাবেলার মূল দায়িত্বটি এখন নির্বাচিত সরকারের ওপরই বর্তায় এবং মানুষও সেটাই প্রত্যাশা করে।

মানুষের অংশগ্রহণ দৃশ্যত কমে যাওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ হলো আস্থার সংকট। ২৪-এর বন্যায় মানুষ যেভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও ত্রাণ সংগ্রহ করেছিল, পরবর্তীতে সেগুলোর ব্যয় ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনমনে কিছু প্রশ্ন ওঠে। অনেক ক্ষেত্রেই সংগৃহীত তহবিলের ব্যয়ের সন্তোষজনক বা স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না পাওয়ায় মানুষের মধ্যে একধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্র, সরকার বা গণমাধ্যম—সবাই সাধারণ মানুষকে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার জায়গা থেকে সরে গেছে। ঘরবাড়ি ডুবে যাচ্ছে বা শহরগুলো কেন পরিচ্ছন্ন হচ্ছে না—এসব জরুরি বিষয় বাদ দিয়ে গণমাধ্যম এখন রাজনৈতিক দলের টেবিল-আলোচনা নিয়ে বেশি ব্যস্ত। গণমাধ্যমের এখানে একটি বড় দায়িত্ব ছিল সাধারণ মানুষের কষ্টগুলোকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার। ১০-১১ লাখ মানুষ ডুবে আছে, এমন পরিসংখ্যান এলেও তাদের দুর্ভোগের চিত্রটি সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। এটি মূলত আমাদের সমাজ ও রাজনীতির সামগ্রিক দুর্বলতা।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ পিছিয়ে গেছে বা তাদের মানবিকতা কমে গেছে। মূলত প্রেক্ষাপট বদলেছে। মানুষ এখন তাকিয়ে আছে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে—তারা তাদের দায়িত্ব কতটা যথাযথভাবে পালন করছে, সেটাই এখন মুখ্য বিষয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতেও যদি কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে রাষ্ট্র বা সরকার একেবারেই ব্যর্থ বা অনুপস্থিত, তখন সাধারণ মানুষ ঠিকই আবারও আগের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসবে। কারণ, ঘোর বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর একটি বৈশিষ্ট বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে।

স্ট্রিম: মানুষ কি এখন ধরে নিচ্ছে যে সরকার ও এনজিওগুলো নিজেরাই বর্তমান পরিস্থিতি সামলাতে সক্ষম? এ কারণেই কি ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের মতো ব্যক্তিগত বা স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ কমে গেছে?

হোসেন জিল্লুর রহমান: বিষয়টি ঠিক সে রকম নয়। বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে, যারা অনেক প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে। তাই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মুখ্য দায়িত্বটি রাষ্ট্র ও সরকারেরই। মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন হলে সেটি সংগঠিত করার দায়িত্বও সরকারের। সরকার যদি একটি সন্তোষজনক ও সুস্পষ্ট কর্মসূচি সামনে রেখে মানুষের সহায়তা চায়, তবে মানুষ ঠিকই এগিয়ে আসবে। এনজিওগুলো হয়তো নিজেদের মতো করে কাজ করছে, তাই এখানকার প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। আগে যেমন একটা শূন্যস্থান বা ভ্যাকিউম ছিল, এখন তা নেই। মানুষের মধ্যে সহায়তার আগ্রহ এখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান। তবে সেই আগ্রহকে জাগ্রত করে সামনে নিয়ে আসার দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার। তারা যদি সঠিকভাবে মানুষকে আহ্বান জানাতে পারে, তবে মানুষ নিশ্চয়ই সাড়া দেবে।

স্ট্রিম: প্রায় দশ লাখ মানুষ পানিবন্দি থাকার পরও গণমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি সেভাবে উঠে আসছে না কেন? এখানে গণমাধ্যমের পলিসি বা তথ্যপ্রবাহের ঘাটতি কোথায়?

হোসেন জিল্লুর রহমান: আমার মনে হয়, রাষ্ট্র, সরকার বা গণমাধ্যম—সবাই সাধারণ মানুষকে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার জায়গা থেকে সরে গেছে। চব্বিশের পরিবর্তনের রূপকার ছিল সাধারণ মানুষ, তারাই ছিল কেন্দ্রবিন্দুতে। অথচ এখন রাষ্ট্র, সরকার বা গণমাধ্যম সবাই ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড বা 'সংস্কার'-এর মতো বিষয়গুলো নিয়ে বেশি ব্যস্ত। সাধারণ মানুষের কাছে অনেক সময় এগুলোকে কেবল 'কাগজি ব্যাপার' বলে মনে হয়।

নিজেদের ঘরবাড়ি ডুবে যাচ্ছে বা শহরগুলো কেন পরিচ্ছন্ন হচ্ছে না—এসব জরুরি বিষয় বাদ দিয়ে গণমাধ্যম এখন রাজনৈতিক দলের টেবিল-আলোচনা বা সংস্কার নিয়ে বেশি ব্যস্ত। গণমাধ্যমের এখানে একটি বড় দায়িত্ব ছিল সাধারণ মানুষের কষ্টগুলোকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার। ১০-১১ লাখ মানুষ ডুবে আছে, এমন পরিসংখ্যান এলেও তাদের দুর্ভোগের চিত্রটি সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। এটি মূলত আমাদের সমাজ ও রাজনীতির সামগ্রিক দুর্বলতা।

প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি অনুদান, স্বল্পমেয়াদী ঋণ অথবা বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা। বন্যা যেহেতু সারা দেশে একসাথে হয় না, তাই এলাকাভিত্তিক ক্ষতির মাত্রা বিবেচনা করে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

গত এক বছর ধরে যে সংস্কারের আলোচনা চলছে, তা মূলত একটি ‘এলিট’ বা অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে সম্পর্কিত পুলিশ, স্থানীয় সরকার বা শিক্ষা সংস্কার নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি, যতটা হয়েছে সংবিধান নিয়ে। গণমাধ্যমও এর বাইরে নয়; অনেক সময় ক্ষমতার গোষ্ঠীই গণমাধ্যমের মালিকানায় থাকে। তবে চব্বিশের অন্যতম বড় শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল—অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কার বা রাষ্ট্র নির্মাণ যা-ই হোক না কেন, সবকিছুর কেন্দ্রে থাকবে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন। নির্দ্বিধায় বলতে পারি, আমরা এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি।

স্ট্রিম: বাইরের পর্যাপ্ত সাহায্য ছাড়া যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন উপজেলাগুলোর মানুষের স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ? স্থানীয় প্রশাসন বা এনজিওগুলো কি একা এটি সামাল দিতে সক্ষম?

হোসেন জিল্লুর রহমান: না, কোনোভাবেই সক্ষম নয়। এ কারণেই সমন্বয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনজিওগুলোর নিজস্ব বড় কোনো তহবিল থাকে না; তারা সরকার বা বিদেশি সংস্থা থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে কাজ পরিচালনার চেষ্টা করে। অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনের বাজেটও অত্যন্ত সীমিত। সদ্য পাস হওয়া বাজেটে স্থানীয় সরকারের জন্য কতটুকু বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা দেখলেই দুর্বলতার জায়গাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও কেন্দ্রীয় সরকারকেই জোরালোভাবে এগিয়ে আসতে হবে, কারণ মূল দায়িত্বটি তাদেরই। সরকার যদি মানুষের সহায়তা চায়, তবে সেই আহ্বানটি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। সরকার যদি মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে এবং বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে আহ্বান জানায়, তবেই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসবে।

স্ট্রিম: এই মুহূর্তে জাতীয় মনোযোগ বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোর দিকে ফেরাতে এবং দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে সরকার, মিডিয়া ও এনজিওগুলোর সম্মিলিতভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

হোসেন জিল্লুর রহমান: এই মুহূর্তে প্রধানত দুটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, বন্যাকবলিত মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া, যাতে প্রাণহানি না বাড়ে। দ্বিতীয়ত, পানি নেমে যাওয়ার পরপরই রোগবালাইয়ের বিস্তার রোধে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ। অনেক সময় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চেয়েও বিপর্যয়-পরবর্তী রোগের বিস্তারে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। যেমন, আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবাইকে ত্রাণ কাজে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচিত খাদ্যের ব্যবস্থা করা। অন্যদিকে, পানি নেমে যাওয়ার পর স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এখনই যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিতে হবে।

পুনর্বাসনের জন্য সঠিক পরিসংখ্যানের বিকল্প নেই। পরিসংখ্যান না থাকলে সম্পদের অপচয় হবে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সাহায্য থেকে বঞ্চিত হবেন। পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে আমাদের গতানুগতিক চিন্তার বাইরে আসতে হবে। বাজেটে থোক বরাদ্দের বড় সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা প্যাকেজের একটি অংশ বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য নির্দিষ্ট বা ‘ইয়ারমার্ক’ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এক খাতের বরাদ্দ অন্য খাতে স্থানান্তর করা উচিত। বিশেষ করে পুনর্বাসন পর্যায়ে সঠিক পরিসংখ্যান ও যথাযথ পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

হোসেন জিল্লুর রহমান: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত